জার্নি টু রহিংগা ক্যাম্প (পর্ব-২)
লিখেছেন মেহনাজ জাকির প্রমি, জানুয়ারি ৪, ২০১৮ ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ
24068184_771858953023895_4412689400876594950_n

১২ নভেম্বর ২০১৭
ফ্লাইট নাম্বার: বি এস ১৪৩

যাত্রা শুরু কক্সবাজার এর উখিয়ার থাইংখালি ক্যাম্প এর উদ্দেশ্যে! প্রচণ্ড রকম এক্সসাইটমেন্ট আর একি সাথে মাথা ভর্তি চিন্তা নিয়ে ঘর থেকে বের হলাম। সাধারণত আমি দূরের যাত্রায় খুব চেনা পরিচিত না হলে যাইনা কিন্তু এবারের বিষয় ছিল একদমই ভিন্ন
একদিকে UHH সম্পূর্ণ নতুন একটা অরগাইনেজেশন এর সাথে কাজ করতে যাওয়া অন্য দিকে রুম মেট হিসেবে ব্রাজিলিয়ান নারী সারাহ কে পাওয়া দুই টা বিষয় ই আমার জন্য ভিন্ন একটা অভিজ্ঞতা ছিল। ২:৪৫ এর ফ্লাইট (ঢাকা-কক্সবাজার)। প্লেনে এটাই ছিল আমার প্রথম জার্নি। নানারকম উদ্ভট চিন্তা, যাত্রা সঙ্গী হিসেবে চমৎকার দুইজন মানুষকে পাশে নিয়ে আল্লাহ্‌ নামে শুরু করলাম যাত্রা।

সারাহ, ব্রাজিলিয়ান নাগরিক কিন্তু নিজের জীবন শুধুমাত্র ব্রাজিলের ভেতরই সীমাবদ্ধ রাখেনি, আফ্রিকা, কানাডা, কেনিয়া, নাইরোবি প্রত্যেকটা দেশেই নিজের সেবা মূলক কাজের মাধ্যমে নিজের অবদান রেখে চলেছে সে। বাংলাদেশে এটাই তার প্রথম আগমন। সাদা চামড়ার মানুষ দেখলেই আমরা অগ্রিম কিছু বিষয় মনে মনে ধারণা করে নেই এই যেমন, তাদের ভেতর ইমোশন বলতে তেমন কিছু নাই, কাজ ছাড়া সে কিছুই বুঝেনা মেশিন তারা ব্লা ব্লা। কিন্তু সারাহ ছিল একদমই ভিন্ন। সে আমাকে শিখায়, নির্দিষ্ট
একটা সময় পরে পঙ্গু মানুষটার কাছেও ভর করে চলা লাঠিটা তার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায় যখন সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়ে যায় এবং এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং তোমাকে পাড়ি জমাতে হবে নতুন আরেক দেশে যাদের তোমাকে প্র‍য়োজন। প্লেন এর জানলার পাশে মেঘেদের ঘর বাড়ি দেখতে দেখতে পৌছে গেলাম আমরা কক্সবাজার।

UHH এর তত্বাবধানে ১০/১২ জনের একটি টিমের সাথে পরেরদিন ঠিক ভোরেই বের হয়ে পড়লাম আমরা উখিয়ার, থাইংখালির রোহিংগা ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে। ৩৫০০ কম্বল, শীত বস্ত্র, মশারি নিয়ে আমরা প্রস্তুত হলাম অসহায় সেই মানবগোষ্ঠির মাঝে বিতরন করার জন্য। যতটুকু মনে পড়ে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এক টানা দাঁড়িয়ে বিতরণের কাজে সাহায্য করেছি। চোখের সামনে বিশাল এক জন গোষ্ঠির লাইন। ছোট বড়, বৃদ্ধ যুবতী সবাই ছিল সেই লাইনে সামিল। ছিলনা শুধু তরুন যুবকেরা। থাকবেই বা কিভাবে মিয়ানমারের মিলিটারিরা যে তাদের কাউকেই জানে বাচতে দেইনি।নিশৃ ংস সেই হত্যার শিকার হয়েছে তারা সবাই। তার উপর সব চেয়ে আশ্চর্য বিষয় হল বেশির ভাগ মেয়ে ই রেইপড। আহারে! কত টা হেল্পলেস হলে একটা মা তার দুধের সন্তান কে আরেকজন এর কাছে দিয়ে দিতে চায়?? ক্যাম্প এ প্রতি টা ঘরে ঘরে ঢুকেই আমরা যখন মা গুলোর সাথে কথা বলছিলাম, তখন বেশিরভাগ মায়ের ই আমার আর সারাহ কাছে আকুতি মিনুতি ছিল তাদের কলিজার টুকরা টাকে একটা নিরাপদ আশ্রয় দিতে । বেশিরভাগ ঘরেই ৫/৬ টা বাচ্চা। জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই, পাহাড়ের উপর বসবাস। আহারে, আমার সত্যি মনে হচ্ছিল সম্ভব হলে আমি যেনো সারাজীবনের জন্য এই মানুষ গুলোর মাঝেই থেকে যাই, আরেক টু হাত বুলাই তাদের মাথায়।

