সতীত্ব- একটি বিমূর্ত ধারণা
লিখেছেন অর্ফিয়ুস, মে ২৪, ২০১৪ ৭:৫২ অপরাহ্ণ

মানব সভ্যতার ইতিহাস যতদিনের, নারীর সাথে আচরণের রুপটিও ঠিক ততটাই প্রাচীন। বস্তুগত সভ্যতার এই চরম উৎকর্ষের সময়েও ভিন্ন গঠনবৈশিষ্ট্যের হওয়ার কারণে নারীর প্রতি আচরণও ভিন্নরকম।

 

সতীত্বের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে উইকিপিডিয়া নিজেই আবার হার মেনেছে। ‘সতীত্ব’ এমন একটি ধারণা, যার অর্থ হল, কোন ‘মানুষের’ এমন একটি অবস্থা যে সে এখনও যৌন সংসর্গে লিপ্ত হয়নি। সংজ্ঞা দেয়ার পরই প্রচলিত ধারণা দিতে বলা হয়েছে, এটি হল বিবাহপূর্ব পবিত্রতা, সম্মান ও মর্যাদার একটি স্মারক, তবে যা শুধু নারীর জন্য। লক্ষ্য করুন, শুধুই নারীর জন্য। যদিও, এখন সমলিঙ্গ বিবাহ, বা অন্য কিছু প্র্যকটিসের কারণে সতীত্বের এ ধারণা ধোপে টিকছে না আর!

 

সংজ্ঞা দেয়া হয় কিছু নিয়ে ধারণা পরিষ্কার করার জন্য। এই সংজ্ঞা আরও ধাঁধায় ফেলে দেওয়ার মত। যে কাজটিতে নারী পুরুষ উভয়ের ভূমিকাই সমান, বরং পুরুষের ভূমিকা অগ্রগামী সেখানে সে কাজ-পরবর্তী সামাজিক কলঙ্কের চিহ্ন কেন শুধু মেয়েদের গায়েই লাগবে? কেন মেয়েরাই জীবনের এক পর্যায়ে ‘কুমারী’ থাকবে এবং একসময় কৌমার্য্য বিসর্জনের মাধ্যমে তার বিশ্বস্ততার প্রমাণ দেবে?

 

ধর্ম কি বলে? ধর্মের প্রসঙ্গে আসলাম বাধ্য হয়েই, কারণ, মানুষ তার আচরণকে ধর্ম থেকেই নেয়, সচেতন বা অবচেতনভাবে। এবং পরে, সেই আচরণকে দিয়ে ধর্মকে সংগায়িত করতে চায়। যাক, শরণাপন্ন হলাম উইকিপিডিয়ার।

 

বৌদ্ধ ধর্মে ভার্জিনিটি নিয়ে কিছু বলা হয়নি, তবু যারা ধর্মের একান্ত সেবক, তাদের ভার্জিনিটিকে চিররস্থায়ী করে দেয়া হয়েছে, এ নিয়মের ক্ষেত্রে অবশ্য এ ধর্মে নারী পুরুষের পার্থক্য নাই।

 

খ্রিষ্টানরা আবার এই বাবদে একটু রক্ষণশীল, ‘একটু’ শব্দটা মনে রাখেন। এর একটা অর্থ আছে। বিবাহবহির্ভূত সতীত্ব রক্ষাকে সম্মানের চোখে দেখা হয়েছে, কিন্তু এর সাথে জুড়ে দেয়া হয়েহেঃ ‘প্রতিটা মানুষের শরীর স্রষ্টার সম্পদ! শরীরই মন্দির’! আর ভার্জিন মেরীকে কলঙ্ক মোচনের জন্য এক এক মনীষী যীশূর পিতা হিসেবে এক একজনকে প্রস্তাব করেছেন, এমনকি ‘সন্দেহ’ও (!) করেছেন। এখানে একটা জিনিস পেলাম, আগে জানতাম না। কোন পুরুষ জোর করে কোন মেয়ের সতীত্ব হরণ করলে তাকে ওই মেয়েকে বিয়ে করতে হবে এবং যথাযথ পণ পরিশোধ করতে হবে। এই পণের পরিমাণ , মেয়েটি সতী কিনা তার ওপর নির্ভর করে।

 

প্রাচীন গ্রীসে, নারীদের যেখানে পূর্ণাঙ্গ মানুষই মনে করা হত না, সতীত্ব হারানোর অপরাধে অভিযুক্ত মেয়েটিকে জ্যন্ত কবর দেয়ার বিধান ছিলো।

