জেন্ডার স্টাডিজ – ২
লিখেছেন অর্ফিয়ুস, জানুয়ারি ৮, ২০১৮ ১১:৩৫ অপরাহ্ণ

বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের সভ্যতাও এগিয়ে যাচ্ছে। দেখতে ভালোই লাগে, কিন্তু ভাবতে গেলে খটকা লাগে। কেন? আগে একটা গল্প বলি। গল্পটা শোনা।

এক বিজ্ঞানী ল্যাবে পরীক্ষা করছেন। ব্যাঙ একটা, আর একটা বাযার দিয়ে। ব্যাঙের কানের কাছে নিয়ে বাযারটা বাজানো হল। বাজখাঁই শব্দ, ব্যাঙ লাফ দিয়ে চার হাত দূরে গিয়ে অবতরণ করলো। এবার বিজ্ঞানী ব্যাঙের একটা পা কাটলেন, একেবারে গোড়া থেকে। এবার বাযারের শব্দ শুনে ব্যাঙ তিন ফুট গেলো। এবার পালাক্রমে দুইটি এবং একটি পা নিয়েও ব্যাঙ লাফ দিলো, গেলো যথাক্রমে দুই ফুট এবং এক ফুট। চতুর্থ পা কাটার পর দুইদুইবার বাযারের ঘ্র‍্যাত শুনেও ব্যাঙ আর লাফায় না। পরীক্ষা শেষ। এবার বিজ্ঞানী খাতা টেনে সিদ্ধান্ত লিখলেনঃ ‘চারখানা পদ কাটিয়া ফেলিলে ব্যাঙ আর কানে শোনে না’।

কয়েকটা প্রেক্ষাপট বলি।

এক, আগে মঞ্চে, সিনেমায় অভিনয়ের জন্য মহিলা পাওয়া যেতো না। পুরুষরাই ঠোঁটে রঙ মেখে অভিনয় করতো। তো, আস্তে আস্তে নিম্নবিত্ত মহিলারা এ পথে আসতে থাকলো। কারণ দুইটা, পয়সা পাওয়া যায়, আর লোকে চিনেও ভালো। এমন শ্রেণীর মহিলারাই আসতো, যাদের পয়সার দরকার আছে, আর সেজন্য সিনেমাওয়ালী বনে গেলে ‘নতুন’ করে বদনামের আশংকা নাই। উদাহরণ দেখেন, বাংলা ভাষায় প্রথম নারী চরিত্রে নারীরা অভিনয় করা সিনেমা ‘দ্যা লাস্ট কিস’ (১৯৩১) এ অভিনয় করেন ললিতা, চারুবালা, দেববালা নামক তিনজন বাঈজী (উইকিপিডিয়া)। ধীরে ধীরে আরেকটু অভিজাত মহিলাদের প্রয়োজন হচ্ছিলো। কারণ, সিনেমার চরিত্রগুলোর চেহারার আসল আভিজাত্য এইসব যাত্রাপালা শ্রেণীর মহিলাদের চেহারায় আনা যাচ্ছিলো না। কিন্তু ভদ্র মধ্যবিত্তের মেয়ে-বউ তো অপবাদের ঝুঁকি নেবেন না। সিনেমার কথা এটুকুই থাক।

দুই, এবার আসি শিল্প বিপ্লবের কথায়। শিল্প বিপ্লবের জন্য মাথার চেয়ে হাত দরকার ছিলো বেশী। সুতরাং ‘বৈধতা দেয়া’র শর্তে যত্রতত্র পিতৃপরিচয়হীন সন্তান জন্ম দেয়াকে উতসাহ দেয়া হল। পরিবারের বাইরেও নারীকে প্রয়োজন হয়ে পড়লো, জৈবিক আকর্ষণকে অবাধ, সংস্কারমুক্ত করতে তার কাপড়ও সংক্ষিপ্ত করার ব্যবস্থা হল, নারীকে সহজলভ্য করার জন্য এবং সকল শ্রেণীর পুরুষকে  আকর্ষণের জন্য প্রয়োজন হল সকল শ্রেণীর নারীকেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীতে সমগ্র ইউরোপে কর্মক্ষম পুরুষ মানুষের অকাল দেখা দেয়। এন্টিবায়োটিকের অভাবে, যুদ্ধাহত কোটি কোটি মানুষ মারা যায়! বুড়ো এবং শিশু থাকলেও তাদের জন্য নির্ভর করার মত পুরুষ মানুষ হারিয়ে যায়! ফলে কল-কারখানা, শিল্প-প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নের চাকা স্থবির হয়ে পড়ে। ব্যাপক যুদ্ধ বিধ্বস্ত জনপদকে কার্যোপযোগী করার জন্য সর্বত্র শ্রমিকের অভাব দেখা দেয়। ফ্রান্সে এই সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে, সরকার ঘোষণা করে আমাদের মানুষ চাই, কর্মী চাই, শ্রমিক চাই। সুতরাং যেভাবেই পারা যায়, সেভাবেই মানব সন্তান উৎপাদনের লক্ষ্যে সারা ইউরোপে এক আজীব যৌন বিপ্লব সাধিত হল। দেখা দেখি সকল রাষ্ট্রেই তা অনুমোদন করল। নারীরা শিল্প-কারখানায় পুরুষের কাজ করল, সর্বত্র পুরুষের অভাব মেটাতে নারীরাই এগিয়ে এল। মানব সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে, পুরুষের কাজ মেটাতে যেভাবে নারীদের মাঠে নামানো হল, সেভাবে কল-কারখানার কঠোর কাজ, দিন-রাত পরিশ্রমের ধকল থেকে নারীরা মুক্ত থাকেনি। নারীদের মাসিক ঋতু হয়, গর্ভধারণ করতে হয়, যা পুরুষের নাই। নারীদের শরীরের গঠন ও কাজ করা ক্ষমতা পুরুষের মত না হবার পরও, তাদের দিয়ে পুরুষের মত কাজ করানো শুরু হল (নজরুল ইসলাম টিপু, ব্লগস্পট)।

