কচিকাঁচাগুলো ডাঁটো করে তুলি – ৩
লিখেছেন নীলজোসনা, অক্টোবর ২৬, ২০১৭ ১২:০৬ অপরাহ্ণ

 

 

গল্পটার শুরু একটা ভিডিও থেকে। এক মা তার দুই বাচ্চা নিয়ে মজার মজার কাজ করেন। আর সেসবের ভিডিও দেন, সাথে থাকে তার একদম নিজস্ব কিছু বিশ্লেষণ। তো, এই ভিডিওতে তার একটি বিশ্লেষণ খুব আকর্ষণ করলো আমাকে। কি সেটা, পরে বলছি। ভেবে ফেললাম, বাচ্চাদের সাথে এক সপ্তাহ একটা মজার কাজ করবো – ‘ইচ্ছার সপ্তাহ’ হবে। ভালো কথা, এই ‘ইচ্ছার সপ্তাহ’ নামটা বাচ্চাদেরই দেয়া।

যে দুই মানবসন্তানের দেখভাল করার স্বেচ্ছাশ্রমের কাজ আমার, তাদের বয়স যথাক্রমে আট এবং সাড়ে পাঁচ। ওদের বাবা শহরের বাইরে গেলে মায়ের বাসায় থাকতে যাই, অনভ্যাসের বিকালের ঘুম ভেঙে হঠাত ওদের দেখে ভাবি, এরা কে? কোত্থেকে এলো? চারপাশে আমার নয় বছর আগের অভ্যস্ত চেয়ার, টেবিল, খাট, সবকিছুতেই নতুন মাত্রা দিয়ে আমাকে ঝাঁকি দিয়ে বর্তমানে ফিরিয়ে আনে দুইটি এইটুকু মানব শরীর।

পড়াশুনা, চাকুরী, টুকটাক সামাজিক কাজের নেশা, আবার বাচ্চাদের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগ্রত রাখার ফলাফল হল ঘড়ির কাঁটায় নিজে এবং বাচ্চাদের চলতে অনুপ্রাণিত করা। বড়দের জন্য ব্যপারটা সহ্য করার মত হলেও, বাচ্চারা বেশ হাঁসফাস করে।

তো, আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, এক সপ্তাহ বাচ্চাদেরকে ওরা ‘যা চায়’ তাই দেয়া হবে। যা খেতে চায়, খেতে দেয়া হবে, যা পরতে চায়, যা খেলতে চায় তাই করবে। স্কুল থেকে এনে বাচ্চাদের বললাম। শুরুতে বুঝেনি, পরে দুইভাইবোন কি যেন ফিসফাস করলো, এসে জানালো,ওরা রাজি।

কিছু সাধারণ নিয়ম দেয়া হল, পুরো ব্যপারটা আমাদের চারজনের মধ্যে থাকবে, অর্থাৎ গোপন, এমন কিছু চাওয়া যাবে না যেটা এনে দেয়া অসম্ভব (ওরা সম্ভব অসম্ভবের সীমানা মোটামুটি জানে), এক বেলার খাবারের বদলে কেবলই তেঁতুল বা চানাচুর খাওয়া যাবে না, চাইলে সাথেসাথেই দেয়া না গেলে অপেক্ষা করতে হতে পারে ইত্যাদি।

পরের দিন সকাল। সেদিন সোমবার। মেয়ের ম্যাথ ক্লাবের পরীক্ষা আছে। ছেলেকে নিয়ে ফিরছি। বুবু নাই, একটু চুপচাপ। হঠাত বললো, ‘আম্মু তোমার ব্যাগটা আমি একটু ধরি?’ কালো, চ্যপ্টা একটা পার্সব্যাগ, ভেতরে ফোন আর কিছু টাকা রাখা যায়। দিলাম, বললাম সাবধান থাকতে। অদ্ভুত বাচ্চাটা আমার, এই নিরামিষ সাদামাটা ব্যাগটা কবে থেকে হাতে নেয়ার স্বপ্ন দেখে ও? আমাকে বলে নি তো কোনদিন? আর, অনেকদিনের ইচ্ছা না থাকলে এভাবে বুকে চেপে থাকতো? এমন চকচক করতো চোখ? কি আশ্চর্য! রাস্তা দেখবো কি, ছেলের চোখের অদ্ভুত তৃপ্তি দেখতে দেখতে ফিরলাম।

রাতে গল্প বলার সময়ে কথার ভীড়ে গল্পটা ছোট করে ফেললাম। আবদার পেশ হল, আগামীকাল ওরা একটা দোকানে যাবে, স্কুলের পাশেই। খেলনা আছে, জানালা দিয়ে দেখা যায়, ওরা প্রতিদিনই দেখে। যাওয়া হল পরদিন, প্লে-ডোর অনেকগুলো ছাঁচসহ সেট আর ছেলের একটা এরোপ্লেন, কিনে বিশ্বজয়ীর মত বের হল। সারাপথ, সে রাত শুধু সেই গল্প। রাতে আবার আবদার, ‘মাম্মালার বাসায় যাবো।’ ওদের খালার বাসা বেশ দূরে, কিন্তু আবার আমার অফিস থেকে কাছে। তো, ঠিক হল, বৃহস্পতিবার ওদের রেখে এসে আমি অফিস করে আবার যাবো, রাতটা থেকে সকালে ফিরবো। ওদের বাবা বৃহস্পতিবার রাত অফিসে থাকতে হবে, উনি বাদ রইলেন আপাতত।

প্রতিদিনই একটু একটু আবদার, অনেক দিনের জমানো, বের হয়ে আসছিলো। রিকশায় বসে পাশের ঠেলাগাড়ির বস্তাগুলোকে ছুঁইয়ে দেয়া, বৃষ্টিতে ভিজে বাসায় ফেরা, সারাপথ চোখ বন্ধ করে ফিরে আসা, রিকশাওয়ালাকে ওরাই বলে বলে বাসা পর্যন্ত নিয়ে আসা, রাস্তায় পাইপ রাখা – তার ওপর দিয়ে টলোমলো করে হেঁটে পার হওয়া, এক জায়গায় হুয়াইয়ের একটা লাল ফুলানো পুতুল বেলুন- ওকে ছুঁয়ে দেখা এই ত। আর দিনে রাতে যে কোন সময়, ‘আম্মু পে’ ধরবো’ বলে মায়ের পেটে নাক ঘষা। খাওয়া নিয়ে খুব ঝামেলা করতে হয়নি, শুধু প্রতিদিন ফ্রেঞ্চফ্রাই, হোক রাত, তবু!

উইকএন্ডের রাতে মাম্মালার বাসায় যাওয়া হল, আমার দৌড়াদৌড়ির চুড়ান্ত, কিন্তু রাতে ফিরে ও বাসার সাড়ে ছয়ের পুচকুর চকচকে মুখ দেখে বুঝলাম, ব্যপারটা ফাঁস হয়েছে। কিছুক্ষণ পরে এসে অবশ্য ‘বিলম্ব অনুমতি’ নেয়া হল। রাতে আবদার, ‘রাত জাগবো’। এই ব্যপারটা অবশ্য নতুন না। বাবামা রাতে টেবিলে বসে কি করে, এই কৌতুহলের জন্য আগেও দিয়েছি এমন। তিন চারটা মুভি কিউ করে দিয়ে, আর ওয়াইফাই অফ করে দিয়ে আসি, সাথে কিছু খাবার, শুধু ঘুমানোর আগে লাইট ফ্যান কম্পিউটার অফ করে আমাকে একটু জাগিয়ে বলতে হবে, এরপর ঘুমাবে। একই নিয়মে দিলাম। সকালে ফেরার সময়েও এইরকম আনুবীক্ষণিক আবদার। মুখে ফস করে ‘না’ চলে আসে, অভ্যাসমত। মাথা নেড়ে হ্যা বলি, আর চকচকে চোখ দেখি, চারটা।