 

হিন্দু ধর্মের ব্যপারটা বেশ অদ্ভুত; প্রাচীন ভারতে সতীত্ব কেন্দ্রীক সামাজিক বিধিনিষেধ ছিলো না। পরে একে বিয়ের কণের জন্য অবশ্য লক্ষ্যণীয় শর্ত হিসেবে দেখা হয়েছে। তার মানে হল, বিবাহপূর্ব (বিবাহবহির্ভূত নয়) সতীত্ব রাখতেই হবে।

 

আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছিলো, যে মেয়েটা, পরিস্থিতির শিকার হয়ে ‘সতীত্ব’ নামক সামাজিক বস্তুটিকে খুইয়ে বসে,  আনন্দ লাভের কোন উদ্দেশ্য থেকেই নয়, তাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য সমাজ বা ধর্ম কোন ছায়া তৈরী করেছে কি না! যে ছায়ার আড়ালে থাকলে সে ‘পবিত্র’ই থেকে যাবে, তার উদ্দেশ্যের সততা তাকে তার সম্মানের আসন থেকে বিচ্যূত করবে না!

 

একদম থিওরিটিক্যাল দৃষ্টি থেকে দেখলে অবাক হতে হয়। বৌদ্ধ বা খৃষ্টান সমাজে এই রকম মেয়েদের স্থান নেই। হিন্দু ধর্মে মনে হয় যেন কী একটা ফাঁক আছে, কিন্তু সেটা এতো সংকীর্ণ, যে তার মধ্য দিয়ে যাওয়া স্বয়ং সীতার পক্ষেই সম্ভব হয়নি। আজকের এই সমাজে কোন মেয়েকে যদি সতীত্ব প্রমাণের জন্য ‘অগ্নিপরীক্ষা’র সম্মুখীন হতে বলা হয়, সম্ভবত সে এই সমাজের মুখেই পদাঘাত করে বলবে, “থাকলাম আমার অসতীপনা নিয়ে আমি, যাও!’’ এখানে অবশ্য আরও বড় হেঁয়ালী আছে একটা। সীতাকে প্রমাণ দিতে হয়েছিলো, তিনি সতী ছিলেন। কিন্তু এমন যদি হোত, রাবণ রাজা তাঁর সম্মান নষ্ট করেছে, কিন্তু তাঁর অমতে? তাহলে? রাম কি করতেন? হাহ! তাহলে মনে হয় সমাজ সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে দেয়ার সম্মানটাও দিতো না।

 

ইসলামে এই রীতিগুলোর পরোক্ষ সমাধান আছে। কিন্তু এর অনুসারীরা সেসব ঘেঁটে দেখার কষ্টখানা করে কি না আমার জানা নাই। কারণ সমাজে সেসবের প্রয়োগ নেই, এর চরম অন্যায়ের মুখেও এর প্রতিবাদ নেই।

 

উদাহরণ দিই; দেখেন।

১। মনে করেন, একটি মেয়ে, বিয়ের পর কোন কারণে স্বামীর ঘর থেকে ফেরত এসেছে। সমাজ শতমুখে বলতেই পারে, আহা, বেচারী! কিন্তু কোন পুরুষ কি স্বেচ্ছায়, বিনা চাপে এই মেয়েটিকে স্ত্রী হিসেবে নেবেন? মেয়েটি, হোক সে ষোড়শী, তার জন্য বীভৎস অসুন্দর সব প্রস্তাব আসতে থাকে। এ ব্যপারে আমরা আবার ‘মধু খাওয়া মূসলমান’, অর্থাৎ কি না ‘কুমারী মেয়ে বিয়ে করা আল্লাহর রাসুলের(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সুন্নাহ’!! নামাজের সুন্নাহ ছেড়ে দিচ্ছি প্রতিদিন ১৬ রাকায়াত, তাতে কি? রাসুলের সুন্নাহ বলে কথা!!

 

২। আবার মনে করেন, খুব সাবধানে পড়বেন, আমার লেখার চাপে আপনার ঠুনকো মুসলমানিত্ব ভেঙ্গে যায় না যেন! একটি মেয়ে, জোর করে তার অসম্মান করেছে কেউ, জীবনের চরমতম অপমানের সাক্ষী মেয়েটার মন। অবিবাহিতা, কিন্তু উইকিপিডিয়ার সংজ্ঞায় সে ‘কুমারী’ নয়, পারবেন সে মেয়েটিকে আপনার ছেলের বউ বা আপনার ভাইয়ের বউয়ের মর্যাদা দিতে? পারবেন, দীর্ঘ বৈবাহিক জীবনে তাকে কোন খোঁটা না দিয়ে আর দশটা মেয়ের মত আচরণ করতে?

