ধারাবাহিক উপন্যাস “নিয়ন্ত্রিত পরিণতি”
লিখেছেন নাসরিন সিমা, এপ্রিল ২, ২০১৪ ৯:২৮ পূর্বাহ্ণ

কোচিংয়ে চুপচাপ বসে আছে আনু। ওর পরণে নীল টি শার্ট, আর জিন্স ওড়না গলায় পেচানো। স্মৃতি ভেতরে ঢুকে ওকে দেখে একটুক্ষণের জন্য হতবাক হয়ে রইলো, ভাবলো,
“এ কেমন পরিবর্তন একবারে অধপতনের শেষ পর্যায়। স্মৃতির ড্রেসআপ দেখে আনুও অবাক হলো ওর পরনে সবুজ ফুলহাতা জিফসী, সবুজ প্রিন্টের স্কার্ফ দিয়ে মাথা ডেকে রাখা, আর ওড়না দিয়ে চারপাশ শালিনভাবে জড়ানো আনু হাস্সোজ্জল কন্ঠে,
-স্মৃতি তোমাকেতো পুরো ইরাণী মেয়েদের মতো মনে হচ্ছে, ব্যাপার কী?
স্মৃতি বিরক্ত হয়,
-আর তোমাকে?
আনুর পাশে ফাঁকা সিটে না বসে স্মৃতি নিশা রহমানের পাশে গিয়ে বসে, আনু অবাক হলো কিন্তু কিছু বললোনা।
স্মতি নিশার সাথে কথা বলছিলো, আনু স্বাভাবিক কন্ঠে,
-স্মৃতি শোন।
-পরে কথা বলবো আনু, এখন না।
-একটু শোননা প্লিজ।
-না এখন না।

স্মৃতি ওর রুমে বসে পড়ছে, দুদিন ধরে ও ওর নতুন একটা পার্টস খুঁজে পাচ্ছেনা, ওটাতে এক্সপেনসিভ একটা জিনিস ছিলো জিনিসটা কী সেটা কিছুতেই মনে করতে পারেনি, ওটা হিরার হবে, এর আগে ঐ ধরণের জিনিস স্মৃতি সিনেমায় হয়তো দেখেছে। স্মৃতির রুমে ঢোকেন ওর চাচা আকমল চৌধুরী, আজই গ্রাম থেকে এসেছেন। খুশি হয় স্মৃতি,
-চাচা তুমি? বসো, কেমন আছো?
আকমল চৌধুরী বসলেন, তার পরনে কমদামী বেমানান একট শার্ট, আর মলিন প্যান্ট, দুটোর ম্যাচিং একেবারে হয়নি একটুও মানাচ্ছেনা, চেহারাতেও মলিনতার ছাপ ষ্পস্ট। মলিন কণ্ঠে,
-তোমার আব্বা কখন আসবে?
-ঠিক জানিনা চাচা, মাকে জিজ্ঞেস করেছো?
-হ্যা তোমার মাও জানেনা।
-অ বাড়ির সবাই ভালো আছে? দাদু, চাচী……
-হ্যা মা ভালো আছে, আচ্ছা তুমি পড়ো আমি ভাবীর সাথে গিয়ে কথা বলি। উঠে চলে গেলেন আকমল চৌধুরী। উনি চোখের আড়াল হলেও তাকিয়ে থাকলো স্মৃতি। চাচা, ফুফুদের এই মলিনতা স্মৃতির মনে মায়া আরো বাড়িয়ে দেয়। স্মৃতির দুচোখে অশ্রু জমা হয়, এই মুহুর্তে অবাক হয় স্মৃতি ওর বাবার কথা ভেবে, বাবার কথা ভেবে ওর বাবাওতো এমনই মলিন ছিলেন কিন্তু এখন? আর ভাবতে চায়না স্মৃতি পড়াশুনায় মনোযোগ দেয়।

