বাইতুল্লাহ’র পথে ৩,৪
লিখেছেন নাসরিন সিমা, জানুয়ারি ৬, ২০১৮ ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ

যোহর পড়ে এসে দুপুরের খাবার খেতে হোটেলে ফিরলাম। খাবার কেমন হবে এ নিয়ে আগে ভাবিনি কিন্তু খাবার দেখে স্বস্তি পেলাম। নির্ভেজাল বাংগালী খাবার। একটু বিশ্রাম নিয়েই আবার আছরের উদ্দেশ্যে বাইতুল্লাহ’র দিকে যাত্রা। তখনো হজ্জ যাত্রী আসেনি বেশি। শুরুর দিকটায় গেলে আল্লাহর ইচ্ছায় হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করতে বেশি বেগ পেতে হয় না। রাস্তায় দেশি বিদেশী মানুষগুলোকে দেখি। একই উদ্দেশ্যে ছুটছে তারা। সৌদি আরবে ভিক্ষাবৃত্তি হারাম কিন্তু আফ্রিকান আর নাইজেরিয়ান নিগ্রো মহিলারা বাচ্চা নিয়ে লাইন ধরে সেই নিষিদ্ধ কাজটা করছে।

আমি দু:খিত যেটা বলব সেটার জন্য, আল্লাহ বেশিরভাগ মানুষের চেহারার সাথে তার কাজের মিল রেখেছেন! দেখবেন যারা ধর্ষণের দায়ে, ডাকাতি ছিনতাই, অবৈধ কিছুর জন্য ধরা পড়ে তাদের চেহারা বেশিরভাগই খুব বাজে টাইপের হয়ে থাকে! আর এটা আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ! সেখানে গিয়েও চোখে পড়লো নিষিদ্ধ এই ধরণের কাজগুলো নিগ্রোরাই করছে।

যাইহোক আসল কথায় ফিরি। তখন বাইতুল্লাহতে ঢোকা মানে হলো মাতাফে ঘুরঘুর করা। ক্যামন ছোট বাচ্চার মতো মনে হতো নিজেকে, মনে হতো আল্লাহ্ আমার কোন চাওয়া এবার ফেরাতেই পারবেন না। আর কান্না আসতো খুব। সেখানে গিয়ে এটুকু বুঝেছি, উপলব্ধি করেছি, মন থেকে অনুভব করেছি যে মানুষের চোখের পানির মূল্য ওই একজন স্বত্ত্বার কাছেই অনেক দামি! মানুষের কাছে একবার কোন সমস্যা নিয়ে কান্নাকাটি করে দেখুন হয়তো সহমর্মিতা দেখাবে। দুবার করুন, কিন্তু তিনবারের বেলায় বিরক্তি দেখতে পাবেন। এটাই চরম সত্য! যত কাছের মানুষই হোক কিছু একটা বারবার চাইবেন দিতে না চাইলে তার মুখের দিকে তাকানোর এনার্জি হারিয়ে ফেলবেন। কিন্তু ……. একমাত্র তিনিই আপনার চাওয়া গুলো সরাসরি না দিলে জমিয়ে রাখবেন! ‘”হাসবুনাল্লাহি নি ‘মাল ওয়াকিল, নি ‘মাল মাওলা ওয়া নি ‘মান নাসির! ‘”

আছরের নামাজ পড়তে নিয়ে টের পাচ্ছিলাম আমার পায়ের ব্যাথা বাড়ছে ধীরে ধীরে। সায়ী করবার সময়টাতে সেইযে ঠান্ডা জমলো সকাল এগারোটায়, এই আছরের টাইমে ব্যাথায় রুপান্তরিত হতে শুরু করলো। উল্লেখ্য আমাদের হোটেল থেকে স্বাভাবিক গতিতে হাঁটলে বাইতুল্লাহ অবধি যেতে দশ থেকে বারো মিনিট লেগে যেতো।