অনেক আগে একটা ভারতীয় বাংলা সিনেমা দেখেছিলাম। হানিমুনে গিয়ে নির্জন সৈকতে স্ত্রীটিকে প্রচন্ড অসম্মান করে কিছু বখাটে, স্বামী বেচারা তার পিতার অমতে মেয়েটিকে নিয়ে আলাদা হয়ে যান, কারণ পিতা বউকে অপবিত্র বলে ছেড়ে দিতে বলেছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পর মেয়েটি সন্তানসম্ভবা হলে মাতাল পুরুষটি স্বরুপে আবির্ভূত হন, মেয়েটি সংসার ছেড়ে চলে যায়। বহুদিন পর, মেয়েটি তার ‘রাতের বিল’ চাইতে আসে তার পরিত্যক্ত স্বামীর কাছে, কারণ সে তদ্দিনে খারাপ হয়ে গিয়েছে। অথচ, যে অন্যায়ের দায় পুরুষেরও, তার গায়ের দাগটি সমাজ সযত্নে মুছে দিলেও, মেয়েটির দাগটি তখন স্কুলে যায়, অবিকল পিতার চেহারা তার।

 

কি জবাব দিবেন আপনি? আপনার সমাজের ধর্মীয় মুরুব্বীরা ‘অবক্ষয়, অবক্ষয়’ বলে হাত ধুয়ে ফেলেছেন, কিন্তু এ অবক্ষয়ের অসহায় শিকারটির কোন স্থান কিন্তু তাঁর ঘরে নেই।

 

আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মত লম্বা জামা পরে চোখে সুরমা দেয়া মুরুব্বী, একটু জানাবেন কি? আপনার রাসুল যখন একাধিক বিধবাকে বিয়ে করেন যাঁর আগে দুইবার বিয়ে হয়েছে, এমন কোন মহিলার জানাযা পড়ান, যে ব্যভিচারীণী ছিলো এবং স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকারের কারণে যাকে রজমের শাস্তি দেয়ায় তাঁর মৃত্যূ হয়, তখন কি সুন্নতের বাধ্যবাধকতা আপনাকে আর কিছু শেখায় না? নাকি সৎ কাজের আদেশ আর অসৎ কাজের নিষেধের বেড়াজালে আপনি আয়নায় দাঁড়াতে ভুলে গেছেন? সমাজ আপনার কাছে বড় হয়ে গেছে সুন্নাহর চেয়ে? তাহলে মনে রাখবেন, ইসলাম যে ইনসাফভিত্তিক সমাজের কথা বলে, সেটা আপনার হাত দিয়ে আসবে না, শায়খ! সরে দাঁড়ান পথ ছেড়ে। শূণ্যতা তৈরী হোক, আর কেউ উঠে আসুক। ‘আমার বেণী তেমনি র’বে, চুল ভেজাবো না’র দলে ভিড়ে থাকা জ্ঞানপাপীদের দিয়ে সমাজের পরিবর্তন আসেনি কোনদিন, আসবেও না!

পোস্টটি ৩৬৬১ বার পঠিত
 ৬ টি লাইক
৫২ টি মন্তব্য
৫২ টি মন্তব্য করা হয়েছে
    • ধন্যবাদ সাফওয়ানা! রিএকটিভ সমাজের ভয়ে বহুদিন ধরে একটু একটু করে লিখে লিখেও দিতে পারছিলাম না, প্রথম কমেন্টে সে দ্বিধা ধুয়ে দিলেন। ধন্যবাদ!

  1. আপু, আপানাকে এক হাজার গোলাপের শুভেচ্ছা! এমন লিখা কতদিন পরে পড়লাম। আপু , আপনি কে গো? আমাকে একটু বলবেন কানে কানে?

  2. আপনার লিখাটা ফেইস বুকে শেয়ার করলাম। আমাকে আবার মানুষ পুরুষ বিদ্বেষী জানে। দেখা যাক! কয়শ গালি খাই! তবে, এটা কোন সাধারণ লিখকের লেখা না। এতোটুকু শিউর!

