প্রত্যাবর্তিত স্নেহের পরশ
লিখেছেন নাসরিন সিমা, জুলাই ২২, ২০১৪ ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ


রিয়াদ তানিমের কথা ভাবে তানিমদের বসার ঘরে বসে থেকে, তানিম একদম নষ্ট হয়ে গেছে। তানিমকে ফেরানোর উপায়টা কী তবে? নাকী ঐ রিমন ছেলেটাকে বুঝাব? সে একটা ব্যাপারে আমার প্রতি দুর্বল তবে কী ওকে আগে………… চিন্তায় ছেদ পড়লো, তৌফিক এসে সালাম দিয়েছে,
-কী ভাবছো ভাইয়া?
-ওহ তৌফিক এসে গেছো কেমন হয়েছে পরীক্ষা?
-ভালো হয়েছে, মা কোথায়? আলেয়া বেগম ভেতরে ঢোকেন তৌফিকের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন,
-কাপড় পাল্টাও বাবা, তোমার খালাম্মা, মিনি ওরা কোথায়?
তৌফিক হেসে দেয়,
-ও মা তুমি জানো নাকী? আমিতো ভাবলাম তোমার জন্য খালাম্মার আসাটা সারপ্রাইজ হবে, তাই আমি একটু আগেই দ্রুত এসে পড়েছি……… খালাম্মা পেছনে আসছেন। রিয়াদ হাসিমুখে,
-তৌফিক যাও দ্রুত ফ্রেশ হও যোহর নামাজের সময় চলে যায়…
-হ্যা ভাইয়া তাই যাচ্ছি।
রিয়াদের মা ও ছোট বোনকে দেখে আলেয়া বেগম হাস্সোজ্জ্বল কন্ঠে,
-আপা কেমন আছো? রিয়াদের মা রাবেয়া বেগম বোনের দিকে তাকান,
-ভালো আছি, তুই ভালো আছিস তো!
-এইতা আল্লাহ যেমন রেখেছে, মিনি কোথায়? ওমা মিনি কতো বড় হয়েছো বোরখাও পরো দেখছি।
মিনি লজ্জা পায়, বললো,
-কেমন আছো খালাম্মা?
-এইতো মা, তোমরা হাতমুখ ধুয়ে নাও আমি খাবার রেডি করছি, আজ সবাই একসাথে খাবো।


অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে,২০০৫ সালের মে মাস। তৌফিকের রেজাল্টের দিন আজ। তানিম ধীরে ধীরে অধঃপতনে শেষ চুড়ায়, তৌফিক বড় ভাইয়ের কু কির্তীর সবটা জানে, কিন্তু মাকে বলার সাহস ওর হয়না, না জানি মা কোন অসুখ বেধে ফেলে। তৌফিক রেডি হচ্ছে রেজাল্ট নিতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ওর যাবার আগেই রিয়াদের আগমণ কতোগুলো মিষ্টির প্যাকেট সহ। হাস্সোজ্জ্বল কন্ঠে,
-তৌফিক তুমি জিপিএ ৫ পেয়েছো!
তৌফিক আনন্দে কেঁদেই ফেলে মাকে জড়িয়ে ধরে,
-মা!
আলেয়া বেগম জিপিএ টিপিএ বোঝেননা, শুধু এটুকু বুঝলেন তাঁর ছেলে অনেক ভালো রেজাল্ট করেছে, তিনিও কেঁদে ফেলেন। কিছু বলে পারেননা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। রিয়াদ এবার মলিন কন্ঠে, খাল্ম্মা এটা খুশির খবর, আপনি ভেঙ্গে না পড়লে একটা দুঃখজনক খবর দেয়ার আছে!
আলেয়া বেগম নির্লিপ্ত কন্ঠে,
-তানিমের ব্যাপারেতো! আসলে কী জানোতো রিয়াদ আমার তানিম নামে যে একজন ছেলে আছে সেটা আমি ভাবিইনা, দশদিন পনেরোদিন যে ছেলে উধাও থাকে, মা ছোট ভাইটাকে নিয়ে কিভাবে সংসার চালাচ্ছে সেই খোঁজ পর্যন্ত নেয়না…… আচ্ছা বলো কী হয়েছে?
-ওকে পুলিশ  অস্ত্রসহ ধরেছে, ফুলতলী চালের গুদাম থেকে। আলেয়া বেগম শকড হলেন, তৌফিক মাথা নিচু করে আছে, ও সবটা জানে। আলেয়া বেগম বললেন,
-ওর বন্ধু রিমনের কি খবর?
-সে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, আর বোনের বিয়ে দেয়া পর্যন্ত কিছুদিন সময় চেয়ে বলেছে তারপর আমি ধরা দেব। খালাম্মা আমি রিমনের বোনকে বিয়ে করতে চাই, বিষয়টি আমি আপনাকেই প্রথম বললাম, আপনি একটু মাকে বলবেন প্লিজ, মার সম্মতি থাকলে বাবাও সম্মতি দেবেন।
আলেয়া বেগম অবাক কন্ঠে,
-রিমনের বোনকে? কি বলছো রিয়াদ, ওরকম দাগী আসামীর বোনকে তুমি বিয়ে করবে?
-খালাম্মা ও ওর ভুল বুঝতে পেরেছে, তাছাড়া ওর বোনতো নির্দোষ! প্লিজ খালাম্মা!
-আচ্ছা ঠিক আছে বাবা, আমি জানি তুমি কোন ভূল সিদ্ধান্ত নিতে পারোনা।


সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, রিয়াদ রিমনের বোনকে বিয়ে করেছে দু মাস হলো। তৌফিক একটা কলেজে ভর্তি হয়েছে। তৌফিক কলেজ থেকে ফেরারা সময় ফুলতলী নিউ মার্কেটের সামনে একজনকে দেখলো,যে লোকটি তানিমের কেসের ব্যাপারটি জানে, তৌফিক তার সাথে কথা বলে জানতে পারলো,
-তানিম যামিন পেয়ে যাবে দু একদিনের মধ্যেই। খুশি হলো তৌফিক!
ও বাস থেকে নেমে গ্রামের পথে হাঁটছ, মেজাজটা বেশ ফুরফুরে, মনটাও হালকা, মাকে এই খবরটা দেবে বলে! যতোই হোক ভাইতো!
গ্রামে ঢুকতেই একটা মসজিদ, মসজিদে চারজন লোক কিছু একটা করে দেখে এগিয়ে যায়, লাশ রাখার খাটিয়া বের করা হচ্ছে! তৌফিকের ভেতরটা মোচড় দেয়, একজনকে বললো,
-কে মারা গেছে?
রিয়াদকেও দেখলো তৌফিক,
-ভাইয়া কে মারা গেছে?
রিয়াদ জড়িয়ে ধরে তৌফিককে,
-খালাম্মা আর নেই তৌফিক!
বিদ্যুতে শক খাওয়ার মতো চমকে রিয়াদের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় তৌফিক ওর দৃষ্টি ঝাপসা, অস্থির কন্ঠে,
-কী বলছো তুমি! মা কেন হতে যাবে মাকে তো আমি ভালো দেখে গেলাম!
রিয়াদ ওকে শান্ত করার চেষ্টা করে,
-খালাম্মা কোথায় কার কাছে যেন শুনেছে তানিমের ফাঁসি হয়ে যাবে তারপর বাড়ি ফিরে এসে স্ট্রোক……
তৌফিক রাস্তায় ধুলোর মধ্যে বসে পড়ে, অশ্রুগুলো সব বাঁধ ভেঙ্গে বেরিয়ে আসছে………
দাফন কমপ্লিট হলে রিয়াদের সাথে বাড়িতে ঢোকে তৌফিক! তানিমও চুপিচুপি মায়ের শেষ কৃত্যে অংশ নিয়ে এখন বাড়িতে ঢুকেছে। তৌফিকের দৃষ্টি গেলো মায়ের বানানো তিনটি নকশী কাঁথার উপরে, আগামীকাল হাটবার তৌফিক ওগুলো নিয়ে গিয়ে বিক্রি করবে, আর সেই বিক্রির টাকা থেকে কলেজের বেতন দেয়ার কথা………তৌফিক রিয়াদের বুকে মুখ গুঁজে ফুফিয়ে কাঁদে। এবার তানিম তৌফিককে কাছে টেনে নেয়, অশ্রু ভরা কন্ঠে,
-তৌফিক ভাই আমার! তুই চিন্তা করিসনা, আমি আজ থেকে সবসময় তোর পাশে থাকার চেষ্টা করবো! এই দ্যাখ সব আত্মীয় স্বজনের সামনে ওয়াদা করছি……
তৌফিক কিছু বলেনা, চুপচাপ বড় ভাইয়ের কথা শোনে! স্নেহের পরশ এবার ভাইয়ের হাতে, মায়ের স্নেহের মতো কী আর সে পরশ প্রাণবন্ত হতে পারে? কোনদিন? তৌফিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কান্না ওর থামেনা……………। (সমাপ্ত)

পোস্টটি ৩২৯ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
২ টি মন্তব্য
২ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. দ্বিতীয় পর্বের জন্য ধন্যবাদ!

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.