রাতের রাজধানী নারীর জন্য নয় ?
লিখেছেন রাজু আহমেদ, অক্টোবর ২৪, ২০১৫ ৯:৫৭ পূর্বাহ্ণ
safe_image

সকালে বিবিসি বাংলার ওয়েবসাইটি যে খবরটি প্রথম পড়লাম সেটাই ছিল ধর্ষণের খবর । গতরাতে রাজধানীতে দু’টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে । একটিতে ভিকটিম তার গৃহস্বামী দ্বারা ধর্ষিতা হয়েছে মর্মে থানায় মামলা করেছে । অন্যটিতে ভিকটিম এখনো আইনের আশ্রয় চায়নি । মূলত রাজধানীর ২ কোটে মানুষের মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা কি মাত্র দু’টোই ঘটেছে ? অন্তত আমার এ সংখ্যাটায় বিশ্বাস নাই । ধর্ষণ এই দেশের একমাত্র অপরাধ যেটাতে ভিকটিম আক্রান্ত হয়েও তার ব্যথা লুকায় । এটা যতটা ঝামেলা এড়ানোর জন্য তার চেয়ে বেশি আমাদের সমাজব্ধ মানুষের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে । এই সমাজের মানুষ যতটা ঘৃণা ধর্ষিতাকে করে ততোটা ঘৃণা যদি ধর্ষককদের করত তবে নিশ্চিত করে বলতে পারে এ সমাজে ধর্ষকদের অস্তিত্ব থাকত না । ধর্ষকদের দিকে কেউ ঘৃণার তীর নিক্ষেপ করে না । এমনকি আইন ধর্ষকদের শাস্তি নিশ্চিতের বিধান দিলেও আইনের ব্যবহারকারীর শত চেষ্টা করে ধর্ষককে নিরাপদ প্রমান করতে চান । একজন ধর্ষিতা হওয়ার পর তার জবানবন্দী, ফিঙ্গারিং টেষ্ট কিংবা বিচারালয় পর্যন্ত তাকে আরও হাজারবার ধর্ষণ করা হয় । সেজন্যই ধর্ষিতা একবার ধর্ষিত হয়ে আইনের আশ্রয় না নিয়ে ধর্ষণের ক্ষত লুকাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাতে তাকে আরও বারবার মৌখিক কিংবা প্রমাণ দিতে ধর্ষিতা হতে না হয় । সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের হলেও নির্মম সত্য, ধর্ষিতা প্রমাণিত হওয়ার পর কিংবা নিছক অভিযোগ উঠলেই ধর্ষিতার রক্ত সম্পর্কীয় আপনজনও তাকে বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করে । এ সমাজ যেন ধর্ষিতার আশ্রয়স্থল নয় । তারা ধর্ষকদের শুধু আশ্রয় নয় বরং তাদের নিরাপত্তাও দিবে কিন্তু ধর্ষিতাকে সহজভাবে নেবে না । এজন্যই দিনের অবশেষে যেমন রাতের অন্ধকার এসে সবকিছু ঢেকে দেয় তেমন ভীষন যন্ত্রনা-ব্যথার ক্ষত মুখ বুঝে সহ্য করে ধর্ষিতাও তার অতীতটাকে অন্ধকারে লুকিয়ে রাখতে চায় । যা দু’চারটি ধর্ষণের ঘটনা আমরা শুনি তা প্রকাশ্যে আসে যখন আর সেগুলো লুকানোর মত অবস্থা থাকে না । এরপরেও আইন তার স্বমহিমায় ধর্ষিতার পক্ষে সাহায্যের অবদান রাখে না কিংবা রাখতে পারে না ?

 

 