  3. এমন কোন মহিলার জানাযা পড়ান, যে ব্যভিচারীণী ছিলো এবং স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকারের কারণে যাকে রজমের শাস্তি দেয়ায় তাঁর মৃত্যূ হয়, তখন কি সুন্নতের বাধ্যবাধকতা আপনাকে আর কিছু শেখায় না? আপু, স্বীকার করে তওবা করলেও কি পাথর মারা হতো? জানতে মনে চাইছে

    • আপনার জবাব দিতে দেরী হয়ে গেলো, জেনেই নিলাম আরেকটু।

      মহিলাটিকে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন, এজন্য তিনি তাঁকে তিনবার ফিরিয়ে দেন। আল্লাহর রাসুল চাইছিলেন, এই অপরাধের বিষয়টি গোপন রাখতে এবং মহিলাটিকে তওবার সুযোগ করে দিতে। কিন্তু মহিলাটি এমনই ভীত ছিলেন তাঁর অপরাধ নিয়ে, তিনি তিনবারের মেয়াদ পূর্ণ করে আবার আসেন রজমের শাস্তি ভোগ করতে, তাঁর আশা ছিলো, এতে তাঁর কিয়ামতের দিনের শাস্তি মাফ হয়ে যাবে।

  4. ওহ্ অনেক ভাল লাগল লেখাটা পড়ে। মনে হয় মনটা ভরে গেল সুখে। আর সাথে সাথে এও ভাবছি আসলেই আমরা সবাই ‘মিষ্টি খাওয়া নবীর সুন্নাত’ এটা নিয়েই আছি :( ।আমরা আর কবে সঠিকভাবে ইসলামকে বুঝতে শিখব? কবেই বা ছেলে-মেয়েয় বৈষম্য দুর হবে? এ সমাজে নারীর আসল অধিকার আদৌ কি প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে?

    • ভালো লেগেছে জেনে খুশী হলাম। আর, পরিবর্তন আমাদের হাত দিয়েই আসবে। ‘আমরা যদি না জাগি’ সকাল হবে না।

  5. ইসলাম যে ইনসাফভিত্তিক সমাজের কথা বলে, সেটা আপনার হাত দিয়ে আসবে না, শায়খ! সরে দাঁড়ান পথ ছেড়ে। শূণ্যতা তৈরী হোক, আর কেউ উঠে আসুক। ‘আমার বেণী তেমনি র’বে, চুল ভেজাবো না’র দলে ভিড়ে থাকা জ্ঞানপাপীদের দিয়ে সমাজের পরিবর্তন আসেনি কোনদিন, আসবেও না!
    সুন্দর লিখেছেন। :)

  6. অল্প বয়সী,কূমারী মেয়ে বিয়ের সুন্নাত পালন করতে করতেই যেখানে দিন-রাত চলে যায়,সেখানে সময় কই নিজেকে সাধারন মানুষ ভাবার?!!

  7. ‘আমার বেণী তেমনি র’বে, চুল ভেজাবো না’র দলে ভিড়ে থাকা জ্ঞানপাপীদের দিয়ে সমাজের পরিবর্তন আসেনি কোনদিন, আসবেও না!
    পারফেক্ট…

  8. ধন্যবাদ… সাহসীপূর্ণ লিখা…

  9. উইমেন এক্সপ্রেসে আমার পড়া সেরা লেখা।
    শিল্পী কে অনেক অনেক ধন্যবাদ! যে এত কঠিন কথা গুলো এতো সুন্দর করে লিখতে পারে সে-ই শিল্পী!

    আমাকে একটা পুরষ্কার দেয়া উচিত (সেরা লেখাটি পড়ার সৌভাগ্য অর্জনের জন্য)!

  10. চমৎকার এবং সাহসী লেখা… শুভেচ্ছা রইল লেখিকার জন্য। :)

  11. এ কী লেখা পড়লাম! কী চমৎকার বিশ্লেষণ! অসংখ্য ধন্যবাদ।

    • আপনাকেও ধন্যবাদ! আপনার লেখাগুলোও ভালো লাগে, জীবনঘনিষ্ঠ লেখা। লিখে যান

  12. মেয়েদের সমস্যা গুলোতে পুরুষদের চাইতে মেয়েদের দায়টা ই বেশি… আপনার কথাটার সাথে একমত। সমস্যা খুঁজতে গেলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েদেরকে ভিলেন হিসেবে বিভিন্ন রুপে পাওয়া যায়,আফসোস! :(

