দূষিত পানির রমরমা বাণিজ্য
লিখেছেন ওসি সাহেব, এপ্রিল ২, ২০১৬ ৭:১২ অপরাহ্ণ
download

বোতলজাত পানির দাম বেশি হওয়ায় কম দামে বেশি পানির প্রলোভন দেখিয়ে রাজধানীজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে ‘জার’ নামক প্লাস্টিক কনটেইনার ভর্তি পানির রমরমা বাণিজ্য। এক ধরনের অস্বচ্ছ ও প্লাস্টিকের কনটেইনারে ভর্তি করে ‘মিনারেল ওয়াটার’ নামে বিক্রি করা হচ্ছে এ পানি। ঢাকা ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধ থাকায় অনেক নগরবাসী বাসাবাড়িতে এ পানি কিনে খাচ্ছেন। এ ছাড়া রাস্তার ফুটপাথে গড়ে ওঠা চায়ের দোকানগুলোতেও এক গ্লাস এক টাকা মূল্যে এ পানি বিক্রি হচ্ছে দেদার। হোটেল-রেস্তোরাঁ, স্কুল-কলেজ, বেকারি, ফাস্টফুডের দোকান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে চাহিদামতো এ পানি সরবরাহ করা হয়। বিভিন্ন নামে-বেনামে প্রতিষ্ঠান খুলে এ ব্যবসায় করা হচ্ছে। যারা এ পানির ব্যবসায় করছেন তাদের বেশির ভাগেরই নেই বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স। জারের পানি আদৌ পরিশোধন করা হয় না। সরাসরি ওয়াসার সাপ্লাই করা পানিতে ফিটকিরি ও দুর্গন্ধ দূর করার ট্যাবলেট মিশিয়ে তা কনটেইনারে ভরে বাজারজাত করা হয়। বিএসটিআই, জেলা প্রশাসন ও র‌্যাব মাঝে মধ্যেই এর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় করে থাকে। কখনো কখনো পাঠানো হয় জেলখানায়। কিন্তু এ ব্যবসায় ক্রমান্বয়ে এতটাই লাভবান হয়ে উঠেছে যে জেল-জরিমানার পরও তারা আরো বেপরোয়াভাবে অবৈধ এ ব্যবসায় চালিয়ে যাচ্ছে। 
রাজধানীতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নলকূপ বসানোর সুযোগ নেই। ঢাকা ওয়াসা দুই দশক আগে রাজধানীর বিভিন্ন মোড় থেকে বিনামূল্যে পানি সরবরাহের কলগুলোও তুলে নিয়েছে। নগরবাসীকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ওয়াসা, কিন্তু এখনো পর্যন্ত তারা সফলতা দেখাতে পারেনি। নদীর পানি বিশুদ্ধ করে গ্রাহকদের সরবরাহ করলেও পানিতে দুর্গন্ধ থেকে যাচ্ছে। আগুনের তাপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোটানোর পর সে পানি কোনো রকম পানযোগ্য হলেও দুর্গন্ধ যাচ্ছে না। এ কারণে অনেক নগরবাসী মিনারেল ওয়াটারের নামে জারের পানি কিনে খেতে বাধ্য হচ্ছেন। আর এ সুযোগে এলাকার অলি-গলিতে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন অবৈধ কোম্পানি, যারা বাসাবাড়ি, দোকান-হোটেলে এ পানি পৌঁছে দিচ্ছে। 
মোড়ে মোড়ে বিনামূল্যের কল চালু থাকার সময় নগরবাসী গরমে স্বস্তি পেতে হাতমুখ ধুতে পারত, মেটাতে পারত তৃষ্ণা। কিন্তু ওই সব পানির লাইন থেকে বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বস্তিতে অবৈধ সংযোগ নেয়ার অভিযোগে ওয়াসা কর্তৃপ বিনামূল্যে পানি সরবরাহ পরিষেবা বন্ধ করে দেয়। এ অবস্থায় পথচলা মানুষ বাধ্য হয়েই নিরাপদ ভেবে পান করছে ফুটপাথের ‘ফিল্টার পানি’। 
ফকিরাপুল মোড়ে ফুটপাথে আজিবর শেখের চায়ের দোকানে আদা-চায়ের পাশাপাশি ‘ফিল্টার পানি’ বিক্রিও বেশ জমজমাট। এই চা বিক্রেতা জানান, ছাত্রছাত্রী ও রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে সব ধরনের পথচারী তার ‘ফিল্টার পানির’ ক্রেতা। প্রতি গ্লাস পানির দাম মাত্র এক টাকা। আর কোম্পানির কাছ থেকে তিনি ২০ লিটারের বড় জারভর্তি পানি কেনেন ৪০ টাকায়। দিনে তার বিক্রি হয় তিন-চার জার পানি।
ভালো করে খেয়াল করলে চোখে পড়ে, ওই দোকানের ‘ফিল্টার পানির’ জারগুলো আদৌ মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) অনুমোদিত নয়। এ ছাড়া জারগুলোর গায়ে কোনো কোম্পানির নাম বা মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখও উল্লেখ নেই।
