হরর গল্প (হিংস্র শকুন)
লিখেছেন কুয়াশা, জুলাই ১৬, ২০১৭ ৮:৩৬ পূর্বাহ্ণ

Image result for শকুন

বাস থেকে নামতেই অঝোরে নামল বর্ষা। পাশেই পুলিশ ফাড়ি থাকায় ভিজতে হলোনা সোহানার। কি অদ্ভুত পরিস্থিতি! মাঝ দুপুরে লোকালয়হীন বাস স্টপে একটু ভয় হয় ওর। পুলিশ ফাড়ি শুধুই নামে, এ যাবতকাল কোন পুলিশ এখানে আসেনি। গ্রাম্য বাস স্টপেজ, চারেদিকে যতদূর চোখ যায় ধান ক্ষেত। খুব আনমনে ভাবটা কেটে যায় কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেখে। পঁচিশ ত্রিশ বছরের এক যুবক প্রায় অর্ধেক ভিজে গেছে তাই দ্রুতই ঢুকেছে ভেতরে। সোহানা চমকে গেছে খানিকটা। সোহানাকে দেখে বেশি ভেতরে না ঢুকে নিজ মনে ভেজা অংশটুকু রুমালে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। সোহানা নিজেকে একরকম গুটিয়ে নিল। শ্রাবণের মাঝামাঝি সময় তবুও ছাতা ব্যাগে না রাখার বোকামি এই দু’জনই করেছে। হঠাত কতগুলো শকুন এসে ঘরটির চারপাশে এসে ছেয়ে গেল।সোহানা ভয়ে প্রান হারাবার যোগাড়।যুবকটি খুব দ্রুত দরজা লাগিয়ে দিয়ে সোহানার দিকে তাকালো,

-মাফ করবেন এছাড়া উপায় ছিল না।
সোহানার ভয়ার্ত চোখে খানিক আস্থা খুঁজে পেয়ে শান্তি পেল সে।
সোহানা কাঁপা গলায় বলল,
-না ইটস ওকে! আমিও এটাই করতাম। কিন্তু আশ্চর্য হচ্ছি শকুন কেন?
যুবকটি আর কিছু বলে না। শকুনগুলো ভয়ংকর শব্দ করে চলেছে, আর ভয়ংকর তাদের চাহনি।

*
মেঘ প্রায় থেমে এসেছে। সুর্য উঁকি দিয়েছে। সোহানা ঘুমিয়ে পড়েছিল । শকুনগুলির ভয়াবহ শব্দে সে বসে বসে ঘুমালো কি করে সেটা নিজেও বুঝলো না। ঘরটা থেকে বের হয়। আশেপাশে কোথাও যুবকটি নেই। রোদের ঝলকে পানিতে ভিজে যাওয়া ধানপাতাগুলি কেমন চিকচিক করছে। সতেজ সজীব ধানক্ষেতের যতদুর তাকানো যায় চকচকে সৌন্দর্য। সোহানা বাড়ির পথ ধরে হাঁটছে। আনমনে ঘটনাটি নিয়ে ভাবছিল। সামনে সাইকেল নিয়ে এসে ছোট চাচা দাঁড়িয়ে আছেন। সোহানা তাকায়
-চাচা!
-ফোন ধরছিলে না কেন? কতবার ফোন দিয়েছে সবাই। তোমার মা সেন্সলেস হয়ে আছেন দু’দিন যাবত। কই ছিলে তুমি?
চোখ ছানাবড়া হয়ে যায় সোহানার চাচার দিকে হতবাক হয়ে তাকায়,
-কি বলছ এসব! তুমি আজকেই সকালে আমাকে কলেজ যাবার জন্য বাসে তুলে দিয়ে গেলে মনে নেই?
ওর চাচা শংকিত কন্ঠে,
-সোহানা তুমি আসলে কি কারো সাথে পালিয়ে যাবার প্লান করেছিলে? সে কি আসেনি? তিন দিন আগের কথা বলছ আজ ঘটেছে………
সোহানা রাগে কষ্টে ভাষা হারিয়ে ফেলে। শব্দ করে কেঁদে ওঠে। ওর চাচা ওকে খুব কষ্টে সামলে নিয়ে বাড়ি যায়।
পুরো বাড়ি থমথমে হয়ে আছে। কেউ সহজে কথা বলছে না। রান্না হয়নি চুলায়। সোহানার ক্ষুধা পেয়েছে প্রচন্ড। মা’র কাছে যায় এখনও শরীরে অসুস্থতার ধকল আছে।মায়ের কপালে হাত রাখে। পাশের চেয়ারে বসে মায়ের গালের সাথে গাল লাগিয়ে দেয়,
-মা! তোমরা আমাকে সন্দেহ করছ। কিন্তু যা ভাবছো তার এক বর্ণও সত্য না। আমি এও জানি না ঐ অদ্ভুতুড়ে যুবকের রুমাল আমার ব্যাগে কি করে এলো!
সোহানার মা কিছুই বলেন না। অঝোরে কাঁদছেন তিনি। গ্রামে এ নিয়ে শালিস বসবে রাতে। গ্রামের একটা মেয়ে দুই রাত কেন এভাবে উধাও ছিল? বাবা -মা এতোটা কান্ডজ্ঞানহীন কি করে হয়! এসবের জবাবদিহিতা চলবে।

