“পাকিস্তানী নারীঃ ৬ টি গল্প লজ্জার, লাঞ্চনার আর যুদ্ধ করে টিকে থাকার।”-৪
লিখেছেন টুইংকল, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৭ ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ

Image may contain: 1 person, closeup

নাজনীন ৪১
নারীর জীবনে একমাত্র ভালো থাকার সময় হলো তার শিশুকাল। তখন সে খেলতে পারে,হাসতে পারে। আমরা তিন বোন ছিলাম। আমার ছোট বোন স্কুলে যেত, আর বড় বোনের বিয়ে হয়ে যায় কম বয়সেই। আমি একটু আধটু পড়াশুনা করেছিলাম,পড়তে আর লিখতে জানতাম।পড়াশুনা করেছি হয়তোবা, পঞ্চম কি চতুর্থ শ্রেণী অবধি, মনে নেই। আমরা যে বাড়িতে থাকতাম কাদা দিয়ে জিনিস পত্র বানাতো গ্রামের লোকজন, গ্রামটির নাম থাট্টা। আমরা কয়েক বছরের জন্য করাচিতে একটি ভাড়া বাসায় ছিলাম আমাদের পড়াশুনার জন্য। আমার বাবা-মা দুজনেই কাজ করতেন, বাবা আরো বেশি বেশি ইনিকামের চেষ্টা করেছিলেন,তিনি শ্রমিক ছিলেন না, তিনি ভালোই আয় করতেন।আমার মা একটি স্কুলে, শিশুদেরকে দেখাশুনা করার কাজ করতেন।যখন মা কাজ ছেড়ে দিলেন,আমি সেখানে কাজ শুরু করলাম,আর পড়াশুনা ছেড়ে দিলাম।

ছোটবেলা পেরিয়ে আসার পর একজন নারী খুব দ্রুত বুড়ো হতে শুরু করে, সংসারের দায়িত্বগুলো তাকে ধীরে ধীরে এমন বানিয়ে দেয়। যদি সে দুর্ভাগ্যের অধিকারী হয়, তখন তার বিয়ে করতে হয় ভুল মানুষকে আর তখন সে তার নিজের এই বোঝাসম জীবন থেকে মুক্তি পেতে চায়।যখন আমার বাগদান হলো, তখন আমি সেলাইয়ের কাজ করে টাকা ইনকামের মাধ্যমে নিজের যৌতুক সংগ্রহ শুরু করলাম।যদি যথেষ্ট যৌতুক না দিতে পারি তাহলে আমার বিয়ে নাও হতে পারে। আমি খুব দ্রুতই ষোলতে পৌছলাম, বিয়ে করলাম আমার কাজিন নাবীলকে। বিয়ের তিনবছর পর আমাদের ছেলে হয়,সামির। সে মাচিউরড হওয়ার আগেই সাত মাসে জন্ম গ্রহন করে। ছেলের দশ মাস হওয়ার পরও নাবীল আমার কাছে আসতো না। আমি তখন ওর বাড়িতে নিজেই ফিরে গেলাম।

যখন ফিরলাম সবাই আমাকে খারাপভাবে ট্রিট শুরু করলো। আমার শাশুড়ি আর ননদ আমাকে যথেষ্ট টাকা দিতো না, খাবার দিতো না। কেউ আমার ছেলেকে ভালোবাসতো না। তখন আমি নিজেই টাকা ইনকাম শুরু করি, আমার ছেলের দেখাশুনা একাই করে গেলাম, ওদের বাড়িতে থেকেই। নাবীল কখনো আমাকে মারেনি, কিন্তু সে আমাকে ইমোশনালী ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলতো। সে কখনো তার ছেলেকে নিজের কাছে টানেনি। সে আমাকে না জানিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করেছিল, আর ওর পুরো পরিবার সেই নতুন বঊকে জানতো।ওদের দুজনের সন্তান হয়। ওর মা বোন এই বিয়ে দেয়ার ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছিল। তারা কিভাবে এটা করতে পারলো? নিজের ভাতিজি আর নিজের কাজিনের সাথে! আমার জীবনটা দুর্দশায় ভরে গেল।

