কাটুক প্রহর জ্ঞানান্বেষণে…..
লিখেছেন মনটা আমার বাঁধনহারা..., ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৫ ৯:১৬ অপরাহ্ণ

1416167338

অনেক বছর আগে বিয়ে নামক দমকা হাওয়া আমার মনের অহর্নিশ প্রজ্জলিত জ্ঞানের শিখাটিকে এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিয়েছিল। বিয়ের পর সংসার জীবনটাকে এত বেশি লাগতো যে, সারাক্ষণ সংসারের টুকিটাকি জিনিস নিয়েই মগ্ন থাকতে মন চাইতো। জ্ঞানার্জনটা আমার জীবনের একটি মিশন ছিল। কিন্তু ঘরণী+রাঁধুনি সত্ত্বার মুগ্ধতার কাছে উবে গিয়েছিল জ্ঞান পিপাসা। আর লেখা পড়া করবো না এমন একটা আভাস দিতে শুরু করেছিলাম বাড়ির সবাইকে। আমার সকল অন্যায় আবদার সর্বপ্রথম বাবার কাছেই জাহির করতাম। আমার পড়তে ভালো লাগে না শুনে বাবা বললেন, ঠিকআছে মন যখন চাইছে না তাহলে এই বছর নাহয় থাক। এনজয় কর তোর নতুন জীবন। আগামী বছর থেকে আবার ক্লাসে যাওয়া শুরু করিস। বাবার প্রস্তাব পছন্দ না হলেও এই বছরের মত রক্ষা পাওয়া গিয়েছে ভেবে চুপ হয়ে গিয়েছিলাম। বাবাকে বলেছিলাম আমার যে পড়তে ভালো লাগে না সেটা যাতে কাউকে না বলেন। কিন্তু বাবা ঠিকই ভাইয়াকে বলে দিয়েছিলেন।

সেদিন রাতেই ভাইয়া আমাকে কাছে বসিয়ে বললেন, চলো আজ তোমাকে একটা মজার গল্প শোনাই। এক বহতা নদীর নির্জন বাঁকে জন্ম হয়েছিল দুটি গাছের। একে অন্যেকে অবলম্বন করে ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছিল গাছ দুটি। প্রকৃতির সব রূপ একসাথে বরণ করে নিতো দুজন। গাছ ডাল-পালা মেলে, মাটির নীচে শেকড় ছাড়িয়ে দিন দিন শক্ত সামর্থ্য হয়ে উঠছিল। দেখে গাছীরও ইচ্ছে হলো ডানা মেলতে, শেকড় ছড়াতে। সে আব্দারের সুরে গাছকে বলল, এই আমিও ডালপালা ছড়াতে চাই। গাছ হেসে বলল, কি দরকার তোমার শুধু শুধু কষ্ট করার? আমি তো আছি ডালপালা ছড়িয়ে তোমাকে রক্ষা করার জন্য। কিছুদিন পর গাছী আবার বলল, নিজেকে খুব দুর্বল মনেহয় মাঝে মাঝে। শেকড় ছড়িয়ে একটু মজবুত হই? গাছ বলল, তুমি নিশ্চিন্তে থাকো যে কোন ঝড়ের মোকাবিলার জন্য আমার শেকড়ের শক্তিই যথেষ্ট। গাছীর স্বনির্ভর হবার ইচ্ছে গুলো গাছের কাছে গুরুত্ব না পাবার কারণে গাছী দুর্বল আর গাছ নির্ভর হয়েই রইলো।

এরপর একদিন ভীষণ ঝড় উঠলো সেই নদীর অবিবাহিকায়। বাতাসের তান্ডব আর নদীর পানির ঝাঁপটা গাছ একা বেশীক্ষণ হইতে পারলো না। এক এক করে ভেঙে পড়তে শুরু করলো গাছের ডালপালা। দুলতে শুরু করলো গাছে বাতাসের সাথে। গাছী তার দুর্বল শরীর নিয়ে গাছকে সাহায্য করতে চাইলো কিন্তু পারলো না। কারণ সে শক্তি বা সামর্থ্য কোনটাই গাছীর ছিল না। গাছের আগেই যে সমূলে লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। কিছুক্ষণ পর প্রচন্ড শব্দে গাছও এসে হুমড়ি খেয়ে পড়লো গাছীর পাশে। গাছী তখন কাতর কন্ঠে গাছকে বলল, তোমাকে বার বার বলেছিলাম আমাকে ডালপালা মেলতে দাও, শেকড় ছড়াতে দাও। কিন্তু তুমি আমাকে সেই সুযোগ দাওনি। যদি দিতে তাহলে আজ হয়তো আমাকে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে হতো না। তোমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে পারতাম। গাছও তখন অনুশোচনা ও লজ্জা জড়ানো কন্ঠে বলল, তুমি একদম ঠিক বলেছো। নিজেকে তোমার চেয়ে শক্তিশালী আর তোমার উপর সর্বদা কতৃত্ব বজায় রাখার জন্য আমি তোমাকে ডালপালা মেলে মজবুত হতে দেইনি। যদি দিতাম তাহলে হয়তো আজ আমাদের পরিণতি এমন হতো না। দুজনে মিলে এই ঝড়ের মোকাবিলায় টিকে যেতে পারতাম।

