শত কোটি গল্পের ভীড়ে
লিখেছেন নাসরিন সিমা, সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৪ ৯:০৮ পূর্বাহ্ণ


মণিকা গেট খোলা পেয়ে বিস্মিত হয়ে ভেতরে ঢোকে,
-আনিকা কোথায় তুমি? এভাবে দরোজা খোলা রেখেছো কেন?
দরোজা লাগিয়ে আনিকার সাড়া না পেয়ে আনিকার রুমে ঢুকেই ওকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখলো। থমকে দাঁড়িয়ে গেলো আহত কন্ঠে,
-কী হয়েছে, পড়ে আছো কেন? আনিকার কোন সাড়া না পেয়ে আতঙ্কিত পায়ে ওর পাশে এগিয়ে যায়, অনেক কষ্টে খাটে উঠিয়ে চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়, কিন্তু তারপরও কোন সাড়া নেই। দ্রুত ডাক্তারকে ফোন করলো। হঠাৎ আনিকার বেড সাইডের ড্রয়ারে ওর দৃষ্টি আটকে যায়, ওখানে চাবি ঝুলানো। ড্রয়ার খুলে ভেতরের সব এলোমেলো, শংকিত কন্ঠে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো,
-কে এসেছিলো?
মণিকা ড্রেস চেঞ্জ করার কথা ভুলে গেছে, আনিকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, ছলোছলো দৃষ্টি নিয়ে। আনিকার মায়াবী মুখখানা দেখছে আর ভাবছে, তোমার অন্ধত্বের সুযোগ নিয়ে যে এমন কাজ করেছে তার শাস্তি হওয়া জরুরী……………… দরোজায় কেউ নক করায় মণিকার ভাবনায় ছেদ পড়লো, দ্রুত দরোজা খুলে ডাঃ নওশাদ নাফিজকে দেখতে পেয়ে এক সাইডে দাড়িয়ে ভেতরে ডোকার ইশারা করে,
-প্লিজ ডক্টর! নাফিজ ঢুকেই আনিকার রুমের দিকে দ্রুত এগিয়ে গেলো, মণিকা গেট লাগিয়ে পিছু পিছু,
-হঠাৎ কি যে হয়েছে বাসায় এসে দেখি এই অবস্থা! নাফিজ ঘরে ঢুকেই নাক সিটকাতে থাকে,
-এ কি ক্লোরোফরমের গন্ধ আসছে কেন? কেউ কী এসেছিলো? মণিকার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়,
-কী বলছেন ক্লোরোফরম! নাফিজ আনিকার পার্লস চেক করে,
-তুমি বুঝলেনা, তুমিও তো ডাক্তার হতে যাচ্ছ।
-আমি ভাবতেই পারিনি, এমন কিছু হতে পারে! কে এমন করতে পারে?
নাফিজ এ প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে সরাসরি আনিকার যথাযথ চিকিৎসায় ব্যাস্ত হয়ে পড়লো। মণিকা চাচাকে সবটা খুলে বলে দ্রুত বাসায় আসতে বললো।