সেই ঘটনার পর  বাবা-মা’র কাছে চলে আসি। আমার ছেলের যখন তিন বছর, আমি তখন কাজে চলে গেলাম। সে সময় একমাস ওকে ছেড়ে থাকতে হতো। ছেলেটা আমাকে তখন আমার প্রথম নাম ধরে ডাকতো, আর আমার মাকে আম্মি বলতো।আমি খুব কম আয় করতাম। মাসে ৬৫০০ রুপি, সেই টাকায় আমাদের মা ছেলের খাবার, চিকিতসা, আর পোশাকের ব্যবস্থা হয়ে যেতো।সামীর কেবলই পঞ্চম শ্রেণী কিন্তু আমি ওর উচ্চ শিক্ষার জন্য কোন ব্যাবস্থা করতে সক্ষম ছিলাম না। আর শুধু মাত্র এই কারণেই গরীবরা অশিক্ষিত থেকে যায় পরম্পরা থেকে পরম্পরা।এমনতো না যে, আমরা পড়তে চাইতাম না; এটাই স্বাভাবিক যে আমরা পারতাম না!

জিবনে অনেক পরিশ্রম করেছি, কিন্তু দু বছর আগে আমাদের গ্রামে হওয়া বন্যার ভয়াবহতা সাথে কোন কষ্টেরই তুলনা হয় না। আমি যখন করাচীতে কাজ করতাম তখন আমাদের থাট্টা গ্রামে বন্যা হয়েছিল।আমার ছেলে, মা আর বোন বাসে উঠতে পেরেছিলো পানির ভয়াবহ রুপ দেখার আগেই। তারা কোন ব্যবহার্য জিনিসই নিতে পারেনি, এমনকী কাপড়ও না।আমার বাবা থাট্টাতেই ছিলেন আর তিনদিন পানির ভয়াবহতার মধ্যেই ছিলেন।সরকারী কর্মকর্তাগণ ভুক্তভোগী সবাইকে ২০,০০০ রুপি দেয় আর বন্যায় ডুবে যেতে থাকা মানুষগুলোকে রক্ষা করে।পাকিস্থানী  বিজনেস ওনার রাও এই উদ্ধার কাজে সহায়তা করেছিলো।

আমি যখন বাড়িতে ফিরলাম, সবকিছু নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো; মূল্যবান জিনিসপত্র, বছর ধরে জমানো টাকা, আর আমাদের পুরো বাড়িটা যেটা ভালো ভাবেই তৈরী করা হয়েছিল।আমরা সরকার থেকে কোন সাহায্য নেইনি। তারা প্রতি বাড়িতে ২০০০০ রুপি দিয়েছিল,সাথে আমাদেরকেও দিতে চেয়েছিলো। আমার পরিবার আর আমি আমাদের বাড়িটা নিজেদের উদ্যোগেই নতুন করে তৈরী করতে শুরু করলাম। সেই অসহায় সময়ে আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য একতাবদ্ধ এক সমাজ তৈরী হয়েছিলো। আমরা একই খাবার খেতাম আর এও জানতাম না যে আগামীদিন খাবার পাবো কি না, এটাও আমরা একে অপরের সাথে শেয়ার করতাম আর রবের কাছে চাইতাম তিনি যেন আমাদেরকে আগামীতে একটু বেশি কিছুর ব্যবস্থা করে দেন!

চলবে……

অনুবাদঃ টুইংকল

পোস্টটি ১১১ বার পঠিত
 ৩ টি লাইক
১ টি মন্তব্য

Leave a Reply

1 Comment on "“পাকিস্তানী নারীঃ ৬ টি গল্প লজ্জার, লাঞ্চনার আর যুদ্ধ করে টিকে থাকার।”-৪"

Notify of
Sort by:   newest | oldest | most voted
নীলজোসনা
Member

ইস! আরও পড়ার অপেক্ষায় থাকলাম

wpDiscuz