ফেসবুকের গল্পঃ ইমাম হাসান আল বান্নার বিয়ে
লিখেছেন ওসি সাহেব, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৪ ৯:৫৬ অপরাহ্ণ

ইমাম হাসান আল বান্নার বয়স যখন ২৬ বছর, আম্মা উম্মু সা’আদ পাত্রী খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু অমন পরহেজগার ছেলের জন্য উপযুক্ত পাত্রী পাওয়া খুব সহজ সাধ্য ছিল না। একবার তিনি সুলক্ষ্মী পরিবারে যেয়ে গল্প সল্প করছেন। এমন সময় কানে এলো কুরআন তিলাওয়াতের এক মিহি শব্দ। যেমন সুন্দর গলার সুর, তেমন শুদ্ধ তিলাওয়াত। তিনি বিমোহিত হয়ে গেলেন। আলহাজ্ব আলসূলী সাহেবের স্ত্রী তার পাশে বসা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, বোন এত সুন্দর তিলাওয়াত করছে কে? ‘আমার মেয়ে, লাতীফা’- জবাব দিলেন লাতীফার মা। তিনি বললেন : ‘আমি কি তাকে একটু দেখতে পারি’? লাতীফার মা বিস্মিত হয়ে গেলেন। হাসান আল বান্নার মা আমার মেয়েকে দেখতে চাচ্ছে, এতে কি আবার অনুমতি লাগে? তিনি উঠে দাঁড়িয়ে উম্মু সা’আদের হাত ধরে নিয়ে গেলেন লাতীফার ঘরে। দু’জনে দেখতে পেলেন লাতীফা তখনো সালাত আদায় করছেন। উম্মু সা’আদ খুব তীক্ষè নজরে লাতীফার সালাত আদায়ের দৃশ্য দেখতে লাগলেন। কী সুন্দর তিলাওয়াত! ইবাদাতে কী একাগ্রতা!! তিনি মুগ্ধ হয়ে গেলেন। সালাত আদায় শেষ হওয়া মাত্রই উম্মু সা’আদ দৌঁড়ে যেয়ে লাতীফাকে জড়িয়ে ধরলেন। তাকে বারবার দেখলেন। চোখ যেন ফিরানো যায় না এমন রূপ মেয়েটার। হাসান আল বান্নার বড় ছেলে আহমাদ সাইফুল ইসলাম তার মা সম্পর্কে বলেছেন : “আমার আম্মাকে দেখে অনেকেই ইউরোপিয়ান মনে করত, দেখতে খুবই সাদা ও সুন্দরী ছিলেন, খুব শৌখিন ও রুচির মানুষ ছিলেন তিনি”। হাসান আল বান্নার আম্মা উম্মু সা’আদ যেন তার আকাক্সিক্ষত মেয়ের সাক্ষাৎ পেয়ে গেলেন। তিনি পড়িমরি করে বাসায় ফিরে গেলেন, মুখে এক গাল হাসি, আর অন্তরে একরাশ আনন্দ তার। ইমাম আল বান্না রাতে বাসায় আসলেন। মা একান্তে নিয়ে লাতীফা সম্পর্কে তার মতামত জানিয়ে দিলেন। হাসান আল বান্না কয়েকটি প্রশ্ন করলেন আম্মাকে। তিনিও খুশি হলেন মায়ের আনন্দ দেখে। বাবা-মাসহ সবাইকে ডেকে হাসান আল-বান্নার মেয়ে দেখা সম্পর্কে পাকাপাকি হয়ে গেল। সিদ্ধান্ত হলো হাসান আল বান্না লাতীফাদের বাসায় যাবেন, চাইলে তাকে দেখবেন, পছন্দ হলে ঐখানে বসেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে আসবেন।

