যুদ্ধ-নারীঃপ্রতিশোধের প্রকাশ যেখানে ধর্ষণ
লিখেছেন লোরাক্স, আগস্ট ২১, ২০১৬ ২:৪৪ পূর্বাহ্ণ

                 MSF168198

        পূর্ব আফ্রিকার দেশ বুরুন্ডি এখানে রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মহিলাদের ধর্ষণের স্বীকার হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে ব্যাপকভাবে।Women and Girls  Hub  বুরুন্ডির পার্শ্ববর্তী দেশ  তানজানিয়ার রিফিউজি ক্যাম্পে অবস্থানরত এমন কয়েকজনের সাথে কথা বলেছে।এইসব ভাগ্যহত সর্বহারা মহিলাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তাদের রিপোর্টে উঠে এসেছে।

সোফি। তিনি বুরুন্ডির রাজধানী বুজুম্বুরাতে সেনাকর্মকর্তা স্বামীর সাথে বাস করতেন।একদিন সোফির বাসায় ঝড়ের বেগে কিছু লোক হামলা চালায়তারা তার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করে।স্বামীর মৃতদেহের পাশেই গণধর্ষণের স্বীকার হন তিনি।বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট পিয়েরে নকুরুঞ্জিজাকে সমর্থন না করার জন্যই তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে বলে তারা বলে।আর তার স্বামীর এই অসমর্থনের এর জন্য তাকে খেসারত দিতে হবে বলে হুমকি দেয়।পরে তারা সোফিকে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া পর্যন্ত ধর্ষণ করে।

জ্ঞান ফিরলে সোফি নিজেকে হাসপাতালে আবিষ্কার করে।সেখানে তাকে বলা হয় জীবন বাঁচাতে চাইলে তাকে বুরুন্ডি ছেড়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নাই।তা নাহলে তার স্বামীর হত্যাকারীরা তাকে বাঁচতে দিবে না।তাই  উপায় না দেখে মার্চে সোফি তাঞ্জানিয়াতে পাড়ি দেন

২০১৫ সালের এপ্রিল হতে প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার বুরুন্ডিয়ান তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন কিনা তৃতীয়বারের মত নকুরুঞ্জিয়া বুরুন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট হন।নকুরুঞ্জিয়ার এই ক্ষমতা দখলকে বিরোধীদল অসাংবিধানিক হিসেবে অবিহিত করে।তার বিরুদ্ধে দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পরে।দিনব্যাপী রাজধানীর রাস্তায় রাস্তায় প্রতিবাদ মিছিল চলতে থাকে।কিন্তু রাতের বেলায় ‘ইমবোনেরাকুরে’ নামক সরকার সমর্থিত একদল সঙ্গবদ্ধ যুবক আন্দোলনকারীদের বাসায় স্বশস্র  হামলা চালায়।তারা আবাসিক এলাকাগুলোতে ধর্ষণ, হত্যা ও লুটপাট চালায়।

এই অবস্থার প্রেক্ষিতে হেগভিত্তিক আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত সম্ভাব্য যুদ্ধ অপরাধের অভিযোগে বুরুন্ডিতে তদন্ত শুরু করে।কিন্তু নকুরুঞ্জিজা এই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে।এ ছাড়াও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে জাতিসঙ্ঘ প্রেরিত একদল পুলিশ বাহিনীকে প্রত্যাখ্যান করা হয়।

মানবাধিকার পর্যবেক্ষক ও গবেষক স্কাই হুইলার তানজানিয়ার Nduta কাম্পের ৭০ জন মহিলার সাক্ষাতকার নেন যারা কিনা বুরুন্ডিতে যৌন সহিংসতার স্বীকার হয়েছেন।হুইলার বলেন, ‘এইসব মহিলাদের টার্গেট করেই ধর্ষণ করা হয়েছে ভিন্ন রাজনৈতিক মত থাকার জন্য- এটা সুস্পষ্ট। দেখা গেছে নির্যাতিতদের অধিকাংশই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর স্ত্রী অথবা কন্যা।’

 

সান্দ্রা নামে আরেকজন মহিলার কথা জানতে পারা যায়।তার বাসায় অতর্কিত হামলা চালানো হয়।তার স্বামীর কাছে জানতে চাওয়া হয় যে সে কোন দল সমর্থন করে,কিন্তু জবাব দেওয়ার আগেই তাকে হামলাকারীরা পেটাতে থাকেসান্দ্রা সে সময় ভয়ে বিছানার আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন।তারা তাকে খুঁজে বের করে ধর্ষণ করে।আবার তারা তাকে জিজ্ঞাসা করে সে সত্যিকার অর্থে প্রেসিডেন্টকে মেনে নিয়েছে কিনা,তবে উত্তর দেওয়ার আগেই তাকে রামদা দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়এতোটুকুতেই তারা ক্ষান্ত হয় নাই,পরে তার কাছে টাকা চাওয়া হয়। যদিও সান্দ্রার স্বামী কোনোমতে প্রাণে বেঁচে যায় কিন্তু তার ৫ বছরের শিশু সন্তানকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে সেই সন্ত্রাসীরা।

পৃথিবীর অন্যতম গরীব ও জনবহুল দেশ এই বুরুন্ডি২০০৫ সালে ১২ বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি হয়,যার সূত্রপাত হয়েছিলো ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে।তখন পুরুষদের ধরে ধরে হত্যা করা হত অথবা যুদ্ধে অংশগ্রহণে বাধ্য করা হতো। পুরুষেরা যুদ্ধরত অথবা জীবন রক্ষার্থে পালিয়ে বেড়ানোর কারণে বাড়িতে মহিলাদের অরক্ষিত অবস্থায় থাকতে হত।এতে তারা আক্রমণের সহজ স্বীকার হতেন। বর্তমানে এই একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখা যাচ্ছে সেখানে-এই  অভিমত প্রদান করেন তানজানিয়ার ক্যাম্পের মহিলাদের জন্য কর্মরত International Rescue Commission(IRC) এর একজন পরামর্শক।

