বাইতুল্লাহ’র পথে…<3
লিখেছেন নাসরিন সিমা, ডিসেম্বর ৪, ২০১৭ ২:০৮ অপরাহ্ণ

২০১৭! বছরের শুরুর দিকে হঠাৎ করেই প্লান করা হল! সেই সূদুর সৌদি আরব! কত গান কত কবিতা লেখা হয়েছে। কত মানুষ অসংখ্য বার সেখানে যাওয়ার জন্য প্লান করেছেন অনেকেরই যাওয়া হয়ে ওঠেনি। আমারো মনে হচ্ছিল সত্যিই কি যেতে পারব! ছেলেটা বড়ই (১০ হবে) আর নানী Parul Akhter খালামনি Mohtadia Shamima, তাজনিন বিনতে আব্দুর রাজ্জাক সবার সাথে ভালো থাকবে। স্পেশালি Habiba Binte Abdur Razzaque শিশুরা ওর কাছে নিজেকে নিরাপদ মনে করে না কীযে ভালো থাকে, ওর কাছাকাছি থাকে, আমার বড়টা তো ওকে পেলে আমার কাছেও আসতো না।। চিন্তা হচ্ছিল মেয়েকে ২.৫০ নিয়ে, আমার অনুপস্থিতি তাও এতোগুলো দিন সে কিভাবে নিবে। আর আমিও ওদেরকে ছেড়ে কিভাবে থাকবো। যাইহোক ধীরে ধীরে সময় এগিয়ে আসছিল, প্রয়োজনীয় কেনাকাটা, আত্মীয়-স্বজনদের কাছে বিদায় নেয়া।পর্যায়ক্রমে সব শেষ হল।আমি যেতে পারব? এরকম প্রশ্ন নিজেকে বহুবার করেছি। শুকরিয়া মহান আল্লাহর যিনি চেয়েছেন আমি সেখানে যাই, তার ঘরের মেহমান হই।আর আমার সাথের মানুষটাকেও Mahmud Hasan Cdcs যিনি আমাকে নিয়ে গেছেন। আল্লাহ তাকে তার চিন্তার তার সামগ্রিক কাজের সঠিক প্রতিদান দিন। ভেবেছিলাম যাওয়ার আগের সমস্ত সামাজীক কুসংস্কার, বিদয়াত জীবন থেকে কবর দিয়ে যাব। কিন্তু…… হয় না। একাকী কোন উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব না!

জুলাইয়ের ২৫ তারিখ ছিল ফ্লাইট।সেদিন সকালে শশুরআব্বা গ্রাম থেকে আসলেন, তিনি আগে হজ্জ করে এসেছিলেন তাই নিয়ম-কানুন গুলো বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, কিভাবে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করবো, কিভাবে গেলে ভীড় এভোয়েড করা যাবে, শাশুড়ীমা দুদিন আগেই এসেছিলেন।এরপর লাগেজ গোছানো, একবারে বেধে নেয়া হলো। যাওয়ার একটু আগেই দু’জন ভাই এসেছিলেন। আমাদেরকে ঘড়ি গিফট করলেন এরপর গাড়ি এলে সবাই গাড়িতে উঠলাম। মেয়েটাকে কোলে জড়িয়ে রেখেছিলাম। কত কথা তার! আমাদের গাড়িতে বিদায় দেওয়ার জন্য আরো ছিলেন, Noor Mohammad ভাই, অর্ণব হাসান। এয়ার পোর্টে যখন নামবো কেমন জানি শেষ বিদায়ের মতো অনুভুতি হচ্ছিলো। মেয়ে আমার ঘুমিয়ে গেছে।ওর কপালে চুমু দিয়ে মন শক্ত করলাম। আম্মুও কাদছিলেন, ছোট বোনগুলো, শাশুড়িমা হয়তো সবাইই, তাকানোর সাহস হয়নি। আমি যখন ছেলেটার দিকে তাকিয়েছি তখন বুঝলাম নানী খালামনি সহ সে যতই ভালো থাকুক ওরও কস্ট হবে, ওর চোখদুটোও ছলছল করছিল। এরপর শুরু হলো অফিসিয়াল আনুষ্ঠানিকতা। পাসপোর্ট দেখানোর আনুষ্ঠানিকতা।সেগুলোও শেষ হলো, এখন অপেক্ষা… সেখানে বসে থাকাকালীন দেখলাম সৌদি এয়ারলাইন্সের ডল গুলোকে, আমি দু্ঃখিত ডল বলার জন্য, কিন্তু তাদেরকে আমার রোবট টাইপের ডলই মনে হয়েছে, শপিংমলে সাজিয়ে রাখা ডলগুলোর মতই তাদের অবয়ব, আর সেভাবেই ওদের নিজের ফিটনেস ধরে রাখতে হয়।কথা না বলে নড়াচড়া না করে যদি স্থীর হয়ে ওরা দাঁড়িয়ে থাকে তখন মুর্তি ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না আপনার! যাই হোক বিমানে যখন ঊঠলাম তখন ক্যাপ্টেনগণ শুরুতেই ভ্যররথনা জানালেন।এই প্রথম সরাসরি খালিচোখে দেখেছিলাম! প্রথম বিমানে ওঠাতো, একটু নার্ভাস ছিলাম। উড়তে শুরু করার সময় যখন আল্লাহু আকবার বললাম, তখন সব ভয়, নার্ভাসনেস দূর হয়ে গেল অনায়াসেই। এমনকী মুহুর্তের মধ্যেই মনের ভেতরে ছেলেমেয়েদেরকে নিয়ে যে টেনশন জমে ছিল তাও দুর হয়ে গিয়েছিল আলহামদুলিল্লাহ। যে খাবার গুলো দিলো খেতে নিয়ে হালকা অরুচি এসে গেলো, তবুও একটু খেয়েছিলাম, তবে পরোটা আর চকোলেট কেকটা ভালোয় লাগলো মোটামুটি।

