উজ্জয়িনী সিরিজ -১
লিখেছেন কুয়াশা, সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৪ ১২:৪৬ অপরাহ্ণ

“দৃঢ়তার হাত ধরে পথচলা”

 

পুরো আকাশ জুড়ে মেঘেদের আনাগোনা, কালো মেঘে ছেয়ে আছে। সকালটা শুরু হলো এমন করে, সূর্যের আলো দেখার সম্ভাবনা আজ নেই বললেই চলে। এমন সকালে বিছানা ছেড়ে উঠতেই ইচ্ছে করেনা। আড়মোড়া ভেঙ্গে তবুও উঠে পড়ে উজ্জয়িনী। অগোছালো এলোমেলো চুলগুলোকে চিরুনী দিয়ে শায়েস্তা করে নেয়। গত রাতে বেনী করা হয়নি তাই চুলের এই অবস্থা। উজ্জয়িনী কাল রাতে খুবই টায়ার্ড ছিলো, বৃদ্ধাশ্রম থেকে ফেরার সময় অনেক রাত হয়েছিলো প্রায় বারোটা। রাস্তার নিয়ন বাতির আলোয় নিজের পোশাকের রঙ্ পাল্টে যাওয়ায় পরিবেশটা ভুতুড়ে মনে হচ্ছিলো ওর কাছে, এই প্রথম নিয়ন বাতি দেখেছে তাতো না, তবুও একটা ভয় আর আতংক মনের চারপাশে ছেয়ে ছিলো।  বিশাল বিশাল জ্যাম পেরিয়ে এসে রিকশা ঠিক করেছিলো দশ টাকায়। ফিরে এসে মায়ের শাসন থেকে কোন ক্রমে উদ্ধার পায়, মায়ের হাতেই দু তিন নলা খাবার মুখে তুলে বারবার হাই তুলছিলো, আর বলেছিলো,
-মা আমার এখন খুব ঘুম পাচ্ছে, প্লিজ ঘুমাতে যাই?
মায়ের দীর্ঘশ্বাস শুনে চমকে উঠেছিলো উজ্জয়িনী, মা বলেছিলো,
-তোকে কতোবার বলেছি বৃদ্ধাশ্রমের এই চাকুরীটা ছেড়ে দে, এতো দূর একা একা একটা মেয়ের যাতায়াত করা ঠিকনা তাও মাঝে মাঝে রাত বেশী হয় ফিরতে। উজ্জয়িনী আর কিছু বলেনি, এর পরে কিছু বলা যায়না, সত্যিইতো মেয়ে সে, এ সমাজে মেয়েদের নিরাপত্তা অন্য সব প্রাণীদের থেকে কম! সমাজের আনাচে কানাচে বিড়াল, কুকুর নির্দিধায় দিনে রাতে ঘুরে বেড়াতে পারে কিন্তু মেয়েরা? মানুষের কাছেই নিরাপদ না, পদে পদে বাধা বিপত্তি আর শঙ্কা!
বাস্তবে ফিরে আসে উজ্জয়িনী, রান্নাঘর থেকে মায়ের স্পেশাল হাতের বানানো খিঁচুড়ীর গন্ধে খুশি হয়। রান্নাঘরে ঢুকে মাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে,
-মা তোমার খিচুড়ীর গন্ধে আমার পেটটা চোঁ চোঁ করছে।
মায়ের কন্ঠ অনুযোগ,
-সে আর বলতে? তাতো হবেই যা ফ্রেশ হয়ে নে আমি খাবার রেডি করছি।
-আচ্ছা।

