নারী ভাবনা ১২ঃ হাত বাড়িয়ে দিই
লিখেছেন নীলজোসনা, আগস্ট ১২, ২০২০ ৫:১৬ অপরাহ্ণ

চারজন পুরুষ, একটা ঘরে তাঁরা এক এক করে এসে চেয়ারে বসলেন। সামনে একটা বড় স্ক্রীন। সাদাকালোতে সেখানে দেখানো হল এক জোড়া হাত। উলটে পালটে, সময় নিয়ে, কবজি-নখ-আঙুল। প্রশ্ন করা হল, ‘বলেন তো কার হাত? যার হাত, তার পেশা বয়স জেন্ডার আন্দাজ করবেন।’ কেউ বললেন, কন্সট্রাকশন কর্মীর হাত, কারণ কড়া পড়েছে। কেউ বললেন, আঙুলের গাঁটগুলো ফুলে আছে, এ হাতের মালিক পুরুষ। কঠোর পরিশ্রম করেন হাতের মালিক কারণ নখ এক ধারে ভাঙা, একজন বললেন। নিয়মিত পরিশ্রম করা হয় এ হাত দিয়ে, কাটাকুটির দাগ বসে গেছে। তবে একটা কথা ঠিক, চারজন পুরুষের কেউই বলতে পারেন নি, কার হাতজোড়া তাঁকে দেখানো হচ্ছে। সব শেষে পাশের একটা দরজা খুলে হাতের মালিক ঢুকলেন ঘরে। চারজন ভদ্রলোকই চমকে উঠেছিলেন, দুইজন মাথা নিচু করে ঝরঝর কেঁদে ফেললেন। একজনের মা, একজনের বোন, একজনের স্ত্রী, একজনের মেয়ে, সে হাতের মালিক। যে হাত তিনি স্ক্রিণে দেখে চিনতে পারেন নি। এ হাতের কামাইতে তিনি রোজ খান, পরেন, বসেন, ঘুমান। কয়েকজনের চোখে পানি, লুকানোর সামান্য চেষ্টাও নেই সে চোখে। কি প্রচন্ড ভালোবাসা, একই সাথে অনুতাপ, কি জানি হারিয়ে ফেলার ছায়া। একজন তো মেয়ের হাত মুখের সামনে চেপে ধরলেন, মেয়েটার মুখে কি মায়ার হাসি! ভাইটা বোনটাকে বললো, আমি এখন থেকে প্লেট রেখে উঠে চলে যাবো না আর। 

ভিডিওটা দেখেছিলাম কয়েক বছর আগে, সম্ভবত সবাইকে দেখাতে চেষ্টাও করেছিলাম। বুঝলাম, এই যে মনের জায়গাটা, যেখান থেকে সিগনাল এসে কান্না বের করে দিচ্ছে, এটাকে কাজে লাগানো যায় কি করে? আজকের লেখাটা পুরুষদের জন্য। প্রধানতঃ। 

আপনি তার কাজে হাত লাগান বা ইচ্ছে থাকলেও ব্যস্ততায় পারেন না, আপনার ভালোবাসার মানুষটা টের পায়, জানেন? মৃত্যূর আগ পর্যন্ত গরম খাবার, টানটান বিছানা, ভাঁজ করা জামা প্যান্ট, সময়মত ইস্ত্রি করে আনার তাগিদ, পরিষ্কার চিরুণী-বালিশ-মশারী-কাঁথা এবং আরও কত কিছুর যোগান দিয়ে যায় অবিরাম। বিশেষ করে, যদি বড় পরিবার হয়। আপনার সন্তানের পিঠ ডলে, দাঁত মেজে দেন এক মহিলা, হয়ত আপনি আসার জন্য রাতে অপেক্ষায় থাকেন আরও এক জোড়া চোখ, যার চারপাশে ভাঁজ পড়ে গেছে, দৃষ্টি অস্বচ্ছ। কি করার আছে এঁদের জন্য? না, প্রতিদান না। তাঁদের কাজের জায়গাগুলোকে আর একটু আরামের, আর একটু স্বচ্ছন্দের করে দিতে পারেন কি ভাবে? 

এক। ঘরোয়া কাজ এবং যদি অন্যান্য গৃহস্থালী কাজও থাকে, কে করছেন, জানেন নিশ্চয়ই। তাঁর কি সহকারী আছে? না থাকলে ব্যবস্থা করে দিবেন। যাতে, তাঁর পর্যাপ্ত বিশ্রাম হয়। তাঁর শিশুরা যেন মায়ের আঁচলের ছায়া পায় আর একটু বেশি। মায়ের কোলের জন্য কান্না করতে থাকা শিশুর সামনে আপনার জন্য খাবার তৈরী হচ্ছে, এ খাবারে আফসোস আর কষ্ট মিশে থাকে। 

