নববর্ষে নারীর নিরাপত্তা কতটুকু?
লিখেছেন প্রশান্ত চিত্ত, এপ্রিল ১৩, ২০১৭ ৭:৪০ অপরাহ্ণ
image-28333

রমনার বটমূল। ছায়ানটের শিল্পীদের পরিবেশনা। আহা বৈশাখ। বর্ষবরণ। চারদিকে তার জোর প্রস্তুতি চলছে। নতুন শাড়ি-চুড়িতে সাজিয়ে নেওয়ার নানা পরিকল্পনা। লাল-সাদায় বেলী ফুলে আর কপালে টকটকে সূর্যলাল টিপে নিজেকে সাজিয়ে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে যান সবাই।

পয়লা বৈশাখ। এটি একটি সর্বজনীন উৎসব। প্রাণের উৎসব। এই প্রাণের উৎসবে প্রাণের সঙ্গে প্রাণ মিলিয়ে বর্ষবরণ করি আমরা। উচ্ছলতায় নিজেকে সাজিয়ে এতদিন বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে শামিল হতেন সবাই। কিন্তু ১৪২২ সনের পয়লা বৈশাখের পর এই দিনের আনন্দ উদযাপন নিয়ে একটা আতংক তৈরি হয়েছে সবার মনে। বিশেষ করে নারীদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। তারা এখন আগের মতো স্বতঃস্ফূর্ত নন এই পয়লা বৈশাখ বরণে।

এর কারণ নববর্ষে নারীদের যৌন হয়রানি। ১৪২২ সনের ১ বৈশাখে টিএসসি এলাকায় সকাল সাড়ে ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে হাজার হাজার মানুষের উপচেপড়া ভিড়ে উচ্ছৃঙ্খল কিছু তরুণ মেয়েদের হয়রানি করে। পয়লা বৈশাখের ওই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও টিএসসি এলাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান ছিল। এ সব অনুষ্ঠানে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার লোক ওই সব স্থানে জড়ো হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ও টিএসসি এলাকা থেকে লোকজন বের হওয়ার সময় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের রাজু ভাস্কর্য এলাকায় প্রচ- ভিড় হয়। এই ভিড়ের মধ্যে সংঘবদ্ধ একদল নারী লাঞ্ছনাকারী ঘটনাস্থলে নারীদের হয়রানির চেষ্টা করে। নারী লাঞ্ছনাকারীরা ভিড়ের মধ্যে কতিপয় নারীর শাড়ি ধরে টান দেয়। তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলে। ২০-২৫ জন যুবক এক নারীর শ্লীলতাহানি ঘটানোর চেষ্টা চালায়। এই সময়টাতে তরুণীদের উদ্ধার করতে গিয়ে আহত হন প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন।

এ ঘটনায় পরদিন শাহবাগ থানার এসআই আবুল কালাম আজাদ বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় অজ্ঞাতনামা কতিপয় যুবকের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। প্রচ- ভিড়ের মধ্যে আট-দশজন দুষ্কৃতকারী মামলায় বর্ণিত ঘটনাটি ঘটিয়েছেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলের লোকজনকে কয়েকদফা লাঠিপেটা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসেন। সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ঘটনার পারিপাশির্^কতায় এই মামলার অভিযোগটি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

এমন নৃশংস ঘটনার পর এই সর্বজনীন উৎসবটিতে কী নারীরা পারবেন তাদের মতো করে বাইরে আনন্দ-উৎসবে যোগদান করতে? দ্বিধা-দ্বন্দ-ভয়। মনের কোণে এখন সারাক্ষণ। পয়লা বৈশাখ আনন্দের জায়গায় এখন ভর করেছে আতংক। তবে কী জনসাধারণ এই আনন্দে শামিল হবে না? এ বছর নিরাপত্তা ব্যবস্থাটি-ই বা কেমন?

ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্র জানায়, এবার ঢাকার ৭০টি স্থানে বাংলা বর্ষবরণের অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বাংলা বর্ষবরণের নানা আয়োজন রমনা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়কেন্দ্রিক হলেও এবার সারা ঢাকায় থাকছে নজরদারি। যেসব স্থানে অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি ডিএমপি কর্তৃক দেওয়া হয়েছে সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

বাংলা নববর্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রার নিরাপত্তায় মাঠে থাকবে মহানগর গোয়েন্দার (ডিবি) ও স্পেশাল উইপন্স অ্যান্ড ট্যাকটিক্স (সোয়াট) টিম। দেশে প্রথমবারের মতো এ স্পেশাল টিম বর্ষবরণের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে। এছাড়াও বর্ষবরণের এ মঙ্গল শোভাযাত্রার সামনে, পেছনে, মাঝে এবং দুপাশে পুলিশি পাহারা থাকবে। পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকবে। ১৯টি ওয়াচ টাওয়ার দিয়ে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। সে অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হবে। এছাড়াও এসব স্থানে ঢুকতে পৃথক প্রবেশ ও বাহির হওয়ার গেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের আর্চওয়ে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হবে। ভেতরে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে দেহ তল্লাশি করা হবে। ডিএমপির নির্দেশনা অনুযায়ী, উš§ুক্ত স্থানে যেসব অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে সেগুলোতে সাড়ে ৪টার পর কাউকে ঢুকতে দেওয়া হবে না। ৫টার মধ্যে সেসব অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে। তবে সংরক্ষিত স্থানে ইনডোরে ৫টার অনুষ্ঠান করা যাবে। পাশাপাশি বিশ^বিদ্যালয়ের প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, বিএনসিসি এবং বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে সার্বিক নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকবে।

রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে নিরাপত্তার জন্য নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। কিন্তু আমরা মনে করি আইন জারি করে, কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই নিরাপত্তা নারীকে দেওয়া যায় না। তার জন্য সবার আগে নারীর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জরুরি। একটু লক্ষ্য করলেই আমরা দেখব বিভিন্ন উৎসবে যেখানে ভিড় থাকে বেশি সেখানে বখাটেরা ওত পেতে থাকে সবসময়। এরকম নিপীড়নের শিকার নারী সবসময়ই হন। নিপীড়নকারীর বিচার যদি সঠিকভাবে হয় এবং তা প্রচার পায় তাহলে ওত পেতে থাকা বখাটেদের দাপট কমবে অনেকটা।

জোহরা শিউলী : সাংবাদিক

সূত্রঃ ঢাকা টাইমস।

পোস্টটি ১১৯ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.