প্রত্যাবর্তিত স্নেহের পরশ
লিখেছেন নাসরিন সিমা, জুলাই ১৯, ২০১৪ ২:১৮ অপরাহ্ণ

 


প্রায় আধাঘন্টা ধরে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন মিসেস আলেয়া বেগম। তাকে খুব তাড়াতাড়ি থানা শহরে যেতে হবে। ছেলেটা এস এস সি পরীক্ষা দিতে যাবার সময় প্রবেশপত্র বাড়িতে ফেলে গেছে। অথচ এই বাস ষ্ট্যান্ডে এসে আবার এতো দেরি, সময়ও বেশি নেই। আলেয়া বেগম বড় ছেলেটাকে সাইকেল নিয়ে যেতে বলেছিলেন কিন্তু ওনার নাকী জরুরী মিটিং আছে, করো তোমার জরুরী মিটিং আর তোমার ভাইটা এই এক কার্ডের অভাবে জীবন নষ্ট করে ফেলুক…… আলেয়া বেগমের কোন কথাকেই গুরুত্ব দেয়নি  বড় ছেলে  তানিম। আলেয়া বেগম তাই নিজেই যাবার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন।  আর এখন সমস্যা বাসের, এতোক্ষণে একটা বাসও আসেনি, সময় খুবই কম, বাস  এখন আসলেও ২০ মিনিট লাগবে যেতে। তারপর পরীক্ষা কেন্দ্র খুঁজতেও সময় লাগবে, কোথায় খুঁজবেন তিনি। আলেয়া বেগম মাত্র দুইবার গেছেন ঐ থানা শহরে, তাও একা না তাঁর স্বামী যখন বেঁচে ছিলেন তখন দুজন একসাথে। প্রায় দশ বছর আগের কথা। আলেয়া বেগম ধীরে ধীরে অস্থির হয়ে পড়ছেন, কী করবেন ভেবে পাচ্ছেননা। একটা বাসের দেখা পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন,কিন্তু বাসে তিল ধারণের জায়গা নেই যেন, বাস কাছাকাছি এসে দাঁড়ালে হেলপারকে জিজ্ঞেস করলেন,
-এই বাস কি ফুলতলি যাবে?
হেলপার দুজনকে নামতে সাহায্য করে,
-হ্যা যাবে কিন্তু আপনি যেতে পারবেননা, এতো ভীড়ে উঠবেন কী করে?
-আমাকে উঠতেই হবে খুবই জরুরী বাবা একটু জায়গা করে দিননা।
হেল্পার রেগে গিয়ে বললো,
-কী সব মহিলা রে বাবা, এতো ভীড় তাও জায়গা করে দিতে বলে, বলি আমি আপনাকে আমার মাথায় জায়া করে দেব? বে আক্কেল মহিলা কোথাকার!
আলেয়া বেগম টেনশনে, লজ্জায় অপমানে কেঁদেই ফেললেন, এখন কী করবেন তিনি! তার মাথা ঘুরছে। হঠাৎই কারো ডাক শুনতে পেলেন,
-খালাম্মা!
চমকে ডাক লক্ষে তাকান আলেয়া বেগম, মটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়ানো তার বোনের ছেলে রিয়াদ! যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন, দ্রুত প্রবেশ পত্র রিয়াদের হাতে দিলেন, ও কার্ড হাতে নিয়ে মটর সাইকেল ঘুরিয়ে
-খালামমা আমি তৌফিককে এটা দিয়ে আবার আসব, পরে কথা হবে।
দ্রুত স্থান ত্যাগ করলো।


