কচিকাঁচাগুলো ডাঁটো করে তুলি – ২
লিখেছেন নীলজোসনা, অক্টোবর ১৯, ২০১৭ ১:৪১ পূর্বাহ্ণ

 

মানুষ, স্রষ্টার  সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। ভাবতেই ভালো লাগে, আপনি আমি আমরা সবাই এক মহান শিল্পীর সযতনে তৈরী ভাষ্কর্য, যিনি নিছক খেয়ালের বশে আমাদের তৈরী করেন নি। একটি শিশুকেই দেখুন না।কি নিখুঁত তার হাত পা নাক মুখ- সব  কিছু। যে বয়সে তার সাহায্য দরকার, সে বয়সে সে কোলে নেবার মত ওজন নিয়ে জন্মায়, যেন আমরা ওদের কোলে নিয়ে নিয়ে দরকারী কাজগুলো করে দিতে পারি। আর যখন সে স্বাবলম্বি, তখন তার হাত পা শক্তসমর্থ, আঘাত সামলানোর ক্ষমতা তৈরী হয়ে যায়। আপনার হাতেই দেখুন, চামড়ার নিচে অসংখ্য রক্তনালী এক বারও তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে না।  আপনার চুল, চোখ, শরীর ঠিক কেমন করে আপনার ব্যক্তিত্বের সাথে মিলিয়ে তৈরী করা  হয়েছে।

আসুন এবার চোখ ফিরাই, আমাদের হাতে মহান সে শিল্পীর তুলে দেয়া সে শিল্পটির দিকে।  হ্যাঁ, আমি আমাদের বাচ্চাদের কথাই বলছি।  তাকিয়ে দেখুন, সে শিল্পী কী অসামান্য দক্ষতায় আমাদের চোখ-নাক-চুল-ইচ্ছেগুলো ওদের মধ্যে রোপণ করে দিয়েছেন।  ওরা আমাদের অবয়ব নিয়ে আসে, অসহায় বলেই কি? যেন আমরা মায়ায় পড়ে ওদের কাজগুলো যত্ন করে করে দিই? হয়তবা।  ওরা আমাদের মতোই হাসে, কারণ আমরাই ওদের শেখাই, ওরা আমাদের মতো করেই জীবনকে দেখতে শেখে।

আজকের পৃথিবীতে আমরা যারা বড় হয়েছি, কিংবা আমাদের বাচ্চারা বড় হচ্ছে, আমাদের আর আমাদের বাচ্চাদের সামনে অনেকগুলো চ্যলেঞ্জ আসে, যা আমাদের ছেলেবেলায় আসেনি। যে স্বাদের অস্তিত্বই আমরা জানিনা, ওদেরকে সে স্বাদ ভরা জগতে ছেড়ে দিয়ে কেবল ‘সময় খারাপ’ বলে আমাদের কর্তব্য শেষ হবে না। আপনি জানেন না হয়ত, আপনার চঞ্চল ছেলেটি, উচ্ছ্বল মেয়েটি এমন একটি যুদ্ধ নিজের সাথে প্রতিদিন করে যাচ্ছে, যে যুদ্ধ আপনি চিনেনই না। এই সদাপরিবর্তনশীল জগতে তাকে ছেড়ে দিতে আপনি বাধ্য, কিন্তু ছড়ি হাতে তাকে শুধু কিছু ‘নিয়ম’ শেখানোই যথেষ্ঠ নয়, প্রয়োজন মূল্যবোধ শেখানো। নিয়ম সব জায়গায় খাটে না, কিন্তু মূল্যবোধ আমাদেরকে শিখিয়ে দেয়, বা জেনে নিতে উৎসাহ দেয়, আমরা কখন কি করবো।

তো, অনেক লেখাপড়া,  খুঁটিনাটি কাজ আর অভ্যাস  শেখানোর ফাঁকে আসুন  না আমরা বাচ্চাদের কিছু জিনিসের পার্থক্য শেখাই। তাদের হাতে তুলে দিই কিছু মূল্যবোধের ছাঁকনী, চলার পথ যেন নিজেরাই খুঁজে বের করে নিতে পারে। ভাবছেন, ওয়ার্কশিট দিচ্ছি? হতেও পারে, কিন্তু এ ওয়ার্কশিট ওদের জন্য নয়, আপনি আমি আমাদের মত বাবামায়েদের জন্য সাহায্য হয়ে উঠতেও পারে। 

১। স্রষ্টা এবং সৃষ্টি (creator and creation):

