শত কোটি গল্পের ভীড়ে
লিখেছেন নাসরিন সিমা, অক্টোবর ১৪, ২০১৪ ৩:১৬ অপরাহ্ণ

২২
আজ শুক্রবার, পার্টির সেইদিন। এখানে জমা হবে দেশের সব শীর্ষ সন্ত্রাসীরা, আরও জমা হবে নগ্ন নারীদের বিশ্রি বিশ্রি উন্মাদনা! সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে, ঈশান, নিতাই, অদৈত এরা মেহমানদেরকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। আব্দুস সামাদ দ্রুতবেগে ঈশাণের সামনে আসে গদগদ কন্ঠে,
-অফ! আমার কিযে আনন্দ হচ্ছে, এরকম একটা পার্টিতে থাকতে পারছি……
কথাটা শেষ করেই ও ওর মতো চলে গেলো। ঈশাণের ঠোঁট জুড়ে ফুটে উঠলো করুণ এক চিলতে হাসি, সাথে দীর্ঘশ্বাস! অদৈত পাতালের সেই হলরুমটির সিড়িবেয়ে নামছিলো ঈশাণ আর নিতাইকে ও ঢুকতে বললো। নিতাই অবাক কন্ঠে,
-ফ্লোরের নিচে এতোবড় হলরুম, দেখিনিতো ঈশান!
-জানতেনা? ছিলোই তো! চলো আমরাও নামি। ঈশাণ সামনে, নিতাই পিছু পিছু নিতাই বিস্ময়ের আতিশয্যে সিড়ির মুখ বন্ধ করতে ভূলে গেলো, ঈশাণ খেয়াল করলেও সে ব্যাপারে কিছুই বললোনা, সামনের সারী থেকে অদৈত ওদেরকে হাত ইশারায় ডাকলো। ওরা সামনে গেলে লিজা বললো,
-ঈশাণ তুমি আমার পাশে বসো।
ঈশাণ মুহূর্তের জন্য নিজের করনীয় ভূলে গেলো, কিন্তু একটু পরেই,
-এই নিতাই তুমি ওটাতে বসো আমি দেখে আসি আব্দুস সামাদ কোথায়? নিতাই বসে পড়ে লিজার পাশটায়, আর লিজা রেগে গেলো অত্যধিক! আব্দুস সামাদকে দেখে নিতাইয়ের পাশে বসলো ঈশাণ। সবাই যখন নোংরামী দেখায় মত্ত হয়ে গেলো, ঈশাণ তখন ফোনে  সি আই ডি অফিসার আজাহার চৌধুরীকে আসতে বললো।  অনেক মানুষের মধ্যে এসে সমস্ত অস্ত্র, ড্রাগ নিয়ে, চলে গেলেন যে গুলো পার্টি শেষে সকাল দশটায় প্রদর্শনী করানোর কথা ছিলো। সাথে ক্লোরোফরম মিশিয়ে প্রিন্স জোসেফ ও লারা জোসেফকেও। গাড়ীতে ওঠে আজাহার চৌধুরী ঈশাণকে এস এম এসে ধন্যবাদ জানালেন।

