ব্যবধান
লিখেছেন কুয়াশা, নভেম্বর ১১, ২০১৭ ১১:৫২ অপরাহ্ণ

টিমটিমে আলোয় ছুটে চলেছে রিকশা। মফস্বল ছেড়ে গ্রামের পথ ধরেছে রিকশাটা। রাত গভীর হতে চলেছে, রাস্তার দুপাশের ধান ক্ষেতগুলোয় শুনশান নিরবতা। মাঝেমাঝে দু একটা রাত জাগা পাখি ডানা ঝাপটিয়ে ছুটছে! কি জানি কিসের টানে! কিসের খোজে! শীতের  রাতে দূর থেকে দু একটা আলো দেখে মনে হচ্ছে কোন অশরীরি কিছু আলো নিয়ে ছুটছে।রিকশাওয়ালা রিকশা থামিয়ে পেছন দিকে তাকালো,
-বউ!
-হুম! বল।
-ঐ দ্যাখো একটা খেজুর গাছ! রসের হাড়িতে মনে হয় অনেক রস জমছে।তুমি চাইলে আমি আইনা দিতে পারি,দুইজন মিলে…
-নাগো এটা করা ঠিক হইবনা।
-ক্যান ঠিক হইবনা? এইটা তো সরকারী গাছ সকলেরই হক আছে।
মনিরা কথা বলে না। সোহাগ বুঝে নেয় তার বউটার মন এতে সায় দেয় না। সে মুচকি হেসে বলল,
-আচ্ছা থাক!
মনিরা হঠাত ককিয়ে ওঠে,
-ও মাগো! সোহাগ রিকশা থামায় দ্রুত,
-কী হইছে?
মনিরা হাসতে থাকে পাগলের মত হাসছে সে,
-জানো……………………… হাসি আটকাতে পারে না সে।
সোহাগ অস্থির কন্ঠে,
-মনি ঠাট্টা মশকরা কর ক্যান! আমি ভাবলাম ব্যাথা পাইছো!
মনিরা হাসি থামায়,
– ব্যাথাইতো! কিন্তু এই ব্যাথা যে এতো আনন্দের তা কি আগে জানতাম? তোমার সন্তান আমার পেটের ভিতরে ফুটবল খেলতেছে।ও যতক্ষন খেললো আমি হাসি থামায় ক্যামনে কও।
-তাই! আনন্দে মুখে চোখে আলোর ঝিলিক সোহাগের,
-আগে বললানা আমি হাত দিয়ে ওর নড়ে ওঠা দ্যাখতাম!
-এর পর দেখে নিও। এখন চলো। কত রাইত! দশটা পার হইছে মনে হয়। এই এতো রাইতে মুরুব্বিরা গর্ভবতী মহিলাকে বাইরে দ্যাখলে খবর আছে। সন্ধ্যা লাগলেই আর আকাশের নিচে যাইতে দ্যায় না।
– হ বউ চলো। খুব ইচ্ছা হল তোমারে রাতে এই রিকশায় করে আনতে তাই… সাবধানে থাইক্যো,কম্বলটা ভালো কইরা জড়াইয়া নাও আর ধইরা  বস কিন্তু।
-আচ্ছা! বাড়ি গিয়া মাকে ফোন দিতে হইব মনে কইরো।
-আম্মায় আমারেও বলছে, দিব টেনশন কইরো না!


সোহাগ মনিরার মুখে খাবার তুলে দেয়,
-তুমি হেলান দিয়া বস, পিঠে ব্যাথা করতাছে তাই না?
-নাহ! বেশি না, আমি নিজেই খাই, তুমিও নাও মা তোমার পছন্দের কবুতরের গোশত রান্না কইরা দিছে।
-আচ্ছা নেই তুমি আগে খাও মনিরা।
-না একসাথে খাব, তুমিও নাও… জানো সোহাগ! আজ এক মহিলারে দ্যাখলাম ডাক্তার আপার সামনে কাদতেছে!
-ক্যান? আগ্রহী চোখে মনিরার দিকে তাকায় সোহাগ।
-ডেলিভারীর তারিখ আজই, মহিলারে একা পাঠাইছে তার স্বামী। সিজারের জন্য সই লাগবে, কিন্তু কেউ নাই! স্বামীরে ফোন দেয় ধরে না। গাড়িতে করে একা আসছে। কেমন লাগে বলতো! যে সন্তান দুনিয়াতে আসবে সে কি শুধুই সেই মহিলার?
-আমি জানি বউ বড় বড় লোকেদের ঘরে অনেক পয়সা থাকে, গাড়ি থাকে, বড় বড় বাড়ি থাকে।কিন্তু ওদের মধ্যে ভালোবাসতে জানে খুব কম মানুষ। আমি তোমারে একটা কথা দিলাম। কোনদিন একা ছাড়বনা তোমারে।যে কষ্ট করে তুমি আমারে সন্তান উপহার দিবা সেই সন্তানের বাবা হিসেবে সাথে থাকতে না পারা খুব দূর্ভাগ্যের জানোতো!

রাত গভীর হয় মনিরার ঘুমহীন চোখে সোহাগের চোখ মনিরা বকবক করে আর সোহাগ ওর মাথাটায় প্রেমের পরশ বুলিয়ে দেয়! মনিরা ভাবে, এই রাতগুলো যেন শেষ না হয় কোনদিন!

পোস্টটি ১১৭ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
২ টি মন্তব্য

Leave a Reply

2 Comments on "ব্যবধান"

Notify of
avatar
Sort by:   newest | oldest | most voted
শুকনোপাতার রাজ্য
Member

সুখ তো এমনই। এর রঙ ভিন্ন হলেও সব সময়ই রঙ্গিন

wpDiscuz