পারিবারিক মানবিকতা ও আমরা-১
লিখেছেন নাসরিন সিমা, আগস্ট ৮, ২০১৬ ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ

 

কয়েকটা ঘটনা দিয়ে শুরু করি…..

১….
বেশ কিছুদিন আগে এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সবাইকে ডাবের পানি পান করানোর জন্য সে বাড়ির বড় ছেলে ডাব কাটছিল। সবাই সেই পানি খেয়ে তৃপ্ত হলাম। এরপর দেখলাম ডাবের যে অংশগুলো ফেলতে হবে, ছেলেটি সেগুলো ফেলে দিয়ে মেঝের ঐ অংশটুকু মুছে ফেলল, উল্লেখ্য পাশেই তাঁর মা দাঁড়ানো। সে নিঃসংকোচে আমাদের সামনেই কাজটি করেছে… উহু দাঁড়ান, ঘরে বসে থাকা বেকার ছেলেটি সে নয় সে একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার।

২….
মা সারাদিন এ কাজ সে কাজে ব্যস্ত থাকে। একটু বসার অবকাশ নেই। ঘরের দু তিনটে বড় বড় ছেলে গোছলে ঢুকে একবার গামছা চায়, একবার লুঙ্গি চায়। গোছল শেষে লুঙ্গি গামছা বাথরুমে ফেলে আসে। অবলীলায় তাদের মা অন্য কাজের ফাঁকে সেই কাপড় গুলো ধুয়ে নেড়ে দেন একটুও বিরক্ত হননা, রাগারাগি করেননা। ছেলেদের ক্ষুধা পেলে চিৎকার দিয়ে মাকে খাবার দিয়ে যেতে বলে, মা হাতের সব কাজ ফেলে তার বুকের মানিকের খাবারের ব্যবস্থা করেন। কম্পিউটারের পর্দায় ছেলেটি তখন পর্ণ দেখছে নাকী, অন্য কিছু দেখছে তা মায়ের খেয়ালের বিষয় নয়।

৩…
গল্পটা একটু অন্য ধাঁচের। মানবতার মুক্তির দূত, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সঃ)। তার মতো ব্যাস্ত, কর্মঠ, কষ্ট করা মানুষ আর একজন পুরুষও আছেন বলে আমি মনে করিনা। সেই মানুষটি ঘরে ফিরে স্ত্রীদেরকে কাজে সাহায্য করতেন, লক্ষ্য করুন “স্ত্রীদেরকে”! তাঁর জুতোর তলায় পা পড়ে যখন আয়েশার রাঃ পা থেকে রক্ত পড়ছিল তখন তিনি কষ্ট পেয়ে বলেছিলেন, “আমাকে আগে বলোনি কেন?”

এখন ফিরি আসুন আমার উদ্দেশ্যের দিকে….
দুজন বোনের লেখা পড়লাম, একজনের প্রতি অন্যজনের বিদ্বেষ লক্ষ করলাম। আসলে কিছু চিন্তা মানুষের একান্তই মস্তিষ্কগত, আর কিছু সমাজে অহরহ ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে মানবিক চিন্তার স্ফুরণ! এখন সমাজের এই ঘটনাগুলো যদি শুধুই সামাজিকতার খাতিরে দেখি তাহলে একজন স্ত্রীর কাজ হল…
*সংসার সামলানো (কারোর কোন সাহায্য ছাড়া- স্বামী, শশুর শাশুড়ী, দেবর ননদ, যেমনটা কাজের বুয়া করে থাকে)

*সন্তান লালন পালন (জন্মদাতা একজন থাকেন যিনি সারাদিন অফিস সেরে এসে পায়ের উপরে পা তুলে চায়ের মগ হাতে নিয়ে আয়েশ করে দেশের খবরাখবর দেখবেন, যদিও সন্তান, কাজে ব্যস্ত মায়ের পিছু ঘুরতে ঘুরতে পা পিছলে পড়ে গিয়ে বড় আঘাত পাবে, আর জন্মদাতা তখন পিতা হয়ে উঠবেন স্ত্রীকে এই বলে শাসাবেন “কেমন মা তুমি?” বাচ্চার খেয়াল রাখোনা। এই জান্মদাতাকে তখন “জানোয়ার” না বললেও আপনি মানুষ বলবেন কি? প্রশ্ণ রেখে যাচ্ছি,চাইলে উত্তর দিয়ে যাবেন।

*শশুর শাশুড়ীর সেবা করা (যেহেতু তারা ছেলে জন্ম দিয়েছেন, ছেলের বউ এনেছেন সেহেতু সমগ্র দায় তার। কখন চা লাগবে, কখন ঔষধ লাগবে, কখন গোছলের জন্য কুসুম গরম পানি লাগবে, সবটার দায়িত্ব বৌমার। ছেলেদের এইসব দায়িত্ব নেই যেহেতু তারা বউ নামক কলুর বলদ এনে ভরণপোষন দিচ্ছেন)।

*দেবর ননদের প্রয়োজন পূরণ (তাদের ভাই একজন দাসী এনেছেন, সো, আজ বন্ধুরা আসবে বিরিয়ানী রান্না করো, নুডলস, বার্গার…. ভাবী গো এতো কিছুই তো করলে তোমার হাতের এককাপ চা না খেলে হয়?)

হুম থামেন, একটু দম ছেড়ে নিই আমি। একজন নারীর এইসব কাজ কোন পুরুষ করতে পারবেনা। কিন্তু অফিসিয়াল (এসর মধ্যে বসে কম্পিউটার সামনে নিয়ে, শিক্ষকতা ইত্যাদি), শ্রমনির্ভর (মাটি কাটা, জমি চাষ ইত্যাদি) কাজগুলো কিন্তু নারী করে, করতে পারে। সুতরাং কষ্টের ভারটা কোনদিকে বেশী লক্ষ্য করুন।

বাকীটুকু পরবর্তী অংশে…..

 

পোস্টটি ৮১৩ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
৬ টি মন্তব্য
৬ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. আল্লাহ রব্বুল আলামীন পুরুষকে নারীর এক ষ্টেপ উপরে মর্যাদা দিয়েছেন। কিন্তু এই মর্যাদার ভুল প্রচলন সমাজে উপরে উল্লেখিত দাসীর মতো খাটিয়ে নেয়া অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু পুরুষের মর্যাদা সাংসারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সন্তানের ভবি্ষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আয়ের খাতগুলো কিভাবে ব্যায় হবে, স্ত্রীর সামগ্রীক প্রয়োজন পূরণ হবে কিভাবে ইত্যাদি।

  2. আপু খুবই চমৎকার লিখেছেন। এই বিশ্লেষণমূলক লেখাটার জন্য অনেক ধন্যবাদ

  3. এই সামাজিকতাই তো মানুষকে সমাজের সাথে বেধে রেখেছে নচেৎ মানুষ টিকতো কি করে?

    • ভালোভাবে বেঁচে থাকা আর মরার মতো বেঁচে থাকার পার্থক্যটা কি জানা আছে আপু?
      অর্ধেক মানুষ যদি মরার মতো বেঁচে থাকে তাতে হয়তো টিকে থাকা যায়, কিন্তু সেটা কি আদৌ সঠিক বিচরের মধ্যে পড়ে, এই অনৈতিক সামাজিকতকে বদলানো অত্যন্ত জরুরী।

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.