প্রায় সারারাত ধরে চললো পার্টি। সবাই মদ খেয়ে মাতাল হয়ে বিভিন্ন ষ্টাইলের নোংরামী শেষে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। ঈশাণ ফজরের নামাজ পড়ে নিজের রুমে ঢুকেছে কেবলই, দরজা বন্ধ করতে যাবে অমনি মুখোমুখি দাড়ালো নিতাই বিস্মিত কন্ঠে,
-তুমি মুসলমান?!
ঈশাণ কিছই লুকানোর চেষ্টা করেনা, স্বাভাবিক কন্ঠে,
-নিতাই ভেতরে এসো, তুমি ড্রিঙ্ক করোনি?আসলে একদিন না একদিন কেউ না কেউ জানতোই! বলে রুমের দরজাটা বন্ধ করে দিলো। নিতাই বিস্ময়ের ঘোর কাটাতে পারেনা,
-না ড্রিঙ্ক করিনি, আমি তোমার দিকে তাকিয়ে অবাক হচ্ছিলাম এতো সুন্দরী আর সেক্সী নারীদের মাতাল করা ড্যান্স, তুমি একবারও তাকালেনা সেদিকে! কিসের মোহে এতোটা ভালো থাকা যায় ঈশাণ? তুমি কী এমন কোন নারীর ভালোবাসা পেয়েছো যাতে তুমি মগ্ন……………
ঈশাণ থামিয়ে দেয়,
-নিতাই আমি তোমার অবস্থা বুঝতে পারছি, আমি জানি আজকের পর থেকে আমি আমার মিশনের কাজগুলো এখান থেকে করতে পারবোনা, হ্যা আমি মুসলমান, আমি এই দেশকে, দেশের মানুষগুলোকে অদৈতর ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রগুলো থেকে রক্ষা করে চাই, অদৈত মুসলিম বিদ্বেষী, আমি একজন মুসলিম হয়ে তা মানতে পারিনা। শুধু কী তাই? স্বার্থের জন্য নিবেদিতার মতো ছো্ট্ট একটা মেয়েকেও সে রেহায় দিতে চায়নি। আমি চলে যাবো নিতাই, আর ঐ যে কিভাবে ভালো থাকা যায় প্রশ্ন করলে, এটার উত্তর এক কথায় হয়না নিতাই, এটা বোঝার জন্য অনেক সময় লাগে।…………
নিতাই ঈশাণের দুহাত চেপে ধরে,
-তুমি কোথাও যাচ্ছোনা! আজ থেকে আমিও তোমার সাথে আছি ঈশাণ!
ঈশাণ মনে মনে আল্লাহকে ধন্যবাদ দেয়, আর স্পষ্ট স্বরে বলে,
-আজ অদৈত পুরা ফতুর হয়ে গেছে নিতাই, সমস্ত অস্ত্র গায়েব, সাথে প্রিন্স আর লারা!
-তাই! যদি আমাদেরকে সন্দেহ করে?
-না তা করবেনা, বরং ভাববে প্রিন্সরা ওসব নিয়ে পালিয়েছে। ঈশাণের ফোন বেজে ওঠে, রিসিভ করে নিচু গলায়,
-কেমন আছো আনিকা?
ওপারের খুব প্রিয় কন্ঠটি উদ্বিগ্ন,
-সব ঠিক আছেতো! আপনি কেমন আছেন?
-আলহামদুলিল্লাহ! এতো উদ্বিগ্ন কেন? সব ঠিক আছে। তোমাদের কী খবর?
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে,
-ঈমন ভাইয়া, মণিকা সবটা মেনে নিয়েছে, আজ থেকে আমরা ধানমন্ডিতেই থাকবো।  আচ্ছা রাখছি, গোছানো বাকী আছে, কেটে যায় ওপার থেকে। ঈশাণ মুচকী হেসে মোবাইল রেখে মনে মনে বললো, খুব শীঘ্রই আমি তোমাকে বিয়ে করবো আনিকা!

২৩
নিবেদিতা ক্লাসের পড়ায় খুব মনোযোগী। এখন সন্ধ্যা সাতটা বাজে। চায়না রানী শুধুই উসখুস করছে, ব্যাপারটা খেয়াল করে রাইমা বললো,
-চায়না কি হয়েছে তোর?
-দিদি আমার একটা পরামর্শ দরকার!
-কিসের?
-দ্যাখো একটা অপরাধের ক্ষমা পেতে কি ধর্মত্যাগ করতে হয়?
রাইমার হাতে মেলামাইনের গ্লাস ছিলো অজান্তে পড়ে যায়, চায়না গ্লাসের দিকে একবার তাকিয়ে,
-দিদি! তুমিও না! এতো অধৈর্য হলে চলবে? ভাবতে হবে বুঝলে? যুক্তিগুলো সঠিক কিনা?
রাইমার উত্তেজিত কন্ঠ,
-কী ভাববি তুই? ধর্মান্তরিত হওয়া যায় কিনা?
-না দিদি তা না, সে যুক্তি দেখিয়েছে, যে ওদের ধর্মগ্রন্থটায় শুধুমাত্র সঠিক, আর অন্যগুলো বিকৃত, আর কুরআনই নাকী ভগবানের সর্বশেষ নির্দেশিকা। আমাদের বেদ, গীতা, রিগবেদ, শ্যামবেদ এমনকী খ্রিষ্টানদের বাইবেলও নাকী বিকৃত হয়ে গেছে। চায়না একবার নিবেদিতার দিকে তাকায়, তারপর নিচু স্বরে,
-আমাদের পক্ষের যে যুক্তিগুলো আছে সেগুলো মুখে শোনা, আমরা বেদ গীতা ছুঁয়েও দেখিনি, এসোনা দিদি আমরা ষ্টাডি শুরু করি!
রাইমা নরম হয় এটা ঠিক বলেছিস, আয় বাংলায় যেগুলো আছে সেগুলো পড়ি, আমার দাদাশশুরের পুরনো আলমারীর সব বই আমার ট্রাঙ্কে রাখা আছে, উনি তোর জামাইবাবুকে দিয়েছিলেন।

