সবুজ ও বৈশাখ
লিখেছেন কুয়াশা, নভেম্বর ২১, ২০১৪ ৪:৪৭ অপরাহ্ণ

কেরোসিনের হ্যারিকেন নিভু নিভু। সলতে বাড়িয়ে দিয়েও কাজ হচ্ছেনা। এই আলোতে চোখ বড় বড় করে পড়ছে সবুজ, মাঝে মাঝে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। কিন্তু কিছুই করার নাই, বিজ্ঞান স্যারের পড়া না করলে কল হাত ফাটিয়ে বাড়ি আসতে হবে। সবুজ ক্লাস ফাইভে পড়ে। ওর দৃষ্টি আবারো ঝাপসা হয়ে আসে, বিরক্ত হয়ে মায়ের দিকে তাকায়। ওর পাশে বসেই মা তালপাতার পাখা বানাচ্ছিলো, এসব তালপাতা প্রতি এক সপ্তাহ পরপর সবুজ বিনাইপাড়া হাটে বিক্রি করে আসে, আর সেই বিক্রির টাকা দিয়ে পরবর্তী এক সপ্তাহ কোনমতে চালিয়ে দেয় সবুজের মা। সবুজের বাবা অনেক আগেই মরা গেছে। সবুজ তাকিয়ে দেখে মা ঝিমুচ্ছে, সে ডাকে,
-মা! ওর মা ঝিমুতে ঝিমুতে একটু সজাগ হয়,
-কও বাজান। কথা শেষ করে আবারো ঝিমুতে থাকে, সবুজ ডাকে,
-মা ওমা ওডোনা, গুমাইতাছ ক্যান? ওর মা গালে পড়ে রক্ত খাওয়া মশাটাকে ঠাস করে মারে, হাত হ্যারিকেনের কাছে নিয়ে,
-দ্যাকছো কতো রক্ত খাইছে! হাতের রক্ত বিছানায় মোছে,
-বাজান কও কি হইছে? ডাকতাছ ক্যান? সবুজ আহলাদের স্বরে,
-ওমা হ্যারিকেনে কেরোসিন নাই, পড়ুম ক্যামনে, কেরোসিন ঢাইলা দেও। সবুজের মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
-আইজ আর পইড়োনা, কেরোসিন একটু আছে, কাইল অব্দি চালাইতে অইবো, তুমি সকাল সকাল ওইডা পইড়ো।
সবুজ আর কিছু বলেনা, বই খাতা উঠিয়ে পাশের ভাঙ্গা এক টেবিলে রেখে দেয়, ওর মা খাওয়ার আয়োজনে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে, সড়াৎ সড়াৎ শব্দে মাটির হাড়ি থেকে পান্তা ভাত তোলে, সবুজের দিকে প্লেট এগিয়ে দেয়, তাতে দু চিমটি লবণ আর একটা কাঁচা মরিচ। নিজের প্লেটে সামান্য পান্তা ভাত আর অনেকটা পানি নেয়, সবুজ প্রতিদিনের মতো আজও মায়ের প্লেটের দিকে আঁড় চোখে তাকায়, চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আজ একটা নতুন কথা বলে,
-রোজ রোজ পান্তা খাইতে বালা লাগেনা, তাও খালি এই মরিচ দিয়া। ওর মায়ের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে,অন্ধকারে চোখ মোছে, পরে স্বাভাবিক কন্ঠে বলে,
-সবুজ! তুমি যেদিন বড় হইবা, পড়ালেখা কইরা চাকরী করবা, সেইদিন থাইক্যা আমরা আর পান্তা ভাত খামুনা! সবুজের মনে নতুন আশা জাগে , নতুন স্বপ্নে বিভোর হয়ে সে পান্তায় নতুন স্বাদ অনুভব কে খুব দ্রুত প্লেটের পান্তা শেষ করে।


