উজ্জয়িনী সিরিজ-৬
লিখেছেন কুয়াশা, অক্টোবর ১৬, ২০১৬ ৭:৫৬ অপরাহ্ণ

Image result for নির্ভরতা

ছায়া

রিকশায় বসে আছে উজ্জয়িনী। অনেক বেশী নেতিয়ে পড়েছে যেন! খুব অস্থির ভঙ্গীমা ওর দু চোখ জুড়ে।জ্যামের কারণে রিকশা একটুও নড়ছেনা। প্রায় লাফিয়ে রিকশা থেকে নামে, ভাড়া মিটিয়ে ফুটপাত ধরে খুব দ্রুত হেটে যায়। বারবার ঘড়ির দিকে তাকায়।অনেকদুর পর্যন্ত হেটে বিশাল এক বটগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে যায় চারপাশে অনেকবার তাকিয়েও কাউকে আসতে না দেখে দীর্ঘশাস ফেলে। মোবাইল বের করে মায়ের নাম্বারে কল করে…… ও পাশ থেকে একজন রিসিভ করে,
-হ্যালো, আপা!
-হ্যা পুষ্পিতা, মা কি করছে?
-খালাম্মাকে এখনই খাইয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ আগে ঘুমিয়েছেন।
-ঠিক আছে তুমি পাশেই বসে থাকো, টিভি দেখতে যেওনা, মা উঠে গেলে বুঝতে পারবেনা। বুক সেলফ থেকে একটা বই নিয়ে পড়। অখানের সবগুলো বই আমার অনেকবার পড়া, তাই ফিরে এসে তোমার কাছে বইয়ের সারসংক্ষেপ শুনবো।
-জি আপা, আমি খালাম্মার পাশে বসেই পড়বো, তুমি টেনশন করবেনা।
-হুম, রাখছি। আল্লাহ হাফেজ।

 

প্রায় দশ মিনিট পর এক প্রৌড়াকে রিকশা করে আসতে দেখলো উজ্জয়িনী, রিকশা এসে ওর সামনে থামলো। সবগুলো চুল সাদা হয়ে গেছে। শুনেছিলো বয়স সত্তরের কম হবেনা। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে চল্লিশ ছুই ছুই করছে। মহিলার পরণে লং কুর্তি, জিন্স! চুলগুলো রাবার ব্যান্ট দিয়ে বেধে রাখা।ওড়না যেন না পরলেই নয় তাই পরেছেন। উজ্জয়িনীকে অঙ্গুলী নির্দেশ করে বললেন,
-তুমি উজ্জয়িনী?
-জি! আপনি মিসেস আনোয়ারা!
-হুম, রিকশায় উঠে এসো।
উজ্জয়িনী কেমন জড়সড় হয়ে রিকশায় উঠে বসে, কি এক সংকোচ ওকে ঘিরে ধরেছে। মিসেস আনোয়ারা গভীর ভাবে উজ্জয়িনীকে দেখে,
-চেহারার একী হাল করেছো? ২৫ ২৬ বছরের তরুণী মেয়ের এমন হাল দেখে সত্যিই খুব কষ্ট হচ্ছে আমার।
উজ্জয়িনী অবাক হয়ে মহিলার দিকে তাকায়, বিব্রত কন্ঠে,
– আপনি আমাকে চিনতেন?
-হ্যা অবশ্যই, তোমার বড় ভাইয়া উমায়েরের বিয়েতে দেখেছিলাম, লাবন্যে ভরপুর এক অসম্ভব সুন্দরী মেয়ে ছিলে।আজ কোনভাবেই মেলাতে পারছিনা।
দীর্ঘশাস ফেলে মাথা নিচু করে উজ্জয়িনী, আর কিছু বলেনা! 