দুদিন পর ঈশাণ আসে নিবেদিতাদের বাড়ীতে, নিবেদিতা রাইমা চায়না সবাই খুবই খুশি হয়, রাইমা প্রসন্ন কন্ঠে,
-ঈশাণ আজ তোমায় ছাড়ছিনা দুপুরে খেয়ে তবেই যাবে ।
-যথাজ্ঞা দিদি, কিন্তু আরেক দিদি কি নিয়ে চিন্তিত?
চায়না গম্ভীর কন্ঠে,
-জানো ঈশান আফসার উদ্দীনের মেয়ে আছে না আনিকা ও আমাকে মুসলমান হতে বলেছে, নানা যু্ক্তি দেখিয়েছে, সেই যুক্তির খন্ডন করার জন্য ষ্টাডি করে গিয়ে দেখি আমরাতো অনেক কিছুই মানিনা। ঈশাণের সুন্দর ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন মুখমন্ডলে প্রশান্তির রেখা ফুটে ওঠে, অজান্তেই মনের কোণে ভেসে ওঠে আনিকার মায়াবী মুখটি, মনে মনে ধন্যবাদ জানায় আনিকাকে আর ভাবে,
“জীবন সঙ্গিনী হিসেবে আমি সঠিক মানুষটিকেই আপন করতে যাচ্ছি! ঈশাণ বাস্তবে ফিরে  এসে,
-কী ব্যাপারে দিদি? আমায় বলো, অদৈতর ঘাটিতে থাকতে থাকতে গীতা আর বেদটা ভালোভাবেই পড়েছি, দেখি আমার প্রশ্নের সাথে তোমার প্রশ্ন মিলে যায় কিনা? তবে আমি উত্তরটাও জেনে গেছি।
-ওমা তাই নাকী!  আচ্ছা বলছি শোন, একটা জায়গায় আছে
“কল্কি অবতার নামে একজন অবতার নারাশাংসা নামের একজন মানুষের কাছে ভগবানের বাণী নিয়ে এসেছিলেন ; এরপর নারাশাংসা সে বাণী অনুযায়ী নিজে চলেন এবং অন্যকেও চলতে আহবান করেন ; ভগবান  নারাশাংসাকেই সর্বশেষ বাণী পাঠিয়েছেন ; এরপরে আর কোন বাণী কারো কাছে পাঠাবেননা। (সংগৃহিত)”
এখন আমরা এই নারাশাংসাকেতো মানছিনা, আর কল্কি অবতারই বা কে? আর ভগবান কি বাণী পাঠালেন যার ব্যাপারে আমরা হিন্দুরা জানিইনা, এমনকী ইন্ডিয়ান খাঁটি হিন্দুদের মুখেতো কখনো নারাশাংসার নাম শুনলামনা!
ঈশাণের মুখমন্ডল গম্ভীর হয়ে যায়, স্থীর কন্ঠ ওর,
-কল্কি অবতার হলেন জিবরাইল (আঃ), যিনি ভগবানের কাছ থেকে বাণী এনেছিলেন, আর সেই বাণী হলো মুসলমানদের কুরআন! যেটা শেষ ধর্মগ্রন্থ! আর নারাশাংসা হলেন মুলমানদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)। যিনি শেষ নবী তার পরে আর কোন নবী আসবেনা। দিদি ঠিকই বলেছো আমাদের তাকেই মানা উচিত!
থ মেরে যায় চায়না রাইমা! অনেকটা সময় নেয় স্বাভাবিক হতে। পরে ঈশাণ চলে গেলে মলিন কন্ঠে চায়না বললো,
-থাক আর ষ্টাডি করবোনা, ঈশাণের জানাতো ভূলও হতে পারে তাইনা দিদি?
রাইমা মলিন কন্ঠে জবাব দেয়,
-হুম! (চলবে)

পোস্টটি ৫৭৮ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
৪ টি মন্তব্য
৪ টি মন্তব্য করা হয়েছে

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.