আলেয়া বেগম এবার বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলেন, আর মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলেন। প্রায় দশমিনিট হেঁটে বাড়ি পৌঁছলেন। মানসিক চাপে তিনি শারিরীক ভাবেও অত্যন্ত কাহিল হয়ে পড়েছেন। আলেয়া বেগম ঘেমে একাকার, বাড়িত ঢুকেই মাটির বারান্দায় বসে পড়লেন। দশ মিনিটের রাস্তা হাঁটা তার জন্য কোন ব্যাপার না কিন্তু আজ এইটুকু হেঁটে তাঁর মনে হচ্ছে তিনি দশ মাইল রাস্তা হেঁটেছেন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে কাপড় পাল্টান তিনি, তারপর রান্নাঘরে ঢোকেন, রিয়াদের জন্য নাস্তা বানাবেন বলে। এই ছেলেটাকে খুব ভালোবাসেন আলেয়া বেগম, মাঝে মাঝে ভাবেন, তানিম বড় ছেলে না হয়ে যদি রিয়াদ হতো……… তৌফিকও রিয়াদের মতো ভালো। তানিম নাকী কিসের ব্যবসা করে কিসর ব্যবা আল্লাহই ভালো জানেন। সবসময় বাউন্ডুলেদের মতো ঘোরে আর তাস খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলেন আলেয়া বেগম। কাজ কেন আর এসব ভাবেন আলেয়া বেগম। ভাবতে ভাবতে কখনো এমনও হয়েছে যে, ভাত পুড়িয়ে ফেলেছেন নয়তো আঙ্গুলে সুঁচ বিধে রক্ত পড়ছে টপটপ করে তার তৈরী করা কাঁথায়। প্রতিটি নকশী কাঁথা তিনি দশদিনে তৈরী করেন, আর প্রতিমাসে তিনটি করে কাঁথা তৈরী করেন, বাজারে বিক্রি করে তৌফিক। আলেয়া বেগম নাস্তা তৈরী করছেন আর এসব ভাবছেন, তানিম এসেছে টেরই পাননি তানিমের কথায় বাস্তবে ফিরলেন,
-মা! কী ভাবছো কী? তাকান আলেয়া বেগম, তানিম আর ওর এক বন্ধুকে দেখে,
-কী হয়েছে?
-প্রবেশ পত্র দিয়ে এসেছো?
বিরক্তভরে জবাব দিলেন আলেয়া বেগম,
-হ্যা।
তানিমের বন্ধুটি দাঁত কেলানো হাসি দিয়ে,
-এইসব পড়ালেখা করে কী লাভ? শুধুই সময় নষ্ট। আলেয়া বেগম ভ্রু কুঁচকিয়ে চুপ করে থাকলেন, একটু পরই রিয়াদ ভেতরে ঢুকলো, আলেয়া বেগমকে সালাম দিয়ে তানিমের দিকে তাকালো,
-তানিম কেমন আছো?
-ভালো, তুমি?
-আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি, কি অবস্থা…………
তানিম রিয়াদের কথা শেষ না হতেই চলে যায়।
রিয়াদের মুখটা মলিন হয়, আলেয়া বেগমের দিকে তাকায়,
-খালাম্মা প্রবেশপত্র ওর হাতে ভালোভাবেই দিতে পেরেছি। খুব কাঁদছিলো তৌফিক। আজই ওর পরীক্ষা শেষ তাইনা? থা েষ করে পাশের মোড়া টেনে বসে রিয়াদ।
-হ্যা বাবা আজই শেষ, কিন্তু ওর কার্ড রেখে গেছে তুমি কী করে জানলে বাবা?
-আসলে একটা পরীক্ষাও দেখতে যেতে পারিনি, তাই ভাবলাম আজ শেষ আজ অন্তত যাই, তারপর শুনলাম এই অবস্থা!
আলেয়া বেগম বললেন,
-তুমি না গেলে যে কী হতো রিয়াদ, আল্লাহ বাঁচিয়েছেন, তোমার আম্মা কেমন আছে?
-আম্মা ভালো আছেন, আজ এখানে আসবেন, তৌফিক পরীক্ষা শেষে আমাদের বাড়িতে যাবে তারপর আম্মা আর মিনি আসবে।
খুশি হন আলেয়া বেগম,
-ও খুব ভালো কথা কতোদিন আপাকে দেখিনা,  রিয়াদ যাও বাবা তুমি ঘরে যাও।