 

বেশ কিছুক্ষণ রিকশার টুংটাং আওয়াজই শুধু শোনা যাচ্ছে, কেউ কোন কথা বলছেনা। উজ্জয়িনীর মনে হলো ও কোন মফস্বল শহরে এসেছে। ঢাকার চিহ্ন বা ছিটেফোটাও নেই যেন।উজ্জয়িনী এবার বলল,
-আর কতদুর ম্যাম? আসলে মা অসুস্থ তো সেজন্য বলছিলাম!
– এই আর পাচ মিনিট, আমাকে আন্টি বল, ম্যাম নয়। একটু থেমে, কি হয়েছে তোমার মায়ের?
-উমায়ের ভাইয়া মারা যাবার পর থেকে নির্বাক হয়ে গেছেন, কারো কথা শুনতে পান কিনা বুঝা যায়না। নিজের মর্জিমত চলেন। দুমাস হতে চলল নিজে হাতে খাবার খাননা। হাসেননা, মাঝে মাঝে শুধু কাদতে দেখি।

মিসেস আনোয়ারা মলিন কন্ঠে,
-অহ! এতোটুকুনি একটা মেয়ে কতকিছু সামলে চলেছ! তবে তারপরও একটা উপদেশ তোমায় দেবো সেটা হল নিজের শরীরের যত্ন নাও। আট বছর আগে যে ছেলেটি তোমার জন্য মরতে পারবে বলে ভাবত, সে আজ তোমাকে এমন দেখলে ফিরেও তাকাবেনা মা! তোমার একটা ভবিষ্যত আছে সেটা ভুলে যেওনা সৌন্দর্য ছাড়া মেয়েদের মুল্য নেই।
কান্না চলে আসে উজ্জয়িনীর, ভাবে হয়তো তাই, আরমান সেজন্যই এখন বিয়ে নিয়ে আর কিছুই বলেনা। দেখা হয় কথা হয় কিন্তু বিয়ে নিয়ে কোন কথা বলেনা, এতো ঝড় বয়ে যাওয়ার পর খুব ইচ্ছে করে উজ্জয়িনীর যে, ওর পাশে একজন ছায়ার মত আছে। দিনশেষে যার বুকে মাথা রেখে সে দশ মিনিট নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে!

 

 

ওর ভাবনায় ছেদ পড়ে, মিসেস আনোয়ারা রিকশা থামাতে বললেন ভাড়া মিটিয়ে দেন তিনি। উজ্জয়িনী সংকুচিত কণ্ঠে,
– আমি দিতাম আন্টি!
মিসেস আনোয়ারা ক্রত্রিম ধমকের সুরে,
-মায়ের বয়সী কেউ থাকলে মেয়েদের কে ভাড়া দিতে হয়?
আর কিছু বলেনা উজ্জয়িনী।সামনেই একটা বাড়ি পুরোনো আমলের একতলা ছাদ দেয়া বাড়ি। রংগুলো খসে পড়ার মত অবস্থা। দরোজায় নক করেন মিসেস আনোয়ারা। একজন আঠারো বিশ বছরের ছেলে দরজা খুলে দিয়ে ভ্রু কুচকিয়ে,
-কাকে চান?
মিসেস আনোয়ারা বললেন,
-শায়লা আছে?
-জি আছে, আসুন।
মিসেস আনোয়ারার পিছু পিছু ঢোকে উজ্জয়িনী, চারপাশে ভালোভাবে দেখে নেয় ভেতর থেকে একজন বলল,
-আদিল কে এসেছে বাবা?
–আপুর কাছে এসেছে মা! আপুকে ডেকে দাও। কথাটা শেষ করে মিসেস আনোয়ারার দিকে তাকায়, পাশেই ড্রয়িং রুম দেখিয়ে,
-ভেতরে গিয়ে বসুন। একটু দাঁড়িয়ে, উজ্জয়িনীর দিকে লক্ষ করে,
-আপনাকে বেশ চেনা মনে হচ্ছে, কোথাও দেখেছি বলে মনে হচ্ছে!
উজ্জয়িনী কোথাও একটা হারিয়ে গিয়েছিলো নিজের অস্তিত্ব টের পায় আদিলের কথায়, নিজেকে সামলে নিয়ে,
-আমি উজ্জয়িনী!……
আদিল প্রায় চিৎকার করে, উজ্জয়িনী আপু! আপা দেখ দুলাভাই অবশেষে তার বাড়ি থেকে তোমাকে নিতে উজ্জয়িনী আপুকে পাঠিয়েছে!
মিসেস আনোয়ারা, উজ্জয়িনী দুজনেই দুজনের দিকে তাকায়, কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায় উজ্জয়িনী, শায়লা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে উজ্জয়িনীকে, কান্নায় ভেংগে পড়ে,
–উজ্জয়িনী, উমায়ের তোমাকে পাঠিয়েছে না? কিন্তু এতোদিন পরে! একবছর হতে চলল কোন যোগাযোগ রাখেনি…… আমি কত কষ্টে আছি যদি বুঝতো!