জেদ্দায় যখন নামব তার একটু আগেই শুরু হল তালবিয়া পাঠ, ভেতর থেকে কেমন একটা অনুভুতি, ভাষায় প্রকাশ করার মতো না! যখন নামলাম তখন ওখানে এগারোটা। নামার কিছু পরেই গাড়িতে ওঠার জন্য তাড়াহুড়া শুরু হয়ে গেলো।গাড়িগুলো খুব সুন্দর আর আধুনিক! এরপর যেখানে গেলাম সেটাও এয়ারপোর্টের অংশ।বসার সাথে সাথে লিবেরা মোবাইল সিম কোম্পানীর এক লোক এসে সিম বিক্রির চেষ্টা করছিলো, আর তাতে সে সফল ও হলো , সবার সাথে আমরাও কিনলাম। এরপর অপেক্ষা! গাড়ীর অপেক্ষা। যে গাড়িতে আমরা কাংখিত স্থানে পৌছবো! আম্মুকে ফোন করে জেদ্দায় পৌছার কথা জানালাম।ইমিগ্রেশন শেষ হলে অনেক পরে গাড়ি আসলো। উঠে বসলাম। রাত্রির অন্ধকার মরুভুমি জুড়ে, গাড়ির এসিতে তখন আমি বরফ হবার জোগাড়। ধীরে ধীরে যখন আলো এসে গেলো, ফজর তখন পেরিয়েছে, গাড়িতেই সবাই একসাথে নামাজ আদায় করা হলো। এরপর সমস্বরে তালবিয়ার শব্দে ভেতরে এক আবেগীয় প্রস্রবণ ছিল যেন। মক্কায় ঢোকার আগে মুয়াল্লিম যখন বললেন, ঐ যে গেইট! দেখার সাথে সাথে আমার কান্না চলে এসেছিল! শুধু একটা জিনিস মনের মধ্যে ভাসতে শুরু করলো, এই রাস্তায় রাসুলকে সঃ কত কষ্ট করতে হয়েছে, আঘাতে আঘাতে, অন্যায় অপবাদে জর্জরিত হয়েছেন! আজ আমরা এসি গাড়িতে করে যাচ্ছি, তিনি তপ্ত রৌদ্রে পায়ে হেটে মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন! মনে হলো এতো আরাম করে আমরা কি তার শাফায়াত পাবার যোগ্য হয়ে উঠতে পারবো??

চলবে…

পোস্টটি ৫২ বার পঠিত
 ২ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

Leave a Reply

Be the First to Comment!

Notify of
wpDiscuz