ইতিকাফ জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম
লিখেছেন রাজু আহমেদ, জুলাই ৯, ২০১৫ ৯:২৬ অপরাহ্ণ

মহান আল্লাহ তায়াল কর্তৃক নির্ধারিত, মানবতার মুক্তির দুত হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কর্তৃক প্রচারিত, পৃথিবীর বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মব্যবস্থা ও জীবনবস্থার নাম ইসলাম । সেই ইসলাম কর্তৃক স্বীকৃত ইবাদাত সমূহের মধ্যে এ’তেকাফ বা ই’তিকাফ অন্যতম । একমাত্র আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে মুসলমানদের মধ্য থেকে পরহেজগার ও দ্বীনদার কিছু মুসলমান কয়েকদিনে জন্য তাদের দুনিয়াবী সকল কাজকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর ঘর খ্যাত পবিত্র মসজিদে নিরিবিলিতে, নিভৃতে স্বয়ং প্রভূর ইবাদাত বান্দেগীতে কাটিয়ে দেয়ার নামই ই’তিকাফ । ই’তিকাফ পালনরত দিনগুলোতে তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাত এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনাদর্শ চর্চা অর্থ্যাৎ তার সুন্নাতসমূহকে যথাযথভাবে পালন করে থাকে । হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তার উম্মতদেরকে ই’তিকাফ পালন করার আদেশ দেয়ার পূর্বে তিনি তার জীবদ্দশায় একাধিকবার ই’তিকাফ পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে সে অনুযায়ী তার উম্মতদেরকে অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন । ই’তিকাফের সবচেয়ে বড় উপকারীতা হল, ই’তিকাফের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত হওয়া যায় এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম বাহন হিসেবে ই’তিকাফ স্বীকৃত । ই’তিকাফের আভিধানিক অর্থে বলা যায়, ‘ভালো বা মন্দ যে কোন ধরণের কাজের ওপর নিজেকে আবশ্যকভাবে নিযুক্ত করা বা বেঁধে রাখা’ । ইসলামী চিন্তাবদিগণ ই’তিকাফের পারিভাষিক সংজ্ঞায় বলেছেন, ‘রোজা অবস্থায় কোন মসজিদে নির্দিষ্ট নিয়মে অবস্থান করাকেই ই’তিকাফ বলা হয়’ । ই’তিকাফের সূচনা অনেক প্রাচীন । হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ এবং তাদের উম্মতরা তাৎপর্যমন্ডিত কাজ হিসেবে ই’তিকাফ আদায় করত । মহান আল্লাহ তা’য়ালা মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআন মাজীদে ঘোষণা করেছেন, ‘আমি ইবরাহীম ও ঈসমাইল (আঃ) কে নির্দেশ দিলাম যে, তোমরা আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ই’তেকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ’ (সূরা বাক্বার-১২৫) । হাদিসে শরীফে এসেছে, হযরত উমার (রাঃ) রাসূল (সাঃ) কে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আমি জাহেলী যুগে মানত করেছিলাম যে, আমি একদিন মসজিদে হারামে ই’তিকাফ করব । রাসূল (সাঃ) তাকে তার মান্নত পূর্ণ করতে নির্দেশ দিলেন’ (বুখারী ও মুসলিম, ই’তিকাফের অধ্যায়) । উপরে উল্লিখিত কুরআনের আয়াত ও হাদীস দ্বারাই প্রমাণ হয় পূর্বেকার নবীদের জমানায়ও ই’তিকাফ চালু ছিল ।