গাছ আর গাছীর গল্প থেকে কি শিখলে? এই প্রশ্নের জবাবে মাথা নীচু করে চুপ করে ছিলাম। ভাইয়া তখন হেসে বলেছিলেন, সর্বাবস্থায় একে অন্যেকে সাহায্য করার ক্ষমতা ও যোগ্যতা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে থাকা উচিত। ক্ষমতা ও যোগ্যতার মাঝে তারতাম্য থাকতে পারে। কিন্তু একজন যোগ্য ব্যক্তি একদম অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়ে কখনোই একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে পারে না। জানো একটি সংসারকে উড়োজাহাজের সাথেও তুলনা করা হয়ে থাকে। স্বামী-স্ত্রী হচ্ছে সেই উড়োজাহাজের দুইজন পাইলট। দুইজনেরই উড়োজাহাজকে উড়ানোর ক্ষমতা থাকতে হবে। যাতে একজন কোন কারণে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে গেলে অপরজন পতনের হাত থেকে উড়োজাহাজকে রক্ষা করতে পারে। এটা ঠিক যে আল্লাহর রহমতে তোমার স্বামীর যতটুকু যোগ্যতা আছে। তাতে তোমাকে সংসারের হাল ধরার কোন প্রয়োজন কখনোই পড়বে না ইনশাআল্লাহ। কিন্তু ভবিষ্যৎ তো আমরা কেউ জানি না, তাই না?। যে কোন সময় যে কেউ যে কোন দুর্ঘটনায় পতিত হতে পারে। তখন যাতে সংসার, সন্তান ও নিজেকে অন্তত সামলে নিতে পারো এইটুকু যোগ্যতা তো অন্তত অর্জন করে রাখা উচিত তোমার। আর এই বিষয়টা নাহয় বাদই রাখলাম। সংসার হয়েছে, কয়েকদিন পর সন্তানও হবে তোমার। সেই সন্তানকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চাইলেও তো তোমাকে আগে জ্ঞানার্জন করতে হবে। কেননা শিক্ষিত মা’ই তো শিক্ষিত জাতির কর্ণধারদের জন্ম দেবে তাই না?

মনের ঘুমিয়ে যাওয়া জ্ঞান পিপাসা এক ঝাটকায় জেগে গিয়েছিল আমার। আলহামদুলিল্লাহ এরপরে আর কোনদিন তাহার ঘুমাইবার সাধ জাগেনি। বরং জ্ঞানের সমুদ্রে আকন্ঠ নিমজ্জিত থাকার নেশাটা আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে দিনে দিনে। আজকাল চারপাশে যত রকমের সমস্যা দেখি এর মূল কারণ অজ্ঞানতা, অবিদ্যাকে মনেহয়। বলা হয় যে, প্রতিটা মানবের মাঝে একটি করে দানবও লুকায়িত থাকে। আর প্রত্যেকের মাঝে বিদ্যমান দানবের লাগাম তার নিজের হাতেই থাকে। কিন্তু সেই লাগাম টেনে ধরার শক্তি নির্ভর করে সেই ব্যক্তির জ্ঞানের উপর। তাই জ্ঞানার্জনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। জ্ঞান হচ্ছে আলো। একমাত্র সঠিক জ্ঞানের আলোতেই দূর করা সম্ভব প্রবৃত্তির নানান প্রলোভনের আপতিত অন্ধকার। জ্ঞান আমাদের রাহ’বার। কখনো যদি দুনিয়ার এই গোলকধাঁধার মাঝে নিজেকে হারিয়েও ফেলি কেউ। জ্ঞান পথপ্রদর্শক হয়ে আবার সঠিক পথ খুঁজে নিয়ে সহায়তা করে আমাদেরকে। জ্ঞান একটি আয়না। যাতে আমরা নিজেদেরকে দেখতে পারি। নিজেদের দোষ, গুণ, অপরগতা, অসহায়ত্বকে দেখতে পারি। যা আমাদেরকে অন্যদেরকে বুঝতে সহায়তা করে।