নিজেদের জীবন নিয়ে আমাদের কত অভিযোগ তাইনা? বিশ্বাস করেন আমার সেদিন চিৎকার করে দুনিয়াবাসী কে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, এসে দেখে যাও তোমরা এদের অবস্থা তারপর বলো যে তোমরা ভাল নেই। একটু নিরাপদ ভাবে বেচে থাকার জন্য কতই না আকুতি মিনতি তাদের। এদিকে এর ভেতর পরিচয় হয় একজন রহিংা যুবক এক সাথে। জিয়াউল হোসেন, মিয়ানমার এর একটি বিশ্ববিদ্যালয় এর জুউলোজির ছাত্র ছিল সে।পড়া শুনা চলাকালীন অবস্থায় মিয়ানমার এর এই অবস্থার শিকার হয়ে সে এখন মাথা গুঁজে থাইংখালি ক্যাম্প এ।কিন্তু থেমে থাকেনি এখানেই তার জীবন। CFS, child friendly space নামে একটি স্কুল খুলে ক্যাম্প এর বাকি শিশুদের মাঝে সে সেই শিক্ষার আলো জ্বালাতে শুরু করেছে। কথায় আছে, “there is a hope there is a way “। জীয়াউল কে দেখে সত্যি আমার এই প্রবাদ টির কথাই মনে পরেছে, যে কিনা হাজার বিপদে থাকা সত্বেও নিজের ভালো কাজ করার ইচ্ছে শক্তি টি নষ্ট করেনি। প্রতিদিন সকাল ১১ টা থেকে তার তত্বাবধানে CFS এ ক্লাস হয়।মজার ব্যাপার হল আমরা যখন বাচ্চা গুলর জন্য চকলেট, কেক, খেলনা নিয়ে উপস্থিত হই তারা যেন খুশি তে আমাদের মাঝে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল। মিয়ানমার সরকার এই চরম নিশৃংস তার ভেতরেও বাচ্চাদের মুখে অনবরত তাদের বার্মিজ (মিয়ান্মার এর ভাষায়) জাতীয় সং গীত গেয়ে তারা দৃঢ় কন্ঠে তখনো বলছিল তারা তাদের দেশ মিয়ানমার কে ভালবাসে, ফিরে যেতে চায় আবারো তারা মিয়ানমার এ। নিজ চোখে না দেখলে হয়ত বিষয় গুলো অনুভব করা সম্ভবনা।

এদিকে রাস্তায় হাটার সময় আমার চোখে পড়ে বেশ কিছু মক্তব যেখানে রহিংগা জনগোষ্ঠির মধ্য থেকে কেউ একজন আরবি পড়াচ্ছে এবং বাচ্চারা তার দেখা দেখি পড়ছে। ওপাশ থেকে কানে ভেসে আসলো আসরের আজানের মিষ্টি ধ্বনি, “হাইয়া আলাসসালা হাইয়া আলাফালাহ”। এত সব ঝামেলার মধ্যে থেকেও ক্যাম্প থেকে মুসল্লিরা সারিবদ্ধ ভাবে তার প্রভুর ডাকে সাড়া দিতে কিছু মুসলিম সংস্থার নির্মিত মসজিদে তারা গিয়ে নামাজের জন্য একত্রে জমায়েত হচ্ছে।কি চমৎকার সে দৃশ্য! সাথে সাথেই আমি আমার সৃষ্টিকর্তার কথা স্মরণ করলাম, “হে আমার একমাত্র রব তুমি সত্যি কাউকে তার সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দিওনা”।

পড়ন্ত বিকেল, এদিকে সকাল থেকে দাড়িয়ে ৩৫০০ কম্বল, মশারী, শীত বস্ত্র সব কিছু দেওয়া শেষ কিন্তু ও আল্লাহ্‌ মানুষের অভাব যেনো শেষ হয়না।বামে, ডানে, উপরে, নীচে শুধু শতশত মানুষের হাত আমাদের দিকে তাকিয়ে। আমার সামনে রাখা টেবিল টা ধরে কিছুক্ষনের জন্য আমি যেন নিস্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে গেলাম। সাথেই সাথেই মনে মনে বিপদাপন্ন এই মানুষ গুলোর জন্য দুয়া করলাম সেই সাথে UHHএর প্রত্যেক টা সদস্য এবং আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ডায়েবেটিক্স রোগীর জন্য দুয়া করলাম যাদের মাধ্যমে এত বড় একটা কাজ করার সুযোগ আমি পেয়েছি, শুকরিয়া জানালাম তাদের সবাই কেই। সাধারণত পিছনে ফিরে তাকানো বা কারো সামনে খুব একটা অনুভুতি প্রকাশ করার অভ্যাস নেই আমার কিন্তু সেদিন আমি ক্যাম্প থেকে ফিরার পথে বারবার যেনো ফিরে তাকাচ্ছিলাম।জড়িয়ে ধরছিলাম মা গুলোকে, বাচ্চা গুলোর কপালে চুমু খাচ্ছিলাম। আহা! মানুষ গুলোর গায়ের ঘ্রাণ, মাটির গন্ধ আমার না জানি কত পরিচিত। আরো দৃঢ় মনবল নিয়ে আমি বারবার ফিরে যেতে চাই তাদের মাঝে।ভালো থাকুক, ভালবাসার মানুষ গুলো। বিদায় থাইংখালি ক্যাম্প…..

পোস্টটি ৩২ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

Leave a Reply

Be the First to Comment!

Notify of
wpDiscuz