সমতার প্রতিজ্ঞা কার কাছে হে নারী ?
লিখেছেন সাফওয়ানা জেরিন, মার্চ ৮, ২০১৬ ৬:৫৩ অপরাহ্ণ
image_1457383352-3289419a0b

টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী ।
হাড়ীত ভাত নাঁহি নিতি আবেশী ।।
বেঙ্গসঁ ষংসার বড্‌হিল জাঅ ।
দুহিল দুধু কি বেন্টে ষামায় ।। 

ভাবছেন আমার কী হল! মাথা খারাপ হয়ে গেলো নাকি বেশী পড়তে পড়তে? আসলে তেমন কিছু নয়। উপরের কবিতাটি চর্যাপদের ৩৩ তম পদ। যেখানে একটি অসহায় মেয়ের অবস্থা বর্ণনা সাপেক্ষে এই ৪ টি চরণ লেখা হয়েছে।

একটি গ্রামের মেয়ে দেহ ব্যবসা করার জন্য পাহাড়ের টিলায় ঘর বেঁধেছে, তার হাড়িতে ভাত নেই, সুতরাং তাকে নীতির কথা বলে লাভ নেই। আর এই দেহ ব্যবসা থেকেই ব্যঙ্গের সংসারের মতো অবৈধ সন্তানে ঘর ভরে ওঠে। কিন্তু গাভীর বোঁটা থেকে একবার দুধ বের হলে তা যেমন বোঁটায় ফিরিয়ে দেওয়া যায় না, তেমনই সন্তান সে অবৈধই হোক না কেন, তাকে ফেলে দেওয়া যায় না।

চর্যাপদ রচিত হয়েছে সে পাল আমলে। সেই আমলেও নারীকে সমাজপতিরা ছাড় দেয়নি এতোটুকু ও। এই কবিতা তার যথার্থ প্রমাণ।

যেদিন থেকে নারী নিজেকে মানুষ হিসেবে চিনতে শিখেছে, সেদিন থেকেই মূলত অধিকারবোধের জাগ্রত হয়েছে। এরপর অনেক জল গড়িয়ে নারীবাদী আন্দোলন একটা কথাই বলেছে- তা হল- সমঅধিকার।

এই সমঅধিকারই নারীর জন্য গোঁদের উপর বিষ ফোঁড়া হয়েছে। কোথাও কিছুটা সুবিধা দিলেও বেশীরভাগ অসুবিধাই বয়ে এনেছে নারীর জন্য।

একমাত্র নারীকেই আবাদ করে মানব সভ্যতাকে আলোর মুখ দেখানো যায়। তাহলে সমঅধিকার কীভাবে হয়? নারীর অধিকার বা মর্যাদা সভ্যতার প্রতি দানের প্রাপ্য কী এরচেয়ে বেশী নয়?

কিন্তু প্রশ্ন হল এই সমতা আমরা কার কাছে চাই? শুধুই পুরুষের কাছে?

যদি বলি নারীই নারীর উপর সবচেয়ে বেশী নির্যাতন করে, কথাটা কী খুব ভুল হবে?

ঘরের শত্রুই যে বড় বিভীষণ। নারীর ঘর ভেঙ্গেছে? কার কারণে? কোন সে আগুন?

শ্বশুর বাড়িতে কেরোসিন তেলে নারী ঝলসে গেছে? কার সেই ইন্ধন? সংসারে নিত্য কথা চালাচালির অশান্তি, সেটাই বা কার কাজ?

পুরুষের যদি এতে অংশগ্রহণ থাকেও সেই পুরুষকে কে লালন পালন করে বড় করলো? বৃক্ষের নাম জানা যায় ফলের পরিচয়  পাওয়ার সাথে সাথেই। তাহলে মেধা মনন প্রজ্ঞা আর প্রকৃত মানবতাবোধের জ্ঞান আগে কার প্রয়োজন। এই জন্যই কী নেপলিয়ান বলেছিলেন- আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও আমি একটি শিক্ষিত জাতি তোমাদের উপহার দিবো। এই কী ভালো পুরুষ পাওয়ার মূল তত্ত্ব নয়?

