শত কোটি গল্পের ভীড়ে (৫,৬,৭)
লিখেছেন নাসরিন সিমা, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৪ ১:৫৬ অপরাহ্ণ


আজ আনিকার চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হবে। নাফিজ আনিকার কেবিনে একটা চেয়ারে বসে আছে। মণিকা জ্যামে আটকে গেছে, আর আনিকা প্রথমে মণিকাকে দেখতে চায় বলে নাফিজ অপেক্ষা করছে, আর তাছাড়া ঈমনও আসার কথা। আনিকা মলিন কন্ঠে,
-আপনার বাবা কেন আমাকেই তার ছেলের প্রথম অপারেশনের জন্য সিলেক্ট করলেন? আপনি সে ব্যাপারটা শুধুই এড়িয়ে যাচ্ছেন কেন? না বললে বিষয়টা আমাকে হীণমন্যতায় ফেলে দেবে এই অপারশেনে দেখতে পাওয়া, আনন্দের চেয়ে কষ্টটা বেড়ে যাবে………।
নাফিজ মলিন কন্ঠে,
-আমি কারণ বলবো কিন্তু তুমি প্লিজ কাউকে বলবেনা।
-ঠিক আছে, কথা দিলাম।
-আমার বাবার নাম আফসার উদ্দিন!
চমকে ওঠে আনিকা,
-কী! এটাতো আমার বাবার নাম!
-আর কিছু জানতে চেওনা, শুধু এইটুকুই জেনে রাখো আমরা একই বাবার সন্তান! আনিকা আর কিছু বলোনা, ভাইয়া আসছে………..
-এসো ভাইয়া! একটু পরে আনিকাও ঢুকলো, সাথে ওদের চাচা আকরাম উদ্দিন। এবার সেই কাংখিত সময় আনিকা দেখবে অনেকদিন পর চারেদিকে দেখবে! আর সবশেষে আনিকা মণিকার মুখটায় আগে দেখে নেয়। খুশি হয়ে মনে মনে অসংখ্যবার আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানায়। আকরাম উদ্দিন হাস্স্যোজ্জল কন্ঠে,
-কবে রিলিজ ডক্টর……
-ঈমন! আংকেল আমার নাম ঈমন, নাফিজ আমার ছোট ভাই। দু তিনদিন পরে নিয়ে যাবেন!
-ও আচ্ছা ঠিক আছে। আনিকা, আমি আবার অফিস যাচ্ছি মা তোমরা থাকো।
-ঠিক আছে চাচা।
ঈমন হাস্সোজ্জল কন্ঠে,
-তোমার বাবা মা আসবেননা আনিকা?
আনিকা কিছু বলার আগে মণিকা মলিন কন্ঠে,
-আমাদের মা নেই আর বাবা আমাদের বোঝা বহন করতে না পেরে অনেক আগেই পালিয়েছেন।
নাফিজ অজান্তেই আনিকার কথার উত্তর দিয়ে ফেলে,
-বাবার ব্যাপারে এভাবে বলোনা মণিকা।
ঈমন বললো,
-না নাফিজ যারা পালিয়ে যায় তারা প্রতারক, যদি কোন বিপদেও পড়ে থাকে তবুও সেটা এই প্রতারণার কারণেই হয়।
নাফিজ আর কিছু বলেনা সে ব্যাপারে এড়িয়ে যায়,
-ভাইয়া চলো আমরা যাই।
-হ্যা চলো। ঈমন আগে বের হয় পাশাপাশি নাফিজও।
ঈমন বললো,
-ওদের সাথে পরিচয় কিভাবে?
-আনিকা যখন অন্ধ হয় তখন থেকে সে অনেক বড় কাহিনী, পরে বলবো ভাইয়া, একটু পরে ওটিতে যেতে হবে চলো ডিনার সেরে ফেলি আর তার আগে আনিকাদের ডিনারটা দিয়ে যাই।
ঈমন বিস্মিত কন্ঠে,
-তুমি ওদেরকে ডিনার দেবে? নাফিজ ওদের ব্যাপারে এতো কেয়ার! তুমি কী কারো প্রতি দুর্বল?
-নাউযুবিল্লাহ! না ভাইয়া আমি ওদেরকে বোন মনে করি।

আফসার উদ্দিন স্ত্রী সাহারা খাতুনের পাশে শুয়ে আছেন। সাহারা খাতুন বললেন,
-দীর্ঘ আট বছর যে তুমি সিঙ্গাপুরে ছিলে সে ব্যাপারটা তুমি কেন বলোনা আমাকে? সবসময় এড়িয়ে গেছো।
-আমি তো বলেছি সাহারা ঐ সময়টাকে নিয়ে তুমি আমাকে কিছু বলো না আমি এখন সে ব্যাপারে বলবোনা, তবে বলবো সময় এলে ঠিকই বলবো।