পরদিন সকালে হাসান আল বান্না আলহাজ্ব আলসূলী সাহেবের বাসায় গেলেন। হাজি সাহেবকে ডেকে কম্পিত ও লজ্জিত স্বরে লাতীফাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। আনন্দিত হাজি সাহেব যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। লাতীফাকে দেখতে চাইলেন না, মায়ের দেখায় যথেষ্ঠ মনে করলেন, এ যেন, হাজি সাহেব ভাবলেন, আজকের যুগের কোনো ছেলে না। তিনি ধড়পড় করে উঠে গেলেন মেয়ের কাছে। স্ত্রীকে ডাকলেন সেখানে, অন্যান্য ছেলেমেয়েরাও চলে এলো পাশে। মেয়েকে এই দুর্লভ মানুষের বিয়ের প্রস্তাব শুনিয়ে দিলেন। লাতীফাও আল বান্নার মতো এর জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়ভার বাবা মার উপর ছেড়ে দিলেন। মানে এখন বিয়ে বসতে কোনো বাঁধা রইলো না আর। এমন ছেলের সাথে মেয়ে বিয়ে দিতে কোনো চিন্তা ভাবনা করা লাগেনা। তিনি হাসান আল বান্নাকে সবার রাজি হবার কথা শুনিয়ে দিলেন এবং যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি করার জন্য অনুরোধ করলেন।

ইমাম বিয়ে করতে চাইলেন একদম সুন্নাতি কায়দায়। মসজিদে বিয়ে হতে হবে, বিয়েতে বাহুল্য ব্যয় সংকোচন করতে হবে এবং কোনো যৌতুক আদান প্রদান থেকে উভয় পক্ষ বিরত থাকতে হবে। সবই মেনে নেয়া হলো।

মসজিদের ইমাম সাহেব বিয়ে পড়ালেন। ১৩৫০ হিজরী মুতাবেক ১৯৩২ সালের রমাদানের প্রথমে বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়, বিয়ে হয় রমাদানের ২৭ তারিখ এবং উঠায়ে নেয়া হয় ঐ বছরের ১০ জিলহজ্জ। বিয়ে নিয়ে হাসান আল বান্না বলেছেন : “আল্লাহর ইচ্ছায় আমার মন হালকা হয়ে গেল। যে বয়সে বিভিন্ন কারণে ফিৎনায় পড়ে যাওয়ার ভয় হয় খুব বেশি, সেই বয়সেই আল্লাহ তাআলা আমার বিয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন। খুব সহজে এবং সাদামাটাভাবে আমার বিয়ে সম্পন্ন হয়।” হাসান আল বান্নার ভাই আব্দুর রাহমান বলেন : “ভায়ের বিয়ের সমস্ত আয়োজন মসজিদে করা হয়। সংগঠনের ভায়েরা কয়েক ডালা খেজুর নিয়ে আসলেন। সবাই আনন্দ চিত্তে তা খেয়ে নিলেন। সবার মনের মাঝে এক অনাবিল ভালোবাসার উষ্ণতা, আর এক জান্নাতি চেতনার উচ্ছ্বাস সেদিন আমরা লক্ষ্য করলাম”।

লাতীফার দাম্পত্য জীবন ছিলো ইসলামের এক জ্বাজল্যমান নমুনা। তিনি এক স্মৃতি চারণায় বলেছেন আবূ সায়ফ (হাসান আল বান্না) মনে করতেন নারীরা কখনোই পুরুষের অধীন নয়। আল্লাহ পুরুষকে ‘ক্বাওয়াম’ (নিসা : ৩৪) বা দায়িত্বশীলের যে পদমর্যাদা দিয়েছেন সে সম্পর্কে তিনি প্রায় বলতেন “ওয়া লাইসায যাকারু কাল উনথা” মেয়েদের মতো পুরুষ নয়। তিনি বলতেন : ‘ক্বাওয়ামের’ অর্থ হলো আল্লাহ যে বায়োলোজিক্যাল পার্থক্য দিয়ে নারী পুরুষকে সৃষ্টি করেছেন তার স্বীকৃতি দিয়ে নারী আর পুরুষের কাজের যে ক্ষেত্র করে দিয়েছেন সেখানে পৃথক করা। একজন আরেকজনের উপর প্রাধান্য বা প্রভুত্য এখানে বুঝানো হয়নি। তিনি এটার নাম দিয়েছেন মাতৃত্ব এবং পিতৃত্ব। তিনি এ বিষয়টাকে তিন ভাবে দেখতেন :

