“তোমার প্রেম যে বইতে পারি ,এমন সাধ্য নাই”
লিখেছেন নীলজোসনা, জুলাই ২৭, ২০১৫ ২:৩১ অপরাহ্ণ

পড়ছিলাম এই আয়াতগুলোঃ
“হে মুমিনরা, তোমাদের মধ্যে যে নিজ ধর্ম থেকে ফিরে যাবে,(সে আল্লাহর কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না) অচিরে আল্লাহ এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালবাসবে। তারা মুসলমানদের প্রতি বিনয়-নম্র হবে এবং কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে জেহাদ করবে এবং কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভীত হবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ-তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী।” (৫:৫৪)
একটু বলে নিই। আমি তাফসীরকারকের মর্যাদার কাছেধারেই নই। আমার কথায় কুরআনের তাফসীরের তাৎপর্য খোঁজার চেষ্টা করা ঠিক হবে না। 
যা হোক, ভাবছিলাম, তাহলে কঠোরতার জন্য কাফের হওয়াটা জরুরী। নীতির ক্ষেত্রে কাটছাঁট আর আচরণে-বন্ধুত্ব স্থাপনে কাফেরদের সাথে যে নীতি, অন্তত ঈমানদারদের সাথে সেই নীতি নয়। 
আর একটু বাস্তবে নেমে আসি। পরিবারেরই একজন, সেদিন গরম হয়ে বললেন, “এই যে মেয়েরা এখন হিজাব পরে, এইগুলা হিজাব কোন? চোখ ফিরানো তো দূরের কথা, আটকায় যায় আরও! কি লাভ? আর সারা শরীর না ঢেকে মাথায় কী কী যেন করে, মাথায় আছেটা কি?…”। চোখ, গলা কোনটাই তুলে কথা বলা যাবে না, এমন সম্পর্কের মানুষ তিনি। তবু মিনমিন করে বলেই ফেললাম, আমার সেই চাচীটার কথা। স্লিভলেস ব্লাউজ ছাড়া আর কোন ব্লাউজ নাই দেখে যিনি মুরুব্বীস্থানীয়কারও সামনে (বিশেষ করে শশুরবাড়ির) ওড়না পরে দেখা করতেন, তিনিও আজকাল বাইরে বেরোনোর সময় মাথায় একটা ফ্যাশনেবল হিজাব জড়ান। তাতে উনার আখিরাতের কি লাভ ক্ষতি আমি জানিনা, সেইটা আমার ডিপার্টমেন্টও না। আমি দেখেছি, ওই হিজাবটার সাথে যে আগের পোশাকগুলো মানায় না এটা তিনি ওই ফ্যাশনেবল দেড় গজ কাপড়ের কাছ থেকেই শিখে নিয়েছেন, এবং সেগুলো বদলেও ফেলেছেন। একটা ইংলিশ ফ্রেইজ খুব ভালো লাগে আমার, ‘walking in my shoes’- আমার জায়গায় এসে আমার পদক্ষেপগুলো না ফেলতে হলে আপনি কিছুতেই বুঝবেন না, আমার জীবনে কি চলছে। হয়তো আপনি জন্মগত আল্লাহ-সচেতন মুসলমান পরিবারের গর্বিত সদস্য, কিন্তু আমি আর এক ট্রেডিশনাল মুসলিম পরিবারের ধ্যানধারণা থেকে বের হয়ে শুধু একটা পরিবর্তন নিজের জীবনে আনতে যে যুদ্ধ করেছি, হতে পারে সেটা সব ড্রেসে জর্জেটের ওড়না কে সুতী ওড়নায় রুপান্তর করা, সে যুদ্ধ আপনি নিক্বাব দিয়ে চাকরী করতেও হয়তো করেন নি। অথচ প্রতিদিন প্রতি ওয়াক্ত নামাজে আপনি আল্লাহকে বলছেন, ‘মালিকি ইয়াওমিদ্দীন- আল্লাহ বিচার দিনের মালিক’, আর নিজের আ’মলের উচ্চমর্যাদায় নিশ্চিত হয়ে নিজেই আমার কাজের বিচার করে ফেলছেন, আমাকে আখ্যা দিচ্ছেন, ‘আমার হিজাব কবুল হবে না?’ 
একটূ কৌতুহলী হয়েই পোশাক সংক্রান্ত আয়াতগুলো একত্র করে ভাবতে চাইলাম। আপনিও একটু দেখে নিতে পারেন। 
১। হে বনী-আদম আমি তোমাদের জন্যে পোশাক অবর্তীণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং অবর্তীণ করেছি সাজ সজ্জার বস্ত্র এবং পরহেযগারীর পোশাক, এটি সর্বোত্তম। এটি আল্লাহর কুদরতেরঅন্যতম নিদর্শন, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে। (আ’রাফ ২৬) “
