উজ্জয়িনী সিরিজ-৮
লিখেছেন কুয়াশা, জানুয়ারি ৬, ২০১৮ ১২:০৭ অপরাহ্ণ

প্রহরগুলো…

কফির মগে ছোট্ট একটা চুমুক দিলো উজ্জয়িনী।পুরো বাড়ি অন্ধকার।মাগরীবের নামাজ পড়েছে সে একটু আগেই।একাকী বসে আছে বেলকণির এক কোণে শীতের তীব্রতা ওকে স্পর্শ করছে না যেন। হু হু করে শীতল বাতাস বইছে, কিন্তু উজ্জয়িনী নির্বিকার! পুস্পিতা মাঝে মাঝে এসে ওকে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু না বলেই আবার চলে যাচ্ছে, ভয় পাচ্ছে আবার না এলোমেলো কান্ড করে বসে। এবারো এসেছে ঘরে এসে বসতে বলার জন্য, ঘরে লাইট জ্বালানোর অনুমতি চাইতে এসে থমকে দাঁড়িয়ে আছে বেলকণির দরোজায়। সে দেখতে পাচ্ছে, উজ্জয়িনী অন্য একটা মগে নিজের কফির অর্ধেক ঢেলে বললো,
-মা! আজ কফিটা অনেক টেস্টি হইছে, খেয়ে দেখ।আর ভাগ করে খেলে তো মজা দ্বি-গুণ বেড়ে যায় তাইনা মা?
পুস্পিতার চোখ ভিজে ওঠে, নিজের কাছেই মনে মনে বলে সে, “এতো শক্ত মানসিকতার একটা মানুষ, কতটা ভেঙ্গএ পড়লে এমন করতে পারে! আল্লাহ তাকে ধৈর্য দিন আপনি”!
আনমনে ভাব কাটিয়ে আবারো মনোযোগী হয়, উজ্জয়িনী কথা বলে চলেছে,
-মা জানো এভাবে তুমি পাশে থাকলেই আমি কেবল সব সামলিয়ে উঠতে পারি! আরমান আমাকে ওদের বাড়িতে যেতে বলছে, আমি কি করে যাই বলো? কোনভাবেই সম্ভব না তোমাকে এভাবে রেখে যাওয়া। আর জানো, ……… মা ! ওমা! তুমি একটু আমার সামনে আসতে পারবে মা! এসো না ! একবার…… শব্দ করে কেদে ফেলে, বুকের ভেতরে বয়ে চলা ঢেউটা এবার উছলে উঠেছে ওর চোখের কোণ অবধি। পুস্পিতা কাছে যায় জড়িয়ে ধরে,
-আপা মনে পড়ে তোমার, যখন আমার মা মারা যায় তখন তুমি আমার কাছে গিয়ে কী বলেছিলে আমায়?
থেমে যায় উজ্জয়িনী, পুস্পিতা বলে চলেছে,
-তুমি বলেছিলে, “এভাবে কেদো না, তুমি কাদলে তোমার মা কস্ট পাবে যে। আজ থেকে তুমি আমার ছোট বোন, আমি তোমাকে আমার বাড়ি নিয়ে যাব।” এখন তুমি খালাম্মাকে কষ্ট দিচ্ছো কেন? আজ কতোদিন হলো প্রায় দেড় মাস হতে চলল তুমি এমন করছো, সবাইকে চলে যেতে বলেছো, ভাবী বাচ্চাগুলো তোমাকে দেখার জন্য প্রতিদিন ফোন করছে……আরমান ভাইয়া আসলেও তুমি তেমন কথা বলছো না,তোমার শাশুড়ী কতোবার তোমাকে নিতে এসে ফিরে গেলো। এসব দেখলে খালাম্মা কষ্ট পেতো না বলো? কেন এমন করছো? আমি আমার দেখা মানুষ গুলোর মধ্যে তোমার মতো শক্ত মনের মানুষ আর কাউকে দেখিনি, শত ঝড়-ঝাপ্টা সামলিয়ে কেমন সোজা হয়ে দাড়াতে দেখেছি তোমাকে, সেই তোমাকে আমি মিলাতে পারছি না আপা!
উজ্জয়িনী কথা বলে না পুস্পিতাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আবার কাদে! চিৎকার করে কাদে, তখন আকাশে কতোগুলি বাদুড় ডানা ঝাপটিয়ে শব্দ তুলে নিজের আগমন আর প্রত্যাবর্তনের চিহ্ন রেখে যেতে চাইলো, কিন্তু ওর কান্নার শব্দে তা কেবল ব্যার্থ হয়ে গেলো।

