মোহরানা কেবল লোক দেখানো আচার নয়, নারী কেনা বেচাও নয়, নারীর সম্মানজনক অধিকার
লিখেছেন তৃণ, অক্টোবর ২৭, ২০১৫ ১১:১৬ অপরাহ্ণ

কোরান শরীফে মোহর বা মহরানাকে সাদাক , আজুর হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।যার অর্থ কনেকে এমন একটি উপহার যেখানে কোন ক্ষতি নেই , বরং লাভ রয়েছে, । যেটি বাধ্যতামূলকও বটে। সূরা আহযাবে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “হে নবী! আপনার জন্য আপনার স্ত্রীগণকে হালাল করেছি, যাদেরকে আপনি মোহরানা প্রদান করেন।” তার মানে মোহরানা ছাড়া বিয়ে হালাল হয় না। নবীকন্যা ফাতেমা(রাঃ)-এর বিয়েতে আলী (রাঃ) তার যুদ্ধে যাবার বর্ম বেঁচে সেখান থেকে কিছু অর্থ মোহরানা বাবদ দিয়েছিলেন, বাকীটা দিয়ে ওয়ালিমা খাইয়েছেন।

হাদীসে এসেছে, একজন নারী রাসূলের (সাঃ)সাথে নিজেকে বিয়ের প্রস্তাব করেন। এটা শুনে রাসূল(সাঃ) অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেন। মহিলাটি কয়েকবার বলার পর এক ব্যক্তি তাকে বিয়ে করবার জন্য রাসূলের (সাঃ) অনুমতি প্রার্থনা করেন। তখন রাসূল(সাঃ) তাকে মোহরানা হিসেবে কি দিতে পারবে জানতে চান, একটি লোহার আংটি হলেও। কিন্তু ব্যক্তিটি এতোই হতদরিদ্র যে লোহার আংটি দেবার মতো সক্ষমতাও তার ছিল না। পরে লোকটি বলেন যে, তিনি কিছু সূরা মুখস্থ পারেন। এটা শুনে রাসূল(সাঃ) এটাকে মোহরানা হিসেবে মেনে নিয়ে ঐ মহিলাটিকে এই ব্যক্তির সাথে বিয়ে দেন এই বলে যে লোকটি মহিলাটিকে ঐ সূরাগুলো শেখাবে। (বুখারী, মুসলিম)
রাসূলের (সাঃ) এর স্ত্রীগণের মোহর ছিল বার উকিয়া এবং এক নাশ। এক নাশ মানে অর্ধ উকিয়া অর্থাৎ পাঁচশ দিরহাম। (মুসলিম)
রাসূল(সাঃ) এর আমলে আব্দুর রহমান ইবনে আওফ(রঃ) এক নওয়াত (এক আঁটি খেঁজুর পরিমাণে)স্বর্ণের বিনিময়ে বিয়ে করেছিলেন।

এগুলো হচ্ছে রাসূলের যুগে বিভিন্ন বিয়ের ঘটনা যেগুলোতে যে যার সাধ্যমত দেবার চেষ্টা করেছেন।


বিভিন্ন ফিকাহতে এসেছে মোহরানা এমন পরিমাণে হওয়া ভাল যা কিনা একজন নারীকে সামাজিক নিরাপত্তা দিবে। যা শোধ করতে স্বামী ব্যক্তিটির কিছুটা কষ্ট হবে কিন্তু সাধ্যের বাইরে হবে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিয়েতে মোহরানা ধার্য হয় না, হয়তো না জানার ফলেই। তখন পরবর্তীতেও মোহরানা নির্ধারণ করা যায়, আর পূর্বের ভুলের জন্য মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে ক্ষমা চাইতে হয়। মোহরানা সাধারণতঃ ছেলে-মেয়ের সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয়ে থাকে।


সূরা নিসাতে আল্লাহতাআলা বলেছেন, “
আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও খুশীমনে। তারা যদি খুশী হয়ে তা থেকে অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ কর।

 

এখানে স্ত্রী নিজে চাইলে স্বামীর আর্থিক সঙ্গতি বিবেচনা করে মোহরানার কিছু অংশ ছেড়েও দিতে পারে, কিন্তু এটাতে তাকে কিছুতেই বাধ্য করা যাবে না। কিন্তু আজকাল এটাই রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিয়েতে কিছুমাত্র মোহরানা উসুল হিসেবে দেখিয়ে বড় একটা অংশ বাসর রাতে স্ত্রীকে অনুরোধ করে মাফ চাইয়ে নেয়া হয়। সদ্য স্বামীর ঘরে আসা মেয়েটি লজ্জায় মুখ ফুটে নিজের অধিকারের কথা বলতে পারেন না, ক্ষমা করে দেন নিঃশর্তে। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে মোহরানা একটি ফরজ দায়িত্ব, এটা একটা ঋণ। একজন শহীদেরও ঋণ ছাড়া সব গোনাহ মাফ হয়ে যায়। ঋণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত কোন ব্যক্তির পরকালের হিসেব পূর্ণ হয় না। আল্লাহ তাআলা বান্দার হক ক্ষমা করতে পারেন না। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, কোন ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সকল ঋণ শোধ করার ব্যবস্থা করা হলেও মোহরানার ঋণটুকু তার সদ্য বিধবা দুঃখক্রান্ত স্ত্রীর কাছ থেকে মাফ চাইয়ে নেয়া হয়। শোকে মূহ্যমান হয়েই হোক, বা লোকলজ্জা বা সংস্কারের কারণেই হোক স্ত্রী সেটা মাফ করে দেন। এটা একটা অপসংস্কৃতিই বটে, মুসলিম নারীর একটি নায্য পাওনা থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয়। যা তাকে আল্লাহতাআলা সম্মান করে দিয়েছেন।

ইদানীংকালে মোহরানা নিয়ে এক ধরণের ব্যবসাও শুরু হয়েছে। পাত্রের সংগতি বিবেচনা না করেই লাখ লাখ টাকা মোহরানা ঠিক করা হচ্ছে যা আদৌতেই শোধ করার কোন মানসিকতা দেখা যাচ্ছে না। আবার বিয়ের অল্প কয়েকদিনের মাথায় অনেক পরিবারে ডিভোর্স হয়ে যাওয়াতে আইনি প্যাঁচে পড়ে মোহরানার পুরো অংকটাই দিতে বাধ্য হচ্ছেন স্বামীরা। দুটো পরিস্থিতিতেই ইনসাফ হচ্ছে না। বিয়ের মতো ধর্মীয় সামাজিক বন্ধনে আল্লাহতাআলা সম্মানের সাথে যে ভালোবাসার রহমত দিতে চান, তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পরিবারগুলো।

তাই নারীকে পণ্য করেও নয়, আবার অবহেলা করে ঠকিয়েও নয়। ভালবেসে সম্মানের সাথেই সংসারজীবনে ধীরে ধীরে মোহরানা শোধ করে দেয়া উচিত, যা একটি বৈবাহিক বন্ধনকে আরো সুদৃঢ় এবং আস্থার করে তোলে। 

পোস্টটি ৬৬৭ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
১ টি মন্তব্য
একটি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. ভাল লিখেছেন… ভাল লাগলো। কয়েকটি সূরা মুখস্থও দেন মোহর নামক মূল্যবান বিনিময় হতে পারে, সত্যি কি চমৎকার!

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.