রাত দশটায় আনিার জ্ঞান ফিরলো। পাশে মণিকা ও আকরাম উদ্দিন উদ্বিগ্ন চেহারা নিয়ে বসে আছে। আনিকা উঠে বসতে চাইলে মণিকা বাধা দেয়, তোমার হাতে স্যালাইন ফুড়ানো। আকরাম উদ্দিন আনিকার মাথার কাছে এগিয়ে গিয়ে মাথায় হাত রাখলেন,
-কী ঘটেছিলো মা বলোতো আমায়?
আনিকা ফোনে কথা বলা থেকে শুরু করে সেন্সলেস হওয়ার আগ পর্যন্ত পুরো ঘটনা খুলে বললো। আকরাম উদ্দিন বিমর্ষ কন্ঠে,
-আমি তোমার নামের ঐ দলীলটা খুঁজে পাচ্ছিনা আনিকা! সম্ভবত যে এসেছিলো সে ওটা নিতেই এসেছিলো। সাভারে তিনটা দোকানের পজিশনের দলীল ওটা, তোমার মা তোমার নামে কিনেছিলেন। কথা এ পর্যন্তই বলে শেষ করেন আকরাম উদ্দিন কিছুক্ষণ নিরবতা শুধুই স্যালাইনের পানি পড়ার টুপটুপ শব্দ, স্যালাইন শেষ হলে উঠে দাঁড়ান আকরাম উদ্দিন,
-মণিকা স্যালাইন খুলে আনিকাকে নিয়ে এসো টেবিলে খাবে, আমি টেবিল রেডি করছি।
মণিকা সূচ খুলতে খুলতে,
-জ্বি চাচা।
ফ্রেশ হয়ে দুবোন টেবিলে এসে বসে, আকরাম উদ্দিনই খাবার সার্ভ করলেন, মণিকা মলিন কন্ঠে,
-চাচা তুমি বসো আমি নিয়ে নিচ্ছি। আনিকা বেশী কিছু খেতে পারলোনা, বরং খাবার শেষ না করেই,
-চাচা আমি উঠতে চাচ্ছি, মাথাটা কেমন জানি ঘুরছে, আমি রুমে যাই?
-হ্যা সাবধানে যাও, আকরাম উদ্দিন বললেন, মণিকা ওর পথপানে তাকিয়ে রইলো কিছুটা সময়, আনিকা রুমে চলে গেলে মণিকা নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে,
-চাচা আমার মনে হয় এখন ওর চোখের অপারেশনা করানো দরকার! না জানি কে কোন কারণে ওর সাথে শত্রুতা শুরু করলো!
আকরাম উদ্দিন প্লেটে ডাল উঠিয়ে নিলেন,
-আমারও ঠিক তাই মনে হচ্ছে, কিন্তু কী বলোতো অপারেশনের খরচটা কোথা থেকে জোগাড় হবে সেটাইতো ভেবে পাচ্ছিনা। আর দলীলটাও খুঁজে বের করা দরকার, যার কাছে থেকে পিশন গুলো কেনা হয়েছিলো যদি দলীল তাঁর হাতে যায় তবে তো আমি অন্য আশংকা করছি, আনিকার স্বাক্ষর নেয়ার জন্য আবার ওর উপরে আক্রমণ হতে পারে। মণিকা মনোযোগ দিয়ে চাচার কথা শোনে, ওর উদ্বিগ্নতা বেড়ে যায়, অস্থির কন্ঠে,
-এলাকায় আমাদের দুবোনের নামে যে জমিগুলো আছে ওগুলো বিক্রি করে হলেও অপারেশনটা করাতে হবে। আকরাম উদ্দিন নিরুপায় দৃষ্টিতে মণিকার দিকে তাকিয়ে,
– ভেবে দেখছি, তুমি আজ আনিকার পাশে ঘুমাও। আমি উঠছি।


এয়ারপোর্টে এসে নামলো ইমরান ঈমন। রিসিপশন পয়েন্টে ডাঃ নওশাদ নাফিজ ও আমিনা আফরোজ। ইমরান এসেই নাফিজকে জড়িয়ে ধরলো, আর আমিনা কে লক্ষ্য করে,
-আমিনা আগের মতো বোরিং মেয়েটা আছো নাকী বদলে গেছো?
আমিনা হাসলো,
-এসেই ঝগড়া? নাফিজ মুচকী হেসে,
-ভাইয়া থাক আমার সামনে ঝগড়া করোনা, বিয়েটা হয়ে যাক দুদিন ওয়েট করো তারপরে যতো ইচ্ছে হয়, এখন চলো গাড়ীতে ওঠো।
আমিনা ঈমন আর নাফিজের মামাতো বোন, ঈমন আর আমিনার বিয়ে আগামী সপ্তাহে, ঈমণ আমেরিকা থেকে ডাক্তার হয়ে ফিরলো। ঈমণের বাবা মা ও নাফিজ ঢাকায় থাকে ধানমনডির সংকর রোডে। নাফিজও ডাক্তার ঈমণের ছোট ভাই সে। বাসায় অনেক আত্মীয় স্বজন, আর বাহারী সংবর্ধনায় পুলকিত হয় ঈমন, বাবাকে দেখেই জড়িয়ে ধরে,
-বাবা কেমন আছো? ওর বাবা গভীর আবেগে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন,
-আছি বাবা ভালো, মায়ের সাথেও অনেক কথা বলে ঈমন এরপর সব আ্মীয় স্বজন াওয়া দাওয়া শেষে রাত্রিবেলা এক এক করে বিদায় নেয়, আমিনাও ওর বাবা মার সাথে চলে যায় ।