২। হে আদম-সন্তানরা! তোমরা প্রত্যেক সিজদার স্থলে বা মসজিদে (নামাযের সময়) সৌন্দর্য গ্রহণ কর ( পোশাক ও সাজসজ্জা পরিধান করে নাও), খাও, পান কর ও অপব্যয় করো না। তিনি অপব্যয়ীদেরকে ভালবাসেন না।” (আ’রাফ ৩১)
৩। (হে নবী!) আপনি (মুমিনদের) বলুনঃ আল্লাহ সৌন্দর্যের যেসব উপকরণ বা সাজ-সজ্জাকে বান্দাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন এবং যেসব পবিত্র জীবিকা বা আহার্য দিয়েছেন সেগুলোকে কে হারাম করেছে? আপনি বলুনঃ এসব নেয়ামত আসলে পার্থিব জীবনে মুমিনদের জন্যে (যদিও অন্যরাও তা থেকে পার্থিব জীবনে উপকৃত হয়, কিন্তু) কিয়ামতের দিন তা বিশেষভাবে মুমিনদের জন্যই নির্দিষ্ট হবে। এমনিভাবে আমরা জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আয়াতসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করি। (আ’রাফ ৩২)
৪। ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের গুপ্তাঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত: প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাদি, কামনামুক্ত পুরুষ, ও বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। (নূর ৩১) 
৫। হে নবী! আপনি আপনার পত্নীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। (সুরা আহযাব: ৫৯) 
৬। যারা মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিতে চায় তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতে মর্মন্তুদ শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না। (নূর ১৯)
আর একটা হাদীস মনে হয় একটু দেখা উচিত। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুই শ্রেণীর জাহান্নামী যাদের আবির্ভাব এখনো হয় নি। এক শ্রেণী, যাদের হাতে গাভীর লেজের মত চাবুক থাকবে। তা দ্বারা তারা লোকদের প্রহার (জুলুম) করবে। আরেক শ্রেণী, এমন কিছু নারী যারা পোষাক পরেও নগ্ন, যারা (পরপুরুষকে) আকর্ষণকারী ও (পরপুরুষের প্রতি) আকৃষ্ট। যারা বুখতী উটের হেলানো কুঁজের মত মাথা বিশিষ্ট। এরা জান্নাতের সুবাস পর্যন্ত পাবে না। অথচ জান্নাতের সুবাস অনেক অনেক দূর থেকেও পাওয়া যায়।-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২১২৮; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস : ৮৬৬৫
কি বুঝা গেলো? একটা মেয়ে পোশাক কেন পরবে? 
১। তাকে যেন চেনা যায়, যে সে উত্যক্ত হতে চায় না। 
২। সাজসজ্জ্বার উপকরণ আল্লাহরই দেয়া। এমনকি নামাজে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সময়ও সাধ্যমত পরিপাটি হয়ে দাঁড়ানো উচিত। 
৩। ‘গোপন’ সাজসজ্জ্বা ইচ্ছাকৃতভাবে দেখানো যাবেনা। যা আপনিই বের হয়ে যায় তা ছাড়া। 
৪। শরীর বিশেষ করে উর্ধাঙ্গের ব্যপারে আলাদা করে সতর্ক করা হয়েছে, যেন ঢেকে রাখা হয়। স্বচ্ছ বা টাইট, যা পরেও না পরা হয়, সেরকম কাপড় না পরা। 
৫। অশ্লীলতার প্রচলন বাড়ে, এমন কাপড় না পরা।
৬। পোশাক দিয়ে আকৃষ্ট করতে চাওয়া হয় না এমন কাপড় না পরা। 
এখানের বেশ কয়েকটা বিষয় মনস্তাত্বিক। কেউ কোন উদ্দেশ্যে কাপড় পরেছে, আপনি আমি কি করে জানবো? এখন দেখেন, এ আদেশগুলোর মধ্যে যেগুলো না-বোধক, সেগুলো স্বয়ং আল্লাহ কিভাবে বলছেন? 
– পরহেযগারীর পোশাক, এটি সর্বোত্তম… 
