মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে আমার প্রিয় মানুষ- আমি আমার জীবনটাকে ওয়াকফ করে গেলাম।
লিখেছেন নাসরিন সিমা, জানুয়ারি ৩১, ২০১৫ ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ

 

 

সেদিন ছিলো সোমবার, বিকাল পাঁচটা, ২১শে জুলাই ১৯৯৭।আব্বু ছিলেন প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক। সকাল বেলা আমরা খিচুড়ী খাচ্ছিলাম। আমার এক ভাবী ছুটতে ছুটতে এসে বললেন আব্বুকে লক্ষ্য করে,

– আব্বা আজ স্কুলে যাবেননা।

-কেন?

-ওরা পুকুর পাড়ে রামদা, সুলপি এসবে ধার দিচ্ছে!

আম্মু আমি দুজনই আব্বুর দিকে তাকালাম, কোন প্রতিক্রিয়া নেই। শুধু বললেন,

-আচ্ছা, ঠিক আছে তুমি যাও। ভাবী যাওয়ার আগে আম্মুর দিকে তাকিয়ে অনুরোধ করে গেলেন যেন!

আম্মু যেতে না দেয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করতে লাগলেন।

আব্বু মুচকী হেসে,

-আরে আমি কী ওদেরকে ভয় করি নাকী?  আল্লাহ রক্ষা করলে কেউ তাকে মারতে পারে? বোকা!

আব্বু আমার দিকে তাকালেন,

-আম্মু আজকে আপনার স্কুল যেতে হবেনা, আজ আমি আপনাকে ছুটি দিলাম!

কিন্তু আমিতো নাছোড়বান্দা, আব্বুকে দু তিন ঘন্টা না দেখে থাকতে পারতামনা। রাত্রিবেলা ফিরতে দেরী হলে জেগে থাকতাম আম্মুর সাথে।  আমি যাবোই এমন জেদ ধরায়, আমিই জয়ী হলাম।

স্কুল থেকে ফিরছিলাম, তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ছিলাম। ঝোপের আড়াল থেকে দু একজনের কথা শুনতে পাচ্ছিলাম, আব্বু সাইকেল চালিয়ে বাড়ীর দিকেই ফিরছিলেন। কিন্তু পায়ে মল পরা, কয়েকজন দুর থেকে নৃত্য করার ভঙ্গীতে মল বাজাচ্ছিলো আর বলছিলো, দ্যাখো দ্যাখো রাজ্জাক মাষ্টার ভয় পায় তাই চলে যায়…………

একথা শোনার পর আব্বু থেমে যান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কখনো আপোস করতেননা, সাইকেল দাঁড় করিয়ে রেখে, আমাকেও ওখানে দাঁড়াতে বললেন, আর গাছের শুকনো ডাল ভাঙ্গছেন আর বলছেন, এদেরকে আমি গ্রাম ছাড়া করবো, মসজিদটাকে নিজেদের ভোগের বস্তু বানিয়ে আমাকে ভয় দেখাচ্ছে, আরে মসজিদের জমিগুলোকী তোমাদের বাবার সম্পত্তি! গ্রামে যারা সংগঠন করতেন তারা আব্বুকে নিতে এসে এই অবস্থা দেখে, একজন দ্রুত গিয়ে মসজিদের মাইকে বলিলেন আব্দুর রাজ্জাক ভাইকে ওরা মেরে ফেলবে তোমরা সবাই চলে এসো । চারে দিকে কিছুক্ষণের জন্য  অন্ধকার হয়ে যায়, এখন বুঝি ওটার নাম ককটেল! অনেক মানুষ এসে জমা হয়েছে। আমি আব্বুকে ভীড়ের মধ্যে থেকেও দেখার চেষ্টা করছিলাম, আব্বু একবার ঘাড় ফিরালেন কিন্তু ওদের মুখোমুখি হবার জন্য চলা অব্যাহত রেখে,

-আচ্ছা তোমাদের কী হাতও নেই!