এক. স্বামী স্ত্রীর মধ্যে শারীরিক পার্থক্য একেবারেই ন্যাচারাল। পুরুষ এক ধরনের সৃষ্টি, বেশ কিছু পার্থক্য সহ নারী অন্য ধরনের। পুরুষের যেমন দায়িত্ব ও কর্মক্ষেত্র আছে, নারীরও ভিন্ন কর্মক্ষেত্র আছে, আছে ভিন্ন দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা এই প্রসঙ্গেই বলেছেন : মেয়েরা পুরুষের কাছে তেমনই পাওয়ার অধিকার রাখে, যেমন ভাবে পুরুষ এক মেয়ের কাছে অধিকার রাখে। তবে মেয়েদের উপরে পুরুষের আছে একটা অতিরিক্ত মর্যাদা”। (সূরা বাকারা : ২২৮) এখানে দেখানো হয়েছে একটা সংসারের আধিপত্য নারী পুরুষ দুইজনের মাঝে সমভাবে বণ্টিত। দুইজনের মাধ্যমেই সংসার সৃষ্টি হবে। তবে দায়িত্ব থাকবে পুরুষের কাছে। কারণ সেই শারীরিকভাবে বেশি পারংগম। আর মায়ের কাছে থাকবে সংসারের চাবিকাঠি, ফলে সম্মান ভোগ করবেন তিনিই বেশি।

দুই. হাসান আল বান্না মনে করতেন যেহেতু দুইজনের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক পার্থক্য আছে, কাজেই তার রিফ্লেকশান তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পড়া উচিৎ। দাম্পত্য জীবনে ইসলাম একজন নারীকে দিকনির্দেশনা দেয়, তাকে গর্ভধারণ, বাচ্চা পালন, তাদের প্রাথমিক জ্ঞান ও ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করার মতো কঠিন দায়িত্ব পালন করা। আর পুরুষ অনেকগুলো সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, সংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দ্বায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরিবারের সুন্দর অর্থনৈতিক অবস্থা তৈরি করবেন এবং এর সাথে সাথে আর দশটা মানুষের সাথে চলার মতো সামাজিক মর্যাদা সম্পন্ন করে পরিবারকে এগিয়ে নিবেন।

তিন. তিনি মনে করতেন স্বামী স্ত্রীর একে অন্যের প্রতি দৈহিক আকর্ষণ একেবারেই প্রাকৃতিক। এই সম্পর্ক তৈরি করতে ইসলাম আসেনি। কারণ এই সম্পর্ক তৈরি যে কেউ করতে পারে। এমন কি পশুদের মাঝেও এই সম্পর্ক অটোমেটিক ভাবে আসে। আর স্বামী স্ত্রীর ক্ষেত্রে শুধু দৈহিক সম্পর্ক হলে টিকবে কম। কারণ এমন এক পর্যায় স্ত্রীর আসতে পারে, যখন তার প্রতি দৈহিক আকর্ষণ অনেক কমে যায়। স্বামীরও এমন দৈহিক অবস্থা হতে পারে, যার পরে নিজের স্ত্রী অন্যের দিকে যেতে পারে। কাজেই ইসলাম স্বামী স্ত্রীর মাঝে আত্মার সম্পর্কটাই বড় করে দেখেছে। ইসলাম বলে দিয়েছে : “আল্লাহর অস্তিত্বের নমুনা হলো তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকে তোমাদেরই জোড় তৈরি করে দিয়েছেন, যাতে করে তার কাছে যেয়ে মনে শান্তি পেতে পার। এবং তিনি তোমাদের মধ্যে প্রেম ও অনুগ্রহ দিয়ে দিয়েছেন”। (সূরা রূম : ২১)। কাজেই প্রেম ভালোবাসাটাই এখানে মুখ্য।