    • জি। কিন্তু মেয়েরা যখন শিক্ষিত হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশী হারে, এগুলো থেকে বের হয়ে আসার জন্য মেয়েদেরই চেষ্টা করা উচিত

  13. আরেক বার মন্তব্য করতে আসলাম। লেখাটি এক কথায় চমৎকার। তবু আরো কিছু কথা বলার লোভ সামলাতে না পেরে………।

    ১. একটা জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে তুলে এনেছেন ক্ষুরধার-তেজস্বী লেখনীতে। যেসব ইস্যুতে অনেকেই অস্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
    ২.অনেক তথ্য সমৃদ্ধ।
    ৩. বিভিন্ন ধর্মের একটা তুলনামুলক আলোচনা করেছেন যা প্রবাহ কে সুখপাঠ্য করেছে।
    ৪. সতীত্ব শুধু নারীর বিষয় নয়, পুরুষের জন্য ও ইস্যু হতে পারতো কিন্তু সেটা হয় নি। আপনার লেখায় তা চমৎকার ভাবে ফুটে উঠেছে।
    ৫. ইসলাম-পন্থীদের চেতনায় একটা নাড়া দেয়ার চেষ্টা করেছেন শেষতক এসে। আপনার যৌক্তিক এবং প্রাঞ্জল উদাহরণ গুলো যে কারোই মনোযোগ আকর্ষণে সার্থক না হয়ে পারে না।

    তবে,
    ১. তথ্যের অনেক কিছুই উইকি-নির্ভর। সাধারণত আমরা কোন কিছু সম্পর্কে ধারণা পেতে উইকিতে ঢু দিলেও রেফারেন্স হিসেবে উইকি এতোটা শক্তিশালী মনে হয় না।
    ২. এখানে বেশ কিছু ইস্যু ঘুরপাক খেয়েছে। সতীত্ব/কুমারীত্ব, বিবাহপূর্ব যৌন সংসর্গ, স্বেচ্ছায় বিসর্জিত সতীত্ব (সুখ-তাড়িত), বাধ্য হয়ে বিসর্জিত কুমারীত্ব, বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক, বিধবা নারী। সমাজে তাদের অবস্থান এবং পরবর্তী জীবনে এর গ্লানি। মনে হচ্ছে লেখিকা কেন্দ্রীয় ফোকাস দিতে চেয়েছেন যারা সুখের তাড়নায় নয় বরং অনিচ্ছাকৃত ভাবে তাদের সম্ভ্রম হারায় সে সব নারীদের পরবর্তী জীবনে ভোগান্তি নিয়ে। এখানে অবশ্যই তারা অপরাধী নয় এবং ন্যায়বিচার মতে তাদের কোন শাস্তি পাওয়ার কথাও নয়। কিন্তু আরও অনেক ইস্যুর ভীড়ে এর প্রাধান্যতা কমে গেছে। কেউ মনে করতে পারে সাধারণ অর্থে কুমারীত্বের ধারণার বিরোধীতা করা হয়েছে।

    বিধবা বিবাহ একটা ইস্যু।
    বিবাহ পূর্ব অনিচ্ছাকৃত যৌনতায় বাধ্য হওয়া নারী একটা ইস্যু।
    বিবাহ পূর্ব স্বেচ্ছাকৃত যৌনতা আরেকটা ইস্যু (লেখিকা নিশ্চয়ই এটাকে সমর্থন করে লিখেন নি। এক্ষেত্রেও কেউ যদি ভুল করে সংশোধিত হতে চায় সেটা ও নিশ্চয়ই একটা ইস্যু।)
    আমার মনে হয় ২য় ইস্যু টা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেটাকে নিয়ে কাজ করা উচিত। প্রথম ইস্যুটা এতটা ভয়াবহ নয়, লোকে এটাকে কিছুটা স্বাভাবিক-ই মনে করে ২য়টার তুলনায়। যদিও দু টোতেই তার কোন হাত নেই, অপরাধ ও নেই। পুরো লেখটা একটা ইস্যুতেই ফোকাস করে হলে আরো সুন্দর হতো। যদি এর সাথে একটা কেস স্টাডি যুক্ত করা যেত তাহলে এর আবেদন অনেক গুণ বৃদ্ধি পেত বলে আমার মনে হয়।

