শিশু বিকাশ (পর্ব-এক)
লিখেছেন নুসরাত জাহান, নভেম্বর ১, ২০১৭ ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ
1

অনেক টু বি মাদার আছেন,অনেকে মা হয়েছেন প্রথম বারের মত আর অনেকে দ্বিতীয় বারের মত সবার জন্যই আমার কিছু কথা।
একটা বাচ্চার সাইকোলজি বুঝে তাকে হ্যান্ডল করাটা খুব ই গুরুত্বপূর্ণ আর এটা করতে হয় মূলত মা কে যেহেতু মায়ের কাছেই বাচ্চা বেশি সময় ধরে থাকে।

সব বাচ্চার স্বভাব,বুদ্ধি,আচরণ একরকম নয়।কেউ জেদি,কেউ শান্ত,কেউ খুব দুষ্ট।কেউ খেতেই চায় না,কেউ ভালোই খায় আবার কেউ নিত্যনতুন খাবার চায়।কেউ একবার বললেই বুঝে আর কাউকে বারবার বলতে হয়।সব বাচ্চা আলাদা।আপনাকে বুঝতে হবে আপনার বাচ্চাটি কেমন আর তাকে সেভাবেই সামলাতে হবে।
আপনার বাচ্চাকে আপনি যখন স্কুলে দিবেন তখন আপনি খেয়াল রাখবেন সে কতটুকু শিখছে আর তার শিখতে কেমন সময় লাগছে।সব বাচ্চার শেখার সময় এক নয়।কারো ২ মিনিট লাগে তো কারো ২ দিন।কেউ খেলার মাধ্যমে শিখে আর কেউ টিভি বা অন্য মিডিয়া দিয়ে ভালো শিখতে পারে।

যে যেভাবেই শিখুক, যত সময় নিয়েই শিখুক জোর করে বাচ্চার উপর কিছু চাপিয়ে দিবেন না।
আমাদের মায়েরা কাগজে কলমে এখন মোটামুটি শিক্ষিত কিন্তু বাচ্চাকে পড়ানোর সময় এসে তারা কেন যেন অশিক্ষিতার মত আচরণ করেন।

বাচ্চাকে জোর প্রদান করেন,শিখতে সময় লাগলে মারেন,পাশের বাড়ির বাচ্চার কিংবা কলিগের বাচ্চার সাথে তুলনা করেন।রোল নং ১০ এর মধ্যেই হওয়া লাগবে এজন্য দিন রাত পড়ার টেবিলে বসিয়ে রাখেন। প্লিজ এটা করবেন না।আপনি তাহলে নিজ হাতে বাচ্চার মেধা নষ্ট করে দিচ্ছেন।এভাবে বাচ্চার শেখার আগ্রহ তৈরি হয় না বরং পড়ালেখা কে বাড়তি কাজ ভাবতে শুরু করে এবং পড়ায় সে আগ্রহ পায় না,ফাঁকি দিতে চায়।

পাশের বাড়ির বাচ্চা ১ম বা ১০ম হোক কোন সমস্যা নেই।আপনার বাচ্চা পাশ করলেই চলবে।সে কি জানে সেটা দরকার, সে জেনে একটা কাগজে লিখে কত নাম্বার নিয়ে আসল সেটা দরকারি না।

আপনি বাচ্চাকে B for Ball শিখালেন,সে পরীক্ষার খাতায় B for Bat লিখে পাশ করল আর অন্য বাচ্চা B for Ball লিখে ১ম হল এখানে কৃতিত্ব আপনার সন্তানের বেশি।সে নিজের চিন্তা কে বিকশিত করতে পেরেছে।

প্রশ্ন করেন মায়েরা ‘কিন্তু মানুষ তো রেজাল্ট দেখে?’
আমার উত্তর হল, তো? মানুষের দেখা দিয়ে আপনার কোন লাভ টা হচ্ছে? আপনি যদি ভাবেন ১ম হওয়াটা গর্বের ব্যাপার তবে সেটাতে গর্ববোধ করবেন আর যদি ভাবেন পাশ করলেও হবে,ফেইল করলেও আমি লজ্জিত হব না বরং আমার সন্তানকে চেষ্টা করে যেতে উৎসাহ দিব তাহলে সেটা নিয়েই আপনি গর্ববোধ করতে পারেন।এখানে আপনার থিংকিং বা চিন্তা ভাবনাই মূল ব্যাপার।
যখন কলিগের বৌ বুক ফুলিয়ে বলবে ভাবি জানেন আমার বাচ্চা তো সবসময় টপ করে আপনি কেন চুপ থাকেন আর বাচ্চাকে এসে তুলনা করে পড়তে বলেন? আপনি বরং ঐ ভাবিকেই বলুন খুব ভালো আর আপনি আপনার সন্তান নিয়ে সন্তুষ্ট!