দুই। মহিলাদের দিনের বেশিরভাগ সময়টা কাটে রান্নাঘরে। সেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস থাকে যেন, লক্ষ্য করুন। এসি লাগেব না, একটা ব্যাটারির ফ্যানই রাখা যায়। তাতে কুটোবাটার সময়টায় ঘর্মাক্ত হতে হবে না। এগজস্ট ফ্যান না থাকলে লাগিয়ে দিন। রামায়ণের গল্প পড়েছেন? চরিত্রের শুদ্ধি প্রমাণ করতে রাবণ-রাজ্য ফেরত সীতাকে অগ্নপরীক্ষা দিতে হয়েছিলো। আপনাদের ঘরে মা-বোন-বউ-ভাবীরা রোজ অগ্নিপরীক্ষা দেন। চাইলে একটু সহজ করে দেয়াই যায় যায় সে সময়টা, তাতে আর মনে মনে কেউ বনী ইসরাইলকে অভিশাপ দিতে দিতে রান্না করবে না। বনী ইসরাইলের দোষ? ওরা রেডিমেড খাবার খেতে চায়নি, রান্নাবাড়া করতে চেয়েছিলো। 

তিন। কে রান্না করেন বাড়িতে? ভারি কাজগুলো? চাদর মশারি ধোয়া? তাঁর হাতগুলো দেখবেন। আজকাল অনেক বিকল্প আছে। কাপড় ধোয়ার মেশিন আছে, কুটোকাটারও। সামর্থ্য নেই? বিশ টাকা বেশি দিয়ে বাজার থেকে মাছ মুরগি কাটিয়েই আনুন না। মায়ের হায়াত বাড়াতে পারবেন না, অবশিষ্ট হায়াতটুকুতে আরামটা বাড়তে পারবেন। স্ত্রী হলেও একই কথা, আপনার বাচ্চাদের মা’টি আরেকটু সুস্থভাবেই বাচ্চাদের পাশে থাকুক, চানই তো, না? 

চার। মা ভাবীকে দেখে শিক্ষা হয়েছে? বউকে আর যৌথ পরিবারে দেখতে চান না? ভালো। কিন্তু যদি আপনি আর আপনার বাচ্চারা যৌথ পরিবারটিতে যান, তাহলে? যে বাড়তি পরিশ্রমটা হচ্ছে, সেটার দায়িত্ব ভাগ করে নেবেন নিশ্চয়ই? নিজেদের উৎসব আনন্দগুলোকে অন্যজনের জন্য পিঠ ভাঙা অত্যাচার বানিয়ে দিয়েন না।   

পাঁচ। কেউ ভাবতে পারেন, এ আর এমন কি? মা-বউ এরা তো চাইলেই এসব ব্যবস্থা করে নিতে পারে। হয়ত কেউ পারে, অনেকেই পারে না। কেন জানেন? আমরা মেয়েরা নিজেদের জাতের প্রতি বড় নিষ্ঠুর। যে সুবিধা হয়ত আমি শশুর বাড়িতে পাচ্ছি না, সে সুবিধা আমার বাপের বাড়িতে কারুকে পেতে দেখলে আমার গা জ্বলবে। আমি সেই পুরানো গীত ধরবো, ‘আমরা কি করি নাই? আমার মা সারাজীবন করেছেন’ ইত্যাদি। আবার কোন কোন বুদ্ধিমতী দিব্যি হেসেখেলে বেড়াবে, একজন বোকা মায়াবতীকে রান্নাঘরের উত্তাপে ঠেলে দিয়ে। কিসের জোরে? হয়ত মুখের জোর, নইলে টাকার। আপনার একই বাড়িতে দেখবেন, দুই বউ দুই মর্যাদায়, দুই মাত্রার পরিশ্রম করছেন। সবাই মেনেও নিয়েছে। মায়ের জাতি নিষ্ঠুরও হতে পারে কিন্তু। এজন্যই আপনাদের লাগবে। কাউকে ছোট করতে হবে না, বকে ঠিক করতে হবে না, যার পরিশ্রম যত বেশি, তাকে ততটুকু সাহায্যের ব্যবস্থা করে দেন। যাতে সবাইই সুস্থ থাকেন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম পান, বিকেলের আলোতে বইটা নিয়ে বসতে পারেন, একটু চা পান খেতে এদিক ওদিক ঘুরে আসতে পারেন। 

স্নেহের মূল্য শোধ না হোক, কৃতজ্ঞতাটুকু প্রকাশ হোক। কারুর যত্ন হাত পেতে নিতে যদি ছোট না হোন, কৃতজ্ঞতা জানিয়ে কিছু আরামের ব্যবস্থা করে দিতেও ছোট হবেন না নিশ্চয়ই। মেয়েদেরকে সারাক্ষণ তেল দিতে হয় না, খুন্তি কড়াই নিয়ে রোজকার যুদ্ধেও সহযোদ্ধা হওয়া লাগে না। কাজের মত কাজ একটা করে দিলেই সারাজীবন মনে রাখবে।  

Facebook Comments
পোস্টটি ২৩০ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment