রুচিবোধ
লিখেছেন নাসরিন সিমা, অক্টোবর ১০, ২০১৪ ৩:৫১ অপরাহ্ণ

 

তখন সময় ছিলো ২০০৬। ইন্টারমিডিয়েট ফার্ষ্ট ইয়ারে পড়তাম। বগুড়া মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজ ছিলো আমার কলেজ। স্যার ক্লাস নিচ্ছেন ইংরেজী। উনি বললেন তোমাদেরকে একটা ঘটনা শুনাই……
বার্লিন শহরে একজন নারী জনসম্মুখে ঘোষণা দিলো যে, সে ছেলেদের মতো উদোম শরীরে সাইকেল চালাবে। যথারীতি করেওছে………………… এই মেয়েকে স্যালুট দেয়া যায়না? দ্যাখো তোমরা যারা বোরকা পরো তাদের অধিকাংশের মনটা ছোট হয়, তারা কনজারভেটিভ হয়, নিজেকে বিকশিত করতে পারেনা। এখন তোমাদের সময় হলো নিজেকে মেলে ধরা, ফুলের মতো সুবাস ছড়ানো। সেদিন আমার পাশে বসা সাদিয়া ইসলাম দ্রুত বেগে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেছিলো,
-স্যার একটা কথা বলি?
-অবশ্যই বলো!
-আমাদের তো আপনার স্যালুট জানানো মেয়েটার মতো প্রাকটিস শুরু করা উচিত তাইনা?
স্যারের মুখমন্ডল উজ্জল হয়ে যায়, যে উজ্জলতায় কুৎসিত দৃষ্টি সাদিয়ার দিকে ক্রমাগত বাড়তে থাকে বলেন,
-এইতো একজন মেয়ে পাওয়া গেছে, যে স্বাধীন চিন্তা করে, কিন্তু তুমি বোরকা পরো কেন?
-জি স্যার ভাবছি বোরকা বাদ দেব, তবে আপনি যদি আপনার মেয়েকে বার্লিন শহরের মেয়েটার মতো সাইকেল চালিয়ে পুরো বগুড়া শহর ঘুরাতে পারেন, আমি আর বোরখা পরবনা…………………
সেদিন দেখার মতো হয়েছিলো স্যারের মুখটা। ক্লাসের নির্দিষ্ট টাইম শেষ না হতেই তিনি চলে গিয়েছিলেন!

দ্বিতীয় ঘটনাটাও এমনই, একজন স্যারের। স্যারটির নাম আব্দুস সবুর আমাদের যুক্তিবিদ্যার ক্লাস নিতেন, আমি বোরকা পরতাম ঠিকই কিন্তু ক্লাস হতো একএকটা এক এক ভবনে বা একএক তলায়। আমরা প্রায় ছোটাছুটি করে সিড়ি বেয়ে উঠতাম। ঐ স্যার বলতেন তোমরা কতো উচ্ছল, প্রাণবন্ত। আমি জীবনে প্রথম এবং শেষ সেবারই স্যারের নেয়া ক্লাস টেষ্টে হাইষ্ট মার্কস পেয়েছিলাম, আমার সাথে সাদিয়াও। স্যার আমাদেরকে কলম গিফট করেছিলেন আর হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলে সেই সাদিয়া বলেছিলো,
-এ ব্যাপারে আমরা একটু পিছিয়ে স্যারের সাথে হ্যান্ডশেক করতে পারবনা! আমি কিছু বলিনি, হ্যান্ডশেকও করিনি, মুগ্ধ হতাম সাদিয়ার প্রতিবাদে। একদিন স্যারের সাথে আমার দেখা হলো, আমার সাথে এক আপু ছিলেন। স্যার পড়াশুনার খোঁজখবর নিয়ে বললেন, সমস্যা থাকলে আমার বাসায় আসতে পারো, এই নাও কার্ড। পরে আপু বললেন,
-খবরদার কখনো যেওনা, স্যার কী করে জানো ছাত্রীদের মুখমন্ডলে হাত দিয়ে বলে তোমার মুখটাতো অনেক শুকিয়ে গেছে, এ বাবা কতো ব্রণ হয়েছে মুখে ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপরে একদিন বগুড়ার সাতমাথা পত্রিকায় বড় করে শিরোনাম আসে “মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজের লেকচারার আব্দুস সবুর বাথরুমে অনার্স পড়ুয়া ছাত্রী শাপলার সাথে………………”
এই দুইটা নোংরা ঘটনা তুলে ধরার কারণ আপনাদেরকে বলছি, তসলমা নাসরিনের “বাঙ্গালীর বোরখা” লেখাটা পড়ার পর থেকে মেজাজ আমার তেতে আছে। যুগে যুগে বার্লিন শহরের ঐ নারীর মতো তসলিমারা গড়ে ওঠে, আব্দুস সবুর, পরিমলদের মতো স্যাররা ও স্থান গেড়ে বসে থাকে দিনের পর দিন! কিন্তু সাদিয়ার মতো প্রতিবাদী মানুষগুলো তৈরী হয় খুব কম। যে কারণে নারীই এসব নোংরামীর ভিকটিম হয়, জীবনের আসল অর্থ বোঝার আগেই সে কারণেই হারিয়ে যেতে হয় তাদেরকে, হয়তো বেছে নিতে হয় আত্মহত্যার পথ। তসলিমার পথ ধরে কেউবা বেঁছে নেয় তসলিমার মতো পথ, যে পথটাকে কুকুরের চলার পথ বলা ছাড়া অন্য কিছু বলা যায়না। আর যে পথ ধরে তৈরী হয় ইমরাণ এইচ সরকার, লাকীদের মতো নির্লজ্জ মিথ্যাচারীরা। জনসম্মুখে চাষ হয় নোংরামীর। এদেরকে শুধু ঘৃণা করলেই কী হয়ে যায়? আর কোন করনীয় নেই?

পোস্টটি ৫৭৩ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
৪ টি মন্তব্য
৪ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. খুব চমৎকার সময়োপযোগী লেখা, ধন্যবাদ!!

  2. বগুরা শহর ছেড়েছি অনেক দিন হোল। মা আর ছোট ভাই বোন সেখানেই। জানা মতে ইসলামী আন্দলনের মজবুতি এলাকা এটি। সাদিয়ার মতো নারীর সংখ্যাই তো বেশী হওয়ার কথা সেখানে। তার পরেও এমন অবস্থা… আল্লাহ্‌ই ভালো জানেন!
    মহিলা কলেজ হিসাবে দুই একজন কে ভর্তি করার সিদ্ধান্তও নিয়েছি। কলেজটির এখন কি অবস্থা জানেন কি আপু? plz জানাবেন

    • আমি নিজেও অনেকদিন হলো বগুড়া থাকিনা। কলেজটির ব্যাপারেও সঠিক অবস্থা জানা নেই। এখন বগুড়া গেলেও খুব কম সময় নিয়ে যাওয়া হয়। তাতে আত্মীয় স্বজনের খোঁজখবর দেখা সাক্ষাতেই ফেরার সময় হয়ে যায়। @ রোমান।

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.