২০শে রমযান সূর্যাস্তের কিছুক্ষন পূর্ব থেকে শুরু হয়ে ২৯/৩০শে রমযান অর্থ্যাৎ যে দিন ঈদের চাঁদ দেখা যাবে সে তারিখের সূর্যাস্ত পর্যন্ত পুরুষদের জন্য মসজিদে এবং মহিলাদের জন্য নিজ গৃহের যেখানে নামায পড়ার স্থান নির্ধারিত সেখানে পাবন্দীর সাথে অবস্থান করাই ই’তিকাফ । বিভিন্ন সহীহ হাদিসের মাধ্যমে ই’তিকাফের মর্যাদা এবং ইহার অধিক সওয়াবের কথা বর্ণিত হয়েছে । তবে ই’তিকাফ পালনকারীকে কিছু শর্ত আবশ্যিকভাবে মেনে চলতে হয় । ই’তিকাফ আরম্ভ করিলে প্রস্রাব-পায়খান এবং পানাহারের দরকার না হলে ই’তিকাফের স্থান ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়া উচিত না । প্রস্রাব-পায়খানা এবং পানাহারের প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার অনুমতি আছে তবে যদি খানা পৌঁছাইবার লোক থাকে, তবে খাওয়ার জন্য বাহিরে যাওয়া যাইবে না বরং ই’তিকাফ পালনের স্থানে বসে পানাহারের কাজ সমাপ্ত করতে হবে । ই’তিকাফ পালন অবস্থায় বেকার বসে থাকা উচিত নয় বরং কুরআন মাজীদ তেলাওয়াত, নফল নামাজ আদায়, সাধ্যমত তাসবীহ-তাহলীল এবং আল্লাহর নিকট তওবা-ইস্তেগফার পড়িবে । ঘুমানের সময় ঘুমাইবে । ই’তিকাফ অবস্থায় দুনিয়াবী কথাবার্তা বলা কিংবা অতিরিক্ত সময় ঘুমানো যাবে না । মহিলাদের হায়েয-নেফায শুরু হলে ই’তিকাফ ছাড়িয়া দিবে । কেননা এই অবস্থায় ই’তিকাফ পালন দুরুস্ত নয় । ই’তিকাফ পালনকারীদের জন্য স্বামী-স্ত্রী মিলন (সহবাস) এবং আলিঙ্গনও দুরুস্ত নয় । ই’তিকাফ কারীদের জন্য কয়েকটি বিষয়ে লক্ষ্য রাখা আবশ্যক । যথা-
১. যেই মসজিদে নামাযের জামাআত হয়, (পুরুষের) এই ধরনের মসজিদে অবস্থান করা । ই’তিকাফের নিয়তে অবস্থান করা কেননা ইচ্ছা ব্যতীত অবস্থান করাকে ই’তিকাফ বলে না । যেহেতু নিয়ত সহীহ হওয়ার জন্য নিয়তকারীকে মুসলমান ও জ্ঞানবান হওয়া শর্ত, কাজেই এই দু’টিও নিয়তের শামিল । হায়েয-নেফাস ও গোসলের প্রয়োজন হইতে পাক হওয়াও জরুরী ।
২. ই’তিকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান হইল (কাবা শরীফ) মসজিদে হারাম । তারপর মসজীদে নববী, তারপর বায়তুল মোকাদ্দাস । তারপরে যে জামে মসজিদে জামা’আতের ব্যবস্থা আছে । অন্যথায় মহল্লার মসজিদ এবং যে মসজিদে বড় জামা’আত হয় ।
৩. ই’তিকাফ তিন প্রকার । ক. ওয়াজিব, খ. সুন্নাতে মুআক্কাদাহ এবং গ. মুস্তাহাব । মান্নতের ই’তিকাফ ওয়াজিব । হোক তা বিনা শর্তে । যেমন কেউ শর্ত ব্যতীত ই’তিকাফের মান্নত করিল । কিংবা শর্তের সহিতও হতে পারে । যেমন কেউ শর্ত করিল যে, যদি আমার অমুক কাজ ইহয়া যায় তবে আমি ই’তিকাফ করিব । রমযানের শেষ ১০ দিন ই’তিকাফ আদায় করা সুন্নাতে মুআক্কাদাহ । হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) নিয়মিতভাবে প্রত্যেক রমযানের শেষ ১০ দিন ই’তিকাফ পালন করিয়াছেন বলে অনেক সহীহ হাদিসে উল্লেখ পাওয়া যায় । তবে এই সন্নাতে মুআক্কাদাহ মহল্লার মধ্য হইতে কয়েকজনে আদায় করিলে সকলের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায় । তবে যদি মহল্লার মধ্য থেকে কেউ ই’তিকাফ আদায় না করে তবে সকলেই গুনাহগার হবে । রমযানের শেষ দশদিন ব্যতীত প্রথম দশদিন কিংবা মাঝের দশদিন অথবা অন্য কোন মাসে ই’তিকাফ পালন করা মুস্তাহাব ।
৪. কেউ যদি ওয়াজিব ই’তিকাফ পালন করে তবে তার জন্য রোযা শর্ত । সুন্নাত ই’তিকাফে তো স্বাভাবিকভাবে রোযা হইয়া থাকে । কাজেই উহার জন্য রোযা শর্ত করার প্রয়োজন নাই । কাহারো মতে মুস্তাহাব ই’তিকাফেও রোযা শর্ত । তবে নির্ভরযোগ্য মতে মুস্তাহাব ই’তিকাফে রোযা শর্ত নয় ।
৫. ওয়াজিব ই’তিকাফ কমপক্ষে একদিন হতে হবে । কেউ যদি একদিনের বেশি নিয়ত করে তবে তাহাই আদায় করিতে হবে অর্থ্যাৎ নিয়ত অনুযায়ী ওয়াজিব ই’তিকাফ আদায় করতে হবে । সুন্নাত ই’তিকাফের সময়সীমা দশদিন । কেননা সুন্নাত ই’তিকাফ রমযানের মাসের শেষ দশদিন । মুস্তাহাব ই’তিকাফের জন্য কোন নির্দিষ্ট পরিমান সময় নির্ধারিত নাই । তবে এক মিনিট বা উহা হতেও কম সময় হতে পারে ।
 ৬. ইতিকাফ অবস্থায় দুই প্রকার কাজ করা হারাম । যথা-ক. ই’তিকাফের স্থান হইতে স্বাভাবিক বা শরয়ী প্রয়োজন ছাড়া বাহিরে যাওয়া । নিজ ই’তিকাফের মসজিদ হইতে ভূলেও এক মিনিট বা তদাপেক্ষা কম সময়ের জন্য অযথা বাহিরে থাকতে পারবে না । খ. ঐ সব কাজ করতে পারবে না যা অন্যসময় জায়েজ হইলেও ই’তিকাফ অবস্থায় নাজায়েজ । যেমন-স্ত্রী সহবাস করা । সহবাসের আনুষাঙ্গিক কাজ যেমন, চুম্বন করা, আলিঙ্গন করা ই’তিকাফ অবস্থায় নাজায়েজ । তবে এ কাজে বীর্যপাত না হলে ই’তিকাফ বাতিল হয়না । বীর্যপাত হইলে ই’তিকাফ ফাসেদ হইবে । অবশ্য যদি শুধু কল্পনা বা চিন্তার কারনে বীর্যপাত হয় তবে ই’তিকাফ ফাসেদ বা ছুটে যাবেনা । ই’তিকাফ অবস্থায় অশ্লীল কথা, মিথ্যা বা গীবত করিবে না বরং বেশি বেশি কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত, দ্বীনি ইলম শিক্ষা করা বা শিক্ষা দেওয়া কিংবা অন্য কোন ইবাদাতে কাটানো উত্তম । মোদ্দাকথা, চুপ করিয়া বসিয়া থাকা কোন ইবাদাত নয় ।