তাদের দাম্পত্য জীবন এই তিন দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। লাতীফা বলেছেন : ‘আবূ সায়ফ’ তার পরিবারের আনন্দ বেদনার সাথে শরিক থাকতেন। তিনি দায়িত্ব পালন করতেন এমন ভাবে, সবাই বুঝতো অন্যরা একেক জন পরিবারের সদস্য আর তিনি একাই এই পরিবারের ছায়া দানকারী বিশাল মহিরুহ’। ছেলে আহমাদ সায়ফ বলেছেন : “আমার মারহুম আব্বাকে দেখতাম সব সময় আম্মার দিকের সমস্ত আত্মীয়দের কে কেমন আছেন, তা নাম নিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করতেন; তাদের খবর নিতেন এবং তাদের যে কোনো সমস্যার সমাধানে মগ্ন হতেন। তাদের বাসায় বেড়াতে যেতেন, বাসায় দাওয়াত দিতেন”। মেয়ে ড. সানা’ বলেন : “আব্বা আম্মার সাথে খুব শান্ত ভাবে কথা বলতেন; অনেক উদারতা দেখাতেন; খুব কোমলতার পরিচয় দিতেন প্রতিটি ক্ষেত্রেই। যাই ঘটুক না কেন, আমরা কোনোদিন তাকে উচ্চস্বরে কথা বলতে শুনিনি। সাংগঠনিক কাজের শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও আম্মাকে তিনি বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতেন। আম্মার সাথে তার আচরণে খুবই শৌখিনতার পরিচয় মিলতো। ঘরে যে সব জিনিস লাগবে, তিনি প্রায়ই তার লিস্ট তৈরি করতেন। পারলে নিজে, না পারলে অন্যের সহযোগিতায় সওদা করে বাসায় নিয়ে আসা ছিল তার দৈনন্দিন কাজের রুটিন। আমরা মাঝে মাঝে দেখতাম তিনি বলে দিচ্ছেন কখন ঘি, বা পেঁয়াজ বা রসুন গোছায়ে রাখতে হবে এবং খুবই বিস্মিত হতাম”।

দাম্পত্য জীবনে লাতীফার সুখের উৎস ছিলেন হাসান আল বান্না। তিনি আজীবন সে সুখের আস্বাদন না করে গেলেও হৃদয়-মন ভরা ছিল সুখের আবেশে। তার জীবনের সবচেয়ে গর্বের বিষয় ছিল ইমাম আল বান্না কখনোই তার ব্যবহারে রুষ্ট হননি। অত্যন্ত কঠিন মুহূর্তেও তার ধৈর্য আর আস্থা দেখে ইমাম আল বান্না নিজেও হতেন খুব আনন্দিত। তার চরিত্রের আরেকটা জিনিস ছিল তিনি অসম্ভব রকমের স্বল্পে তুষ্ট থাকতেন। মুখে তুলে কোনো দিন স্বামীর দেয়া উপঢৌকনকে সমালোচনা করেননি। এমনকি কোনো দিন কোনো দাবি মুখ ফুটে বলেন নি। আমার মনে হয় তার পরিবারের সমস্ত সন্তানকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারার পিছনে এই সব গুণাবলী মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। ইমামের অবর্তমানেও তার সন্তানদের তিনজনই হলেন মেডিক্যাল, বিজনেস স্টাডিজ এবং গার্হস্থ্য অর্থনীতিতে ডক্টর এবং প্রফেসর। ছেলে আহমাদ সাইফুল ইসলাম পিতার যোগ্য উত্তরসূরিই বলা যায়।

স্বামীর কাজে তিনি কখনোই বাধা হয়ে দাঁড়াননি, বরং প্রতিটি কাজেই তাকে সাহায্য করেছেন। ইমাম ঘরে ঢুকলেই তিনি তৎপর হয়ে যেতেন। ব্যগ্র হয়ে যেতেন তার সেবা শুশ্রƒসায়। সারাদিনের শতকষ্টও তাকে বুঝতে দিতেন না। রাতে স্বামীর সাথেই তাহাজ্জুদ পড়তেন তিনি। তিনি বলেন : “আমি আমার স্বামীকে আমার প্রতি পূর্ণ খুশি আছে- না দেখে কখনোই ঘুমানো ভালো মনে করতাম না। কারণ মনে করতাম যদি আমি স্বামীকে কষ্ট দিয়ে মরে যাই তা হলে জান্নাতে তাকে হয়ত আর পাবনা”।