*
গ্রাম্য শালিসে একঘরে করা হয়েছে সোহানার পরিবারকে। আশেপাশে কোন প্রতিবেশীর সাথে কোন কথা বা লেনদেন আজ থেকে বন্ধ। সুনির্দিষ্ট কোন কারণ যদি সোহানার পরিবার দেখাতে পারে তবেই এই সিদ্ধান্ত বাতিল বলে গন্য হবে। বাড়ির চাচা জেঠা সবাই যা নয় তাই বলে গালাগাল দিয়ে সোহানাকে ওর রুমে পাঠিয়েছে। খাবার আর বাথরুমের জন্য শুধু রুমটা খোলা হবে। সোহানার বাবা নেই মা মেয়ের পক্ষ নিয়ে কিছুই বলতে পারেননি শুধুই কেঁদেছেন। 
সোহানাদের বাড়ি মাটি দিয়ে তৈরী, মাটির সিঁড়িও রয়েছে। দো’তলার দক্ষিণ পাশটায় ওর রুম। রাত প্রায় দু’টা। চারপাশে অন্ধকার, গাছপালা আর চাঁদহীন পরিবেশে খুব ভয় করে সোহানার। সব ঠিক থাকলে ও মায়ের সাথে ঘুমাতে পারতো, কিন্তু এখন তা সম্ভব না। কখনো ভয় পেলেই ও মায়ের কাছেই ঘুমায়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁদছে অবিরাম, এতো নিশুতি রাতে ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে। বাস স্টপেজের শকুনগুলোর কথা মনে পড়ায় দ্রুত জানালা বন্ধ করে দেয়। গ্রামের পল্লি বিদ্যুত বেশিরভাগ সময়ই থাকে না। আর এখন ঠিক এখনই বিদ্যুত চলে যায়, কেবলই সোহানা ভেবেছে আজ বড় লাইটটা জালিয়ে ঘুমাবে। এখন কি করবে সে? শকুনদের শব্দ শোনা যাচ্ছে এমনভাবে যেন খুব দুর থেকে এগিয়ে আসছে ওরা। সোহানা মা বলে জোরে একটা ডাক ছাড়ে। আবারো ডাকতে গিয়ে গলা রুদ্ধ হয়ে আসে। শকুনগুলো ওর রুমের চারপাশে খুব অদ্ভুত শব্দ করে রাগ প্রকাশ করছে। সোহানা শব্দ করে কাঁদছে আর হেল্প চাইছে কিন্তু কেউ নেই কোথাও। ওর এবার মনে হলো দেয়াল ভেদ করে শকুনগুলো এক এক করে ঢুকছে কি বিভতস সে দ্রিশ্য! এক মুহুর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে ও জোরে জোরে বাবার কাছে শেখা চার কুল পড়তে শুরু করলো, সেন্স হারিয়ে মেঝেতে পড়ে গেলো তখন সোহানা।