উজ্জয়িনী ঘরে আসে রাত এগারোটায়, পুস্পিতার দিকে তাকিয়ে মলিন হাসে,
-পুরো বাড়ি আলো জ্বালাও, বিছানার চাদর, পুরোনো পর্দাগুলো সব খুলে ফেলো। আজ আমি সাজাবো পুরোটা, নিজেও সাজবো, খুব ভালো কিছু রান্না করবো, আরমান আসবে হয়তো একটা দেড়টার দিকে এর মধ্যে সব হয়ে যাবে বলো, মা খুব খুশি হবে তাই না?
পুস্পিতা আনন্দিত হয়, ওর বলা কথাগুলোয় কাজ হয়েছে ভেবে,
-হ্যা আপা অবশ্যই, আমি মশলা বেটে তোমাকে রান্নার সব কিছু রেডি করে দিচ্ছি এর মধ্যে তুমি সব গুছিয়ে ফেলো, শাড়ি কোনটা পরবে বলো আমি বের করে রাখছি…
-আচ্ছা, তাই করো।
আরমান ঢুকেই আশর্যান্মিত হয়ে যায়, ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে পুরো বাসা পরিপাটি করে সাজানো, সুগন্ধে ভরে আছে চারপাশ, খাবারের গন্ধে ওর ক্ষুধা বেড়ে গেলো অনেক।উজ্জয়িনী গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে আরমানের বুকে মুখ গোজে, আরমান কিছু না বলে শক্ত করে জড়িয়ে থাকে ওনেকক্ষণ, মাঝে মাঝে কান্নার তীব্রতায় দুলছে উজ্জয়িনীর শরীর, আরমান ওকে কাদতে দেয় ওভাবেই জড়িয়ে থাকে, ওর নিজেরো ঝাপসা হয়ে আসে দুচোখ…… উজ্জয়িনী নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়, মুখ তুলে আরমানের দিকে তাকায় ধরা গলায় বলে,
-পুরুষ মানুষ কাদে নাকী? হুম!
আরমান না বোধক মাথা ঝাকায় বলে,
-এমন মিষ্টি বউয়ের বর কাদে! কাজলে লেপ্টে যাওয়া চোখে নতুন করে কাজল পরানোর লোভে কাদে! দেবে পরাতে?
উজ্জয়িনী মাথা ঝাকায়, ভেতরের উদবেলিত আলোড়ন মুখে প্রকাশিত হয় অনায়াসেই। আরমান যত্ন করে কাজল পরিয়ে দেয়, শাড়ির কুচি ঠিক করে দেয়, মুচকী হেসে বলে,
-আমাকে কে সাজাবে?
উজ্জয়িনী অবাক হয়ে তাকায় একই কালারের পাঞ্জাবী বের করে ওকে পরিয়ে দেয়, চুল আচড়িয়ে দেয়। টেবিলে খেতে বসে একসাথে। আরমান লাইট নিভিয়ে দিয়ে মোমবাতি জ্বালায়…………

সকালের সূর্য অনেক আগেই ওদের ঘরের জানালা পেরিয়েছে, ভারী পর্দায় তা কেবল আটকে আছে। আরমান উজ্জয়িনীর ঘমন্ত মুখটা দেখছে অনেক সময় ধরে, অনেকদিন হলো ওকে ঘুমাতে দেখেনি, অনেকদিন! কতো টা ধকল পেরিয়ে এসেছে অনুভব করে কপালে চলে আসা অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দেয় আধভেজা চুল থেকে সুগন্ধ নাকে লেগে থাকলো অনেক্ষণ। আরমান ফোনের শব্দে চমকে ওঠে, খুব দ্রুত রিসিভ করে,
-মা!
-হ্যা বাবা কি অবস্থা উজ্জয়িনীর?
-ও ঘুমুচ্ছে মা, আজ অনেকদিন পর, কন্ঠ আরো নিচু করে, গতকাল পুরো বাসা সাজিয়েছে, নিজে সেজে রান্না করেছে… আলহামদুলিল্লাহ।
-আলহামদুলিল্লাহ। ও যেদিন বলবে সেদিনই বাসায় নিয়ে আসবে, তুমি নিজে থেকে কিছুই বলো না। আর কাজে জয়েন করতে চাইলে না করো না, তাতে মন ভালো থাকবে, ব্যস্ততা অনেক কিছু ভুলিয়ে দিতে পারে। ওর ভাবী কি এসেছে?
-না আসেনি, সে ব্যাপারে কথাও হয়নি, তবে শাশুড়ি মা মার যাবার আগে একবার আমাকে বলেছিলো, ভাবীকে বিয়ে করিয়ে দিলে কেমন হয় বলো তো?
-খুব ভালো চিন্তা, ও সুস্থ হোক, ওর ভাবীর মতামত জেনে না হয় ছেলে দেখা শুরু করা যাবে কি বলো?
-হ্যা মা , বাবা কই একটু দাও কথা বলি, কতদিন দেখা হয় না তোমাদের সাথে!
-হুম,মিন বলছে খুব তাড়াতাড়ি দেখা হবে ইনশাআল্লাহ। নাও কথা বলো তোমার বাবার সাথে।

পোস্টটি ৫৪ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

Leave a Reply

Be the First to Comment!

Notify of
wpDiscuz