ফজরের পরপরই ঈমণের বাবা ব্যায়াম করছিলেন রাস্তায়, ঈমণও এসে বাবার সাথে যোগ দেয়, হাস্সোজ্জল কন্ঠে,
-তাইতো বলি আমার বাবা এখনও এত্তো ফিট কেন, যা বডি বানিয়েছোনা? সে ব্যাপারে ওর বাবা ওকে কিছু না বলে,
-ঈমণ তুমি আমেরিকায় যাবার আগে আমি তোমাকে কিু একটা বলেছিলাম তোমার মনে পড়ে?
-হ্যা বাবা ডাক্তার হয়ে ফিরে এসে আমি প্রথমবার কোন বড় রোগের চিকিৎসা করাবো বিনা পারিশ্রমিকে।
হুম মনে রেখেছ, খুব ভালো, আমি নাফিজের কাছে শুনেছি আশুলিয়ায় তাএকটা মেয়ে আছে, অন্ধ। তার অপারেশন তুমি করবে, মেয়েটির বাবা মা কেউ নেই আছে এক বোন আর চাচা। জন্মান্ধ নয়, সিড়ি থেকে পড়ে গিয়ে………… ঈমন বাবার মুখের দিকে তাকায়,
-বাবা তুমি চেনো তাদেরকে? ঈমনের বাবা কথার মোড় ঘুরিয়ে ফেললেন,
-তুমি কবে অপারেশন করছো বলো?
-পরশুদিন করি? কিন্তু তারা কি বিনা পারিশ্রমিকে রাজি হবে করাতে? নাকী খুবই গরীব?
নিশ্চিন্ন্তে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন ঈমনের বাবা,
-তাহলে তাই করো, না ওরা এতোটা গরীব না, তবে নাফিজ যে কোন মূল্যে ওদেরকে রাজি করাবে। তাহলে তুমি প্রস্তুতি নাও, আমি তোমার আংকেলদের সাথে দেখা করে আসছি, তুমি কী যাবে?
-না বাবা তুমি যাও,আমি বরং বাসায় যাই। ঈমণ গেট দিয়ে ঢুকতে য়ে হোঁচট খায়, এতোটায় চোট পায় যে বুড়ো আংগুলের নখ পুরোটায় উঠে গেছে। নখ চেপে বসে পড়লো………
এতো অন্যমনস্ক হয়ে চলাতো ঠিকনা ভাইয়া, পেছন থেকে নাফিজ বললো। ঈমন নখ ছেড়ে পেছনে নাফিজের হাতে ব্যান্ডেজের সরঞ্জাম দেখে,
-নাফিজ! তুমি কি এসব নিয়ে ঘোরো নাকী হ্যা!
নাফিজ ঈমনের নখ তুলা দিয়ে পরিষ্কার করে,
-আমাদের পেছনের বাড়িওয়ালা আঙ্কেল বাথরুমে পড়ে গিয়ে বড় রকমের চোট পেয়েছেন তাই কথা বলতে বলতে ঈমনের নখ ্যান্ডেজ করে দেয় নাফিজ ঈমন হেসে……
-হুম মানতে হবে, সমাজ সেবায় একধাপ এগিয়ে তুমি বাড়ি গিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো। খুব ভালো কথা।
ঈমন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাসায় ঢুকলে ওর মা সাহারা খাতুন শংকিত হয়ে রান্নাঘর থেকে বের হন,
-একী ঈমন ব্যান্ডেজ কেন কী হয়েছে? নাফিজ হেসে,
-ভাইয়া এবার জবাব দিতে দিতে সারা হও। ঈমনও হাসে,
-কিছুনা মা এই বাইরে একটু হোঁচট খেয়েছিলাম। সাহারা খাতুন অনুযোগের সুরে,
-তুই এখনও বড় হলিনা, পড়ে যাওয়া হোঁচট খাওয়া সেই ছোট বেলা থেকে এখন অব্দি থেকেই গেছে…….. আরও বিড়বিড় করতে করতে আবারও রান্নাঘরের দিকে চলে যান তিনি। ঈমণ হেসে নাফিজকে লক্ষ্য করে,
-আমার রুমে এসো নাফিজ। রুমে ঢুকেই ঈমন আরাম কেদারায় হেলান দিয়ে বসে সবসময়ই সে আরামপ্রিয়। নাফিজ ওর মুখোমুখি চেয়ার টেনে বসে,
-সিরিয়াস কথা মনে হচ্ছে!
-হুম তুমিতো পারো মেয়েটির অপারেশন করতে, এবং তা আরো আগেই করে ফেলে পারতে!
নাফিজ মৃদু হেসে,
-না বাবা বিনা পারিশ্রমিকে করাবেন মেয়েটির অপারেশন, যখন বাবা জানলেন ওদেরকে এমনি এমনি বিনা পারিশ্রমিকে অপারেশন করালে ওরা কিছুতেই রাজিই হবেনা, তাই বাবা যেহেতু তোমার কাছে ওয়াদা নিয়েছিলেন, সেহেতু এই কৌশলটা ওদেরকে রাজি করানোর ক্ষেত্রে পারফেক্ট!
-ও আচ্ছা!
-তুমি কবে থেকে চেনো ওদেরকে?
-এই তিন চার বছর তো হবেই। আর আমি আমাদের সংকর রোডেই ইবনে সিনা হাসপাতালেই ওদেরকে আনার ব্যাবস্থা করবো, তুমি টেনশন ফ্রি থাকো ভাইয়া।

চলবে………………

আগের দুই পর্ব……

– See more at: http://womenexpress.net/nasrin-mahmud-sima/literature/%e0%a6%b6%e0%a6%a4-%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%be%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ad%e0%a7%80%e0%a7%9c%e0%a7%87/#sthash.T0gbTO7o.dpuf

পোস্টটি ৪৯৫ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
২ টি মন্তব্য
২ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. সুন্দর… চলতে থাকুক :)

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.