*
এখন ভোর গলিয়ে সুর্য উঁকি দেবার কথা। কিন্ত মেঘের তোড়ে ঝুম বাদলা শুরু হয়েছে। সোহানার মা নামাজ শেষ করে সোহানার জেঠুর কাছ থেকে সোহানার ঘরের চাবি নিয়ে ওপরে ওঠেন। দরজা খুলেই মেয়েকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে কান্না শুরু করে দেন। বাড়ির সবাই সেখানে জমায়েত হয়ে সোহানার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছে। জ্ঞান ফিরলে সোহানা ওর মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে জড়সড় হয়ে বসে থাকে।ওর চাচী বলল জেঠুকে,
-ভাইজান ঐ ছেলের সাথে দেখা হবে না ভেবে হয়ত ঘুমের ঔষধ খেয়েছে।
সোহানার জেঠু রাগে অন্ধ হয়ে কর্কশ কন্ঠে বলেন,
-কি! এক্ষুনি ডাক্তার ডাক রফিক পরিক্ষা করব। এই কথা সত্যি হলে নিজে ওকে জবাই করব। অন্য ছেলেমেয়েরা যেন ভুলেও এই জঘন্য পথ না মাড়ায়। সোহানা ভয়ে চমকে উঠছে বারবার।ওর জেঠুর কথা শুনে আরো বেশি। সোহানার মা এবার সাহস করে বললেন,
-ভাইজান আপনারা ওকে একটা কথা বলার সুযোগ দিয়েছেন? আসলে কি হয়েছে জানা দরকার মেয়েটা খুব ভয় পেয়েছে বলে আমার মনে হচ্ছে।
-তুমি থাম মেঝ বউ, মেয়েকে তো অমানুষ বানিয়েছ। এই রফিক কি বললাম শহর থেকে ডাক্তার নিয়ে আয় যেইখান থেকে পারিস। সোহানার চাচা বলল,
-হ্যা ভাইজান যাই।
ডাক্তার পরীক্ষা করে কিছুই পায় না। সোহানার চোখে ভয়ের ছাপ দেখে ডাক্তার সহমর্মী হয়ে বলেন,
-তুমি কি ভয় পেয়েছো মা? 
মায়ের কোল ঘেঁসে বসে থাকা সোহানা হ্যা সূচক মাথা নাড়ে। 
-কিসের ভয়? খুলে বল আমায়। যা হয়েছে তার সবটা।
-ডাক্তারদের এসব অবিশবাসের বিষয়। আপনি আমাকে পাগল বলবেন।
-না একদম না তুমি বল। আমরা সবাই শুনবো। তার আগে বল তুমি কিসে পড়?
-ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেব এবার।
-ওকে। বল এবার।
সোহানা সবটা খুলে বলে। ওর জেঠুর সন্দেহ খানিকটা কমলেও পুরো শেষ হয় না। ডাক্তার চলে গেলে জেঠু নতুন নির্দেশ জারি করেন সোহানার প্রতি। ‘চাইলে মা চাচী জেঠির সাথে বিকালটায় বাইরে কাটাতে পারো, রাতে নিচে এসে তুমি তোমার মায়ের রুমে ঘুমিও। তবে কলেজ কোচিং সব আপাতত বন্ধ। ‘

