“পাকিস্তানী নারীঃ ৬ টি গল্প লজ্জার, লাঞ্চনার আর যুদ্ধ করে টিকে থাকার।” -৩
লিখেছেন টুইংকল, ডিসেম্বর ৩, ২০১৭ ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ
Image may contain: 1 person, smiling
 
জারা জামাল এপ্রিল ৯ ২০১২
শেয়ার হয়েছে, টুইটার, লিংকেদিন।
 
নার্গিস, ১৮
আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন গ্রামে একান্নবর্তী পরিবারে থাকতাম যেখানে তিনটি মাত্র শোবার ঘর ছিলো। আমার মা গবাদী পশুর খাদ্য তৈরী করতেন।তিনি দুধ বিক্রি করতেন আর বিক্রির টাকা নিয়ে তারপর হাট থেকে বাড়ি ফিরতেন।আমার বাবা কোন সাহায্য করতেন না।তিনি কখনোই সংসারে কোন অবদান রাখেননি, খুব স্বার্থপর ছিলেন।আমার মাকে বিয়ে করার আগে তিনি আমার খালাকে বিয়ে করেছিলেন।যখন খালা মারা যান, তখন তার পরিবার আমার মাকে বলেন, বোনের ছেলে-মেয়েদেরকে বোনই ভালোভাবে দেখাশুনা করতে পারবে। তাই আমার মা আমার বাবাকে বিয়ে করেন। আমরা আটজন সদস্য ছিলাম,খুব কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আমাদেরকে।
 
যখন আমি শিশু ছিলাম, কখনো আমার পছন্দের কিছু কিনে নিতে পারিনি, কিন্তু স্কুলে যাবার সুযোগ চেয়েছিলাম।আমি শেখার জন্য পাগল ছিলাম। আমার প্রিয় শিক্ষক কিরণ আমাকে খুব ভালবাসতেন। তিনি আমাকে তার চেয়ারে বসতে বলতেন আর অন্য শিক্ষার্থীদেরকে শেখানোর জন্য সাহায্য করতেন।এমনকী আমি তার মতো স্কার্ফ পরতাম আর অন্যদের হোমওয়ার্ক নির্দিষ্ট করে দিতাম।সে সব আমার খুব ভালো স্মৃতি। আমি উর্দু (ব্যাকরণিক) শিখতে সক্ষম হয়েছিলাম। সে সময় তিনি আমাকে ইংলিশ শিখতেও সাহায্য করেছিলেন।
 
আমাদের বাড়িতে নারীরা জীবিকা অর্জন করতো, আমার বাবা ও ভাই যখন ইচ্ছা হতো তখন কাজে যেতেন। আমার বাবা যা আয় করতেন তা আমাদের সবার চেয়ে বেশী। কিন্তু তিনি সেগুলো নষ্ট করতেন, তিনি বন্ধুদের সাথে বাইরে যেতেন আর চার পাঁচদিনেও ফিরতেন না। বাবা হিসেবে তিনি কোন দায়িত্ব পালন করেননি, আমাদের জন্য কোন আয় করেননি।আমার বাবা অশিক্ষিত ছিলেন, তাই আর কারো পড়াশুনা হোক সে্টা তিনি চাইতেন না। আমি চাইতাম আমার শিশুকাল যদি অনেক দিন ধরে থাকত। এসবের চেয়ে হয়তো সেটাই ভালো ছিল।
 
আমার যখন সাত বছর, তখন আমার বাবা-মা আমাকে কাজে পাঠান, করাচির একটি বাড়িতে।আমার গ্রামে চার বছর বয়সের মেয়ে শিশুদেরকে বাথরুম পরিস্কার করা আর হাড়ি পাতিল মাজা শেখানো হতো। ছয় বছর বয়সে আমরা জামা-কাপড় ইস্ত্রী করতে শিখেছিলাম। আমরা যখন দশ বছরে পা দিলাম, তখন থেকেই সব ধরণের রান্না শিখে গিয়েছিলাম।
 