শুধু আজিবর শেখের এ দোকানই নয়, রাজধানীর ফুটপাথের দোকান ও মাঝারি মানের রেস্তোরাঁয় সরবরাহ করা ‘ফিল্টার পানির’ ৮০ শতাংশই পরিশোধিত নয় বলে বিএসটিআই কর্মকর্তাদের অভিমত। 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে শতাধিক প্রতারকচক্র ওয়াসার পানি সরাসরি জারে ভরে এগুলো ‘ফিল্টার পানি’ হিসেবে বিক্রি করছে। বিএসটিআই এবং ওয়াসা এসব অবৈধ কারখানার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানও চালাচ্ছে। অবৈধ কারখানা সিলগালা করে জরিমানাও করা হচ্ছে প্রতারকচক্রকে। কিন্তু একই অবৈধ ব্যবসায়ীরা আবারো জড়িয়ে পড়ছে ‘ফিল্টার্ড পানির’ চড়া লাভের ব্যবসায়। মাত্র ৬০০ টাকার পাঁচ হাজার লিটার ওয়াসার পানি প্রতারকচক্র বিক্রি করছে ছয় থেকে দশ হাজার টাকায়।
কোহিনুর ওয়াটার হাউজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান রাজধানীর মিরপুর এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরে জারের পানির ব্যবসায় করে আসছে। কিন্তু নিয়মমতো পরিশোধন না করেই বাজারজাত করে আসছিলেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক। এ কারণে গত ১৩ মার্চ বিএসটিআইয়ের ভ্রাম্যমাণ আদালত কারখানাটি সিলগালা করে দেন। ভেঙে ফেলা হয় বেশ কিছু জার। এ ছাড়া মালিককে সাত হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। 
একইভাবে মগবাজার মধুবাগে রিলায়েন্স ট্রেডিং করপোরেশন দীর্ঘ দিন থেকে দূষিত পানির ব্যবসায় করে আসছে। বিএসটিআইয়ের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে মালিককে তিন মাসের জেল এবং এক লাখ টাকা জরিমানা করেন। 
খিলগাঁও এলাকায় প্যাসিফিক ড্রিংকিং ওয়াটার নামে একটি প্রতিষ্ঠান খুলে ওই এলাকায় জার পানি বিক্রি করা হচ্ছিল অনেক দিন থেকে। সম্প্রতি র‌্যাব ও বিএসটিআই যৌথ অভিযান চালিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করে দিয়েছে। এ ছাড়া কারখানা মালিককে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একইভাবে ওই এলাকার সেনসিবল ব্যাভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজকে অবৈধভাবে জার পানির ব্যবসায় করায় এক লাখ টাকা জরিমানা করেন র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমান। মিরপুরের মহিউদ্দিন ফুডস অ্যান্ড কেমিক্যালকে এক লাখ টাকা জরিমানা ও ১০০ পানির জার ধ্বংস করে দেয় র‌্যাবের সরোয়ার আলমের ভ্রাম্যমাণ আদালত। মগবাজারের আহসান ড্রিংকিং ওয়াটার এবং পশ্চিম যাত্রাবাড়ীর ইউনিক ড্রিংকিং ওয়াটারকে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। 
বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (সিএম) নূরুল আমিন নয়া দিগন্তকে জানান, বর্তমানে দেশে মাত্র ২৪৭টি কোম্পানি বিএসটিআই থেকে অনুমোদন নিয়ে বোতলজাত ও জারে করে পানির ব্যবসায় করছে। এর মধ্যে রাজধানীসহ আশপাশের এলাকাতে রয়েছে দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠান। বিএসটিআই থেকে এ পর্যন্ত ৩৬৭ কোম্পানিকে লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, বাকিদের মধ্যে কারো মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে কিংবা বাতিল হয়ে গেছে। নুরুল আমিন বলেন, রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে জার পানির ব্যবসায় করছে। এদের ধরতে র‌্যাব, জেলা প্রশাসনের সহায়তায় নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। এত