*
গোধুলীর লালচে আভায় সোহানার মুখটা পরীর মত দেখাচ্ছে। একভাবে তাকিয়ে আছে শুন্যে। একটু অন্যদিকে তাকিয়েই বাস স্টপেজে দেখা সেই যুবকটিকে দেখে হতচকিত হয়ে মা আর জেঠিকে দেখানোর জন্য বলল,
-মা দেখ ঐ যে উনি সেদিন ওনার সাথেই দেখা হয়েছিল এদিকেই আসছেন। হয়তো রুমাল নিতে। 
ওর মা বা জেঠি কেউ দেখতে পায় না। মা কিছু বলার আগেই জেঠি খানিক তিরস্কারের সুরে,
-আবার নতুন নাটক!
কেউ দেখতে না পাওয়ায় সোহানা ভয়ে কাঁপতে লাগল। ওর মা অভয় দিতে মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
-সোহানা আমার কথা মন দিয়ে শুনবে তুমি। তুমি যে ঘটনা এর আগে বর্ণনা করেছ তাতে পুরো ঘটনা অশশরীরিদের বা জীনদের ঘটানো। সুতরাং তুমিই শুধু দেখতে পাবে আমরা না। তুমি তার সাথে কথা বল,আমি আছি। কোন ভয় নেই।
সোহানা একটু সাহস পায় ঢোক গিলে কাঁপা গলায় বলল,
-কে আপনি? কি চান?
যুবকটি অনুনয় করে বলল,
-আমি একজন জিন। কিন্তু খুবই লজ্জিত যে আপনাকে কষ্ট দিয়েছি।
সোহানা আর একটু সাহসী হয়,
-একথা কেন বলছেন? আর প্লিজ আপনার কথা কষ্ট করে আমার জেঠু সহ সবাইকে শুনাবেন?
-ওকে। 
ইতোমধ্যে ওর জেঠি বাড়ির সবাইকে ডেকে এনেছে। যুবকটি আবারো বলল,
-আমি জিন। এখন আপনি আমাকে যেমন দেখছেন ঠিক তেমন দেখতে এক লম্পট লোক ছিল। মানুষ্য প্রজাতির। মদ খেত বউ পেটাতো। তাদের ঘরে এক ছোট্ট শিশু ছিল। তো একদিন দুষ্টুমি করে আমি ওদের শিশুটির জায়গায় আমার এক প্রতিবেশীর শিশুকে ঠিক ঐ মাতালের মেয়েটির মত চেহারা বানিয়ে রেখে এসেছিলাম লোকটিকে ভয় দেখাতে। যেহেতু জীনদের ছায়া থাকেনা হয়ত মেয়েকে কোলে নিতে গিয়ে ভয় পেয়ে যাবে। কিন্তু….
থেমে থেকে আবার বলল,
কিন্তু সেদিন এতো ভয়াবহ রকমের মাতাল ছিল লোকটি সেটা আমি দেখিনি। বাড়ি ফিরে বউ পেটাতে পেটাতে ঘুমন্ত বাচ্চাটার এক পা ধরে পাকা মেঝেতে আট থেকে দশবার মাথায় বাড়ি দিয়ে মেরে ফেলে। কয়েক সেকেন্ডে ঘটেছিল ঘটনাটা, সে সময় খুব অজান্তেই ঐ লোকটির বেশ ধারণ করেছিলাম। আর তাকে ভয় দেখিয়ে দেখিয়ে দু ‘বছর ধরে মেরেছিলাম। শেষটায় ঠিক সেভাবে মেরেছি যেভাবে বাচ্ছাটার মাথা আঁছড়িয়ে মেরেছিল। একটু থামে জীন মলিন হেসে বলে,
-আমি একটু আপনাদের বাসায় যেতে চাই।
পরেরটুকু তখন বলছি। সোহানার জেঠু সম্মতি দিলেন।

*
কেউই এখনও জিনটাকে দেখতে পাচ্ছেনা শুধুই সোহানা ছাড়া। ওদের বাড়ি গিয়ে সোহানার কাছে থেকে যাওয়া রুমালটা হাত লম্বা করে ওর ব্যাগ থেকে যখন নিয়ে নিল তখন আরো একবার আতকে ওঠে সোহানা। গ্রামের মোড়লরাও ওদের বাড়ি এসে হাজির হয় সে সময়।জিন বলল,
-ঐ লোকের এই রুমালটা কি করে যেন সে সময় আমার সাথে থেকে গিয়েছিল। জিনদের সেবারের আমার প্রতি শাস্তির সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে জিন প্রজাতির হিংস্র শকুনগুলো আমার সামনে ঐ লোকটিকে খুবলে খাবে আর সেটা আমি দেখব। আরো একটা সিদ্ধান্ত হল, এই রুমাল সবসময় আমার কাছেই থাকবে। আর তাতে শিশুটির কথা মনে পড়বে। সেদিন আপনার সাথে আমার দুষ্টুমির ফলেই আজ আপনাকে কষ্ট পেতে হল। এই তিনদিন আমি আমার দেশে নিয়ে রেখেছিলাম আপনাকে আপনি বেহুস ছিলেন সোহানা। পুলিশ ফাড়িতে আমিই আপনাকে নিয়ে রেখেছিলাম। কি ভাবে যেন রুমালটা আপনার ব্যাগে থেকে গেছে। শকুনগুলো রুমালের জন্যই এসেছিল আপনার কাছে। আমি খুবই দুঃখিত! পুলিশ ফাড়িতে ঢোকা আর ঘুম থেকে ওঠার মাঝখানে আপনার দু রাত কেটে গেছে।
সোহানা উপস্থিত সবার দিকে একবার তাকায় অনুশোচনার তীব্রতা সেখানে স্পষ্ট। আর সেই জিনটি ফিরে যাবার রাস্তা ধরেছে সোহানা শুনতে পেল শকুনের হিংস্র ডাক ক্ষীন হতে হতে মিলিয়ে গেল!

পোস্টটি ৩৪০ বার পঠিত
 ২ টি লাইক
২ টি মন্তব্য

Leave a Reply

1 Comment on "হরর গল্প (হিংস্র শকুন)"

Notify of
avatar
Sort by:   newest | oldest | most voted
Joaquin Reusing
Guest

keep up wrinting

wpDiscuz