খাবার খুব দ্রুত খাচ্ছে উজ্জয়িনী, ব্যাপারটা দেখে ওর মা শবনম মোস্তারী অবাক কন্ঠে,
-আজকে অফ ডে না? এতো দ্রুত খাচ্ছিস কেন?
উজ্জয়িনী মুখের খাবার শেষ করে,
-মা আসলে তোমাকে বলতে ভুলে গেছি, এখানে এই যে বাসাবোতে, অরফানেজ হোমে একটা কাজ পেয়েছি, এটা অনেক কাছে যদি ভালো মনে হয় তাহলে বৃদ্ধাশ্রমের কাজ ছেড়ে দেব। যদিও সপ্তাহে দুদিনের জন্য ওরা আমাকে সিলেক্ট করেছে, তবুও এটা ভালো লাগলে পুরো সময় এখানেই দেবো। মা জানো এই ক্ষেত্রটা বিশাল আর আধুনিকায়নের শীর্ষে।
-কি জানি দুদিনের অবসর আবার সেই দুইদিনও তুই এভাবে কাজের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিস, শরীরের দিকে খেয়াল রাখবিতো।
-মা তুমি জানোই এই কাজগুলি আমাকে কতোটা আনন্দ দেয়, আর তুমিতো জানোই তোমার মেয়ে তোমার আদর্শে গড়ে উঠেছে, না করতে পারবেনা।
শবনম মোস্তারী আর কিছু বলেননা, কারণ মেয়ে একদম ঠিক কথা বলে দিয়েছে।
উজ্জয়িনী রেডী হয়ে নেয়, ও শাড়ী বা থ্রিপিচ পরে কর্মর্ক্ষেত্রে যায় তবে, মাথায় স্কার্ফ বেধে নেয়। ফুলহাতা ব্লাউজ বা জামা পরতে ও খুব পছন্দ করে। আজ শাড়ী পরে বের হয়।

অনবরত এক একটা কঠিন পরিস্থিতি উজ্জয়িনীকে শক্ত হতে শিখিয়েছে, ও বুঝেছে একজন মানুষের জীবনেতো সংগ্রাম, যুদ্ধের আলাদা কোন পরিমাপ নেই। ছোট খাট হোঁচট পেরিয়ে কেউ যদি সোজা হয়ে দাঁড়াতে চায় তখনই হয়তো বিশাল কোন দুর্ঘটণা এসে তার মেরুদন্ডকেই নিষ্ক্রিয় করে দিতে চায়, এতো সব পেরিয়ে আসে সফলতা, যে সফলতা হয়তোবা মুহূর্ত সময়ের জন্য চোখ বন্ধ করা প্রশান্তি ডেকে আনে।
“অরফানেজ হোম” অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ঠিকানাটা খুঁজে পায় উজ্জয়িনী। বিশাল জায়গাজুড়ে ছায়াঘেরা নির্মল এই হোমটি। বেশ কিছু শিশু ছোটাছুটি করছে, তাদের পোশাক বেশ সুন্দর পরিপাটি। মনটা ভে গেলো উজ্জয়িনীর, যাক মলিন বশ বা বসন কোনটায় এই শিশুদের মধ্যে নেই, বেশ প্রাণোচ্ছল আর মায়াবী পরিবেশ পেয়ে এই এতিম শিশুরা ভালোই আছে। দ্রুত পায়ে অফিস রুমের দিকে যায়, আজই জয়নিং ডেট তাই অফিসে বসের সাথেই আগে দেখা করে এপয়েন্টমেন্ট লেটার জমা দিতে হবে।
ফর্মালিটিগুলো সম্পন্ন হলে কলিগদের সাথে পরিচিত হয়, পেয়ে যায় হাইস্কুল লেবেলে একসাথে পড়া এক বান্ধবী তানিয়াকে। উজ্জয়িনী খুবই খুশি হয় দশ মিনিট দুই বান্ধবী মিলে গল্পও করে, তানিয়া হাস্সোজ্জল কন্ঠে,
-আন্টি কেমন আছেন?
-আছে ভালো………
-আর আংকেল? নিশ্চয়ই তোকে আগের মতো উজ্জল  বলে ডাকে !
উজ্জয়িনীর বুকে ধাক্কা লাগে যেন, দুছোখ ঝাপসা হয়ে আসে,
-বাবা নেই তানিয়া!
তানিয়া কথাটা শুনে চুপ হয়ে যায়, উজ্জয়িনীর চোখের দিকে তাকায়, ওর পরিণত দৃষ্টিতে “বাবা নেই” ব্যাপারটা একদম স্পষ্ট দেখতে পায়। উজ্জয়িনী ঘড়ি দেখে,
– এখানে ক্লাস কয়টায়?
-এইতো এখনি শুরু হবে।