অভিযানের পরও কেন অবৈধ পানির ব্যবসায় বন্ধ করা যাচ্ছে নাÑ এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কতগুলো নিয়ম মেনে জারে পানিভর্তি করে বিক্রি করতে হয়। সে জন্য প্রথমত বিএসটিআইয়ের অনুমোদন থাকতে হবে। একজন রসায়নবিদ ও পরিচ্ছন্ন কর্মী থাকতে হবে। যেসব কর্মী জারে পানিভর্তি করবেন, তাদের সুস্বাস্থ্যের সনদ থাকতে হবে। লেবেল, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ উল্লেখ করতে হবে। একটি মানসম্পন্ন সুপেয় পানি তৈরির কারখানায় মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীা করা জরুরি। এ পরীা করা না হলে পানিতে ডায়রিয়া, কলেরা ও টাইফয়েডসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের জীবাণু থেকে যেতে পারে। এ ছাড়া পুনর্ব্যবহৃত (রিসাইকেলড) জারগুলোকে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হয়। বর্তমানে প্রতিটি কারখানায় জার পরিষ্কার যন্ত্র থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব না থাকলে তাদের লাইসেন্স দেয়া হয় না। এ ছাড়া বৈধভাবে পানির ব্যবসায় করতে হলে কমপক্ষে ২০-২৫ লাখ টাকা প্রয়োজন। অনেকে চার-পাঁচ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যবসায় শুরু করে দেন। পরে জরিমানা-জেল দিলেও তারা আবার ওই ব্যবসায় চালাতে থাকেন। নুরুল আমিন মনে করেন, জনগণের মধ্যে সচেতনতা ছাড়া শুধু অভিযান চালিয়ে অবৈধ এ ব্যবসায় বন্ধ করা সম্ভব নয়। 
ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে বর্তমানে মাত্র ৩৫টি কোম্পানির ওয়াসার পানি ব্যবহারের লাইসেন্স রয়েছে। 
বিএসটিআই বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পানিতে অল্প ও ারের গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৬ দশমিক ৪ থেকে ৭ দশমিক ৪। কিন্তু ঢাকায় সরবরাহকৃত বেশির ভাগ জারের পানিতে ারের পরিমাণ বেশি পাওয়া গেছে মোবাইল কোর্টের পরীায়। পানি পরিশোধনের যন্ত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না করায় ারের পরিমাণ বেড়ে গেছে বলে জানা যায়। তাছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানের েেত্রই পরিশোধন না করে ও পরীা-নিরীা ছাড়াই প্লাস্টিকের জারে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। শুধু জারের মুখ কর্কবন্দী করে নাম দেয়া হয়েছে ‘ফিল্টার পানি’। তথাকথিত বিশুদ্ধ পানিভর্তি জারটির গায়ে নেই কোনো লেবেল, এমনকি উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখও দেয়া থাকে না।
দূষিত পানির কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি : ইবনে সিনা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক মেজর (অব:) ডা: আনোয়ার হোসেন বলেন, পানিতে তিকর উপাদানগুলোর মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতিতে টাইফয়েড জাতীয় রোগ, ডায়রিয়া, আমাশয়, কলেরা, জণ্ডিসের মতো জটিল রোগ হতে পারে। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, পিএইচ ভ্যালু ৬.৫-এর নিচে নেমে গেলে পানিতে অ্যাসিডিটি বেড়ে যায়। এতে মাড়িতে তের সৃষ্টি হতে পারে। যদি কেউ লেড ও ক্যাডমিয়ামযুক্ত পানি নিয়মিত পান করে এবং তা অভ্যাসে পরিণত হয় তাহলে তার শরীরে পুষ্টির অসমতা দেখা দিতে পারে।

– See more at: http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/104585#sthash.kp3sAH9U.dpuf

পোস্টটি ৫৩০ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

Leave a Reply

Be the First to Comment!

Notify of
avatar
wpDiscuz