সবুজ পড়ালেখায় আরো সিরিয়াস হয়, মায়ের কথা মনে করে, প্রচুর পড়াশুনা করে, ভোরের আলোর অপেক্ষা করে পড়তে বসার জন্য, সবুজদের বাড়ীর পাশের এক দোকানী সবুজকে ডাকতে যায় নিজের মোবাইল নিয়ে, উৎসাহী কন্ঠ দোকানীর,
-সবুজ তোর খালাই ঢাকা থেকে ফোন করছে, তোর মারে ডাক, ওর মা এসে ফোন ধরে, ইতস্তত কন্ঠে,
-হ হ্যালো, হ্যালো! ওপার থেকে মহিলা কন্ঠ,
-আপা আমি আন্জুমান।
-ও আন্জু বালা আছো?
-হ্যা ভালো আছি, তোমরা ভালো আছো? সবুজ কেমন আছে? দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে,
-আর বালা, আল্লাই যেমন রাখছে, সবুজ এহানেই কতা কইবা?
-হ্যা বলবো, আপা একটু শোন আগে, কাল সকালে তুমি আর সবুজ ঢাকায় আসো, তোমার পাখাগুলো নিয়ে আসবে, ওগুলো এখানে ল বিক্রি করলে অনেক টাকা পাবে। সবুজের মা মলিন কন্ঠে,
-সবুজের স্কুল আছে, আর বিক্রির ট্যাহাতো যাওয়া আসাতেই শেষ হইয়া যাইবো। আন্জুর অভিমানী কন্ঠ,
-আপা তোমার বোন আছেনা! যাতায়াতের চিন্তা তোমার করতে হবেনা, আর কালতো সবুজের স্কুল বন্ধ, পহেলা বৈশাখ না! সবুজকে দাও।
সবুজ মোবাইল হাতে নেয়, লজ্জাজড়িত কন্ঠে সালাম দেয়, খালার কথা শোনে, ওর খালা বলছে,
-সবুজ কাল তোমার স্কুল বন্ধ তাইনা?
-হ বন্ধ
-তুমি তোমার মায়ের তালপাখা গুলোতে কিছু নকশা আঁকবে, এই ধরো নৌকা, তবলা আর সুন্দর করে পহেলা বৈশাখ কথাগুলো লিখবে পারবেনা? অবশ্যই পারবে, তোমার সাইন পেনগুলো আছেনা?
-আছে
-ওগুলো দিয়েই আঁকবে ঠিক আছে?
-আচ্ছা। কথা শেষে মোবাইল দোকানদার চাচাকে দিয়ে আসে সবুজ। আর খুশিতে গদগদ কন্ঠে দোকানদারকে বলে আসলো,
-কাল আমরা ঢাকা যাব।
ফিরে এসে মায়ের বানানো পাখায় নকশা আঁকে, রঙ করে সবুজের মা নিজের বানানো পাখা নিজেই চিনতে পারেনা। অেক রাত অব্দি এই কাজগুলো করে সবুজ, কারণ কালই যেতে হবে। পরে খাওয়া শেষে তেল চিটচিটে ময়লা বালিশে মাথা রাখে মা ছেলে, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ওরা। এই ঘর এই চৌকিটা ওদের কাছে খুবই আপন!


ঢাকার রাজপথে হাঁটছে মা ও ছেলে। সবুজের মা সবুজের বাবার সাথে অনেকবার এসেছে, কিন্তু সবুজ কখনোই আসেনি। সে অবাক হয়ে দেখছে বড়ো বড়ো বিল্ডিংগুলো। রাস্তার পাশের দোকানগুলো থেকে গান ভেসে আসছে, সবুজ শোনার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছু গানের কিছুই বোঝেনা। মাকে জিজ্ঞেস করে,
-ওমা বুজা যায়না ক্যান? মায়ের সংক্ষিপ্ত উত্তর,
-তুমি বুজবানা। এবারে একটা দোকানের গান সবুজ বুঝতে পারে
“তোমার হাত পাখার বাতাসে………” সবুজ মনে মনে হাসে, মাকে বলে,
-ওমা দ্যাখো তোমার লাইগা এই গানডা গায়। সবুজের মা অবাক হয়,
-তাইতো! সবুজ গদগদ কন্ঠে,
-খালায় মনে অয় গাইতে কইছে তাইনা?
-অইতে পারে। সবুজ এবার থেমে যায় আবারো আশেপাশে দেখায় ব্যাস্ত হয়ে যায়। হঠাৎ ওর দৃষ্টি আটকে যায়, অবাক ও বিস্মিত কন্ঠে,
-ও মা কতো বড় শাপলা! মাকে কিছু প্রশ্ন করার আগেই ওর খালু আসে, হাস্সোজ্জ্বল কন্ঠে,
-সবুজ কেমন আছো? আপা আসেন এইযে সি এনজিতে ওঠেন।
সি এন জিতে বসে সবুজ কথা বলে,
-খালু অত বড় শাপলা ওইহানে ক্যামনে অইলো?
সবুজের খালু ইমরান আহমেদ বুঝিয়ে দেন,
-ওটা আসল শাপলা ফুল না, ওটা ইট সিমেন্ট বালু দিয়ে বানানো।
অনেক জ্যাম পেরিয়ে খালার বাসায় ঢোকে ওরা। সবুজ খালাকে সালাম দিলো, ওর খালা গভীর আবেগে ওর কপালে চুমু দিয়ে বড় বোনকে লক্ষ্য করে,
-আপা এসো ভেতরে এসো। সবুজ এরকম বাড়ী কোনদিনই দেখেনি, কী সুন্দর সাজানো, সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় ও সিঁড়িগুলো গুণেছে। ওর খালার কোন ছেলে মেয়ে নেই, কাজের ছেলেটাকে গলা চড়িয়ে ডাকে আঞ্জমান,
-রহীম, একটু এদিকে আয়তো। সবুজের ময়ের দিকে তাকিয়ে,
-আপা পাখাগুলো বের করে দাওতো, রহীমকে দিয়ে দিই ও বিক্রি করে আসুক। সবুজের মা প্রায় তিরিশটার মতো পাখা বের করে দেয়, সাথে এক্সট্রা একটি পাখা বের করে বোনের হাতে দেয়,  সবুজ মিটিমিটি হাসে। আঞ্জুমান পাখা হাতে নিয়ে,
-বাহ সুন্দরতো! এরইমধ্যে কাজের মেয়েটি হরেক রকমের নাস্তা নিয়ে আসে। সবুজ তখন থেকে একটা কথা খালাকে বলার জন্য উসখুস করছে, এবার তাই বলেই ফেলে মাথা নিচু করে,
-খালা আমাগো ধর্ম স্যার কইছে, আল্লাহর নামে যে মানুষগুলানের নাম, সেই নাম ডাকার সময় আব্দুর, আব্দুস, বা আব্দুল কইতে অয়। আঞ্জুমান হাসে,
-হুম ঠিকই বলেছো, ওকে তাহলে আব্দুর রহিম বলে ডাকবো।


