“দোসর খুঁজি ও বাসর বাঁধি গো”
লিখেছেন নীলজোসনা, জুন ২৮, ২০১৬ ৩:৫৮ পূর্বাহ্ণ

 

-আসসালামু আলাইকুম

-ওয়ালাইকুম সালাম

-আপনি মানে মিসেস আজীজ বলছেন?

-জী!

-ভাবী আমি শাহানা। আমার হাজবেন্ড আপনার হাজবেন্ডের কলিগ।ওর নাম মামুন।

-ও হো।শুনেছি তো আপনাদের কথা। ভাবী, ভালো আছেন?

-জী ভাবী, আছি। আপনি?

-আছি ভাবী আলহামদুলিল্লাহ।

-আমি একটা কাজে ফোন করেছিলাম ভাবী, নাম্বার ও-ই দিয়েছে আমাকে। আপনি যদি কিছু মনে না করেন…

-আচ্ছা ভাবী, বলেন। অসুবিধা নাই।

-আপনার তো দুই বাচ্চা, না ভাবী?

-হ্যাঁ

 -ভালো আছে ওরা?

-জি ভাবী। এইতো ঘুম পাড়ালাম ওদের এইমাত্র।

-এখন কি করবেন?

-এই তো রান্না করবো। আমার তো বিকেলেই রান্না করতে হয়, সকালে স্কুল থাকে।

-জি ভাবী জানি।

-জানেন? কিভাবে?

-সেটাই বলতে চাচ্ছিলাম। আমার হাজবেন্ড খুব বিরক্ত বোধহয় আমার ওপর। হুট করে আমাকে আপনার নাম্বার দিয়ে বললো, আমি যেন আপনার থেকে শিখে নিই কিভাবে সবদিক ঠিকঠাক রেখে সংসার করতে হয়…

এতোক্ষণের চেপে রাখা কৌতুহল আর আগ্রহ এক নিমিষে রাগ হয়ে বের হল আমার। ভাবছিলাম, এভাবে আঘাত করে, এরা কেমন মানুষ? টের পাচ্ছিলাম, ফোনের ওপাশে ঠোঁট চেপে অভিমান আর উদগত কান্না সামলাতে থাকা একটা মুখ, আমার জবাবের অপেক্ষায় আছে।

-ভাবী, আপনি ব্যস্ত? তাহলে না হয় আরেকদিন ফোন করি?

-না রে ভাবী। মেজাজ খারাপ লাগছে। সময় নিলাম একটু।

-কেন? আমি বিরক্ত করছি?

-না। শুনেন ভাবী, আর কি কি শিখতে বলেছে ভাই?

-এই তো, আপনি চাকরী করেন। আবার পড়েনও। আবার বাচ্চাও দুইটা। কি করেন, কিভাবে ভাইকেও খুশী রাখেন, এইসব।

-আচ্ছা? তো উনি এগুলো কোত্থেকে জানলেন? নিশ্চয়ই আমার হাজবেন্ড বলেছে, না?

-নয়তো কি? আর কে বলবে?

-বাহ! কলিগের কাছে বলা হয়। জীবনে আমাকে তো বললো না। আসুক আজকে…

-হি হি, সত্যি? আপনাকে কখনও বলে না?

-না। কোনদিন না। আর আপনি তো হাতের কাজ করেন, না? আপনার ঘরের ছবি দেখেছিলাম একটা। বিরাট বড় ওয়ালম্যাট বানিয়েছেন।

-জি ভাবী।

-দেখেন, আপনার উনি আবার মনে করে সেই ছবি বন্ধুদের দেখান। তাঁদের যত আপত্তি সামনাসামনি বলায়। পাছে যদি আমরা লাই পেয়ে মাথায় উঠি!

-তাই ত দেখছি ভাবী। জানেন, আপনার রান্নারও সে কী প্রশংসা। আপনি নাকি ফাইভ স্টার হোটেলের রান্নাকেও হার মানিয়ে দিতে পারেন।

-আহা! শুনতেই কি ভালো লাগছে! আর বলবেন না শাহানা। আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
-কেন? কেন ভাবী?

-আচ্ছা জানেন, আপনার ভাই বাসায় কি কি করেন?

-কি করেন ভাই?

-সকালে বাচ্চাদের স্কুলে যাবার সময় শুধু আমার হাতে ওদের ধরিয়ে দেন। এর আগে রাতে বাথরুমে নেয়া,  পিঠ চুলকে ওদের ঘুম ভাঙ্গানো, হাত মুখ ধোয়ানো, কাপড় পরানো, নাশতা খাওয়ানো কোনোটায়ই আমি হাত লাগাই না। জানেন? আর রাতে ওদের খাওয়ানোর পর ওদের হাত মুখ গা ধুইয়ে বিছানায় নেয়া, কখনও হাড়িপাতিল ধোয়া উনিই করেন, জানেন? কারণ আমার তখন পড়া নিয়ে বসতে হয়।

-সত্যি? আর জানেন, ও না সুবহাকে একদিনও গোসলও করায় নি।

-আপনার মেয়ের নাম সুবহা? বাহ, খুব সুন্দর নাম তো!