আমি যখন ছোট ছিলাম, আমি আমার ভাইয়ের ব্যাট দিয়ে মাথায় ব্যাথা পেয়েছিলাম, যখন সে ক্রিকেট খেলছিলো। আমার ব্যান্ডেজ দরকার ছিলো। আমার বাবা-মা আমাকে বাইসাইকলে করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার ঔষধ দিয়েছিল। আমরা যে এলাকায় থাকতাম,আমরা ভালো কোন চিকতসা পেতাম না, তাই মা বাড়িতেই অনেক বেশী উপশমের প্রাকৃতিক ঔষধ বানিয়েছিলেন। তিনি পেয়াজ, তে্‌ল মাখানো ময়দা দিয়ে প্যাক আর ব্যান্ডেজ তৈরী করেছিলেন।আমাদের বাড়িতে, আমরা কখনো প্রকৃত সুখ কি তা দেখতে পাইনি।আমার বাবা-মা কখনো শান্তি আনতে সক্ষম হননি।আমার বাবা ছিলেন অত্যাচারী। তিনি আমার মাকে মারতেন আর আমি নিজে চোখে সেসব দেখতাম, ছোটবেলা থেকেই।
 
আমার মনে আছে, একদিন আমি মেঝে পরিস্কার করছিলাম, আমার বাবা আমাকে ডেকে বলেছিলেন, স্টোরে কাজে আমাকে সাহায্য করো। আমি তার কাছে এসে বলেছিলাম,আমি আমার কাজ শেষ করে এটা করবো। তিনি অধৈর্য হয়ে যান্ম একটা কাঠের লম্বা তীক্ষ্ণ টুকরো নিয়ে আমাকে মেরেছিলেন। আমি তখন পাচ বছরের। আমি তখন চিৎকার করে কেদেছিলাম।
 
আমার সবচেয়ে ভয়ংকর স্মৃতি হলো, যখন আমি আট কি নয়, বাবা কোন কারণ ছাড়া মাকে মারতে শুরু করেন। লোহার রড দিয়ে মারছিলেন। তার মার শেষ হলে, আমরা ঘুমাতে গেলাম। আমি আমার মায়ের কাছে ঘুমাতাম। আমি খুব ভীত ছিলাম সে রাতে আর ঘুমাতে পারিনি। আমার মনে পড়ে মা বলেছিলেন, ” যা ঘটেছে এটা কোন ব্যাপার না, আমাকে শপথ করে বল তুমি কাউকে বলবে না।” আমার বাবা যেটা দিয়ে মেরেছিলেন সেটা তার বেডের নিচে ছিল। আমি আর আমার ভাই মিলে সেই রড অনেক দূরে ফেলে দিয়ে আসি যেন আর তিনি তা ব্যাবহার করতে না পারেন।সকালে,তিনি জেগে গিয়ে অনেক রেগে গেলেন আর কাঠের লাঠি নিয়ে আবার মাকে মারতে লাগলেন। তিনি ভেবেছেন মা সেই রডটা চুরি করেছেন, তার বিছানার নিচে থেকে। আমি তার দিকে দৌড়ে গেলাম, আর তাকে জড়িয়ে ধরলাম থামানোর জন্য। আমার বাবা অবশেষে থামলেন।তিনি আমাকে আবার ভালোওবাসতেন।
 
মেমোরিগুলো ভুলে যাবার না! বেড়ে উঠেছি এরকম পরিবেশে, যেখানে দেখেছি বাবা মাকে সবসময় অপমান করেছে, কষ্ট দিয়েছে আর এসবের কারণে আমি আমার নিজের ভবিষ্যত নিয়ে উদবিগ্ন ছিলাম। আমার একমাত্র আশার আলো ছিলো যেখানে আমি কাজ করতাম সেখানকার পরিবেশ নিয়ে, আমি একজন শিশু হিসেবে সেই পরিবেশকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম।আমার কাজ আমাকে এমন অনুভব করাতো যেন আমি বিশেষ কেউ।হয়তোবা সেখানেই আমি আমার ভালো কিছু হওয়ার প্রত্যাশা করতে পারি।
চলবে…
অনুবাদঃ টুইংকল
 
 
 
পোস্টটি ১১২ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

Leave a Reply

Be the First to Comment!

Notify of
wpDiscuz