দুপুরের খাওয়ার জন্য ডাইনিং টেবিলে সবাই। সবুজ সবুজের মাও বসেছে, সবুজ খাবারের আইটেমগুলো মনে মনে গোনে মাছ ভাজা, আলুভর্তা, মাছের ঝোল, গরুর মাংস, মুরগীর মাংস, শাকভাজি, ডাল, কাঁচা মরিচ, গরম ভাত, পান্তাভাত। সবুজ বিস্মিত হয়ে মনে মনে বললো, এরাও পান্তা খায়? সবুজের মা প্রশ্নই করে ফেললো,
-আন্ঞ্জু পান্তা ক্যান?
-আপা আজ না পহেলা বৈশাখ! সবুজের মায়ের মুখটা মলিন হয়ে যায় ভাবে, ও এরা তাহলে শখ করে পান্তা খায়, আর আমরা প্রতিদিন! সবুজের খালু হাসিমুখে বললো,
-আপা সবুজ আমাদের সাথে থেকে যাক, আমরা ওকে ভালো স্কুলে পড়াবো। সবুজের মা কিছু বলার আগেই কাজের ছেলেটা সবুজের মাকে দুই হাজার াকা নিয়ে এসে দেয়, কাকা গুো খুচরা পঞ্চাশ একশো করে নোট, অবাক হয়ে সবুজের মা,
-অমা এতো ট্যাহা? আঞ্জুমান বোনের প্লেটে বড় ইলিশ মাছের একটা পিস তুলে দিয়ে,
-বল্লামনা আপা, সবুজের মা কাজের ছেলেটার হাতে বিশ টাকার একটা নোট গুজে দেয়, আঞ্জুমান হাসিমুখে,
– সবুজ থাকবা আমাদের সাথে? সবুজ মলিন কন্ঠে,
-না খালা মারে ছাইড়া আমি থাকতে পারুমনা! সবুজের মা খুশি হয়, সবুজ খাবার খায় আর প্রশ্ন করে,
-এই হানে কতোক্ষণ ধইরা গাড়ী দাড়াইয়া থাকে, ক্যান?
ইমরান সিগনালের ব্যাপারটা সবুজকে বুঝিয়ে দেয়। সবুজ হেসে বললো,
-খালা তোমরা কী একদিনই পান্তা খাও?
-হ্যা সবুজ, আজকের দিনই। সবুজ হেসে বলে,
-কী মজা, তোমরা গরম ভাতের বড়লোক, আর আমরা পান্তাভাতের, ঠিক কথা না মা? সবুজের মা এই কথা শুনে খুশিতে হেসে উঠে, মনে মনে ভাবে কী বুদ্ধির কথা বলেছে তার ছেলে,
-হ তাইতো! কিন্তু আঞ্জুমান আর ইমরাণের মুখ মলিন হয়ে যায় দুজন দুজনের দিকে তাকায়। সবুজ মায়ের মুখের দিকে তাকায়, মায়ের এই ঝলমলে হাসিতে সবুজের মন ভরে যায়।

পোস্টটি ৪৮৪ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
১ টি মন্তব্য
একটি মন্তব্য করা হয়েছে

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.