রবিবার ‘ইচ্ছার সপ্তাহ’এর শেষদিন। মন একটু খারাপ। রাতে গলা জড়িয়ে জিজ্ঞেস করা হল, আমরা আবার কবে খেলবো? একশ রকম অনুভূতি চাপা দিয়ে বললাম, ‘খেলবো আবার। মজা হচ্ছিলো?’ এবার এক জোড়া মুখ সরব, কি কি মজা হয়েছে এক সপ্তাহ, তার বর্ণণা শুনলাম।

কি শিখেছি? হ্যা, আমি আসলেই শিখেছি।

এক. আমরা অনেকগুলো ‘না’ বাচ্চাদেরকে না ভেবেই বলি। একটু ভাবলেই সেগুলোকে ‘হ্যা’তে বদলে দেয়া যায়। ভিডিওর এই বিশ্লেষণেই অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। ভালো কথা, ভিডিওটা দেখে প্রায় শেষ পর্যায়ে ভাবছিলাম, ফুল টাইম চাকুরী করি, নিজের হাতে রান্না, এইসব আমাদের দেশে সম্ভব না। মা’টির একটা কথায় আবার ঘুরে তাকিয়েছি, তিনিও এমনই। বলছিলেন, আমি নিজেকেই চ্যলেঞ্জ করেছি এই খেলাটা দিয়ে।

দুই. বাচ্চাদের চাওয়াগুলো, যদি আপনি ওদের সাথে অনেক কথা বলতে থাকেন আর ওরা জানে আপনি কেন কোন কাজটা করেন, চাওয়াগুলো আসলেই খুব ছোট্ট, নাগালের মধ্যেই থাকে। একটু খুঁড়ে দেখলেই সে চাওয়াগুলো সত্যি করে ওদের চোখে সুপারম্যান হয়ে যাওয়া যায়।

তিন. আমরা বাবামা কিংবা শিক্ষকেরা, এই বাচ্চাদের কাছে গালিভারের মত, দূর্বোধ্য এবং বিশাল। সময় সময়ে আমরাও এদেরকে তুচ্ছ লিলিপুটের জায়গায় ফেলে দিই। এই যে আকারের পার্থক্য, কয়েকটা ‘হ্যা’ খুব সহজে ভুলিয়ে দিতে পারে, আমাদেরকেও । ওদেরকেও। ওরা শিখে যাবে, গম্ভীর মুখে কিভাবে আমার ঘড়ি এগিয়ে দিতে হয়। আমরা তখন ওদের সাথে বৃষ্টির পানিতে থপথপ করে পা ফেলে আনন্দ পাবো, সব ভুলে হি হি হাসতে পারবো।

বিশ্বাস করবেন কি না জানিনা, আমার দেখা শ্রেষ্ঠ মুভি, শর্টফিল্ম কিংবা গানটি আমি ওদের দাঁত বের করা হি হি হাসিতে খুঁজে পেয়েছি। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ওদের ইচ্ছেগুলোয় মুক্তার মত লুকিয়ে থাকা সুখ বের করে আনতে পেরেছি।

প্রথম পর্বঃ https://goo.gl/DjQvnp

দ্বিতীয় পর্বঃ https://goo.gl/DvBCNe

পোস্টটি ৫০৮ বার পঠিত
 ২ টি লাইক
২ টি মন্তব্য

Leave a Reply

2 Comments on "কচিকাঁচাগুলো ডাঁটো করে তুলি – ৩"

Notify of
avatar
Sort by:   newest | oldest | most voted
Amanda
Guest

Digamos que SEO é carro-chefe do SEM. http://adu.uz/user/JooJoaquimDias/

পাঠশালা
Member
পাঠশালা

অসাধারণ পোস্ট…

wpDiscuz