এই পরামর্শক আরও জানান যে সেখানে এমন মহিলাও আছেন যাদেরকে তাদের পরিবার পরিত্যাগ করেছে এবং সাহায্য করার জন্য কেউই এগিয়ে আসেনি।এমনও মহিলা আছেন যারা তাদের পরিবারের মানুষ দ্বারাই ধর্ষিত এবং দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন।

যারা পালিয়ে দেশ ছেড়ে চলে আসছিলেন তাদের অনেকেই আবার সীমান্তে আটকা পড়েন। তাদের মধ্যে যারা  পরে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তানজানিয়াতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন তাদের কয়েকজন বলেন, সীমান্তে কর্মকর্তারা তাদের কাছে অর্থ দাবি করে।যারা টাকা দিতে সক্ষম হন না  অথবা যারা দিতে পারেন তাদেরকেও অনেকসময় শারীরিক নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়েছে।হুইলার বলেন বিভিন্ন উপায়ে তাদের দেশ থেকে পালাতে বাঁধা দেওয়া হতো, ধর্ষণ তার মধ্যে একটি।

1000                         

 আরও একজন ভাগ্যহত নারী মেলানি।বুরুন্ডির মাকাম্বা প্রদেশে ছিল তার বাড়ি।ফেব্রুয়ারির একদিন তার বাসায় একদল লোক আক্রমণ চালায়। মেলানির বাচ্চারা আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে চিৎকার শুরু করে। আক্রমনকারি লোকগুলো বলে,তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখবে কারা কারা একা আছে।তারা তাদের নির্যাতন করবে অথবা হত্যা করবে।

মেলানি তানজানিয়াতে পালিয়ে যাওয়ার জন্য রওনা হয়।কিন্তু সীমান্তে তিন সন্তানসহ আটকে তাকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়পুলিশ তাকে আটক করে।পরে থানায় নিয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয়।তার ৮ বছরের শিশু কন্যাকে ছিনিয়ে নেয়া হয়।রক্তাক্ত-বিধস্ত অবস্থায় সে তাই বাধ্য হয়ে তার অন্য সন্তানদের নিয়ে উপত্যকাসঙ্কুল পথ পাড়ি দেয়।

তানজানিয়ার এই রিফিউজি ক্যাম্পগুলোতে রেপ সারভাইভাররা  চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন।সাথে সাথে মানসিক সহায়তাও দেয়া হচ্ছে।সেখানে কাওন্সেলিং সেবা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।এছাড়া মহিলারা গ্রুপ কাওন্সেলিং এ আগ্রহ প্রকাশ করছেন।হুইলার একথা জানান।

কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হল এই মহিলারা ক্যাম্পের ভেতরেও যৌন উৎপীড়ন থেকে নিরাপদ নন।হুইলার তার গবেষণা কালে জানতে পারেন মহিলারা কাম্পের ভেতরে ও এর আশেপাশের এলাকাগুলোতে ধর্ষণের স্বীকার হচ্ছেন আশংকাজনকহারে

ক্যাম্পগুলোতে মহিলাদের নিরাপত্তার জন্য সুরক্ষিত বাড়িঘর,আলোর সুব্যবস্থা ও অধিক সংখ্যক ল্যাট্রিনের ব্যবস্থা করা দরকার যাতে করে মহিলাদের রাতের বেলা বাথরুমে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে অনেক দূরে যাওয়ার প্রয়োজন না হয়।

অনেক মহিলা জানান,রান্নার জন্য ১০ মাইল দূর থেকে হেঁটে কাঠ সংগ্রহ করতে যাওয়ার সময় তারা আক্রান্ত হয়েছেনক্যাম্প কর্তৃপক্ষ রান্নার জন্য তাদেরকে অধিক সংখ্যক স্টোভ, জালানি ইত্যাদি সরবরাহ করার চেষ্টা করছেন।

কিন্তু এই মহিলারা যে দুঃসহ বেদনার মধ্য দিয়ে গেছেন বা যাচ্ছেন তা কোন প্রকার সাহায্য সহযোগিতা দ্বারা নির্মূল করা যাবে না।

নিকোল তার দুই সন্তানসহ সীমান্তে পুলিশ দ্বারা গ্রেফতার হন।পরে তাকে স্টেসনে আটকে রেখে নির্যাতন ও ধর্ষণ করা হয়।এতে সে চরম অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে স্টেসন থেকে বের করে দেওয়া হয় ।বের হয়ে সে জানতে পারে তার সন্তানদের মেরে ফেলা হয়েছে।

বাড়ি থেকে বিছিন্ন দূরে একাকী অসহায় নিকোলের দেওয়ার মতো আর কিছুই ছিলনা,তার এই দুঃখের কাহিনীর বর্ণনা ছাড়া।

নিকোল গভীর দুঃখ সাথে বলছিলো-“আমার নিজেকে গাছের একটা শুকনো পাতার মতো মনে হচ্ছে।আমি যেন হাওয়ায় উড়ে উড়ে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছি..।”     

                            ——————

 

পোস্টটি ৮৮৩ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
৫ টি মন্তব্য
৫ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. May Allah protect them and replace the tyrant regime and establish peace and justice. Ameen.

  2. মনটা খারাপ হয়ে গেলো :( ।

  3. যুদ্ধের প্রধান শিকার নারীই

  4. রক্ষা করো আল্লাহ! ভিকটিম নারীদের ধৈর্য ও দৃঢ় মনোবল দাও!

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.