ঈদ নামচা ২ – কুরবানী
লিখেছেন নীলজোসনা, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৭ ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

বারান্দার মুখে দাঁড়িয়ে ঝকঝকে চাঁদের প্রতিফলন দেখলাম, চাঁদের আলোর একটা মাদকতা আছে, আমি ঘ্রাণ পাই। এই ব্যপারটা টানে খুব। এখানে আকাশ পরিষ্কার, নয় তারিখের চাঁদেই বেশ তেজ। বাড়িতে এবার নতুন ঘরে ঈদ, শুধু বাবা নাই। নতুন ঘরের উচ্ছ্বাসে একটু বাঁধ পড়েছে।

আমাদের মেয়েদের জন্য কুরবানী ব্যপারটা অন্যরকম। নিসাবের সমান সম্পদ হাতে আসে নাই কখনও, পকেট থেকে টাকা দিয়ে জিনিস কিনে বিলানোর স্বাদ পাইনি। আল্লাহর জন্য প্রিয় জিনিস বাদ দেয়া? হ্যা, সে অভিজ্ঞতা একটু আছে।

আমি রাস্তায় খেলতাম, আজও হাঁটুময় সে দুরন্তপনার ছাপ। কোন কোন বাড়ির ছাদে বালু আছে, বৃষ্টিতে ভিজে এক্কেবারে কাজের উপযোগী। দুই হাতে চেপে বোম্বাষ্টিং বানিয়ে হাত লম্বা করে রাস্তা বরাবর ছেড়ে দিয়ে দুই মিনিট মাথা লুকিয়ে বসে থাকা। একান্ত সহযোগী ছোট বোন, এলাকার আরও কয়েকটা বিচ্ছু, পাশের বিল্ডিং এর রিয়াজ ভাই, এক খেলার সাথীর মামা রেজু মামা। স্কুলেও এক দশা, সব প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছি, যা থাক কপালে। দশ বছর ক্যাপ্টেন ছিলাম, আজও ক্লাসের সবার খাতার নাম পুরোটা বলতে পারি। আম্মু বললেন, আগামী বছর আর খেলতে যাওয়া যাবে না। মাথা গরম হয়ে গেছিলো। বৃত্তি পরীক্ষা সামনে, ব্যস্ত হয়ে গেছি। সিক্সের শুরুতে ধরলাম, আম্মু আর বড় বোনের মত বোরখা পরবো। আম্মু বোধ করি মনে মনে স্বস্তি পেয়েছেন, নিজ থেকে না চাইলে ঘাড় ধরে করানো মুশকিল, তাই। দেয়া হল লাল একটা বোরখা কিনে। আমি ত মহা ফূর্তিতে স্কুলে গেলাম, আমি বড় হয়ে গেছি। সবাই এমন আজব চোখে তাকিয়েছে, উৎসাহ গলে পানি। যা হোক, কেমন করে যেন মানিয়ে নিলাম। আরামের ব্যপার ছিলো, রাস্তায় নেমে আর এদিক ওদিক কাপড় টানাটানি করতে হয় না, দিব্বি লেফটরাইট করে হাঁটা চলে। আর কষ্ট? আমার রাস্তা, আমার বোম্বাষ্টিং, হাতলওয়ালা সিঁড়ির রেলিং বেয়ে হড়কে নামা, সব বন্ধ। সব। দিশেহারা হয়ে যাচ্ছিলাম, মাথায় পাগল পাগল লাগতো। রাস্তা দিয়ে যাবার সময়, সিঁড়িতে, রিয়াজ ভাই, রেজু মামার সাথে মুখোমুখি হওয়া যাচ্ছে, উনারা আমাকে চেনেনই না। এই যন্ত্রণা এড়াতে কষে পড়া ধরলাম। সিক্সের প্রথম দিনগুলো তাই এখনও মনে আছে। যা দরকার না, তা ও নোট করতাম। আল্লাহ সাহায্য করলেন, খুব বেশিদিন কষ্ট হয়নি।

ইউনিভার্সিটিতে এসে আরেক ঝামেলা। কো-এডে আর পড়িনি। আইডিয়াল স্কুলে ছিলো নিয়মের দেয়াল, আর ভিকারুন্নিসা কলেজের দেয়ালই দুই মানুষ উঁচু। টিচারের কাছে পড়ার ঝামেলা এড়াতে টেবিলকে শয়নে স্বপনের চারণভূমি বানাতে হয়েছিলো। নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ভার্সিটিতেও মেয়েদের ছাড়া কাউকে খুব কাজে লাগে নি, একজন দুইজন ছাড়া। কিন্তু আমি আড্ডাবাজ মানুষ, আমার কিম্ভুত শখ আছে, আমি হলে থাকছি, ছেলেরা সহ মজাদার আড্ডা পেটানো হচ্ছে, সেখান থেকে শরীরে মনে ফিরে আসাটা মস্ত কঠিন কাজ। তবু কৃতজ্ঞচিত্তে আমার সহপাঠীদের স্মরণ করি, মামা হবার আনন্দে যারা ফোর্থ ইয়ারে আমার চরম কষ্টের দিনগুলোয় অপরিচয়ের ওপার থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে।

এখনকার গল্পগুলো অন্যরকম। একই সমান সার্টিফিকেটের ভার আমারও কাঁধে, তবু দেশের জন্য একমনে নাগরিক বানাই, দিনশেষে নিষ্পাপ মুখগুলোয় আমার অযোগ্যতা, অধৈর্য্যের অনুতাপ দেখি, মাফ চাই হাত তুলে। শুধু আমার মাথার ওপর প্রভুর মায়ার হাত সরে যাবার ভয়ে, শেষ বিচারের দিনের শাস্তির আশংকায়, ধরতে গিয়েও ছেড়ে আসি কোন অন্যায় প্রলোভনের বাড়ানো হাত।

প্রত্যেকের যুদ্ধ তার নিজের মাপে তৈরী। নগর বাউল আমার ভালো লাগে না, কিন্তু আমার জন্য ফিতনাও মজুত আছে। তার সাথের যুদ্ধটা আমার একার। প্রতিটা লোভের হাতছানীতে আমার মাগফিরাতের আকাঙ্ক্ষা ছাওয়া থাকে যেন প্রভূ, প্রতিটা সংকীর্ণতা যেন ভুলে যাই আপনার পুরষ্কারের লোভে, আমার সন্তান যেন আমার স্বপ্নের চেয়ে বড়ো হয়, যাঁদের নামে নাম রেখেছি, তাঁদের মতো হয়, এই আমার কুরবানী। আরাফাতের দিনের ক্ষমাপ্রাপ্তদের মিছিলে আমাদেরও রেখে দিয়েন মালিক!

ঈদ মুবারক। আল্লাহ আপনাদেরকে, আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন।

Comments

comments

পোস্টটি ১১৫ বার পঠিত
 ৪ টি লাইক
৪ টি মন্তব্য