রোকেয়ার শিক্ষা ও আজকের নারী
লিখেছেন ওসি সাহেব, জানুয়ারি ৯, ২০১৭ ১১:২৮ অপরাহ্ণ
Begum-Ruquaiya-New-Age-Isla

বেগম রোকেয়া দিবস ৯ ডিসেম্বর। ১৮৮০ সালের এই দিনে তাঁর জন্ম এবং ১৯৩২ সালের একই দিনে মৃত্যু হয়। একারণে তাঁর জন্ম ও মৃত্যু দিবস একসঙ্গে পালন করা হয়। তাঁকে বলা হয় বাঙ্গালী নারী জাগরণের পথিকৃৎ। তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক, নারী আন্দোলনের নেতা এবং সাহিত্যিক। সবকিছুকে ছাপিয়ে আমার কাছে তিনি একজন মানুষ যিনি সমাজ থেকে অন্ধকার দূর করে আলোর সন্ধান করেছেন।

ঊনবিংশ শতাব্দীর যে সময়টাতে তিনি নারীদের শিক্ষা এবং মুক্তির জন্য লড়াই করেছেন আজকের এই একবিংশ শতকেও আমরা সেই সাহস দেখাতে পারি কী না তা প্রশ্নের সম্মুখীন। তিনি নিজে শিক্ষিত হয়েছেন এবং সমাজের অন্যান্য নারীকে শিক্ষার পরিবেশ তৈরীর জন্য লড়াই করে গেছেন।

বেগম রোকেয়া সম্পর্কে আমরা কম বেশী সবাই জানি। তাই আজকের এই লেখার উদ্দেশ্য বেগম রোকেয়ার গুনকীর্তন করার জন্য নয়। সেই যুগে বসে তিনি নারীদের সংগঠিত করার চিন্তা করেছিলেন এবং ১৯১৬ সালে তিনি মুসলিম বাঙালি নারীদের সংগঠন আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। বিভিন্ন সভায় তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন। ১৯২৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বাংলার নারী শিক্ষা বিষয়ক সম্মেলনেও তিনি সভাপতিত্ব করেন।

আজকের যুগের অনেক নারীর মতো আমরাও কেবল তাঁকে নারী শিক্ষার পথিকৃত হিসাবেই জানি কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় আমাদের অনেকের কাছে অজানা। আজকের যুগেও আমাদের রয়েছে অনেক নারী সংগঠন কিন্তু সেসবের কয়টাই বা নারীদেরকে সংগঠিত করার কাজে সক্ষম হচ্ছে সেটা একটা বিরাট জিজ্ঞাসা।

প্রতি বছর রোকেয়া দিবসে নারী সংগঠনগুলো দায়সারাগোছের একটি আলোচনা সভা করেই বেগম রোকেয়াকে স্মরণ করার কাজ শেষ করে দেন।

আজকের বাংলাদেশের নারীদের বাস্তব চিত্র আসলে কী? এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমরা বাংলাদেশী নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই বেগম রোকেয়ার যুগের চেয়ে অনেক এগিয়েছি কিন্ত প্রকৃত মুক্তি বলতে যা বুঝায় তা কী পেয়েছি? বাহ্যিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যাবে, আমরা নারীরা আর ঘরে আবদ্ধ নই। নারীরা আজকাল অংশ নিচ্ছে অনেক প্রকার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। কিন্তু নারী মুক্তি কী কেবল একজন নারীর চাকরী করা বা উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনে?

নারী মুক্তিকে ত্বরান্বিত করতে রয়েছে জাতীয়, আন্তর্জাতিক আইন কিন্তু বাস্তবে সেসব আইনের প্রয়োগ কী আমরা শতভাগ করতে পারছি?

আইন করে যেমন নারী স্বাধীনতা বা নারীর অধিকার রক্ষা যায়না অন্যদিকে কখনো কখনো সমাজে ভালো কিছু প্রতিষ্ঠার জন্য আইন প্রতিষ্ঠা করা এবং তার কঠোর প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা আছে। আমাদের সমাজ এখনো নারীকে চালকের আসনে দেখতে অভ্যস্ত নয়।

বড় সংখ্যক নারী বর্তমানে ঘরের বাইরে কাজে এলেও এখনো পর্যন্ত আমরা দাবী করতে পারিনা যে নারীদের মানুষ হিসাবে সমাজের সকল অধিকার প্রয়োগ করার মত পরিবেশ গড়ে উঠেছে। বেগম রোকেয়ার সময়ে তিনি নারীর রাজত্বের স্বপ্ন দেখেছিলেন তার লেখায়। সেই স্বপ্ন এখনো স্বপ্নই থেকে গেছে যদিও নারীরা আজকের দিনে বিভিন্ন পদে আসীন হচ্ছে।

