মুদ্রার উলটো পিঠ -২
লিখেছেন আমি নারী, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৭ ১১:৪৯ অপরাহ্ণ
mudra

বোকা জোলার গল্পটা কি জানা আছে? বোকা জোলা রাজার মেয়ে বিয়ে করতে যায় রাজকুমার সেজে। বিয়ের পর রাতে সে বিছানায় না শুয়ে বিছানার নিচে শুয়ে পড়ায় তার স্ত্রী বুঝতে পারে সে কোন রাজকুমার নয় এবং সে অত্যন্ত বোকা একজন লোক।

এরপর?? এরপর কি হল? এরপরের কাহিনীটাই আমাদের জন্য শিক্ষণীয় এবং আমাদের করণীয় ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য। গল্পের বাকি অংশে- বোকা জোলার স্ত্রী তার স্বামীর দীনতা রাজার কাছে প্রকাশ করেনি। সে ধৈর্য রেখে তাকে শিক্ষিত করে, কাজকর্ম করার পদ্ধতি শিখিয়ে দেয়। রাজার সামনে তাকে বুদ্ধিমান হিসেবে প্রেজেন্ট করে এবং তার প্রচেষ্টায় পরে বোকা জোলা একজন বুদ্ধিমান শিক্ষিত যুবকে পরিণত হয়।

আমাদের সমাজের দিকে তাকাই। বোকা জোলার মত বোকা না হলেও অনেকের স্বামীর আর্থিক অবস্থা অনুকূলে থাকে না। চড়া দামের বাজারে হাজার দশেক কি বিশেক টাকায় নুন আনতে যেখানে পান্তা ফুরোয় অবস্থা সেখানে স্ত্রীর নারীসুলভ চাহিদা মেটানো দায়। এমন স্বামী না পারে কোন দামী পোশাক কিনে দিতে না পারে মেইক আপের নতুন প্রোডাক্টস এনে দিতে। স্ত্রী তাই নিরস চোখে বান্ধবী, ভাবী আর কাজিনদের স্বচ্ছলতা দেখে, দেখে তারা কিভাবে ম্যারেজ এনিভারসারীতে দামী রেস্টুরেন্ট এ চেক ইন দেয় আর তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলার মত খুঁজে পায় না সে কি করেছিল আর কি পেয়েছিল বিয়ে বার্ষিকী

তে। এরপর কি করেন স্ত্রী? কি করা উচিত বলে মনে করেন পাঠক? নিত্যনতুন নিজের ইচ্ছা, পছন্দের সাথে কম্প্রোমাইজ করে চলা কি সম্ভব?? এখানে এসে আমরা দুই ধরনের চিত্র পাই আমাদের সমাজে।

 

চিত্র এক- স্ত্রী বিরক্ত হয়ে আর্থিক সমস্যার কথা, স্বামীর নামে কমপ্লেইন্ট কিংবা ভাগ্য দোষারোপ করতে থাকেন। কখনো নিজের মাকে বা বোনকে কখনো সেই গণ্ডি পেরিয়ে বান্ধবীদের। মা কিংবা বোন দেখা যায় চিন্তিত হয়ে মেয়ে জামাইকে উপদেশ দেন কিংবা মেয়েকে সান্ত্বনা দিতে যেয়ে তার কষ্ট আরো বাড়িয়ে দেন। বান্ধবীরা ‘এমন হলে সংসার কেমনে সম্ভব? আমি হলেতো ভালো করে ধরতাম কেন আয় কম? প্রমোশন কেন হচ্ছে না’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু আড়ালে আবডালে ঠিকই তাদের নিয়ে গসিপে লিপ্ত হয়। মাঝখানে লসটা কার? সেই পরিবারের। স্বামী আসার পর শুরু হয় আবদার, সমাধানের বুদ্ধি দেওয়া, এক পর্যায় ঝগড়া। এরপর ছোটখাটো সব বিষয়ে খোঁটা দেওয়া। ‘আমার বাবার এই আছে, আমি এই পেয়ে বড় হয়েছি, তোমার সংসারে এসে কিচ্ছু পাইনি, নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি’ ইত্যাদি।

চিত্র দুই- স্বামীর আর্থিক দীনতার কথা বুঝে স্ত্রী চুপ থাকেন। কাউকেই বুঝতে দেন না তিনি অভাবে আছেন। কোন পার্টি তে পুরনো পোশাক দেখে যখন কেউ শুধায় নতুন কেন নিলে না। সে তখন তার নিজের ইচ্ছে নেই বলে কথা কাটায়। বিয়ে বার্ষিকী কি জন্মদিনে যখন কেউ গিফটের হিসেব চায় সে তখন বলে তাদের মাঝে আলাদা কোন দিন নেই। সব দিনই নতুন করে কাছে পাওয়ার। স্বামীকে খোঁটা দেওয়া তো দূর, সে উলটো তাকে আশ্বাস দেয় সে তার পাশে আছে সারাজীবন। ঘরে দুধ শেষ তো রঙ চা বানিয়ে বলে এটা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো, তাই কদিন রঙ চা চলবে। এভাবে সে তার অভাবকে ভালোবাসার চাদরে লুকিয়ে রাখে।