এবার তৃতীয় প্রেক্ষাপট। ‘নারী মানুষ নয়, শয়তানের প্রতিনিধি’ – রোমান সভ্যতার এই ধারণা থেকে যে ইউরোপ নারীকে মানুষ ভাবতেই প্রায় দেড় হাজার বছর সময় লাগিয়েছে, নারীকে নাগরিক অধিকার দিতে তার লেগে যায়  লম্বা সময়। নারীর ভোটাধিকারের যুদ্ধটা ১৮৮১ থেকে শুরু হয়ে সারাবিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালে এসে। আর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে।

এবার চতুর্থ ও সর্বশেষ প্রেক্ষাপট। পেয়ারা কিংবা কুমড়োর ফুল স্পর্শকাতর কিছু সৃষ্টি। এদের থেকে ইয়া বড় গোলগাল ফলটি জন্ম নেয়, তাতে ফুলের সৌন্দর্যের হানিও ঘটে, কাজ শেষ করে ফুল ঝরে যায়, আর বীজ পরিপক্ক হলে ফলও বিদায় নেয় প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চ থেকে।  ঠিক তেমনই সৃষ্টির শুরু থেকে নারীর গঠন বৈশিষ্ট্যও পুরুষের থেকে আলাদা। এই আলাদা হবার গাঠনিক বা উপযোগজনিত কারণ আছে। নারীর কাছে পুরুষকে আর পুরুষের কাছে নারীকে আকর্ষণীয় করার জন্য তাদের বৈশিষ্ট্য আলাদা, তেমনই আলাদা তাদেরকে তৈরীর উদ্দেশ্য। কিন্তু এই গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের সামাজিক প্রয়োগ কেমন হল? সে গল্প বেশ হতাশাজনক। আদিম যুগে, কৃষিভিত্তিক সমাজে নারী দাপটের সাথে সংসারের ভেতর বাহির দেখাশুনা করেছে, পুরুষের কাজ ছিলো নিরাপত্তা বিধান আর শিকার। ধীরে ধীরে এই কাজের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হলো। কিন্তু সাথেসাথে দরকার হল আরও হাতের। নারীকে সন্তান উতপাদনে অধিক মনযোগী হতে হল, ঘরকে বেছে নিতে হল। নিজের স্বার্থে বা বাইরের কাজের অযোগ্যতার কারণে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতের জন্য। তার গঠনেও এজন্যই দেয়া হয়েছে নমনীয়তা, সৌন্দর্যপ্রিয়তা। যেন প্রতিটি শিশু বেড়ে ওঠে মানবিক মানুষ হিসেবে। কিন্তু এর সামাজিক প্রভাব বদলে যাচ্ছিলো। নিরুপায় নারী, যে তার এই অনন্য সেবার জন্য বাহবা পেতে পারতো, তাকে বঞ্চিত করা হতে থাকলো। কি রকম? নারীর গায়ে হাত তুললে পালটা মার খাবার ভয় নেই, ভালো খেতে না দিলেও আপত্তি নেই, সন্তানের মায়াতেই সে সংসারে টিকে থাকবে। পুরুষ নারীর ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত’ হলেও আচরণ শুরু করলো ‘কর্তৃত্ববান’ এর। মজার ব্যপার হল, এই ব্যবস্থায় বড় হয়ে একটা নারীও একই আচরণ করতে থাকে। শুরুতে পুরুষ আর এরপর নারী পুরুষ দুধরণের বাহনে চড়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করে এই বিকৃত পুরুষতন্ত্র। ফলাফলঃ নারীর জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরী করে দিতে না পেরে ঘর ছাড়া আর সব জায়গাকে নারীর জন্য  অনিরাপদ বানিয়ে ফেলা, আর সবচেয়ে নিরাপদ যে স্থান, ঘর, সেখানেও চরম সহিংসতার শিকারও এই নারীই।