    ৩. শেষ দিকে এসে লেখিকাকে বেশ উত্তেজিত মনে হয়েছে। এটা সাধারণত হতাশাবাদী দের ক্ষত্রে ঘটে থাকে। অনেক বেশি জাজমেন্টাল কথাবার্তা আলোচিত হয়েছে। ‘আপনাদের দ্বারা হবে না’ টাইপ। আবার প্রচ্ছন্ন ভাবে তাদেরকেই এ সমস্যা সমাধানের আহ্বান করা হয়েছে। এটা আপাতঃ সাংঘর্ষিক। যেমন এ কথা গুলো এমন হতে পারতো– “আপনাদের মতে এ নারী অপবিত্র, পাপী কিন্তু ধর্মমতে এরা পবিত্র এবং পাপী নয় বরং যারা তাদের সাথে এ আচরণ করেছে তারাই পাপী, তাদের-ই বর্জন করা উচিত।” এতে লেখিকার নিরপেক্ষতা থাকতো, আবেদন ও স্পষ্ট হত।

    ৪. ‘Change needs mutual respect’. যাদের পরিশুদ্ধ করতে চাই তাদের ক্ষেপিয়ে দিলে সংশোধন অনেক ক্ষেত্রে হয় না বরং আরো ব্যবধান তৈরী হয়। যাকে সংশোধন করতে চাই সে যদি মনে করে আপনি মনের ঝাল মিটাচ্ছেন না, সত্যি সত্যিই তার ভালো চান। তাহলে ব্যাপারটা অনেক বেশি প্রায়োগিক হয়।
    শুরুতেই যদি তাকে দূরে ঠেলে দিই তবে তাকে কিভাবে শুদ্ধ করব। যারা এ ভাবনা নিয়ে বড় হচ্ছে আসলে কি দোষ তার? নাকি তার ওরিয়েন্টেশানের। সে যে পবিত্রতা/পাপ এর ধারণা নিয়ে বড় হচ্ছে তা তো তাকে এটাই শিখাচ্ছে।
    যেমন- ভারতে একসময় বাচ্চার জন্ম হত গোয়াল ঘরে গরুর উপস্থিতিতে। এতে কল্যাণের ধারণা ছিল। মেডিকেল সাইন্স এটাকে আনহাইজেনিক মনে করে। আপনি তাদের সংশোধন করতে গিয়ে যদি বলেন-ওহে গর্দভের দল এটা করা ঠিক না বা করা যাবে না। এতে সংশোধনের সম্ভাবনা কম। বরং সে দেবতার উপর-ই বেশি নির্ভর করবে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য সঠিক এপ্রোচ হচ্ছে, আপনি বললেন তোমাদের ধারণা হচ্ছে এতে আশীর্বাদ পাওয়া যাবে, মেডিকেল সাইন্স বলে এই এই সমস্যা। তারপর সমাধানের আলোচনা। এটার সমাধানে তাদের বুদ্ধি দেয়া হল, তোমরা আলাদা একটা ঘর বানাও যেখানে বড় একটা গরুর ছবি থাকবে। এতে দুই উদ্দেশ্য-ই সফল হবে। এটা বেশ কার্যকরী হয়েছিল।

    ৫. পুরো লেখাটাই retrospective (অতীত/অন্যের পর্যালোচনা) ধাঁচের তার চেয়ে উত্তম হতো যদি introspective (নিজের জায়গা থেকে) আলোচনা হত। আপনার ভাই/ছেলের জন্য হলে আপনি কি করতেন? এ নিয়ে দু কলম লিখা যেতে পারে।
    পুনরায় চেক করতে পারিনি। ভুল কিছু থাকলে ক্ষমা চাই।

    • আপনার ফিরে আসা মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ। এমন প্রতিউত্তর পেলে লেখার আবেদন এবং উদ্দেশ্য ঠিক আছে কি না বোঝা যায়। আমার সাধ্যমত জবাব দিচ্ছি।

      ১। উইকিনির্ভরতা শুধুমাত্র নিশ্চিত হওয়ার জন্য। কারণ এক কুরআন ছাড়া সব ধর্মগ্রন্থেরই মেয়াদোত্তীর্ণের ব্যপার আছে। একই বিধান গীতায় যা, মনুসংহিতায় তা ছিলো না। অথচ এক সময় মনুই ছিলো এসব বিধানের উৎস। একইভাবে ওল্ড টেস্টামেন্ট আর নিউটেস্টামেন্ট এর জগত থেকে বর্তমান সময়ের তাওরাত আর বাইবেলের অনুসারীরাও সরে এসেছে বহুদূর। সেক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতালব্ধ উদাহরণের চেয়ে উইকির রেফারেন্স অনেক বেশী গ্রহণযোগ্য।