স্মৃতি কেবলই ঘুমিয়েছে, অমনি একটা চাপা চিৎকার শুনতে পেয়ে উঠে পড়ে, মোবাইল দেখে নিশ্চিত হয় দুটা বাজে। কিছুক্ষণ সজাগ থেকে শোনার চেষ্টা করে, ওদের ফ্লাট থেকেই… তাহলে?
স্মৃতি গেস্ট রুমের দিকে যায়, শুনতে পায় সাইমন চৌধুরীর রাগান্মিত কণ্ঠস্বর,
-আরে রাখ্ তোর নীতি কথা, বাস্তবের সাথে এসবের কোন মিল নেই, নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ্ তোকে ভিখারী ছাড়া কিছু মনে হচ্ছে কী?
স্মৃতির মনটা নাড়া দেয়, চোখে অশ্রু আসে, দেয়ালের সাথে সেঁটে দাড়ায় শুনতে পায় আকমল চৌধুরীর কান্না জড়ানো কন্ঠ,
-হ্যা ভাই ঠিকই বলেছো, আজ নিজের ভাইকে তোমার ভিখারী মনে হচ্ছে, বাবা ওখানে তোমার জন্য অপেক্ষায় আছে, টাকাতো অনেক কামিয়েছো, কিন্তু জলাঞ্জলী দিয়েছো আদর্শকে……
দাঁতে দাঁত চেপে সাইমন চৌধুরী,
-একদম চুপ আর একটা কথাও বলবিনা কাল ভোর হওয়ার সাথে সাথে এখান থেকে বেরিয়ে যাবি, আমার বাসায় আর কোনদিন আসবিনা আমার কেউ নেই বাবা ভাই বোন কেউ নেই, কোথায় ছিলি সেদিন, আমার ছেলে মেয়ের আর্তনাদের সময়? বই কেনার টাকা যখন ছিলোনা, চিকিৎসা করার………
থেমে যান সাইমন চৌধুরী দ্রুত বেরিয়ে যান রুম থেকে।
আকমল চৌধুরী কাঁদতে কাঁদতে বলেন,
-আমি এখানে থাকতে আসিনি, বাবা আসতে বলেছিলো তাই এসেছি, তুমি এভাবেই চলতে থাকলে ধ্বংস অনিবার্য। স্মৃতি গেস্ট রুমে ঢুকলো, ধরা গলায়,
-চাচা!
হকচকিয়ে পেছনে তাকান সাইমন চৌধুরী, চোখের পানি লুকানোর বৃথা চেষ্টা করলেন, স্মৃতির দিকে না তাকিয়ে,
-মা তুমি এখানে?
-হ্যা চাচা আমি তোমাদের কথা শুনেছি, কিন্তু বুঝলামনা কী নিয়ে কথা বলছিলে?
-সেকথা বলতে পারবনা, কিন্তু তোমার বাবা সমুদ্রে সাতার কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিন্তু সেখানে বেশিক্ষণ ভেসে থাকা যায়না, ডুবতেই হয়। চুপ হয়ে যায় স্মৃতি আবারো পার্টসে থাকা এক্সপেনসিভ জিনিসটাকে গুরুত্বপূর্ন ক্লু মনে হয়। আরো ভাবলো বাবা আর চাচা কিছু একটা লুকাচ্ছেন, সামান্য কিছু নয় অনেক বড় কিছু, চমকে ওঠে স্মৃতি, বাবা অস্ত্র ব্যাবসায় জড়িয়ে পড়েনিতো! চিন্তাটাকে এখানেই থামিয়ে রাখে, এতো খারাপ বিষয় নিয়ে ভাবতে চায়না স্মৃতি,
-চাচা আমি আসছি, তুমি ঘুমাও। বের হতে নিয়ে আবার তাকায় চাচার দিকে,
-চাচা প্লিজ তুমি কাল যেওনা………
-না মা থাকতে পারবোনা, এমনিতেই কালই যেতাম, আর এখনতো থাকার প্রশ্ণই ওঠেনা।
স্মৃতির মাথায় হাত রাখেন,
-কষ্ট পেওনা স্মৃতি, যেখানেই থাকি, যেভাবেই থাকি তবুও আমি তোমার চাচা। তোমার বাবা অস্বীকার করলেও আমি তোমার চাচাই থাকবো, চাচাদের পরিচয়ের প্রসঙ্গ আসলে এই আকমল চাচার নাম আসবেই তুমি শশুরবাড়ির এলাকায় আমাকে যদি ফেরীওয়ালা হিসেবেও দেখো তবুও কী চাচা না ডেকে থাকতে পারবে? হয়তো শশুর বাড়ীর লোজনের কাছে পরিচয়টা দিতে পারবেনা, তবুও তোমার মন ঠিকই চাচা বলে ডাকবে………
স্মৃতি ফুফিয়ে কেঁদে ওঠে, চাচার বুকে মুখ গোঁজে,
-তুমি প্লিজ আর বলোনা, এভাবে কথা শুনতে আমার কষ্ট হচ্ছে, সহ্য করতে পারছিনা………।
আকমল চৌধুরীও কাঁদছেন, কান্না থামায় স্মৃতি,
-চাচা তোমার নাম্বারটা দাও, মোবাইলে যোগাযোগ করবো।
-আমারতো মোবাইল নেই মা, তবে পাশের বাড়ির নিবারণ দার নাম্বার নাও, ওনাকে ফোন দিলে আমাকে পাবে।
নাম্বার নিয়ে স্মৃতি নিজের রুমে এসে শুয়ে পড়লো, ওর মন চাচ্ছে এখনই চাচাকে একটা মোবাইল কিনে দিতে, কিন্তু কিভাবে? এখন অনেক রাত, আর চাচা ভোরে উঠেই চলে যাবেনে, কিছু একটা ভেবে, স্মৃতি ওর মোবাইলে থাকা সিম খুলে অন্য একটা সিম লাগিয়ে আবার গেস্ট রুমে যায়,চাচা ঘুমিয়েছো?
-না মা ঘুমাইনি এসো।
ভেতরে ঢুকে মাথা নিচু করে স্মৃতি,
-আমার একটা আবদার আছে চাচা,
-কী মা বলো।
-মোবাইল বের করে চাচার হাতে দেয়,
-প্লিজ না করোনা, আমি প্রতিদিন চাচি, মনিরাদের সাথে কথা বলতে চাই।
আকমল চৌধুরী মলিন কন্ঠে,
– আবদার করে মানুষ কিছু চায় আর তুমি আমাকে দিচ্ছো, ঠিক আছে নিলাম, কিন্তু তোমারতো মোবাইল থাকলোনা।
– বাবা কালই কিনে দেবে তুমি ভেবনা, বাবা আমাকে অনেক ভালোবাসে, কিন্তু কোথাও একটা শূন্যতা, মনে হয় জানোতো? কিন্তু চাচা সেই শূন্যতা তেমাদের কাছে আসলে দুর হয়ে যায়।
কথা শেষ করেই নিজের রুমে ফিরে আসে। ওর অনেক জোরে জোরে কাঁদতে ইচ্ছে করে ।  চলবে………

পোস্টটি ২৫২৩ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.