নারীবাদ – এক ভয়াবহ চুলকানো রোগের নাম। এই শব্দের বহুল ব্যবহার আছে। কারও কাছে এটি নিজের সকল অবৈধ কাজকে বৈধ করে নেয়ার পাসপোর্ট,  কারুর কাছে অপকর্মা নারীসমাজের ঘাড়ে আরও একটি উদোর পিণ্ডি, আর কারও কাছে মানবিক মর্যাদা খুঁজে নেয়ার হাতিয়ার।

নারীবাদ মূলত এসেছে নারীর মানবিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও একথা সত্য যে, নারীবাদের প্রথম ঢেউয়ে ভোটাধিকার আদায়ের সংগ্রামের পর নারী যখন সামাজিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম করে, সেসময় নারী চেয়েছিলো, নিজের বিয়েতে মত দেয়া, সন্তানের দেখভালের ব্যপারে মতামতের অধিকার, এরপর আসে সম্পত্তিতে অধিকারের লড়াই। এর কোনটি অযৌক্তিক তো নয়ই, বরং মোটামুটি দুইশ বছরেও সভ্যতা নারীকে এইটুকু অধিকারের খুব সামান্য অংশই আদায় করে দিতে পেরেছে। কিছু ধর্মে এ ব্যপারে বিস্তারিত বিধান আসলেও এসবের ব্যবহারিক প্রয়োগ এখনো সামাজিক দৈন্যকে উতরে যেতে পারছে না।

স্বীকার করা হোক বা না হোক, নারীবাদের ইতিহাস থেকেই এই কথা প্রমাণিত যে, উপরে বলা সবগুলো সামাজিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে কেবল এবং কেবলমাত্র সামাজিক সুবিচারের আশায়ই নারীবাদ আন্দোলন শুরু করেছিলো। কিন্তু অন্যান্য সকল মতবাদের মতই, অন্যান্য প্রেক্ষাপটের কর্ণধাররা নারীবাদকে ব্যবহার করেছেন নিজেদের স্বার্থোদ্ধারে। এই আধুনিক সময়ে এসেও সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর লোক দেখা যাচ্ছে। কেউ না জেনেই ‘নারীবাদাতঙ্ক’ নামক ব্যাধিতে ভুগেন, আর কেউ ইচ্ছে করে জেনেবুঝেও নারীবাদের উদ্দেশ্যকে প্রথম দুইটি প্রেক্ষাপটে আটকে রাখেন, যেন নারী বা সমাজ কেউই নারীর প্রকৃত মানবিক মর্যাদা দেয়ার কথা না ভাবে। এ হল, একদম শুরুতে বলা বিজ্ঞানী আর ব্যঙের গল্পের মত। সমস্যাকে বুঝে, এর সমাধানের পথ বুঝেও, নিজের উপলব্ধিকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিপথগামী করা।

নারীবাদ থেমে থাকেনি। আপনি আমি হয়ত বুকে হাত দিয়ে নিজেদেরকে নারীবাদী বা উপনারীবাদী (নারীবাদ সমর্থনকারী পুরুষ) বলতে সাহস পাবো না। কিন্তু নারীবাদের তত্ত্বীয় ধারণার সাথে সাথে তৈরী হচ্ছে এর সূতিকাগারও। এই তত্ত্ব শুধু একজন নারীকে নিয়েই নয়, ভাবে নারী পুরুষ এবং এর মধ্যবর্তী সকল প্রজাতির নানা দিক নিয়ে ভাবছে।নারীবাদ এখন কেবল মতবাদ নয়। লৈঙ্গিক এবং সামাজিক পরিচয় নিয়ে কাজ করছে ‘জেন্ডার স্টাডিজ’ নামে। একই সাথে অসংখ্য পরিবারও তাদের প্রতিটি ছেলে বা মেয়ে সন্তানকে ‘মানুষ’ হিসেবে জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। এই মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠা একটি পুরুষ নারীকে সহযোগী ভাবতে পারেন, নারীর কাজগুলোকে সম্মান করতে পারেন, নারীর সহায়তায় অমর্যাদা বোধ করেন না, নারীর পরিশ্রমকে মূল্যায়ন করেন, নারীর মেধাকে উপযুক্ত বিকাশের পরিবেশ দিতে সহায়তা করেন। আর মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠা একটি নারীও নিজের মেধাকে শাণিত করেন, এর মাধ্যমেই মর্যাদার আসন পেতে চেষ্টা করেন, নিজেকে শ্রদ্ধা করেন। এবং এজন্যই সস্তা মনোরঞ্জনে নিজেকে নিয়োজিত করেন না। সর্বোপরি নারী পুরুষ সবার জন্য সমাজকে নিরাপদ আশ্রয় করে তুলতে এবং মেধা বিকাশের সর্বোচ্চ অনুকূল পরিবেশ তৈরীতে কাজ করাই একবিংশ শতাব্দীর নারীবাদ বা ‘জেন্ডার স্টাডিজ’ এর মূল লক্ষ্য।

জেন্ডার স্টাডিজ ১ঃ https://goo.gl/CZkf9g
পোস্টটি ৩১৯ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

Leave a Reply

Be the First to Comment!

Notify of
wpDiscuz