ছোট বাচ্চাদের হাতে যে খেলনা আমরা তুলে দিই, তার উৎস ওরা জানে। ওরা হয়ত আমাদেরকে জিগেস করে জেনে নেয়, অথবা ডিসকভারিতে ‘ফ্যক্টরী মেইড’ দেখে শেখে। কেউ কেউ কল্পনাও করে, ও বড়ো হয়ে টয়োটা বানাবে। কোন কোন মায়াবতী ভাবে, ও একটা পুতুলের ফ্যক্টরী দেবে, সব গরীব বাচ্চাদের হাতে একটা করে পুতুল দিয়ে ওদের হাসিগুলা মনের ঘরে জমা করবে। এই যে বাচ্চারা, ওদের হাতের সব জিনিসের বানানোর ইতিহাস জানে, ওদের নিজেদের মহামূল্যবান শরীর আর মনের উৎস জানে কি? ওদের প্রশ্নগুলো কিন্তু আমাদের লজ্জায় ফেলে দেয় মাঝে মাঝে। নিজেদের লজ্জা ঢাকতে আমরা আরেকটা খেলনা ধরিয়ে দিই, না হয়, ধমক দিয়ে চোখের আড়াল করি।

সোজা কথায় বলি, ওদেরকে নিজেদের চিনতে এবং শ্রদ্ধা করতে শেখান। নিজের শরীর কি, কেন আল্লাহ এভাবে ওকে বানিয়েছেন, কখন এর কি কি পরিবর্তন হচ্ছে, কিভাবে সে পরিবর্তনের যত্ন নিতে হবে, জানান। নিজে না পারলে ওর পছন্দের কাউকে দিয়ে জানান। মনে রাখবেন, আপনি সন্ধান না দিলেও সে এসবের জবাব খুঁজবেই। আর হয়ত কোন অসাধু বন্ধু জবাবের ছলে তাকে অন্ধকারের পথ দেখিয়ে দেবে। আর আপনার চোখে দেখালে, সে শুধু বৈচিত্র্যকে জানবেই না, বরং এই বৈচিত্র্যের স্রষ্টাকেও মাথা নুয়ে প্রশংসা করবে, যিনি ওর জন্যই ওর নিজেকে এতো সুন্দর করে বানিয়েছেন।

২। জিজ্ঞাসা এবং জবাব (question and answer):

আমরা কেন প্রশ্ন করি? কৌতুহল থেকেই তো, না? আর জবাব মনের মতো না হওয়া পর্যন্ত প্রশ্ন করেই যাই। শিশুকে প্রশ্ন করতে বাঁধা দেবেন না কখনও। মনে রাখবেন, শয়তান এবং ফেরেশতা, এই দুইয়ের সাথে মানুষের পার্থক্যই তার এই অনুসন্ধিৎসা। একে বন্ধ করে দিলে আপনি বড়জোর একটি প্রাণ লালন পালনের তৃপ্তি পেতে পারেন, মানুষ নামের আশ্চর্য এই সৃষ্টিকে বড় করে তোলার স্বাদ পাবেন না।

৩। মূল্য এবং দাম (value and price) :

একটা তুলনা আমরা বাচ্চাদের প্রায়ই দিই, দোকানের বার্গার বনাম বাসায় বানানো বার্গার। মানে, স্বাদে, দোকানের বার্গার দামে বেশী কিন্তু বাসায় মায়ের হাতে বানানো স্বাস্থ্যকর বার্গারের মূল্য অবশ্যই বেশি, দামে কম পড়লেও। ঠিক এ জিনিসটাই এই সময়ের বাচ্চাদের জানা সবচেয়ে বেশী দরকার।

একটা জিনিসের মূল্য বেশী, কিন্তু দামে নিতান্তই সস্তা হতে পারে। আবার কোনটা অল্প দামে পাওয়া যাচ্ছে, বা একেবারে বিনে পয়সায়, কিন্তু সেটার মূল্য আকাশছোঁয়া হতে পারে। শুধু চকচকে মোড়কে ভুলেই দাম আর মূল্যের এই যাচাই বাছাই ছাড়া যেন কোন জিনিস বা মানুষকে নিজেদের জীবনে জায়গা দিয়ে না দিই, এটা নিজেরাও চর্চা করা উচিত, সময় পেলে বাচ্চাদের সাথে কথা বলে বলে ওদেরকেও বুঝতে দেয়া উচিত।

৪। বাস্তব এবং পরাবাস্তব (real and virtual) :

এ দুই জগত বড় আলাদা, তবু বড় বেশী আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানোও। বাস্তব জগত কি? যে জগতের উপাদানগুলোকে ধরাছোঁয়া যায়, পঞ্চইন্দ্রিয়তে অনুভব করা যায়। আর পরাবাস্তব জগত হল, যে জগতটাকে দেখা যায় না, এবং চাইলে যেখানে অনেক বাস্তবতাই লুকিয়ে রাখা যায়। সমস্যাটা সেখানেই। পরাবাস্তবকে কখনওই বাস্তব ভেবে ভুল করা যাবে না, আবার পরাবাস্তবকে অস্বীকার করাও যাবে না। ছোট একটা উদাহরণ দিই। একজনকে ফোন করলেন, সে সায়দাবাদ, আপনাকে বললো, ‘‘ভাই আমি ত টঙ্গী, আজকে আসতে পারবো না’’। তো, ফোন ব্যবহার করার সময়ই আপনার এই ধারণা রাখতে হবে যে, সে যা বলছে তা ফোনে বলছে, আপনি দেখতে পাচ্ছেন না, আবার ফোন ব্যবহার করা এজন্য বাদও দেয়া যাবে না, তাই না?