-জি ভাবী। ঘুমিয়েছে এখন। এজন্যই আপনাকে ফোন করতে পেলাম…

-আপনিও কিন্তু ভুল করলেন একটা।।

-কি?

-ভাই যেমন সব না জেনেই আমার সাথে আপনাকে এক পাল্লায় মেপেছেন। আপনিও আর সব বাদ দিয়ে দুই বেচারাকে তুলনা করে ফেললেন। না?

-জি ভাবী। কি করবো বলেন, আমি তো আমার সাধ্যমত করি। এরপরও যদি খুশী না হয়! আর কতদিন ভালো লাগে বলেন অন্য কোন মহিলার সাথে নিজের তুলনা শুনতে। আপনি কিছু মনে করবেন না ভাবী।

-অবশ্যই মনে করবো ভাবী। এই কাজটা খুব অন্যায়। আমার খুব রাগ লাগছে আমার হাজবেন্ডের ওপর। জায়গামত না করে কেন এমন একজনের কাছে আমার কাজের কথা বললো, যে আমার প্রশংসা জানার কোন দরকারই নাই? ঘরে গিয়ে নিজের বউকে… ছি ছি। আমার খুব লজ্জ্বা লেগেছে। আপনি আমাকে মাফ করে দিয়েন ভাবী।

-না না ভাবী, আপনি তো কোন অন্যায় করেন নাই।

-আর আপনিও কিন্তু ভাইয়ের মত ভুল করে বসবেন না যেন! না জেনে কাউকে কারো সাথে তুলনা করবেন না। আপনাকে একটা কথা বলি? সময় আছে?

-জি জি ভাবী, বলেন প্লীজ!

– পরিবার হল সভ্যতার এক্কেবারে সবচেয়ে ছোট্ট কিন্তু পরিপূর্ণ উপাদান। ঠিক যেমন একটা বড় বিল্ডিং বানাতে ইঁট। প্রতিটা পরিবার আল্লাহর ইচ্ছায় এক এক রকম ভাবে তৈরী হয়, আল্লাহই এক এক পরিবারকে একেক অবস্থায় রাখেন, এজন্য প্রতিটার কাছে আল্লাহর দেয়া কাজও একেক রকম, তাই না? এজন্য কাউকে আল্লাহ বাচ্চাই দেন না হয়ত, কাউকে আট দশটা দেন। যার যার দক্ষতা অনুযায়ী প্রতিটি পরিবার যেন সমাজকে এক একভাবে সেবা দেয়। এজন্য প্রত্যেকের রসায়নও আলাদা। ঠিক যেমন আপনার মাছ আর গোশতের তরকারীর মশলা আলাদা আলাদা। এজন্য কখনওই কারুর উচিত না, অন্ধভাবে অন্য কাউকে অনুসরণ করা, বা কাউকে দেখে নিজের না পাওয়াগুলো ভেবে চোখের পানি ফেলা। কারণ, আপনার পরিবারকে নিয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্য হয়তো আলাদা, না?

-জী ভাবী। আপনি এতো ভেবে কথা বলেন কি করে?

-সরি ভাবী, মাস্টার মানুষ তো। সুযোগ পেয়ে লেকচার ঝেড়ে দিয়েছি। কিছু মনে করবেন না প্লীজ!

-না না ভাবী। আমি এভাবে ভাবিনি কিন্তু কখনও। মুখে না বললেও মনে মনে ওকে বান্ধবী বা প্রতিবেশীদের হাজবেন্ডের সাথে তুলনা করে কষ্ট পেয়েছি।

-ভাইকে নিয়ে বসেন। তাকেও বুঝিয়ে বলেন। আর বাসায় আসেন একদিন। আচ্ছামত গল্প করা যাবে।

-সত্যি? আমারও খুব ইচ্ছা করছে আপনার সাথে সামনাসামনি বসে গল্প করতে।

-আর যেদিন আসবেন, আপনার বেস্ট ডিশটা রান্না করে আনবেন চুপিচুপি। বেচারা আমার রান্না ভেবে বাসায় গিয়ে ঢোল পেটানো শেষ করলে আপনি বেলুন ফুটো করে দিয়েন।

এবার আমার একলার হাসিতে বাচ্চারা নড়েচড়ে উঠলো। ওপাশেও তাই। ভাবতে ভালো লাগছিলো, অভিমান আর অপমানের কান্নাটাকে গিলে মিষ্টি একটা মেয়ে আবার হাতের কাজে মন দিতে পারবে এখন!

 #নারী_ভাবনা ৬

পোস্টটি ১৫৩৫ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
৩ টি মন্তব্য
৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. আহহ… মামুন সাহেবদের মতো দাঁত থাকতে দাঁতের মূল্য না বুঝা কর্তাদের দায়টা কেন জানি সব সময় শাহানাদের উপরই বর্তায়! আফসোস

  2. যার যার দক্ষতা অনুযায়ী প্রতিটি পরিবার যেন সমাজকে এক একভাবে সেবা দেয়। …….onek valo laglo kothata.

  3. এমন পুরুষের মুখে মাটি পড়ুক…

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.