ছুটে আসেন শায়লার মা, উমায়েরের আট বছরের মেয়ে মাঈশা।

নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় উজ্জয়িনী,
-ভাবী শান্ত হও, বসতেতো দেবে! তাছাড়া সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, বেশী দেরী করবনা।ছোফায় ধপ করে বসে পড়ে, শায়লার কথা শুনে সমস্ত শক্তি যেন নাই হয়ে গেছে উজ্জয়িনীর। পাশে বসে মিসেস আনোয়ারা একটু ধীর গলায়,
– একদম স্থীর রাখো মাথাটাকে…… শায়লার মায়ের দিকে তাকিয়ে, উজ্জয়িনীকে একটু পানি দেন ও অফিস থেকে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে তো!
শায়লার মা দ্রুত কন্ঠে,
– অবশ্যই অবশ্যই, দেখেছেন! হিতাহিত বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছি, মেয়ের ভাংগা সংসার জোড়া লাগতে যাচ্ছে ভেবে……!
উজ্জয়িনী মাঈশার জন্য আনা চকলেট খেলনাগুলো বের করে দিয়ে, হাসার চেষ্টা করে,
-সেই দুই বছরের মাঈশা কত বড় হয়ে গেছে। আমি তোমার ফুফু হই চেন?
মাঈশা হেসে বলে,
-আম্মু তোমার কথা এই একবছর খুব বলতো তুমি নাকী চাচ্চু আর চাচীর মিল করিয়ে দিয়েছ, আম্মু আমাকে বলতো তোমার আব্বুও তোমার ফুফুকে পাঠাবে। আমার আব্বুকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে ফুফু। তুমি নিয়ে আসতে!
মাথা ঘুরিয়ে নিজের চোখদুটো আড়াল করার চেষ্টা করে উজ্জয়ীনী কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে মুহুর্তেই।

 

হালকা নাস্তা সেরে নেয় ওরা মাঈশাকে ভিডিও গেমস খেলার কথা বলে নিয়ে গেছে আদিল। উজ্জয়িনী কথা শুরু করে, শায়লা উদ্গ্রীব হয়ে তাকিয়ে আছে উজ্জয়িনীর দিকে, সে চোখে প্রত্যাশার আলো জলজল করছে।
-ভাবী ভাইয়া খুন হয়েছেন! তুমি শান্ত থাকো প্লিজ! তোমাকে বলতে হবে…………
শায়লা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে চিৎকার করে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়,
-তুমি কি বলছ এসব? বুঝতে পারছ? এটা কি ভয়ংকর মশকরা করছ তুমি? ভাবি হই বলে এতোদিন পর এসে এই কথা বলে ঠাট্টা করবে?