আলেয়া বেগম রান্নাঘরের পাট চুকিয়ে বসার ঘরে গিয়ে রিয়াদকে নাস্তা দিলেন, বললেন,
-বাবা তুমি খেয়ে নাও আমি একটু গোসলটা সেরে নিই।
রিয়াদ বললো,
-খালাম্মা আমি এখন খাবোনা, তৌফিক আসুক আর আমি এখন বরং একটু গ্রামটা ঘুরে ঘুরে দেখি।
-তাই? আচ্ছা ঠিক আছে।
রিয়াদ হাঁটছে আর প্রকৃতির রূপ দেখছে, প্রকৃতির বড় ভক্ত সে, আর এইসব সৌন্দর্য গ্রাম ছাড়া কোথাও দেখা যায়না। রিয়াদ হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়, তানিমের কন্ঠ শুনে, কিন্তু তানিমকে দেখা যাচ্ছেনা, একটা ঝোপের আড়াল থেকে আসছে ওর কন্ঠ! অস্পষ্ট কন্ঠ রিয়াদের,
-তানিম এই ঝোপের আড়ালে কি করছে? একটু পরে অন্যজনের কন্ঠ,
-না তানিম এতোগুলো অস্ত্র কি করে গায়েব হলো আমার বুঝে আসছেনা, আমাদের আলুর গুদামে ছিলো হাজারটি আর চালের গুদামে পঞ্চাশটি এমন জায়গায় ছিলো কেউ টের পাবার কথা না।
তানিম বলছে,
-আমি সরিয়েছি, রিমন আমার কথা শোন কতদিন বসের চামচা হয়ে থাকবো, এখন ওগুলো বিক্রি করে তুমি আর আমি ভাগ করে নেব……
রিমন হেসে ওঠে,
-কী… বলছো! তাই নাকী? তুমিতো দেখি বুদ্ধির সাগর, বসের চোখে ফাঁকি তোমাকে কিছু একটা গিফট করতে ইচ্ছে করছে দেয়া যায়?
তানিম দুশ্চরিত্র ব্যাক্তিদের হাসি যেন ধার কে নেয় এ মুহুর্তে,
-তোমার বোনকে…………
রিমন রাগান্মিত কন্ঠে,
– কথা শেষ করোনা তানিম, আমার বোনের দিকে যেই কুনজর দিয়েছে সেই আর এই পৃথিবীতে নেই, এটা তোমার অজানা নয়। আমি খারাপ হয়েছি বলে আমার বোনকে খারাপ হতে দেব এটা ভাবলে কী করে……… বিমর্ষ কন্ঠ রিমনের,
-আমার ঐ বোন ছাড়া কেউ নেই দুনিয়াতে যার কাছে সুখ দুঃখ শেয়ার করবো, জীবনে যতো বিপদ আপদ এসেছে বোনটি ছায়ার মতো আমার পাশে থেকেছে, ছোটবেলায় বাবা মাকে হারিয়ে কতো শতো ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করে দু ভাইবোন মানুষ হয়েছি…… আজ আমি এতো বড় নোংরা কাজে জড়িয়ে গেছি নিজের অজান্তেই, বোনের দিকে তাকাতে এখন ভয় পাই না জানি কখন ধরা পড়ে যাই, ওকেতো আমি জানাইনি তানিম! জানো তানিম আমার ইচ্ছে হয় তোমার খালাতো ভাই রিয়াদকে আমার বোনের সাথে বিয়ে দিই, যে খুবই ভালো আর আদর্শবান যুবক। থেমে যায় রিমন কিছুক্ষণ নিরবতা ওদের মধ্যে……… রিয়াদ ওখান থেকে প্রস্থান করে। (আগামীতে শেষ)

পোস্টটি ৩২২ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
২ টি মন্তব্য
২ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. আপনার লেখাটা অনেক বড় আপা। পড়তে কষ্ট লাগে আর সময়ও লাগে। পর্ব করে যদি দিতেন…

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.