ক্লাসে ঢোকে উজ্জয়িনী, ২৫ জন স্টুডেন্ট। বয়স আনুমানিক আট বছর। এখানে অন্যান্য স্কুলে নির্দারিত করা ক্লাস ওয়ান বা টু নয়। এখানে ক্লাস গুলো কে ভিন্নভাবে নেয়া হয়। পড়া শেখানো লেখা শেখানো, বিভিন্ন ধরণের সাধারণ জ্ঞান, বিভিন্ন কুটির শিল্প সম্পর্কে ধারণা প্রদাণ, আর স্বাবলম্বী হওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। উজ্জয়িনী বাচ্চাদের সাথে পরিচিত হয়ে নেয়। ওদেরকে আনন্দ দেয়ার জন্য কাগজ দিয়ে নৌকা আর বিমান বানায়, প্রত্যেকের হাতে একটা করে দেয়ার জন্য বাড়ি থেকেও কিছু বানিয়ে এনেছিলো।  এইসব পেয়ে বাচ্চাগুলো খুশি হয়। উজ্জয়িনী হাসিমুখে বললো
-বলোতো এই দুটো জিনিসের নাম কি? সবার সমস্মরে উত্তর পেয়ে যায় উজ্জয়িনী, বলে,
-ইংরেজীতে বলতে পারবে?
-না।
-আমি শিখিয়ে দেবো।……………

ক্লাসের বাইরে ওর পড়ানোর ধরণ দেখছিলেন এই হোমের চেয়ারম্যান। উজ্জয়িনী ক্লাস শেষে বেরিয়ে আসে মুখোমুখি পড়ে যায় চেয়ারম্যান আর এই হোমের প্রধান পর্যবেক্ষকের। সালাম দেয় উজ্জয়িনী, সালামগ্রহণ করে চেয়ারম্যান বললেন,
-আপনার সাথে কিছু কথা আছে আসুন।
পর্যবেক্ষকের রুমে নিরব উজ্জয়িনী, চেয়ারম্যান তার কথা বলে দিয়েছেন, মাথা নিচু করে রেখেছে উজ্জয়িনী, মাথা তুলে বিমর্ষ কন্ঠে,
-আমি এভাবেই অভ্যস্ত, স্কার্ফ বাদ দিয়ে এখানে কেন কোথাও কোন কাজই আমি করতে পারবোনা।
-হুম অবশ্যই সেটা আপনার সিদ্ধান্ত, তবে সাতদিন সময় যখন দিয়েছি আপনি এই সাত দিন আপনার মতো করেই আসতে পারেন, কিন্তু তারপর এভাবে আসা যাবেনা। এবার আসুন।
-জ্বি স্যার! উঠে বেরিয়ে যায় উজ্জয়িনী।

মাগরিবের নামাজ শেষ করেও জায়নামাজ থেকে ওঠেনা উজ্জয়িনী। জীবনের হিসাব কষা শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকেই, অত্যধিক বয়সী মেয়ে নয় সে, বিবিএ শেষ করে এমবিএ পড়ছে । বৃদ্ধাশ্রমে কাজ পাওয়ায় ইভিনিং শিফট বেছে নিয়েছে। মাকে নিয়ে ওর ছোট্ট সংসার, বাবা মারা গেছেন তিন বছর আগে বড় দুই ভাই আছে কিন্তু কোন খোঁজখবর নেয়না, তাদের সংসাের অশান্তি না বাড়াতে মা আর বোন থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে উজ্জয়িনী, বেলকণি থেকে মায়ের ডাক শুনে বাস্তবে ফিরে আসে জায়নামাজ গুছিয়ে রেখে মায়ের কাছে যায়,
-মা কফি বানাবো?
কিঞ্চিত ভ্রু কুচকিয়ে শবনম মোস্তারী,
-তোর শরীর ঠিক আছে? আমিতো ভেবেছিলাম তুই কফিই বানাচ্ছিস! কি হয়েছে শিশুগুলোকে কেমন লাগলো?
-সাতদিন সময় দিয়েছে মা, স্কার্ফ খুলে যেতে হবে ।
মলিন হয়ে যায় শবনম মোস্তারী, ভাবেন মেয়েটার জীবনে একটা কাজও বাধা ছাড়া হলোনা, কোন না কোন বাধা আসবেই।
মলিন হেসে মেয়ের মাথায় হাত রাখেন,
-মন খারাপ করিসনা, সব ঠিক হয়ে যাবে, আজ ক্লাসে গেলিনা?
-না ভালো লাগছেনা!
-আচ্ছা তুই বস আমি কফি বানিয়ে আনি।