বাইতুল্লাহ’র পথে 
চারপাশে একটু হাটাহাটি করে মাগরিব আর এশা পড়লাম। নামাজের সময় তেলাওয়াতে মন ভরে যেতো, আর ওভাবে জামায়াতে নামাজ পড়া সেটাই প্রথম বৈকি। রুমে ফেরার জন্য যখন হাঁটছিলাম অদ্ভুত আশ্চর্যজনক একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম। সেটা হলো – বাইতুল্লাহ চত্ত্বরে অবশ্যই মসজিদের বাইরে অনেক পরিবার নিজেদের মতো বসে খাবার খাচ্ছে, গল্প করছে, তাসবীহ হাতে কখনো চুপ থাকছে, আবার ছুটন্ত ছেলেমেয়েদের দিকে নজর ও রাখছে! দেখে মনে হলো তারা আজ আর বাড়ি ফিরবেন না। যেন নিজের বাড়িতেই বসে আছেন! আবার হাজীদেরকে নিজেদের খাবার গুলো শেয়ার করছেন, কি চমৎকার সেই ছবি!
আর অবশ্যই লক্ষণীয় হলো পরিচ্ছন্ন কর্মীদের একনিষ্ঠ দায়িত্ব পালন একটু পর পর পুরো পাশ পরিষ্কার করছে! সুগন্ধে মনটা যেন পবিত্র হয়ে যাচ্ছে! রাতে রুমে ফিরলাম।পায়ের ব্যাথা এতোক্ষণে আরো বেড়েছে। রাতের খাবার খাওয়া হলো। গোশত আর তিতা করল্লার ভাজি। করল্লা শুধুই খেয়ে ফেললাম। ব্যাথা কমে যায় যেন এই চিন্তাতে।রুমমেইটের সাথে খানিকক্ষন ব্যক্তিগত পরিচিতি, ছেলেমেয়েদের কথা শুনলাম, নিজেও বললাম। এভাবেই চলছিলো প্রতিদিনকার সময়। নিয়ম করে আম্মুকে ফোন দিয়ে আমার দুইটা দুনিয়ার সাথে কথা বলতাম। সকালে ছয়টায় বাংলাদেশে তখন নয়টা। আবার বিকালে সেরকম পাচটা বা ছয়টা বাংলাদেশে তখন আটটা বা নয়টা বাজতো।
ভিডিও কল দিয়েছিলাম চার পাচদিন পর, কিন্তু সেদিন মেয়েকে দেখে আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি। মামাশশুর বিকেলবেলা আছর পড়ে এসে নাস্তা করতে নিয়ে গিয়েছিলেন আমাদেরকে, তিনি মদিনায় থাকেন। আমাদের জন্যই মক্কায় এসেছেন, যদিও দু’দিন পরই মদীনায় যাওয়ার প্লান করেছিলো আমাদের হজ্জ কাফেলা। তিনি অত্যন্ত অতিথী পরায়ন একজন মানুষ। থাক পরের বারে তার আতিথেয়তার বর্ণনা করা যাবে।
খাবার খেতে শুরু করেছি, ভিডিও কলে মেয়েটাকে দেখার সাথে সাথে অটোমেটিক আমি কাদতে শুরু করে দিয়েছি। মেয়েটা হতবাক হয়ে চুপ করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কিছুপরে নিজেই কেটে দিয়েছিলাম, ওর মন খারাপ করিয়ে দেওয়ার মতো বোকামি করে ফেলেছি, অনুভব করলাম। কিন্তু সেই যে কান্না শুরু হলো আমার এক হোটেল মানুষের সামনে নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। মামা থমকে আছেন, পাশের জন কি বলবেন বা কি করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না! আমি নিজে সামলে উঠতে চেষ্টা করছিলাম আর তাতে সফল হলাম। মামা বললেন আমি বাড়িতে ঠিক এ কারণেই ভিডিও কল দেই না বিশেষ করে মেয়ের কাছে তো অবশ্যই না। মামা আমাকে খেতে বলছেন,আমার ইচ্ছে করছে না।সৌজন্যতা রাখতে খেলাম একটু। এরপর মাগরিবের পরে মামা চলে গেলেন। আমরা একটু হাটাহাটি করলাম।বাংলাদেশীদের বসবাসের সংখ্যা যেখানে বেশি সেই এলাকাটা একটুখানি ঘুরলাম।এলাকাটার নাম “মিস ফালাহ”। এশার আজান শুনতে পেলাম তারপর। আর কি সুখকর একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, আজান শোনা মাত্র চারপাশের সব দোকান, শপিংমলের ভেতরের দোকানগুলোতে বেচা কেনা বন্ধ হয়ে গেলো। কেউ কেউ দোকানই বন্ধ করে দিলো। আর ইকামাত শোনা মাত্র যে যেখানে পারে নামাজে দাঁড়িয়ে যায়।আমি অভিভূত হয়ে গেলাম!
নামাজের পর দেশীয় অনেকের সাথে কথা হলো। উল্লেখ্য আমরা আমাদের গ্রুপের সাথে যাতায়াত করছি না, বরং তখন নিজেদের মতো ঘুরছি, মূলতো সবাই তখন এটুকু চিনে গেছে, গ্রুপের অন্যরাও নিজেদের মতোই যাতায়াত করছে। বাইতুল্লাহ’র ভিতরে নামাজ শেষে যার আগে শেষ হতো ফাতাহ গেইটে এসে সিড়িতে বসে অপরজনের জন্য অপেক্ষা করতাম। আগেরদিন নাকী মামা সেখানে বসে তার ভাগিনাকে বলেছিলেন, বৌমা কি সত্যিই এই জায়গাটা চিনে নিতে পারবে? তার ভাগিনা অভয় দিয়েছিলেন, আমিও একটুপরে সেখানে উপস্থিত হয়েছি।আমি একটা জিনিস খুব শিখেছি আলহামদুলিল্লাহ। সেটা হলো চিনে নেওয়া, ন্থান, মানুষ, চেহারা দেখে মানুষের মনের অবস্থান! আলহামদুলিল্লাহ!
গ্রুপের খালাম্মা, আপা ভাবীরা আমাকে বলেছিলেন মেয়েদের তো মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ার দরকার নেই।আর এখন এতো ছুটাছুটি করো না, হজ্জের সময় অসুস্থ হয়ে যাবা। আমি মনোযোগী হয়ে শুনেছিলাম, মন সায় দেয়নি। এসেছিই তো ঐ ঘরটার জন্য! আমি তবুও গেছি।বরং হোটেলে নামাজ পড়তে একটুও ভালো লাগতো না। মোটে হয়তো পাচ ছয় ওয়াক্ত হোটেলে পড়েছিলাম।হোটেলে বেশি সময় থাকার পক্ষেই আমি ছিলাম না, কারণ গীবতটা একটু আধটু হয়েই যেতো, অজান্তেই আমিই হয়তো কিছ বলে ফেলেছি এই ভয়েই! যেটুকু থাকতাম, বই পড়া বা ঘুমানোর চেষ্টা করতাম।
চলবে…

পোস্টটি ২৪ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

Leave a Reply

Be the First to Comment!

Notify of
wpDiscuz