আয়নাল কুর্দিকে জীবন দিয়ে প্রমান করতে হল মানবতা মরেনি
লিখেছেন রাজু আহমেদ, সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৫ ৭:১৯ পূর্বাহ্ণ

৩ বছরের শিশু আয়নাল কুর্দি । সিরিয়ার কোবানিতে জন্ম নেয়া পবিত্র মুখটি জগতবাসীর রূঢ়তার বলি হল কেন ? মায়ের বুকে খুনসুঁটি করে, বাবার কাঁধে চড়ে, খেলনার আওয়াজ শুনে বেড়ে ওঠাই তার অধিকার ছিল । কিন্তু কিভাবে হেসে খেলে বড় উঠবে ? ওর সবচেয়ে দূর্ভাগ্য ওর জন্ম সিরিয়ায়, শিশুটির দূর্ভাগ্য ওর জন্ম যুদ্ধে আক্রান্ত দেশে । যে দেশে মানুষ মানুষকে হত্যা করে পাশবিক সুখে উল্লাস করে । পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয়েই ওকে শুনতে হয়েছে কামানের শব্দ । বাবা আব্দুল্লাহর সুখের আশ্রয় ছিল যেই ছো্ট্ট সোনামনি সেই আয়নালকে শেষ রক্ষা করতে পারেনি বাবা । নিথর দেহটি সমুদ্র উপকূলে ভেসে উঠে শুধু আব্দুল্লাকে বাকশুণ্য করেনি বরং বিশ্বের সকল মানুষকে মূহুর্তকালের জন্য হলেও থমকে দিয়েছে । পকেট থেকে রুমাল/টিস্যু বের করে চোখ মুছতে বাধ্য করেছে । তবে দূর্ভাগ্য আয়নালের । জীবন দিয়ে প্রমান করতে হল,  যে মানবতা এখনো মরেনি । আয়ানালের মৃত্যু হলেও ক্ষণে ক্ষনে মরছে ওর বাবা । স্ত্রী রেহান, প্রিয় বড় ছেলে গালিপ(৫) ও ছোট ছেলে আয়নাল কুর্দিকে হারিয়ে আব্দুল্লাহ মৃত্যু কামনায় ব্যস্ত ।

 

………….

 

আয়নাল কুর্দির জন্মের পূর্ব থেকেই সিরিয়ায় বাশার বিরোধী অবস্থা চলমান । বাশার সমর্থক ও বিরোধীপক্ষের সংঘর্ষে গোটা সিরিয়ায় যুদ্ধ ভয়াবহ পরিসরে চলছে । প্রতিনিয়ত সেখানে শতাধিক মানুষ নিহত হচ্ছে । নতুন শক্তি আইএসের অত্যাচার, পশ্চিমা বিমান হামলা, ন্যাটোর সম্মিলিত হামলায় সেখানে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা যেন সোনার হরিণ । স্ত্রী ও সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য আব্দুল্লাহ মাতৃভূমি ছেড়ে নৌকাযোগে গ্রিসে পাড়ি জমাচ্ছিল কিন্তু নিয়তির পরিহাস । নতুন স্বপ্ন নিয়ে তুরস্কের উপকূল থেকে কয়েক ফুটের একটি ডিঙ্গিতে নতুন ঠিকানার খোঁজে পাড়ি জমিয়েছিল । ১৯ জন সঙ্গীর সাথে গাদাগাদি করে যেতে যেতে স্ত্রী-সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে হয়ত নতুন নতুন স্বপ্নের ছকি আঁকছিলেন আবদুল্লাহ । কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস । গ্রিসের নিকটবর্তী কোস আইল্যান্ডের কাছে তীব্র ঢেউয়ের তোড়ে উল্টে যায় ছো্ট নৌকাটি । মূহুর্তেই আব্দুল্লাহ হাত ফসকে ছুটে যায় গালিপ ও আয়নাল কুর্দি । স্ত্রী-পুত্রদের হারিয়ে কোনমতে যমদূতের কবল থেকে প্রাণে রক্ষা পেয়েছে অসহায় পিতা আব্দুল্লাহ । কিন্তু স্ত্রী-সন্তাদের রক্ষা করতে না পারায় ক্ষনে ক্ষনে সে মৃত্যু আলিঙ্গন করার কামনা করছে । আমার অবুঝ দুই সন্তান ও স্ত্রী মারা গেছে-এই ভয়ঙ্কর কষ্টের বাক্যটি ছাড়া আর কোন বাক্যই তার মুখ ফুটে বের হচ্ছে না । সকালে স্ত্রী-সন্তানের লাশ ভেসে উঠেছে তুরস্কের উপকূলে । থকথকে বালুর ওপর মুখ থুবরে পড়ে থাকা আয়নালের নিথর দেহ দেখে কাঁদেনি এমন দূর্ভাগা বোধহয় বিশ্বে খুব কম আছে ।

 

………….

 

পুতুলের মত শিশু আয়মান আল কুর্দির মৃত্যু ইউরোপিয়ানদের অভিশাপ দিতেই থাকবে । কেননা এ মৃত্যু দায় তারা কোনভাবেই এড়াতে পারে না । অভিবাসীদের নিয়ে তারা যে নষ্ট খেলায় মেতেছিল সেটা মানবতার বিপরীতধর্মী আচরণ । মানুষের মানবিকতার বিপর্যয়ের স্থির চিত্র ফুটে উঠেছে আয়নাল কুর্দির মৃতদেহের চিত্রে । শুধু কি ইউরোপ ? মুসলিম বিশ্বের অন্যতম অভিভাবক সৌদি আরবের পশ্চিমামূখী অবস্থান পশ্চিমাদের মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসী হতে আরও প্রেরণা দিয়েছে । সুতরাং আয়নাল কুর্দির নিথর দেহ কাউকে অভিশাপ মুক্ত থাকতে দেবে না । এটা বিপর্যয়ের মাধ্যম হয়ে আবার আঘাত করবে নতুন করে । সে আঘাত মানুষের বিবেকবোধকে নতুন করে জাগাবে না ? যারা শুধু মানবতার দোহাই দিয়ে চলে সেই তারাই যে মানবতার সবচেয়ে বড় শত্রু তা আবারও প্রমাণ হল । তাদের মানবতার দোহাই শুধু বুলি মাত্র । ধিক্কার জানাই ওদের যান্ত্রিক আচরণের প্রতি ।

 

………

 

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

 

facebook.com/rajucolumnist/

 

পোস্টটি ৩৭৯ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
১ টি মন্তব্য
একটি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. আয়নালরা এভাবেই চলে যায়; আর শুনিয়ে যায় মানবতার আর্তচিৎকার।

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.