গাজীপুরের এক নির্জন এলাকা। সেখানে একটি পুরনো চারতলা বিল্ডিংয়ে নতুন রং করা হয়েছে। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো বিল্ডিং থেকে একটু দুরে একটা চার্চ, যেটাকে দুজন লোক যত্ন সহ পরিষ্কার করছে, আর বিল্ডিংয়ের পাশেই একটা মন্দির। তার চারপাশে তুলসী গাছ। অনেকেরই কৌতুহল জাগে মন্দির আর গীর্জা পাশাপাশি হওয়ায় কিন্তু এই বাউন্ডারীতে কেউ ঢুকতে পারেনা চারতলা বিল্ডিং কিন্তু এখন মানুষ মাত্র দুজন আছে। অন্যরা যে যার কাজে গেছে, ফেরেনি। বিকালের পড়ন্ত সূর্যের রোদ পড়েছে তুলসী গাছে। চায়না রানী বর্মণ অদৈত বর্মণের বাহুডোরে আবদ্ধ। দোতলার বেলকণিতে দাড়িয়ে, চায়না রাণী বর্মন বললো আদুরে কন্ঠে,
-অদৈত সিঁদুর পরিয়ে সব প্রতিজ্ঞা সম্পন্ন করো, এভাবে শাখা সিঁদুর ছাড়া আমি যে তোমার আশ্রিতা হয়ে আছি। ওরা সবাই আমায় টিটকারী দেয়। আমিতো দলীলটা এনে দিয়েছি, আমার সমস্ত সম্পত্তি তোমায় দিয়ে দেব।
অদৈত নিশ্চুপ মূর্তির মতো চায়নাকে জড়িয়ে আছে, কথা বলছেনা।
চায়না মুখ তুলে তাকায় অদৈতর দিকে,
-কথা বলছনা যে!
অদৈত মুচকী হেসে চায়নাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে,
-চায়না এইযে দ্যাখো রোদটা তুলসী গাছে পড়েছে তাইনা, এখানে রোদের কী স্বার্থ আছে? ঐ রোদের মতো হতে চেষ্টা করো।
মৃদু স্বর চায়নার,
-আমাদের সম্পর্কের কোন ইঙ্গিত দিচ্ছ কী?
এ সময় অদৈত নিচের গেট দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে কাউকে ঢুকতে দেখে এক ঝটকায় চানাকে যেন ছুড়ে ফেলে দেয় দৌড়ে নেমে যায় নিচে।
এরকম পরিস্থিতিতে চায়না নিজেকে খুব অবেলিত ও অবাঞ্চিত মনে করে। রাগে দুঃখে দুচোখে জল এসে যায়। হালকা হয়ে নিয়ে রান্নাঘরে ঢোকে,  আনমনে দশ পিচ সামুচা বানায়, কারণ এক্ষুণি এই বিল্ডিংয়ের বাকী তিনতলার ছয়জন চলে আসবে। লুচি তরকারীও বানানো শেষ করে চায়ের পানি বসায়, শাড়ীর আঁচল দিয়ে গলার ঘাম মোছে চায়না, রান্নাঘর থেকে বের হতে গিয়ে অদৈতর মুখোমুখি পড়ে যায় অদৈত রান্নাঘরে ঢোকে, চায়না অভিমান প্রকাশ না করে শুকনো গলায়,
-কে ছিলো?
-হাফ ছাড়ে অদৈত,
-ওফ যা ভয় পেয়েছিলাম, ওটা ডেভিট ছিলো, কালতো ওদের বড়দিন।
-ও! আচ্ছা তোমরা বসো আমি নাস্তা নিয়ে আসছি। ওদেরকে নাস্তা দিয়ে নিজে এসে রান্নাঘরে চা নিয়ে বসলো চায়না, একটা ঘটনা খুব মনে পড়ে…………
” সে ছিলো বাবা নারায়ণ ভট্টাচার্যের কণিষ্ঠ কন্যা, বাবা বেশ ধনী ছিলেন। কিন্তু একপর্যায়ে এসে বোনের বিয়ের সময় সাভারের তিনটা দোকানের পজিশন বিক্রি করেছিলেন চায়নার বাবা, তাও আটাশ বছর আগে। মিসের রোকেয়া আফসার তার বড় মেয়ে আনিকার নামে পজিশন তিনটি কিনেছিলেন। কিন্তু তারপরও অদৈতর বাবা অরিন্দম বর্মন  নিজে ভোগদখল করার জন্য নারায়ণ ভট্টাচার্যকে চাপ দিচ্ছিলেন বারবার। নারায়ণ ভট্টাচার্য এই কাজকে নীতি বিরুদ্ধ মনে করে রোকেয়া আফসারকেই দলীল সহ দিয়ে দেন। এরপর থেকে অদৈতর সাথে চায়নার পরিচয়, অদৈতও ঐ পজিশনের জন্য এখনও মরিয়া। আর যে কারণে চায়নার সাথে গভীর সখ্যতা তৈরী করে। অদৈত বাবার মতো অত্যাচারী, মায়ের সাথেও খারাপ ব্যাবহার করতো। মাকে নিজে হাতে খুন করেছে সে। শুধুমাত্র এইসব অন্যায় কাজে বাধা দেয়ার কারণে। চায়না তবুও অদৈতকে অন্ধের মতো ভালোবাসে। ওর মতো চায়নাও অন্যায় কাজ করে। আনিকাকে ক্লোরোফরম মিশিয়ে………… অন্ধত্বের সুযোগ নিয়ে………………  চায়না নিজের নামের পাশে অদৈতর টাইটেলটাই বসায়, যদিও বিয়ে হয়নি। এখন সে চায়না ভট্টাচার্য না, সে চায়না বর্মণ। তবে আনিকার বাবা আফসার উদ্দিনের সাথে অদৈতর বাবা অরিন্দম বর্মণের একটা পুরনো শত্রুতা আছে, যেটা চায়না জানেনা, জানতেও চায়না। অন্য বিষয়ে আগ্রহ হবে কি করে, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েইতো সে অন্ধকারে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে চা মুখে নেয়। চাতো নয় শরবত হয়ে গেছে। চা ফেলে দিয়ে কাপটা ধুয়ে উপুড় করে রাখে চায়না।