সম্প্রতি মেয়েদের বিয়ের বয়স পরিবর্তনের সরকারী সিদ্ধান্তের বিপক্ষে চলছে ব্যাপক আলোচনা। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে’ মেয়েদের বিয়ের ন্যূ নতম বয়স আগের মতো ১৮ বছর রাখা হলেও ‘বিশেষ প্রেক্ষাপটে’ আদালতের নির্দেশনা নিয়ে এবং বাবা-মায়ের সমর্থনে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ের সুযোগ রাখা হয়। এর ব্যাখ্যায় সম্প্রতি আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন আমাদের সামাজিক বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

আমি অত্যন্ত বিনয় এবং শ্রদ্ধার সাথে মাননীর প্রধানমন্ত্রীর এই কথাটির সাথে দ্বি-মত করছি। এর কারণ হচ্ছে, আমরা যদি ধরেও নেই যে আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট এখনো পশ্চাৎপদ যেখানে নারীদেরকে অল্প বয়সে বিয়ের জন্য বাধ্য করা হয় তাহলে রাষ্ট্র হিসাবে আমাদের লক্ষ্য কী হওয়া উচিত?

আমরা কী সেই পশ্চাৎপদ সামাজিক বাস্তবতাকেই আকঁড়ে ধরে থাকবো নাকি উন্নত বিশ্বের নারীদের সাথে তাল মিলিয়ে এমন সমাজ তৈরী করবো যেখানে একজন নারী তার স্বাধীন এবং স্বতন্ত্র মত গঠন করার মত সুযোগ পেতে পারে? ধরা হয় ১৮ বছর বয়সে একজন মানুষ প্রাপ্ত বয়স্ক হিসাবে স্বীকৃতি পায়, এই সময়েই গড়ে উঠে তার ভোটের অধিকার বা মত প্রকাশের অধিকার।

তাহলে এখানে প্রশ্ন আসে আমরা যদি একজন নারী যার বয়স ৯ বা ১০ বা ১৬/১৭ ধরে নিলাম তার কী রাষ্ট্রের অন্যান্য নাগরিক অধিকার পাবার যোগ্যতা পায়? সে কী সংগঠন করার অধিকার পায়? উপার্জনের মত সক্ষমতা অর্জন করে? আমাদের সমাজে যেখানে আজকে ৫ বছরের পুজারা নিরাপদ নয় সে সমাজে আপনি কেমন করে নারীর প্রতি যৌন নির্যাতনকে ঠেকাবেন? তাহলে বেগম রোকেয়ার শিক্ষাকে আমরা কী ধারণ করতে পারছি?

আজ থেকে শত বছর আগে যে সমাজ বাস্তবতায় বেগম রোকেয়া বলে গেছেন একজন নারীকে তার মতামত গঠনের মত স্বাধীনতা দিতে হবে আজকের বাস্তবতা হচ্ছে আমরা আজো একই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি।

বেগম রোকেয়া তাঁর প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাসের মধ্য দিয়ে নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গসমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখায় তিনি পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসম অবস্থান ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি তাঁর লেখনী দিয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, ধর্মের নামে নারীর প্রতি অবিচার রোধ করতে চেয়েছেন, শিক্ষা আর পছন্দানুযায়ী পেশা নির্বাচনের সুযোগ ছাড়া যে নারী মুক্তি আসবে না – তা বলেছেন। এই চিত্র কী এখনো আমরা দেখছিনা? ধর্মীয় গোড়ামী কী এখনো আমাদের নারীদেরকে বাধাগ্রস্ত করছেনা?

এখানে একটি কথা খুবই কষ্টের সাথে বলতে হচ্ছে যে এই যে সমাজে এত নারী নির্যাতন, নারীর প্রতি সহিংসতা এমনকি নারীর বিয়ের বয়স নিয়ে এই যে সরকারী সিদ্ধান্ত সব কিছুর বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ বা আলোচনা চলছে ব্যক্তিগত পর্যায়ে। তেমন কোন নারী সংগঠনকে আমরা দেখছি না এগিয়ে আসতে। একটা সময় আমাদের দেশে বেশ কিছু নারী সংগঠন সক্রিয় থাকলেও আজকের দিনে তাদের কাউকেই আর সক্রিয় পাওয়া যাচ্ছে না।

বিভিন্ন দিবসে ব্যানার সর্বস্ব দুই একটি আলোচনা সভায় তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ। বেগম রোকেয়া দিবসে আমাদের চাওয়া হচ্ছে সমাজে নারীবান্ধব পরিবেশ গড়ে উঠুক, আমরা আমাদের নারী সংগঠনগুলোর নড়াচড়া দেখতে চাই। দেখতে চাই তারা নারীর পক্ষে শক্তিশালী প্লাটফর্ম হয়ে নারী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। নারীদের জন্য এই মুহূর্তে দরকার সংগঠিতভাবে লড়াই করা।

লীনা পারভীন : কলাম লেখক ও সাবেক ছাত্রনেতা।

পোস্টটি ৩৪৫ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
২ টি মন্তব্য
২ টি মন্তব্য করা হয়েছে

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.