বাচ্চাদের জগতটা সোজাসুজি যুক্তির। এজন্য ওরা যে কোন কিছুকেই চেখে দেখতে চায়। ওদেরকে সুন্দরভাবে বড় হতে দেয়ার জন্য সেটা দরকারও। টককে টক বললেই হবে না, ওরা জিভ দিয়ে দেখতে হবে, কাকে আপনি টক বলছেন। সুতরাং পরাবাস্তবতার জগতে ওদেরকে ছেড়ে দেবার সময় বেঁধে দিতে হবে, আপনার সশরীর উপস্থিতি থাকতে হবে, বাস্তবতাকেও চিনাতে হবে, যেন ওরা নিজেরাই চেখে নিতে পারে, তুলনা করতে পারে। কারুর লেখায় ‘হা হা’ হাসির প্রতিক্রিয়া দিতে পারুক, সাথে সাথে শিখিয়ে দেন কারুর কথায় মজা পেয়ে কিভাবে পেট চেপে হাসা যায়, বইয়ের পাতায় কিছু পড়ে প্রাণ খুলে কাঁদা যায়, কিভাবে শুধু ভাইবোনের চোখ দেখেই বুঝে ফেলা যায় তার মন ভালো নেই।

৫। জীবন আর জীবিকা (Life and livelihood) :

মানুষ বাঁচার জন্য খায়, খেয়ে বাঁচে, মানুষ হওয়ার সংগ্রাম করে। মানুষের শরীরের মূল তিনটি সত্তার চাহিদা আছে। তার একটি হল খাওয়ার জন্য, একটি যৌন চাহিদা, এই দুই মিলে যতটুকু, সেটুকুতে মানুষ আর অন্য প্রাণী একই রকম। একটা প্রাণীকেও পেট ভরাতে হয়, বংশবৃদ্ধি করতে হয়। মানুষের তৃতীর সত্তাটা চিন্তার ক্ষমতাসম্পন্ন। এর ক্ষমতা অদ্ভুত। এই বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তা আছে বলেই মানুষ কাঁচা খায় না, শুধু সেদ্ধতে পেট ভরায় না। নানান রসদ দিয়ে রসনা বিলাস করে। কিংবা থাকার জায়গাটা মনোরম করে সাজিয়ে রাখে। দুটা মানুষ, কোনরকম দামী খাবার না খেয়ে, এমনকি একজন আরেকজনকে স্পর্শ না করেও ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করে প্রাণ আনন্দে ভরিয়ে তুলতে পারে। সারা মাসের কষ্টের রোজগার বাবামায়ের হাতে তুলে দিয়ে লুকিয়ে তাঁদের তৃপ্তির হাসি দেখতে পারে।

আপনার সন্তানকে পড়ালেখা করাবেন, পৃথিবীতে চলার যোগ্য হয়ে ওঠার জন্য, কিন্তু ভুলে যাবেন না, ‘জীবনের জন্যই জীবিকা’, এ শিক্ষাও আপনিই তাকে দিতে হবে। ছোট ছোট কাজ দিন, তাকে তার পারিশ্রমিক দিন, সে পয়সায় কোন অনাহারীর জন্য খাবার কিনে দিতে উৎসাহ দিন, লুকিয়ে সেই দুঃস্থ মানুষটার খুশী দেখতে দিন। আপনার কোলে মনুষ্যসন্তান তৈরী হোক, শুধুমাত্র একটা দুপেয়ে জীব নয়।

শুরুর কথায় ফিরে যাই। জগতের এই একটি কাজ, শিশুকে পৃথিবীতে আনা এবং তাকে নিজের মত আরেকটা মানুষ করে বড় করা, একটি মস্ত বড় দায়িত্ব। মানুষ সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় প্রাণী, যার কোন শারীরিক যোগ্যতা নেই, এমনকি একটু ইঁদুরের সাথেও দৌড়ে পারার। এই মানুষকেই সৃষ্টির সেরা করে বড় করার কাজটি যাঁদের, তাদের একজনের পায়ের নিচে জান্নাত আর আরেকজনের সন্তুষ্টি সরাসরি আল্লাহর সন্তুষ্টি। এই মর্যাদা শুধুই উপভোগের জন্য নয়, আমাদের সন্তানের লিলিপুট চোখে আমাদেরকে গালিভার দেখানোর জন্য নয়। এই মর্যাদার পেছনে লুকিয়ে আছে দায়িত্ব আর কর্তব্যের মস্তবড় বোঝা। এই বোধকে মাথায় রেখেই আমরা প্রতিদিন পথ চলি, ‘কচিকাঁচাগুলো ডাঁটো করে তুলি, বাঁচিবার তরে সবাই যুঝি’। 

 

প্রথম পর্বের লিঙ্ক https://goo.gl/DjQvnp

পোস্টটি ৪৫২ বার পঠিত
 ৩ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

Leave a Reply

Be the First to Comment!

Notify of
avatar
wpDiscuz