      ২। ইস্যু একটিই, ‘বিবাহ-পূর্ব বা বিবাহ-পরবর্তী সতীচ্ছেদের সাথে নারীর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার পরিবর্তন’। আমি কয়েকটি আঙ্গিক থেকে দেখানোর চেষ্টা করেছি, না বুঝতে পারলে সে দায় আমার দূর্বল লেখনীর।

      ৩। আপনি ঠিক, আমি শেষের দিকে একটু দ্রুত গিয়েছি। পুরো লেখাটা শেষ করে প্রায় মাসখানেক ধরে ভাবছিলাম, এর সমাপনীতে একটা ধাক্কা দেয়া দরকার। বজ্রাহত মানুষের জ্ঞান ফিরানো হয় কিভাবে জানেন নিশ্চয়ই? আর, এই উত্তেজনার মূলে হতাশা? হবে হয়ত! যাদের মুখে আশার বাণী শুনে স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছা করে, তাঁদের ব্যক্তিজীবনে এসবের ছিটেফোঁটাও না দেখে, আশাহত হওয়া স্বাভাবিক। তাঁদের নিয়ে আর আশা করছিও না, কিন্তু যে তরূণদের নিয়ে আশা করি, তাদের জাগানোর একটু ব্যর্থ চেষ্টা করলাম।

      ৪। আমি সংস্কারক নই, অন্তত এখনও। কিন্তু তাই বলে ভুল ধরে দেয়ার মতও কেউ থাকবে না? যদি কারও সুযোগ হয়, সে আইডিয়া নিতে পারে, অন্তত কোন বিষয়ে চিন্তা করবে সেরকম আইডিয়া পেতে পারে। বদলে দেবার ধারণা মাথায় রেখে লেখা আসলে কঠিন কাজ। দীর্ঘমেয়াদী এবং নির্দিষ্ট সার্কেলের জন্য লিখতে হয়। সম্ভবত, আমার সে ধৈর্য্য-সাহস-যোগ্যতা নাই।

      ৫। পক্ষপাত! আমি আবেগী মানুষ! শেষের দিকে আপনিও টের পেয়েছেন। পক্ষপাতদুষ্ট হবার ভয়ে নিজের উদাহরণ দিই নি।

      সবশেষে, এতো ভেবে কমেন্ট করার জন্য আবার ধন্যবাদ!

  14. ভয়াবহ ভাল এবং তীর ছোড়া লেখা পড়লাম অনেকদিন পর । তীর গায়ে বিদ্ধ হোক , হওয়াটা জরুরী । ধন্যবাদ লেখককে ।

    • ঠিক। ইসরাফীলের বাঁশির পর তো আর ঘুম ভাংবে না, এখন যদি একটু চটকা ভাঙ্গে কারুর!
      আপনাকে ধন্যবাদ

  15. সুন্দর লেখা। যদিও এসব নিয়ে কথা বলা রিস্কি, কারণ আপনার পাঠকরা আপনাকে সারাক্ষণ এনালিসিস করবে। যে কোন মুহূর্তে যে কোন লেখায় আপনাকে পোলারাইজ করে ফেলবে। যেমন এই মুহূর্তে আমিও ভাবছি, আপনি কি নারীবাদী? নাকি তসলিমাবাদী? নাকি ইসলামিস্ট? না সংস্কারবাদী?

    সব গন্ডীর উপরে উঠে মানবতার জন্য লিখে যান, শুভকামনা রইলো!

    • হা হা হা
      মজা লাগলো আপনার কমেন্ট পড়ে। ভাবুক। কিচ্ছু এসে যায় না। তবে হ্যাঁ, আমি মানবতাবাদী! এইটুক নিশ্চিত।

  16. স্রোতের উল্টা হাঁটা খুব কঠিন। সাহস হারাবেননা, এইভাবেই কড়া নাড়তে থাকুন…………।।
    খুব দামী গবেষণা!!