 

এবার আসি চিত্র এক এর ফলাফলে। চিত্র একে স্বামী স্ত্রীর মাঝে এমন মনোমালিন্য যখন মাত্রা ছাড়ায়, কখনো কখনো স্বামী গায়ে হাত পর্যন্ত তুলে বসে। তখন তাকে পশু ট্যাগ দিতে, অমানুষ বলতে, তার পৌরুষত্ব কে প্রশ্নবিদ্ধ করতে আমরা এক মুহূর্ত দেরি করি না। আমরা বলি স্ত্রীতো ঠিকই বলেছে। বৌ চালানোর মুরোদ নাই আবার আসে শাসন করতে। এমন লোকের ঘর করার দরকার নাই। চলে আসো তুমি। বয়স তোমার আর কতই বা হলো। যেন আমরা, সমাজের বাসিন্দারা বসেই থাকি আগুনে ঘি ঢালার জন্য। এমতাবস্থায় মেয়ের ফ্যামিলির ইচ্ছায় কিংবা সবার ‘উপদেশ’ পেয়ে মেয়ে চলে আসে তার ঘর ছেড়ে। পরিণতি ডিভোর্স। কিংবা যদিও বা সে রয়ে যায় নিত্যদিন খোঁচা আর খোঁটা, গায়ে হাত তোলা বা ঝগড়া এসব চলতেই থাকে। ডিপ্রেশনে ভুগতে থাকেন স্বামী স্ত্রী দুজনই। স্ত্রীতো মা বোনদের বলে হালকা হন, আমাদের সমাজে পুরুষদের সেই সুযোগটাও কম বিধায় নিজের ভেতর নিজে পুড়তে থাকেন তারা।

 

চিত্র দুইয়ে আমরা একজন বিচক্ষণ, বুদ্ধিমতী নারীর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই যার সংসারে অভাব আর্থিক কিন্তু ভালোবাসার কমতি নেই। সেই রাজকুমারীর মত বুদ্ধিমতী এনারা। এদের ঘরে ডিপ্রেশন জায়গা পায় কম কারণ তারা সন্তুষ্ট তাদের অবস্থা নিয়ে। দামী পোশাক,মেইক আপ – কি এসে যাবে এতে যদি স্বামীর কাছেই তার মূল্যায়ন না হয়?

যদি ঘরেই শান্তি না থাকে বাইরে শো অফ করে কি বা আর লাভ?? এই পয়েন্টটাই মেয়েরা বুঝতে ব্যর্থ হন। তাদের অনেকের মতে এটাই জীবন, এতেই সুখ। আগের দিনের নানী দাদীদের মত দুখানা শাড়ি আর শাক লতাপাতা খাওয়ার জীবন আমরা চাই না। সুখের সংজ্ঞাটা ঠিক করা দরকার আমাদের। সারাজীবন চড়াই উতরাই পেরিয়ে বুড়ো বয়সে হাতে হাত রেখে চলতে পারা সুখ নাকি নিজের চাহিদা, পছন্দ অনুযায়ী শপিং, বড় ঘর, গাড়ি – এসব সুখ? আবার যখন স্ত্রীর সুখের জন্য টাকার পিছে স্বামী দৌড়ায় আর সময় দিতে পারে না তখন এই স্ত্রীই মুখ ফুলিয়ে বলেন তার জন্য স্বামীর সময় নেই। কোথাও একসাথে ঘুরতে যাওয়া হয় না। জন্মদিনে সোনার ব্রেসলেট পাওয়া গেলেও স্বামীকে পাওয়া যায় না।

কি বুঝলেন? ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায় সব একসাথে খেতে পারবেন না, সব ধরনের সুখ একসাথে পাবেন না। কমতি থাকবেই। তাই মনের মাঝে, সন্তুষ্টির মাঝে কমতি থাকলে সুখ কখনই ধরা দিবে না। নিজেদের সুখ নিজেদের কাছে বাকিটা বুদ্ধিমতীদের জন্য ইশারাই যথেষ্ট।

পোস্টটি ১৭৩ বার পঠিত
 ৩ টি লাইক
২ টি মন্তব্য

Leave a Reply

2 Comments on "মুদ্রার উলটো পিঠ -২"

Notify of
Sort by:   newest | oldest | most voted
লাল নীল বেগুনী
Member

বাহ… ভালো লাগলো আপনার চিন্তাধারা।

নীলজোসনা
Member

দরকারী লেখা। মানুষ মাত্রেই ভুল, আবার মানুষই পারে এ ভূলের উর্দ্ধে উঠে সুন্দর মানুষ হতে।
ধন্যবাদ। তিন নং মুদ্রার উলটো পিঠ দেখার অপেক্ষায় থাকলাম

wpDiscuz