কার্টেসিঃ সাপ্তাহিক সোনার বাংলা

 

ইমাম হাসান আল বান্নার বয়স যখন ২৬ বছর, আম্মা উম্মু সা’আদ পাত্রী খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু অমন পরহেজগার ছেলের জন্য উপযুক্ত পাত্রী পাওয়া খুব সহজ সাধ্য ছিল না। একবার তিনি সুলক্ষ্মী পরিবারে যেয়ে গল্প সল্প করছেন। এমন সময় কানে এলো কুরআন তিলাওয়াতের এক মিহি শব্দ। যেমন সুন্দর গলার সুর, তেমন শুদ্ধ তিলাওয়াত। তিনি বিমোহিত হয়ে গেলেন। আলহাজ্ব আলসূলী সাহেবের স্ত্রী তার পাশে বসা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, বোন এত সুন্দর তিলাওয়াত করছে কে? ‘আমার মেয়ে, লাতীফা’- জবাব দিলেন লাতীফার মা। তিনি বললেন : ‘আমি কি তাকে একটু দেখতে পারি’? লাতীফার মা বিস্মিত হয়ে গেলেন। হাসান আল বান্নার মা আমার মেয়েকে দেখতে চাচ্ছে, এতে কি আবার অনুমতি লাগে? তিনি উঠে দাঁড়িয়ে উম্মু সা’আদের হাত ধরে নিয়ে গেলেন লাতীফার ঘরে। দু’জনে দেখতে পেলেন লাতীফা তখনো সালাত আদায় করছেন। উম্মু সা’আদ খুব তীক্ষè নজরে লাতীফার সালাত আদায়ের দৃশ্য দেখতে লাগলেন। কী সুন্দর তিলাওয়াত! ইবাদাতে কী একাগ্রতা!! তিনি মুগ্ধ হয়ে গেলেন। সালাত আদায় শেষ হওয়া মাত্রই উম্মু সা’আদ দৌঁড়ে যেয়ে লাতীফাকে জড়িয়ে ধরলেন। তাকে বারবার দেখলেন। চোখ যেন ফিরানো যায় না এমন রূপ মেয়েটার। হাসান আল বান্নার বড় ছেলে আহমাদ সাইফুল ইসলাম তার মা সম্পর্কে বলেছেন : “আমার আম্মাকে দেখে অনেকেই ইউরোপিয়ান মনে করত, দেখতে খুবই সাদা ও সুন্দরী ছিলেন, খুব শৌখিন ও রুচির মানুষ ছিলেন তিনি”। হাসান আল বান্নার আম্মা উম্মু সা’আদ যেন তার আকাক্সিক্ষত মেয়ের সাক্ষাৎ পেয়ে গেলেন। তিনি পড়িমরি করে বাসায় ফিরে গেলেন, মুখে এক গাল হাসি, আর অন্তরে একরাশ আনন্দ তার। ইমাম আল বান্না রাতে বাসায় আসলেন। মা একান্তে নিয়ে লাতীফা সম্পর্কে তার মতামত জানিয়ে দিলেন। হাসান আল বান্না কয়েকটি প্রশ্ন করলেন আম্মাকে। তিনিও খুশি হলেন মায়ের আনন্দ দেখে। বাবা-মাসহ সবাইকে ডেকে হাসান আল-বান্নার মেয়ে দেখা সম্পর্কে পাকাপাকি হয়ে গেল। সিদ্ধান্ত হলো হাসান আল বান্না লাতীফাদের বাসায় যাবেন, চাইলে তাকে দেখবেন, পছন্দ হলে ঐখানে বসেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে আসবেন।