এরপর যখন একটু একটু দেখা যাচ্ছে, তখন দেখলাম আব্বুকে পড়ে যেতে। রক্তাক্ত! আমি চিৎকার করেছিলাম আব্বু বলে! ভয়ঙ্ককর ঐসব অস্ত্র দেখে আমি, খুবই ভয় পেয়েছিলাম। আমি আব্বুর কাছে যেতে চাইলে কেউ আমাকে আটকায়। আম্মু তখনও জানেনি হয়তোবা।

পরে আব্বুকে এতো বেশী রক্তাক্ত হতে দেখে ওদের অস্ত্রের সামনে নিজে হাত এগিয়ে দেন একজন আঙ্কেল। আব্বুকে সরিয়ে দিয়ে অন্যজন, সামনে এগিয়ে যান, তিনি সামান্যর জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন, ওরা ইচ্ছেমতো আঘাত করে পালিয়ে যায়, ওদের একজনকে পেয়ে ওদের অস্ত্র দিয়েই অন্য একজন আঙ্কেল মারতে থাকে! তখন আব্বু বলেছিলেন , “থাক ওতো একা ওকে তোমরা মেরোনা! আর আমিতো আমার জীবনকে ওয়াকফ করে গেলাম। আর ওরা বোঝেনা বলেই এই কাজ করেছে, ছেড়ে দাও!” আব্বুর এই কথার জের ধরে আজও খুনিরা আফসোস করে বলে কতো ভালো মানুষকে আমরা শেষ করে দিয়েছি! আব্বুকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হয়। ঐ অবস্থাতেও বলেছিলেন “আছরের আজান কী হয়ে গেছে?! আমি নামাজ পড়বোতো” সেই অনেকটা পথ বগুড়া মোহাম্মদ আলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া পর যখন ডাক্তার বলেছিলেন, আর আড়াই ঘন্টার মতো সময় আছে! তখন থানা আমীর আংকেল আব্দুল গণি মন্ডল (বর্তমান দুপচাঁচিয়া পৌরসভা চেয়ারম্যান) অস্তির হয়ে ডাক্তারকে ধমক দিয়েছিলেন, ডাক্তর কী কখনো মৃত্যুর সময় বলতে পারে?? বগুড়া থেকে রাজশাহী নেয়ার সময় আমাকে আর শামীমাকে নানাবাড়ী পাঠিয়ে দেয়া হয়, রিমা গ্রামেই বড় চাচার বাড়িতে ছিলো আর সম্পা আম্মুর কাছে, আম্মু আর এক মামা রাজশাহী যাচ্ছিলেন এম্বুলেন্সে করে।

পরদিন সকালে আমার ফুফাকে নানাবাড়িতে দেখলাম, কিন্তু আমার আর শামীমার সাথে কোন কথা বলেননি, আমি হঠাৎই নানার আর্তচিৎকার শুনলাম, উনি বলছেন আল্লাহ আমার মেয়েটাকে কেন আগে নিলেনা জামাইটাকে কেন নিলে!! বোঝার একটুও ঘাটতি থাকলোনা।  আমাদেরকে খাওয়ানোর চেষ্টা মামা মামীর! কিন্তু খেতে ইচ্ছে করছিলোনা, কাঁদছিলাম।! আব্বুর জানাজা হয়েছিলো  দুটা, একটা দুপচাঁচিয়া থানা শহরে, আর একটা গ্রামে। আব্বুর স্কুল মাঠেও হওয়ার কথা ছিলো, কিন্তু সময়ের স্বল্পতার কারনে চলে সেটা হয়নি। স্কুল এলাকার যারা ছিলেন তারা ছুটতে ছুটতে আমাদের গ্রামে আসার চেষ্টা করেছিলেন!

শেষ দেখা যখন দেখেছিলাম, আব্বু কাফনে তাজা রক্তে মেখে ছিলো, আর হালকা ঘুমিয়ে গেলে যেমন দেখা যায় তেমন ছিলো চেহারাটা! সমস্ত ধকল শেষে যেন এক প্রশান্তির ঘুম। চেহারাটা আজও আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে!

আমাকে  সবাই বলে আমি নাকী আব্বুর মতো দেখতে! আব্বুর মতো হাত, পা, হাঁটা চলা,। আমি ভাবি আমি কী আব্বুর মতো শহীদ হতে পারবো! কী জানি? বড্ড ইচ্ছে করে!

পোস্টটি ৩৯৮ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
২ টি মন্তব্য
২ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. আপনার অনেক সৌভাগ্য। আল্লাহ আপনাকে তাঁর কাছের বান্দা করে নিন।
    আর, শহীদকে নিয়ে আরও জানার আকাংক্ষা জানিয়ে রাখলাম

  2. ভারাক্রান্ত হয়ে গেল মনটা। সকল উত্তম কাজের বিনিময় অবশ্যই মিলবে!

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.