ড্রয়িং রুমের দরজায় এসে দাঁড়ায় চায়না। অদৈত, ডেভিট, লিজা, লারা জোসেফ, প্রিন্স জোসেফ, নিতাই চক্রবর্তী, ঈশাণ চক্রবর্তী। এরা সবাই সোফায় গোল হয়ে বসা। অদৈত লিজার খুব পাশে বসে আছে, মাঝে মাঝে আড়চোখে লিজার দিকে তাকাচ্ছে অদৈত। চায়না অজানা আশংকায় কেঁদেই ফেললো তবে খুব নিরবে, ওদের আলোচনায় মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করলো ডেভিট বলছে,
-পজিশনের মালিককে কিডন্যাপ করলেই হয়ে যায় আর কী?
অদৈত উৎফুল্ল কন্ঠে,
-ডেভিট তুমি দেখি বুদ্ধিমান হয়ে যাচ্ছ, অবশ্য এটা লিজার পাশে থাকার কারণে। কি বলো লিজা?
একটু থেমে গম্ভীর কন্ঠে,
-হুম আমিও তাই ভেবেছি ডেভিট। তবে এই দায়িত্ব আমি ঈশাণকে দিতে চাই। কারণ ওর মতো সিনসিয়ার ছেলে ছাড়া এ কাজ যথাযথভাবে হবেনা। তবে ঈশান তুমি চাইলে সাথে কাউকে নিতে পারো। আমি দেখিয়ে দেবো আফসার উদ্দীন তোমার বংশ আমি ছাই করে দেবো, একে একে সব কেড়ে নেব।
ঈশাণ আগ্রহী কন্ঠে,
-ওদের সাথে তোমার এতো শত্রুতা কেন অদৈতদা?
-ঈশাণ তোমাদের জানা দরকার তাই বলছি, আনিকার বাবা আফসার উদ্দিন আর আমার বাবা অরিন্দম বর্মন খুব ভালো বন্ধু ছিলো। একদিন দু বন্ধুতে লাঞ্চ করছিলো। সেখানে অন্তঃস্বত্বা একজন মহিলা এসে বাবার পায়ে পড়ে যায়, বলে আমায় বিয়ে করো আমি তোমার সন্তানের মা হতে যাচ্ছি। বাবার একটু আধটু অন্য নারীর দিকে ঝোঁক ছিলো কিন্তু মা ছাড়া আর কাউকেতো তিনি ভালোবাসতেননা, তাই অন্য কাউকে বিয়ে করার প্রশ্নই আসেনা। বেশী তোড়জোড় করায় বাবা মহিলাটিকে খুন করে। আর……………
দাঁতে দাঁত চেপে রাগান্মিত কন্ঠে,
-আফসার উদ্দিন বাবার বিরুদ্ধে কেস লড়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড নিশ্চিত করে, কিন্তু বাবা জেল কুঠুরীতে হার্টফেল করে মারা যায়। আমি ছাড়বোনা, ঐ আফসারের চৌদ্দগোষ্ঠি বিলীন করে দেব। আফসারের পক্ষে কথা বলার কারণে, শুধুমাত্র পক্ষে কথা বলার কারণে আমি আমার মাকে খুন করেছি। অতএব তোমাদের সবাইকে বলছি খুব সাবধান আমাকে তোমাদের কাজ করে দেখাবে। ডেভিট উচ্চস্বরে,
-অদৈতদা আমরা আছি তোমার সাথে।
চায়না ভাবছে,
-আচ্ছা অদৈত আসলে আমার ব্যাপারে কি ভাবছে? আমাকে শুধুই সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করছেনাতো? আমার ব্যাপারে কোন উদ্যোগইতো ও নিচ্ছেনা। তাহলে? আতংকে পুরো শরীর শিউরে ওঠে চায়নার। এই মুহুর্তে কাঁধে অদৈতর হাতের ছোঁয়া পেলো চায়না, আজ চায়না সে ছোঁয়ায় ভালোবাসা খুঁজে পেলোনা বরং হিংস্র কোন পশুর থাবা মনে হলো। এক ঝটকায় হাতটা সরিয়ে দেয়।
অদৈত অবাক কন্ঠে,
-আরে আমিতো, ভয় পেলে নাকী?

Comments

comments

পোস্টটি ৪৭৪ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য