পরদিন সকালে হাসান আল বান্না আলহাজ্ব আলসূলী সাহেবের বাসায় গেলেন। হাজি সাহেবকে ডেকে কম্পিত ও লজ্জিত স্বরে লাতীফাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। আনন্দিত হাজি সাহেব যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। লাতীফাকে দেখতে চাইলেন না, মায়ের দেখায় যথেষ্ঠ মনে করলেন, এ যেন, হাজি সাহেব ভাবলেন, আজকের যুগের কোনো ছেলে না। তিনি ধড়পড় করে উঠে গেলেন মেয়ের কাছে। স্ত্রীকে ডাকলেন সেখানে, অন্যান্য ছেলেমেয়েরাও চলে এলো পাশে। মেয়েকে এই দুর্লভ মানুষের বিয়ের প্রস্তাব শুনিয়ে দিলেন। লাতীফাও আল বান্নার মতো এর জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়ভার বাবা মার উপর ছেড়ে দিলেন। মানে এখন বিয়ে বসতে কোনো বাঁধা রইলো না আর। এমন ছেলের সাথে মেয়ে বিয়ে দিতে কোনো চিন্তা ভাবনা করা লাগেনা। তিনি হাসান আল বান্নাকে সবার রাজি হবার কথা শুনিয়ে দিলেন এবং যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি করার জন্য অনুরোধ করলেন।

ইমাম বিয়ে করতে চাইলেন একদম সুন্নাতি কায়দায়। মসজিদে বিয়ে হতে হবে, বিয়েতে বাহুল্য ব্যয় সংকোচন করতে হবে এবং কোনো যৌতুক আদান প্রদান থেকে উভয় পক্ষ বিরত থাকতে হবে। সবই মেনে নেয়া হলো।

মসজিদের ইমাম সাহেব বিয়ে পড়ালেন। ১৩৫০ হিজরী মুতাবেক ১৯৩২ সালের রমাদানের প্রথমে বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়, বিয়ে হয় রমাদানের ২৭ তারিখ এবং উঠায়ে নেয়া হয় ঐ বছরের ১০ জিলহজ্জ। বিয়ে নিয়ে হাসান আল বান্না বলেছেন : “আল্লাহর ইচ্ছায় আমার মন হালকা হয়ে গেল। যে বয়সে বিভিন্ন কারণে ফিৎনায় পড়ে যাওয়ার ভয় হয় খুব বেশি, সেই বয়সেই আল্লাহ তাআলা আমার বিয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন। খুব সহজে এবং সাদামাটাভাবে আমার বিয়ে সম্পন্ন হয়।” হাসান আল বান্নার ভাই আব্দুর রাহমান বলেন : “ভায়ের বিয়ের সমস্ত আয়োজন মসজিদে করা হয়। সংগঠনের ভায়েরা কয়েক ডালা খেজুর নিয়ে আসলেন। সবাই আনন্দ চিত্তে তা খেয়ে নিলেন। সবার মনের মাঝে এক অনাবিল ভালোবাসার উষ্ণতা, আর এক জান্নাতি চেতনার উচ্ছ্বাস সেদিন আমরা লক্ষ্য করলাম”।

লাতীফার দাম্পত্য জীবন ছিলো ইসলামের এক জ্বাজল্যমান নমুনা। তিনি এক স্মৃতি চারণায় বলেছেন আবূ সায়ফ (হাসান আল বান্না) মনে করতেন নারীরা কখনোই পুরুষের অধীন নয়। আল্লাহ পুরুষকে ‘ক্বাওয়াম’ (নিসা : ৩৪) বা দায়িত্বশীলের যে পদমর্যাদা দিয়েছেন সে সম্পর্কে তিনি প্রায় বলতেন “ওয়া লাইসায যাকারু কাল উনথা” মেয়েদের মতো পুরুষ নয়। তিনি বলতেন : ‘ক্বাওয়ামের’ অর্থ হলো আল্লাহ যে বায়োলোজিক্যাল পার্থক্য দিয়ে নারী পুরুষকে সৃষ্টি করেছেন তার স্বীকৃতি দিয়ে নারী আর পুরুষের কাজের যে ক্ষেত্র করে দিয়েছেন সেখানে পৃথক করা। একজন আরেকজনের উপর প্রাধান্য বা প্রভুত্য এখানে বুঝানো হয়নি। তিনি এটার নাম দিয়েছেন মাতৃত্ব এবং পিতৃত্ব। তিনি এ বিষয়টাকে তিন ভাবে দেখতেন :