 

 

অবশেষে রাত বারোটায় বাসায় ফেরে উজ্জয়িনী।পুষ্পিতা দরজা খুলে দেয়, উদবিগ্ন কন্ঠে,
-কতবার ফোন দিলাম তোমায়! খুব চিন্তা হচ্ছিলো।
উজ্জয়িনী পুষ্পিতার দিকে তাকায়, ভাবে এই আঠারো বছরের মেয়েটি কতটা আপন ওর, শবনম মোস্তারী যখন ওসুস্থ হন তখন অরফানেজ হোম থেকে ওকে নিয়ে আসে উজ্জয়িনী!দরজা  লক করে রুমের দিকে হাটতে হাটতে, 
-অহ! খেয়াল করিনি। মা কি অবস্থা? ঔষধ খাইয়েছো?ঘুমের ঔষধ সহ?
-হ্যা এই একটু আগে ঘুমিয়েছে, তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও আপা, আমি খাবার টেবিলে দিচ্ছি।
-আচ্ছা। মায়ের কপালে চুমু দিয়ে এসে টেবিলে বসে উজ্জয়িনী।
-তুমিও নাও পুষপিতা।
-হ্যা আপা নিবো। কি কোন খবর পেলে?
-হুম! একবছর আগে ভাবি আর ভাইয়ার কথা কাটাকাটি হয়েছিলো, ভাইয়ার ব্যস্ততা নিয়ে। ফোনে নাকী এক মেয়ের সাথে ব্যবসায়িক প্রয়োজন বলে রেগুলার কথা চালিয়ে যেতো। এরপর ভাবি রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে যায় কিন্তু তারপর থেকেই যোগাযোগ বন্ধ। ভাবি জানতোইনা ভাইয়া মারা গেছে তাই আসেনি। আর তাছাড়া ওরা যেখানে থাকত, ভাবি চলে আসার পর নাকী ভাইয়া ওটা ছেড়ে দিয়েছিলো।কোন খোজ পায়নি ভাবী। মারা যাওয়ার কথা জানতনা, তাই আসেনি।
-পুষ্পিতা খাবার মুখে দিয়ে,
– আহারে এখন কত কষ্ট পাচ্ছে, তাহলে ভাবো! মাঈশার কি খবর?
-আমি ওকে জানাইনি ওরা পরে জানাক সেটাই ভালো! কিন্তু খুনিকে তো পাওয়া গেলোনা, তবে আমি বের করবই!

 

দুদিন পর,
আরমান আর উজ্জয়িনী মুখোমুখি, ওদের বিয়ের তারিখ ঠিক করতে এসেছে আরমানের বাবা মা, তানিয়াও এসেছে। খুব শর্ট নোটিসে মিসেস আনোয়ারাকেও আসতে বলেছিলো উজ্জয়িনী। শবনম মোস্তারী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে সব দেখছেন।
উজ্জয়িনী মলিন কন্ঠে, আরমানের দিকে তাকিয়ে,
-আমার পরিবেশ আমার অবস্থান, সবটায় আপনার জানা। আমি হয়তো কখনই আপনার জন্য সেজেগুজে অপেক্ষা করতে পারবোনা। কারণ আমার সবসময় ব্যস্ততা থাকবে। আপনার পছন্দের ডিসটি হয়তো কখনোই আমি আপননার প্লেটে তুলে দিতে পারবোনা, হয়তো…………
আরমান মুচকি হাসে,
-একটা কথাও তুমি বলবেনা, এখন আমি একটা প্রশণ করবো উত্তর দেবে?
সম্মতি সুচক মাথা নাড়ে উজ্জয়িনী,
– “তুমি যখন কাজের তাড়া পেয়ে খুব দ্রুত হাটবে আমি তখন তোমার হাতটুকু ধরে তোমার সাথে হাটতে পারবো তো?”
উজ্জয়িনী তাকিয়ে থাকে আরমানের দিকে, দুচোখ ভর্তি অশ্রু! এবার সে নিজেকে সামলাতে পারেনা, শব্দ করে কেদে ওঠে। ওর মনে হয় পুরো আকাশটা ওকে ছায়া দিতে ভর দুপুরে ওর ঘরে নেমে এসেছে!

পোস্টটি ৪৭১ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.