বর্তমানে শরীয়তের বিধি-বিধানের চেয়ে সমাজে প্রচলিত ধ্যান-ধারণার দ্বারা বেশী প্রভাবিত হবার কারণে বিয়ে বিষয়টা দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে যাচ্ছে। বিয়েতে নানান ধরণের কন্ডিশনের মধ্যে মেয়ে ও তার পরিবারের প্রতি একটি কন্ডিশন এটাও থাকে যে, বিয়ের পর পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে হবে। এর পেছনে নানান ধরণের যুক্তি থাকে। যেমন, এতে সংসারের ব্যাপারে মেয়েরা মনোযোগী হতে পারে না, আমাদের চাকরীজীবী বৌয়ের কোন দরকার নেই। ইত্যাদি ইত্যাদি। কোন যুক্তি খন্ডন করতে চাই না। আমি শুধু বলতে চাই একটি মেয়ের জ্ঞানার্জনের পেছনে একমাত্র কারণ অর্থাপার্জন নয়। প্রতিটি মানুষকে শিক্ষিত হতে হবে তার নিজের জীবনকে কল্যাণের পথে টেনে নিয়ে যাবার জন্য। জ্ঞানের আলোয় নিজে আলোকিত হয়ে সেই আলো চারপাশে ছড়িয়ে দেবার জন্য। অনেকের মুখেই শুনেছি মেয়েরা বেশি শিক্ষিত হয়ে দাম্ভিক হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে বলবো, যারা দাম্ভিক হয় তারা শুধু সার্টিফিকেট ধারী শিক্ষিত। তারা কখনোই জ্ঞানী নয়। কারণ জ্ঞানের উত্তাপে ব্যক্তি চারপাশকে আলোকিত করে নিজেকে গলিয়ে। একদম মোমবাতির মত।

হ্যা পড়াশোনা সাথে সাথে সংসার সামলানোটা কিছুটা কঠিন কাজই বটে। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা যদি একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন তাহলে খুব সহজেই সেটা দূরীভূত করা সম্ভব। যদি আমার নিজের কথা বলি। একটা সাবজেক্ট শেষ করে নতুন আরেকটা সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশোনা আমি চালিয়ে যেতে পারছি আমার হাজবেন্ডের সহায়তার জন্যই। সাংসারিক কাজ থেকে নিয়ে শুধু করে আমাদের ছোট্ট বাবু সোনার লালন-পালন এমনকি পড়াশোনার বিষয়েও অনেক সাহায্য করেছেন। কখনো ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে ব্যর্থ হলে উনি অভিযোগ করে কখনোই কিছু বলেননি। বরং আমাকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। এবং কিভাবে আমি ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে পারি সেই ব্যাপারেও পরামর্শ দিয়েছেন।। আমার একটুখানি ছোট্ট ছেলেটিও পর্যন্ত সাহায্য করেছে পড়ার সময় আমাকে বিরক্ত না করে। পাশে এসে বসে থেকেছে কিন্তু তার ফেব্রেট খেলা জাম্পিং জাম্পিং করে আমার মনোযোগে বিঘ্ন ঘটায়নি। আমার পড়া শেষ হবার পর সে আবার জাম্পিং জাম্পিং শুরু করেছে ঘর ভরে।

আসলে জীবনে জ্ঞানার্জনের প্রয়োজনীয়তাটা আমরা সেভাবে করে জানি না বা অনুভব করি না বলেই হয়তো ত্যাগের লিষ্টে সবার আগে থাকে শিক্ষার নাম। জীবনকে আলোকিত করার আশায় আমরা তাই সেই উৎসটিকেই নিভিয়ে দেই যেটা থেকে জীবনে ছড়ায় আলোয় বিচ্ছুরণ…..

পোস্টটি ৪৫০ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
২ টি মন্তব্য
২ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. //জীবনকে আলোকিত করার আশায় আমরা তাই সেই উৎসটিকেই নিভিয়ে দেই যেটা থেকে জীবনে ছড়ায় আলোয় বিচ্ছুরণ….. //
    খুব সত্যি কথা!

  2. জ্ঞান একটি আয়না। যাতে আমরা নিজেদেরকে দেখতে পারি। নিজেদের দোষ, গুণ, অপরগতা, অসহায়ত্বকে দেখতে পারি। যা আমাদেরকে অন্যদেরকে বুঝতে সহায়তা করে।” চমৎকার বলেছেন আপু :) :)

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.