এক. স্বামী স্ত্রীর মধ্যে শারীরিক পার্থক্য একেবারেই ন্যাচারাল। পুরুষ এক ধরনের সৃষ্টি, বেশ কিছু পার্থক্য সহ নারী অন্য ধরনের। পুরুষের যেমন দায়িত্ব ও কর্মক্ষেত্র আছে, নারীরও ভিন্ন কর্মক্ষেত্র আছে, আছে ভিন্ন দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা এই প্রসঙ্গেই বলেছেন : মেয়েরা পুরুষের কাছে তেমনই পাওয়ার অধিকার রাখে, যেমন ভাবে পুরুষ এক মেয়ের কাছে অধিকার রাখে। তবে মেয়েদের উপরে পুরুষের আছে একটা অতিরিক্ত মর্যাদা”। (সূরা বাকারা : ২২৮) এখানে দেখানো হয়েছে একটা সংসারের আধিপত্য নারী পুরুষ দুইজনের মাঝে সমভাবে বণ্টিত। দুইজনের মাধ্যমেই সংসার সৃষ্টি হবে। তবে দায়িত্ব থাকবে পুরুষের কাছে। কারণ সেই শারীরিকভাবে বেশি পারংগম। আর মায়ের কাছে থাকবে সংসারের চাবিকাঠি, ফলে সম্মান ভোগ করবেন তিনিই বেশি।

দুই. হাসান আল বান্না মনে করতেন যেহেতু দুইজনের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক পার্থক্য আছে, কাজেই তার রিফ্লেকশান তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পড়া উচিৎ। দাম্পত্য জীবনে ইসলাম একজন নারীকে দিকনির্দেশনা দেয়, তাকে গর্ভধারণ, বাচ্চা পালন, তাদের প্রাথমিক জ্ঞান ও ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করার মতো কঠিন দায়িত্ব পালন করা। আর পুরুষ অনেকগুলো সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, সংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দ্বায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরিবারের সুন্দর অর্থনৈতিক অবস্থা তৈরি করবেন এবং এর সাথে সাথে আর দশটা মানুষের সাথে চলার মতো সামাজিক মর্যাদা সম্পন্ন করে পরিবারকে এগিয়ে নিবেন।

তিন. তিনি মনে করতেন স্বামী স্ত্রীর একে অন্যের প্রতি দৈহিক আকর্ষণ একেবারেই প্রাকৃতিক। এই সম্পর্ক তৈরি করতে ইসলাম আসেনি। কারণ এই সম্পর্ক তৈরি যে কেউ করতে পারে। এমন কি পশুদের মাঝেও এই সম্পর্ক অটোমেটিক ভাবে আসে। আর স্বামী স্ত্রীর ক্ষেত্রে শুধু দৈহিক সম্পর্ক হলে টিকবে কম। কারণ এমন এক পর্যায় স্ত্রীর আসতে পারে, যখন তার প্রতি দৈহিক আকর্ষণ অনেক কমে যায়। স্বামীরও এমন দৈহিক অবস্থা হতে পারে, যার পরে নিজের স্ত্রী অন্যের দিকে যেতে পারে। কাজেই ইসলাম স্বামী স্ত্রীর মাঝে আত্মার সম্পর্কটাই বড় করে দেখেছে। ইসলাম বলে দিয়েছে : “আল্লাহর অস্তিত্বের নমুনা হলো তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকে তোমাদেরই জোড় তৈরি করে দিয়েছেন, যাতে করে তার কাছে যেয়ে মনে শান্তি পেতে পার। এবং তিনি তোমাদের মধ্যে প্রেম ও অনুগ্রহ দিয়ে দিয়েছেন”। (সূরা রূম : ২১)। কাজেই প্রেম ভালোবাসাটাই এখানে মুখ্য।