৭ম দিন।
উজ্জয়িনী বাচ্চাদের কাছে বিদায় নিচ্ছে, বাচ্চাগুলোর মন খারাপ হয়ে যায় ওদের কেউ বললো,
-মিস আপনি আর আসবেননা কেন?
উজ্জয়িনীর কান্না চলে এসেছে, কোনরকমে নিজেকে সামলিয়ে,
-তোমাদের জন্য নতুন একজন মিস আসবেন তিনি তোমাদেরকে…………
বাচ্চারা একসাথে বলে ওঠে,
-আমাদের নতুন মিস চাইনা, চাইনা, আপনিই আসবেন।
কোনরকমে ওদের কাছ থেকে সরে এসে নিরবে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে অশ্রু ফেলে। শিশুগুলোর বাবা নেই, মা নেই আবদার করার কোন মানুষই ওদের নেই। এই কদিনে খুব ভালোবেসে ফেলে উজ্জয়িনী। কাঁধে কারো হাত এসে পড়েছে, চমকে পিছু ফিরে তানিয়াকে দেখতে পায়,
-ওহ তুই!
-কাঁদছিস?
সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে উজ্জয়িনী, তানিয়া সহমর্মিতার সুরে,
-তুইতো এমন গোঁড়া ছিলিনা উজ্জয়িনী, কি হয় এই জেদ না করলে বাদ দেনা স্কার্ফ পরা!
-না তানিয়া তুই বুঝবিনা, একদিন বাসায় আয় সব বলবো।

রেজিগনেশন লেটারটা জমা দেয় উজ্জয়িনী। পর্যবেক্ষক এ মুহুর্তে উজ্জয়িনী দিকে পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন, উজ্জয়িনী প্রস্থানের উদ্যোগ নিলে বললেন,
-বসুন!
উজ্জয়িনী বসে মাথা নিচু করে রাখে, পর্যবেক্ষক গম্ভীর কন্ঠে,
-এখানে এমনও ঘটনা ঘটেছে যে বাচ্চাগুলো টিচারকে এতোটায় অপছন্দ করেছে, তাতে বাধ্য হয়েছি তাকে বহিস্কার করতে, আবার অনেকে ইজি হতে অনেক সময় নিয়েছে, কিন্তু আপনি প্রথম দিনেই বাচ্চাদের মন জয় করে নিয়েছেন। আমাদের লিখিত রুলের একটা জায়গায় স্পষ্ট লেখা আছে স্কার্ফ, বোরখা, পাঞ্জাবী, টুপি, দাড়ি এই সব বাদ দিয়ে এখানে কাজ করতে হবে, কিন্তু আপনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত, এবং এই রুলটা শিথিল করা হচ্ছে, শুধুমাত্র বাচ্চাগুলোর কথা ভেবে। ওদের খুব মন খারাপ। আমাদের উদ্দেশ্য এই শিশুদের ভালো রাখা তাই আপনি স্ার্ফ পরেই আসতে পারেন। উজ্জয়িনী মলিন মুখটা উজ্জল হয়ে ওঠে ঠোঁট জুড়ে বিস্তৃত হাসির পসরা, আর মনে মনে আল্লাহকে ধন্যবাদ দেয়ম ভাবে বিজয় বুঝি এভাবেই অর্জিত হয়!

পোস্টটি ১২২৯ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
১০ টি মন্তব্য
১০ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. অসম্ভব সুন্দর লিখেছেন… অনেক ধন্যবাদ গল্পটার জন্য। :)

  2. অনেক ভালো লাগল… গল্পের নামটা সার্থক! :)

    • আমি আপনার এই কমেন্ট পেয়ে সার্থক হয়ে গেলাম। কোন কিছুর নাম সিেক্ট করাটা আমার কাছে বড্ড কঠিন লাগে। ধন্যবাদ!

  3. খুব ভাল লাগা অনুভূতি কাজ করছে :) !

  4. অনেক সুন্দর লিখেছেন। :)

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.