– এমনিভাবে আমরা জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আয়াতসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করি…
– আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু…
– আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না… 
আল্লাহ নির্দেশ দেন, যে বুঝে তার নিজের জন্য ফরয বানিয়ে নেয়। আর যার একটু সময় লাগে, তার জন্য কী সুন্দর উৎসাহব্যাঞ্জক কথা! তুমি জ্ঞানী হলে, পরহেযগার হলে, তোমার সর্বজ্ঞ দয়ালু আল্লাহকে খুশী করতে তুমিই এগিয়ে আসবে। আল্লাহ তাঁর ক্ষমার হাত প্রসারিত করে রেখেছেন, শেষ নিঃশ্বাসের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তোমার সময় আছে। আল্লাহ জানেন তোমার মাথার ধূসর কোষগুলোয় কখন কি ভাবনা চলছে! 
আর আপনি আমি? কোমর বেঁধে সমালোচনায় নামি, ‘ওর হিজাব, হয় নাই’, আস্তাগফিরুল্লাহ! আপনি আমি কে? সংস্কারক? দা’য়ী? আল্লাহর পথে ডাকি মানুষকে? সাহস আছে মেয়েটিকে হাত ধরে বলার, “আপু, তুমি এত্তো সুন্দর! হিজাবটা এইভাবে পর। আল্লাহ খুশী হবেন”? স্বচ্ছতা আছে অন্তরের, ডাক্তারের কাছে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ পাশে বসা জিন্স ফতুয়া পরা উগ্র সাজের মহিলাটিকে ঘৃণাভরে আড়চোখে না দেখে দুজনের জানা কোন বিষয়ে আড্ডা জুড়ে দেয়ার? যেন জীবনে কোনদিন আপনার কোমল, প্রাণবন্ত ব্যবহারের কথা মনে করেও সে হিজাবকে শ্রদ্ধা করতে শেখে? কোনদিন নিজেও হাতে তুলে নেয়া এক টুকরা রঙ্গীণ কাপড়? কর্তব্যকে অস্বীকার করে, উপেক্ষা করে, তত্ত্ব নিয়ে আর কতদিন আমরা ঘাড় গোঁজ করে বসে থাকবো? 
এখানে একটা ছোট্ট ব্যপার আছে। মনে করেন কেউ অধঃপতনের সিঁড়ি দিয়ে নামছে, আর কেউ আত্নউন্নয়নের পথে উপরের দিকে ধাবমান। একই ধাপ, একজনকে উপরে আর একজনকে নিচে নিয়ে যাচ্ছে। দুইটাকে এক করে দেখবেন না। যে চাচীর কথা শুরুতেই বলেছি, তিনি আর আমি এক না-ও হতে পারি। আমি যদি আগে সারাশরীর বোরখায় ঢেকে হিজাব করি, ‘ভার্সিটিতে যাই, কে কি বলবে’ – এই ভেবে সেখান থেকে নেমে জামার ওপরেই হিজাবের বেশ শুরু করি তবে হয়তো মানুষের চোখে আমাদের দুইজনকে দেখতে একই রকম লাগবে। কিন্তু আল্লাহ? উনি যে সব জানেন? আল্লাহ এজন্যই বলছেন, ‘‘আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না’’।
আল্লাহ, আমার অন্তরের চিন্তাগুলোকে পরিচ্ছন্ন বানিয়ে দিন, তারা যেন আমাকে পরিচ্ছন্ন কাজ করতেই অনুপ্রাণিত করে। যে বিচারের ভার আল্লাহর, মানুষ হয়ে মানুষকে সেই বিচার করতে গিয়ে আমার মূল্যবান সম্পদ-ঈমানই যেন নড়বড়ে হয়ে না যায়।

পোস্টটি ১১৭১ বার পঠিত
 ২ টি লাইক
৪ টি মন্তব্য
৪ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. http://womenexpress.net/blog/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_good.gif

  2. আল্লাহ, আমার অন্তরের চিন্তাগুলোকে পরিচ্ছন্ন বানিয়ে দিন, তারা যেন আমাকে পরিচ্ছন্ন কাজ করতেই অনুপ্রাণিত করে। আমীন… http://womenexpress.net/blog/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_good.gif

  3. চিন্তাজাগানিয়া লেখা, আপু। ধন্যবাদ।

  4. Onek valo laglo.Allah amader ontor gulu k sada kore din shuvro borofer moto.ameen.

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.