তাদের দাম্পত্য জীবন এই তিন দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। লাতীফা বলেছেন : ‘আবূ সায়ফ’ তার পরিবারের আনন্দ বেদনার সাথে শরিক থাকতেন। তিনি দায়িত্ব পালন করতেন এমন ভাবে, সবাই বুঝতো অন্যরা একেক জন পরিবারের সদস্য আর তিনি একাই এই পরিবারের ছায়া দানকারী বিশাল মহিরুহ’। ছেলে আহমাদ সায়ফ বলেছেন : “আমার মারহুম আব্বাকে দেখতাম সব সময় আম্মার দিকের সমস্ত আত্মীয়দের কে কেমন আছেন, তা নাম নিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করতেন; তাদের খবর নিতেন এবং তাদের যে কোনো সমস্যার সমাধানে মগ্ন হতেন। তাদের বাসায় বেড়াতে যেতেন, বাসায় দাওয়াত দিতেন”। মেয়ে ড. সানা’ বলেন : “আব্বা আম্মার সাথে খুব শান্ত ভাবে কথা বলতেন; অনেক উদারতা দেখাতেন; খুব কোমলতার পরিচয় দিতেন প্রতিটি ক্ষেত্রেই। যাই ঘটুক না কেন, আমরা কোনোদিন তাকে উচ্চস্বরে কথা বলতে শুনিনি। সাংগঠনিক কাজের শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও আম্মাকে তিনি বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতেন। আম্মার সাথে তার আচরণে খুবই শৌখিনতার পরিচয় মিলতো। ঘরে যে সব জিনিস লাগবে, তিনি প্রায়ই তার লিস্ট তৈরি করতেন। পারলে নিজে, না পারলে অন্যের সহযোগিতায় সওদা করে বাসায় নিয়ে আসা ছিল তার দৈনন্দিন কাজের রুটিন। আমরা মাঝে মাঝে দেখতাম তিনি বলে দিচ্ছেন কখন ঘি, বা পেঁয়াজ বা রসুন গোছায়ে রাখতে হবে এবং খুবই বিস্মিত হতাম”।

দাম্পত্য জীবনে লাতীফার সুখের উৎস ছিলেন হাসান আল বান্না। তিনি আজীবন সে সুখের আস্বাদন না করে গেলেও হৃদয়-মন ভরা ছিল সুখের আবেশে। তার জীবনের সবচেয়ে গর্বের বিষয় ছিল ইমাম আল বান্না কখনোই তার ব্যবহারে রুষ্ট হননি। অত্যন্ত কঠিন মুহূর্তেও তার ধৈর্য আর আস্থা দেখে ইমাম আল বান্না নিজেও হতেন খুব আনন্দিত। তার চরিত্রের আরেকটা জিনিস ছিল তিনি অসম্ভব রকমের স্বল্পে তুষ্ট থাকতেন। মুখে তুলে কোনো দিন স্বামীর দেয়া উপঢৌকনকে সমালোচনা করেননি। এমনকি কোনো দিন কোনো দাবি মুখ ফুটে বলেন নি। আমার মনে হয় তার পরিবারের সমস্ত সন্তানকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারার পিছনে এই সব গুণাবলী মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। ইমামের অবর্তমানেও তার সন্তানদের তিনজনই হলেন মেডিক্যাল, বিজনেস স্টাডিজ এবং গার্হস্থ্য অর্থনীতিতে ডক্টর এবং প্রফেসর। ছেলে আহমাদ সাইফুল ইসলাম পিতার যোগ্য উত্তরসূরিই বলা যায়।

স্বামীর কাজে তিনি কখনোই বাধা হয়ে দাঁড়াননি, বরং প্রতিটি কাজেই তাকে সাহায্য করেছেন। ইমাম ঘরে ঢুকলেই তিনি তৎপর হয়ে যেতেন। ব্যস্ত হয়ে যেতেন তার সেবা শুশ্রূষায়। সারাদিনের শতকষ্টও তাকে বুঝতে দিতেন না। রাতে স্বামীর সাথেই তাহাজ্জুদ পড়তেন তিনি। তিনি বলেন : “আমি আমার স্বামীকে আমার প্রতি পূর্ণ খুশি আছে- না দেখে কখনোই ঘুমানো ভালো মনে করতাম না। কারণ মনে করতাম যদি আমি স্বামীকে কষ্ট দিয়ে মরে যাই তা হলে জান্নাতে তাকে হয়ত আর পাবনা”।

কার্টেসিঃ সাপ্তাহিক সোনার বাংলা

পোস্টটি ৪৯১ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.