বাংলাদেশে আমার দেখা কমন সিনারিও এগুলা।আরো কিছু উদাহরণ দিচ্ছি –
১। বাচ্চা পরীক্ষায় খাতায় উত্তর লিখে না কারণ সে প্রশ্ন বুঝতে পারে নাই। এরপর মা সারাদিন তাকে রুমে দরজা বন্ধ করে পড়াতেই থাকেন।তাকে খেলতে দেন না। এখানে মা তার বাচ্চার স্বাভাবিক বিকাশের পথ বন্ধ করে দিলেন দরজার সাথে সাথে।

২। বাচ্চা নিজে না লিখে আরেকজন কে লিখতে সাহায্য করে। এরপর মা দিলেন মাইর। এখানে মা বাচ্চাকে সহযোগীতা ব্যাপার টা কোন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে সেটা বুঝার ক্ষমতা ধ্বংস করে দিচ্ছিলেন।

৩। স্কুল থেকে বাচ্চার নামে কমপ্লেইন্ট আসল বাচ্চা অন্যদের তুলনায় স্লো আর পড়া পারে না। মা শুনেই বাচ্চাকে বলল তুমি ব্যাড বেবী আর বাকিদের বলল ওকে আদর করবা না আর। বাচ্চা চুপ করে মাথা নিচু করে রইল।এরপর তাকে যতই আদর করা হোক না কেন সে উত্তর দেয় আমি ব্যাড বেবী। পাঠক আপু রা এই ক্ষেত্রে বাচ্চার সমস্যা কি বুঝতে পারছেন? সমস্যা হল এইটুকুন বাচ্চা হতাশায় ভোগা শুরু করেছিল। যেই হতাশা আমরাই হ্যান্ডল করতে পারি না সেই হতাশা মা তার বাচ্চার উপর চাপিয়ে দিলেন।

এরকম আরো অসংখ্য উদাহরণ আছে।
এখনকার স্কুল গুলোতে পড়ালেখার চাপ এমনি ই বেশি থাকে।প্রয়োজনের অতিরিক্ত পড়া,অতিরিক্ত সাবজেক্টস এ ভর্তি থাকে,গৎ বাধা পড়া সব,বাস্তবতার সাথে কো রিলেশন করা নেই,বাচ্চাদের খেলার মাঠ নেই।তারা চারিদিকে দালান আর গাড়ির ধোয়ার মধ্যে বড় হচ্ছে। একজন বাচ্চাকে ৬-৭ বছরের আগে স্কুলে দেওয়াই উচিত না।সেখানে আমরা ৪/৫ বছরেই দিয়ে দিচ্ছি।প্রস্তুতি শুরু হয় আরো আগে থেকে।তাহলে?
বাচ্চাকে কেন এত সবের মাঝে একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়া বলুন??

কি হবে তার ১ম বা ১০ম হয়ে? আমাদের সাথে যারা ভালো মার্কস পেত তার আজ পাত্তাও নেই আর লাস্ট বেঞ্চে বসা কম মার্কস পাওয়া ছাত্র টাও টপ র‍্যাংকে জব পেয়ে যাচ্ছে।
আইন্সটাইন নাম শুনেন নি এমন কেউ নেই।তাকে ছোট বেলায় স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল দুর্বল ছাত্র বলে।আর সেই মানুষের ব্রেইন নিয়ে আজও গবেষণা চলছে।

পরিশেষে, আপনি আমি কেউ ই ভবিষ্যৎ জানি না। তাই শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ হতে দিন। চাইল্ড সাইকোলজি নিয়ে পড়ুন,জানুন আর নিজের বাচ্চার অবস্থা বুঝার চেষ্টা করুন।
                            (চলবে ইন শা আল্লাহ্‌)

পোস্টটি ৫৩ বার পঠিত
 ২ টি লাইক
২ টি মন্তব্য

Leave a Reply

2 Comments on "শিশু বিকাশ (পর্ব-এক)"

Notify of
avatar
Sort by:   newest | oldest | most voted
পাঠশালা
Member
পাঠশালা

বেশ ভালো লিখেছেন। লেখা চালিয়ে যান।

রৌদ্রের গান
Guest
সিলভিয়া

সময়োপযোগী পোস্ট… লেখকের জন্য শুভকামনা।

wpDiscuz