ই’তিকাফ বৈধ হওয়ার জন্য ই’তিকাফ পালনকারীর মধ্যে কতগুলো শর্ত উপস্থিত থাকতে হবে । যদি তার মধ্যে এ শর্তগুলো পাওয়া না যায় তবে তার বসে থাকা ই’তিকাফের মধ্যে গণ্য হবেন । শর্তগুলো হলো- ১. মুসলমান হওয়া, ২. বোধ সম্পন্ন হওয়া, ৩. ভালো ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করার যোগ্যত সম্পন্ন হওয়া ।  (ছোট বালক, মাতাল বা পাগলের দ্বারা ই’তিকাফ হবে না) । ৪. ই’তিকাফের নিয়ত করা, ৫. হায়েয-নেফাসসহ শারীরিক অপবিত্রতা মুক্ত হওয়া, ৬. পুরুষদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হয় এমন মসজিদে ই’তিকাফ করা এবং মহিলারা তাদের বাসগৃহের নামাজের স্থানে ই’তিকাফ করবে । ই’তিকাফের ফযীলত এবং ই’তিকাফ আদায়কারীর মর্যাদা অপরিসীম । হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমযানের (শেষ) দশ দিন ই’তিকাফ করিবে, উহা তাহার জন্য দু’টি হজ্জ্ব এবং দু’টি ওমরার সমতুল্য হইবে অর্থ্যাৎ দুই হজ্জ্ব এবং দুই ওমরার সমান সওয়াব তাহাকে দান করা হইবে’ (বায়হাকী শরীফ) । অন্য আরেক হাদীসে হুজুর কেবলা ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি সহীহ নিয়তে এবং খাঁটি ঈমানের সহিত সওয়াবের উদ্দেশ্যে ই’তিকাফ পালন করিবে, তাহার পূর্ববর্তী সগীরা গুনাহ মাফ করিয়া দেয়া হবে’ (দায়ালামী) ।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা এবং তার প্রিয় বন্ধু  হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ঘোষিত অসংখ্য সওয়াব লাভের অন্যতম মাধ্যম ই’তিকাফ । এটা উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য স্রষ্টার পক্ষ থেকে এক বিশাল নেয়ামত । অতীতের গুনাহ মাফ করানোর এবং ভবিষ্যতের জন্য সওয়াব হাসিলে অন্যতম সুযোগ । সুতরাং যে সমস্ত মুসলমান নর-নারীর ই’তিকাফ আদায়ের সামর্থ্য আছে তাদের ই’তিকাফ পালন করা উচিত । প্রতিটি মহল্লাবসীর পক্ষ থেকে অন্তত কিছু সংখ্যক মানুষ যেন ই’তিকাফ আদায়ে সচেষ্ট হয় । ই’তিকাফ আদায়কারীর জন্য মহিমান্বিত লাইলাতুল ক্বদরের সওয়ার অর্জন নিশ্চিত । কেননা রমযানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাত্রি সমূহের যে রজনীতেই ক্বদর অবতীর্ন হোক না কেন মসজিদে অবস্থান করার কারণে ই’তিকাফকারী তা পাবেই । পরকালীন অনন্ত জীবনে জান্নাত লাভের এক সুবর্ন সুযোগ ই’তিকাফ । সুতরাং ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক ই’তিকাফ পালন করার জন্য প্রতিটি মুসলমানের মধ্যে প্রতিযোগীতার মনোভাব সৃষ্টি হওয়া আবশ্যক । আল্লাহ আমাদেরকে ই’তিকাফের মত একটি তাৎপর্যমন্ডিত ইবাদাত করার তাওফীক দান করুন ।

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।
www.facebook.com/raju69mathbaria/

পোস্টটি ২৬১ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.