একজন পুরুষের মধ্যে যখন মেয়েদের বিশেষ গুণগুলোর সমন্বয় ঘটে যেমন- মমতাবোধ, যত্নশীলতা, আন্তরিকতা, ত্যাগের মনোভাব, ভাব প্রবণতা, মানুষের অনুভূতি নিয়ে তীক্ষ্ণ বিবেকবোধ, সেই পুরুষ নিঃসন্দেহে একজন অসাধারণ মানুষ হয়ে ওঠেন। 
তবে এই সংখ্যাটা খুব সীমিত। আমার ধারণা ৯৯% নারী , পুরুষের নির্যাতনের পেছনে উপরোক্ত মানবিক গুণগুলোর ঘাটতি থাকাকেই দায়ী করবেন। 
আমি মনে করি, নারীর সাথে জড়িয়ে আছে পৃথিবীর অর্ধেক ন্যায় অন্যায় সংক্রান্ত বিষয়। যে পুরুষ নারীর সাথে ইনসাফ করতে পারে, পৃথিবীর সত্যিকারের শাসন ক্ষমতা তার জন্যই। এই জন্যই পুরুষকে নারীর উদর থেকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। যেন মায়ের মাতৃত্বের গুণ মায়ের উদারতা , মায়ের থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের সাথে পুরুষের সহজাত বীরত্বের সাথে আন্তরিকতা আর মানবতাবোধের বিকাশ ঘটে প্রতিটি পুরুষ হয়ে ওঠেন অসাধারণ, ইনসাফের প্রতীক। এইসব ছেলেদের জন্যই কর্তৃত্ব বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু ইদানিং আমাদের নারী সমাজ এতোটাই জ্ঞান বিমুখ যে নিজেরাই খুব কম জানে, সুতরাং সন্তানের শিক্ষাটা ও তেমন দিতে পারেন না। যার ফলাফল- পুত্র হলে সেই পুত্র কর্তৃত্ব বলতে বোঝেন অফিস শেষে আয়েস করে পায়ের উপর পা তুলে অর্ডার দেওয়া আর রাগের মাথায় শারীরিক ঠাণ্ডা মাথায় মানসিক নির্যাতন, আর কন্যা হলে সেই কন্যা জানে কীভাবে সাঁজতে হয় আর রাঁধতে হয়। 
যে ছেলে মাকে তার বাবার হাতে নির্যাতিত হতে দেখে সে কখনোই তার স্ত্রীকে সোনায় সোহাগা করে রাখতে পারেনা। যে নারী স্বামীর নির্যাতনের কোন প্রতিবাদ প্রতিকার করেনা, সে সংসারের সন্তানরা ও প্রতিবাদ সহিষ্ণু হবেনা, এটাই তো স্বাভাবিক। 
ছেলে বাহির থেকে খেলাধুলা করে আসার পর প্যান্ট খুলে যেখানে ফেলে সেখান থেকে মা যদি উঠিয়ে রাখেন, না সেখান যে নিজের কিছু কাজ নিজের ও করা উচিৎ। 
সে ছেলে কোনদিন বুঝবে না, গর্ভবতী স্ত্রীর কতোটা কষ্ট হয় ঐ পড়া কাপড়খানা ওঠাতে। 
সমতা, সাম্য মানে কী ? এই নয় কী? সমান অধিকার নারীর জন্য নয়। কারন, যতো যাই বলেন পিছিয়ে পড়া জাতির আগে সমতা প্রয়োজন। অধিকারবোধের চেয়েও বেশী প্রয়োজন মানবতাবোধ। সেই মানবতাবোধ বা মানবিক আবেদন পূরণ করে সমাজের কয়জন?

জানার স্বল্পতা মানুষের জন্য এক মহামারী ব্যধির নাম। যার সূচনা হয় আমাদের ঘরগুলো থেকেই। কিছুটা নয় নারী নির্যাতনের দ্বায়ভার তাই নারীর উপরই অনেকখানি বর্তায়। সমতা আর সাম্য যাই বলি আমরা , প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আগে হতে হবে আপামর নারী সমাজকেই।

 

 

 

 

পোস্টটি ৬৫৭ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
৩ টি মন্তব্য
৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. তবে পুরুষ দিবস কোন খানা জাতি জানিতে চাহে … http://womenexpress.net/blog/wp-content/plugins/wp-monalisa/icons/wpml_cool.gif

  2. অনেক ভালো হয়েছে……।

  3. শেষের কথা গুলো ভালো লেগেছে বেশি। সচেতনতা শুরুর প্রয়োজন ঘর থেকে মানে একজন নারীর কাছ থেকেই।

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.