  17. শুধু কি কুমারী বিয়ে করাই সুন্নত ? মহানবী(সা:) তো বিধবা এবং তালাকপ্রাপ্তা নারীদেরকেই বিয়ে করেছিলেন বেশী ! শুধু তো মনে হ্য় একজনই(আয়েশা রা:) কুমারী ছিলাে।

    • সেটাই। যে সুন্নত আমার অনুকূল, সে সুন্নতের আমি ভক্ত, আর যে সুন্নত আমাকে শাসন করে, সে সুন্নত আমি জানিই না। এই ‘আমাদের’ নিয়েই আজকের সমাজ।
      আপনাকে ধন্যবাদ

  18. সুন্দর লিখেছেন! ভাল লাগল!

  19. পুরো পোষ্ট এবং সবগুলো কমমেন্টস পড়লাম। লিখেছেন অসাধারণ।

    কিন্তু আফসোস ভাই আমরা যারা এমন লিখনিতে হায় হায় করি উত্তেজনায় ফেটে পরি কিন্তু কাজের বেলায় শূণ্য। এই সমাজে শিক্ষিত লোকের কোন অভাব নেই। অভাব আছে সু-শিক্ষিত লোকের। অভাব আছে আক্কেল (Common Sense) ওয়ালা মানুষে।

    একজন সত্যিকারের ঘুমন্ত মানুষকে যদি ডাকা যায় সে জাগ্রত হয় কিন্তু যে লোকটা জেগে থেকে ঘুমের ভান করে ঘাপটি মেরে থাকে তাকে আপনি সারা জীবন ডাকলেও শুনবে না। কারন ও বোঝাতে চায় যে সে ঘুমে আছে।

    তেমনি আমাদের সমাজের যারা জাগ্রত ব্যক্তি আছে তারা যদি সত্যিকারে জেগে দুচোখ মেলে তাকায় তবেই এই সমাজ থেকে কলুষতাগুলো দূর হয়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আর তখনই আপনার এই লেখাটা সার্থক হবে। ধন্যবাদ এত সুন্দর করে উপস্থাপন করার জন্য।

    ক্ষমা করবেন ভাই। আমি এই ব্লগে নতুন এসেই বকবক করলাম।

    • নতুন আর পুরনো আবার কেমন কথা? আপনার কথাগুলো ভালো লাগলো। এটাই বলতে চেয়েছি। আমরা নিজেদের সমাজ সংস্কারক বলতে ভালোবাসি কিন্তু নিজের ঘর্্ব সংস্কারের হাওয়া আসতে দিই না

  20. আপনার লেখা পড়ে অনেকদিন পর এই ব্লগে লগইন করলাম।
    মনে হচ্ছিল এই লেখা সভ্যতার মুখোশ পড়া মানুষের হৃদয়তন্ত্রীতে একেকটি বিষ তীর। যে তীর বিদ্ধ হয় শুধু নতুন করে গড়ার জন্যে। কারন ভেঙ্গে আবার গড়তে জানে সে চির সুন্দর।এই লেখা আপামর নারী সমাজের ও নারীরপ্রতি সহানুভূতিশীল মানবিক সমাজের হৃদয়ের কথা। এই লেখা একটি সাহসী উৎসারন। অমিত সম্ভাবনার প্রস্রবন বয়ে আনুক এই লেখা। দোয়া ও শ্রদ্ধা রইল আপনার জন্যে।

  21. ভালো লেগেছে।
    যতটুকু ভেজাল/কলুষিত আছে, তাতে পরিবর্তন আসলেই দরকার। কিন্তু সে চেষ্টায় আছে নিদারুন হতাশা। প্রচেষ্টার শুরুর ধাপে আপনার পদচিহ্ন অনুজদের সাহস জোগাবে…
    আশা করি থামবেন না…

    • আপনাকে ধন্যবাদ ইসরাত। হতাশা অলসদের বিনোদন, আর কর্মঠ মানুষের হতাশ হবার সময় কই? নিজেকে হতাশ হবার সময় না দেয়ায় বুদ্ধিমানের কাজ। ভালো থাকবেন

  22. চমৎকার ! তলোয়ারের মত…

  23. সতীত্ব-আসলেই একটি বিলুপ্ত ধারণা। একটি মেয়ে, ইচ্ছাকৃতভাবে দশটা পুরুষকে একই সাথে খারাপ চিন্তায় বাধ্য করলো, তার সতীত্ব কি এমনিতেও থাকে? আর যে মেয়ে অনিচ্ছায় খারাপ হল, তার সতীত্ব তো এমন মর্যাদার জায়গায়, যাকে ছোঁয়ারও অপমানকারী পুরুষের নেই

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.