কেন ঘটবে ধর্ষণ ? সেই সব পুরুষদের লজ্জা থাকা উচিত যাদের রক্তে কামনার আগুন থাকে । ঘরের বোনটির মত একটি মেয়েকে যৌন হেনস্তা করতে যার লজ্জা করে না কিংবা বিবেকে বাঁধে না তাকে পুরুষ বলতে হবে এবং পুরুষের কাতারে ঠাঁই দিতে হবে কেন ? পুরুষ আর কাপুরুষের মধ্যে পার্থক্য করার এটাই উত্তম সময় । হিন্দু সমাজে কোন পরিবার যখন তাদের সমাজবিরুদ্ধ কাজ করে তখন সবাই মিলে সে পরিবারকে একঘরে করে রাখে । সময় এসেছে, যারা ধর্ষক এবং ধর্ষকদের সমর্থক তাদেরকে সমাজে অপাঙক্তেয় ঘোষণা করতে হবে । যে সকল মহিলা নারীকূলের হয়েও ধর্ষকদের নিরাপরাধ বলে তাদের পক্ষে সাফাই গায় তাদেরকে চিহ্নিত করে সমাজ বিচ্যুত করা উচিত । ধর্ষকদের সাথে কোন ধরণের সম্পর্ক থাকা কিংবা রাখা উচিত নয়; হোক সেটা রক্তের সম্পর্ক কিংবা সামাজিক । দিনের রাজধানীর মত রাতের রাজধানীও নারীর জন্য পূর্ণ নিরাপদ রাখা সকলের দায়িত্ব । অথচ আজকাল রাতের রাজধানী তো দূরের কথা দিনের রাজধানীও যেন নারীর জন্য নরকতুল্য । গত কিছুদিন আগে মাইক্রোবাসে তুলে এক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীকে ধর্ষণ কিংবা সহকর্মীদের দ্বারা সহকর্মী ধর্ষিতা এবং গত রাতে দু’ই নারীকে ধর্ষণ-এ জাতীয় খবর আমাদের লজ্জিত করে না ? ভারতের দিল্লিতে কিংবা মুম্বাইয়ে যখন সে দেশী কিংবা বিদেশী নারী ধর্ষিতা হয় তখন আমরা সেখানকার পুরুষদের প্রতি ঘৃণারোপ করে বিগলিত হই, তাদের জাতিসত্ত্বা বোধ নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করি কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে এতটা উদাসীন কেন ?

 

যে নারী মা-কন্যা, স্ত্রী-বোনের সমতুল্য তাদের ধর্ষণ কেবল পশু মানসিকতার পুরুষরাই করতে পারে । কাজেই ওই পুরুষরূপী নরপিচাশের জন্য কোন সাধু কথা যথেষ্ট নয় । সর্বত্র বিচারহীনতার সংস্কৃতি কাটিয়ে উঠতে না পারলেও অন্তত ধর্ষকদের দমনে যেন ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত করা হয় । নয়ত নৈতিক অধঃপতন যেভাবে শুরু হয়েছে তাতে আমাদের মা-বোনের কেউ নিরাপদে কোথাও চলতে পারবে না । দ্রুত বিচারের মাধ্যমে ধর্ষকদের শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহন আশু আবশ্যক । নারী যেন পুরুষকে ঘৃণার চোখে না দেখে তা নিশ্চিত করার জন্য ধর্ষকদের শাস্তি হওয়া খুব প্রয়োজন । দল-মত, স্বার্থ যেন ধর্ষককে শাস্তি দিতে অন্তরায় না হয় । ধর্ষিতা ও ধর্ষকদের ব্যাপারে সমাজবদ্ধ মানুষের বিরুদ্ধাচারণ ভিত্তিক মনোভাব দূর করতে হবে । আমাদের মানসিকতায় ধিক্কার আসা উচিত । যেখানে ধর্ষকদের ঘৃণা করা আমাদের নৈতিক কর্তব্য সেখানে আমরা ধর্ষিতাকে ঘৃণা করছি । এটা কোন কারনে তা জানিনা তবে এ মনোভাব দ্রুত পরিহার করা উচিত । ধর্ষকদের ঠাঁই যেন সমাজের কোথাও না হয় । আমরা এমন একটা সমাজের স্বপ্ন দেখি, যে সমাজের পুরুষ নারীকে সম্মানের আসনে আসীন করবে এবং নারীও পুরুষকে যোগ্য সহযোদ্ধ, বিশ্বস্থ সহযোগী ভাবতে পারবে । এমন সমাজের নিশ্চয়তা রাষ্ট্র ও পুরুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে নারীর সহযোগিতা নিয়ে দিতে হবে ।

 

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

Facebook.com/rajucolumnist/

 

 

পোস্টটি ৩৪৫ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
১ টি মন্তব্য
একটি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. ধর্ষণে একটা নারীর সতিত্ব-সম্মান হানি হয়ে থাকলে পুরুষের(ধর্ষকের) জন্য কেন তা নয়!! http://womenexpress.net/blog/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_scratch.gif

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.