যে কারনে পর্দার সুফল থেকে বঞ্চিত নারী সমাজ -২
লিখেছেন সাফওয়ানা জেরিন, আগস্ট ২৭, ২০১৬ ১:২৪ অপরাহ্ণ
poro

 

 

করিম সাহেবের স্ত্রী বুঝে পান না, পাশের বাসার ভাবি করিম সাহেবকে দেখলেই ঘোমটা দিয়ে কেন মুখ ঢেকে ফেলেন। পোশাকে তিনি এমনিতেও যথেষ্ট শালীন, তারপরেও এতো লজ্জা কেন পান তিনি। মহিলাকে একটা গেয়ো খ্যাত মনে হয়, করিম সাহেব ভাবি ভাবি বলে এতো আন্তরিকতা দেখান তাও এতোটুকু আক্কল হয়না মহিলার। সেই যে লজ্জা লজ্জাই।

অথচ, করিম সাহেবের স্ত্রী কিন্তু এটা বুঝতে ও অসমর্থ যে – পাশের ঘরের ভাবি যে কারনে নিজেকে আড়াল করে রাখছেন, তা কমবেশি তার জন্যই উপকারি। পরকীয়া কিন্তু টেলিভিশনে দেখা সুন্দরী নায়িকার সাথে হয়না।মানুষ পরকীয়া করলে বেঁছে নেয় হাতের কাছে থাকা মানুষদেরকেই। সেটা হতে পারে প্রতিবেশি, হতে পারে কলিগ। হুমায়ূন আহমেদ যদিও পরে শাওনকে বিয়ে করেছিলেন, তথাপি এই বিয়েটা কিন্তু অসম পরকীয়া প্রেমেরই ফসল। ধর্মে বিয়ের যে ন্যূনতম শর্ত অথবা দ্বিতীয় বিয়ের যে বৈধতা তার মধ্যে কোথাও এমন কথা লেখা নেই যে, পরকীয়া প্রেমকে শুদ্ধ করার জন্যই দ্বিতীয় বিয়ে। বিয়ে বৈধ হলেও পরকীয়া প্রেম অবৈধ।  এতে গুণীজনদের কোন দ্বিমত থাকার কথা নয়। বিগত দিনগুলোতে আমরা অনেক কেইস স্টাডি দেখেছি পরকীয়া প্রেমের বলি হতে। ছোট শিশুরাই এর বড় শিকার।

অনেক দূরে যাবো না। ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সালের পত্রিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় পরকীয়া প্রেমের জেরে নিজের দুই মেয়েকে নদীতে ফেলে হত্যা করছে  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের মো. মনির হোসেন (৩২)।উপজেলার শরীফপুর গ্রামের মনির হোসেন স্ত্রী ও তিন সন্তানের কথা গোপন করে অষ্টম শ্রেণির এক মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তারা বিয়ে করার সিদ্ধান্তও নেয়। মনির তার প্রেমিকার কাছে নিজেকে অবিবাহিত প্রমাণ করতে বিবাহিত জীবনের সব চিহ্ন মুছে ফেলার পরিকল্পনা করেন। সে অনুয়ায়ী ১৪ জানুয়ারি দুই মেয়ে মারিয়া (৬) ও সামিয়াকে (৪) ভৈরব ব্রিজে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে বের হন। পরদিন একা বাড়িতে ফিরে আসে মনির। দুই মেয়ে কোথায় জানতে চাইলে স্ত্রী রত্নার সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়। বিষয়টি শুনে এলাকার মানুষ গত ২৭ জানুয়ারি কৌশলে মনিরকে আটক করে পুলিশে দেয়

২০১৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারির পত্রিকার খবরে আমরা জানতে পারি শিশু মাহফুজের মৃত্যুর খবর। প্রতিবেশি শামেলার সঙ্গে মাহফুজের বাবা জাহাঙ্গীরের ৩০ বছরের পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। একদম ছোট শিশু ২ বছরের মাহফুজকে এই প্রেমের বাঁধা মনে করে সরিয়ে দেন ঘাতক পিতা।

২০১০ এর ৪ আগস্ট এর পত্রিকায় আমরা দেখি, তানহা নামের এক শিশু পরকীয়া প্রেমের ফসল মায়ের নতুন সংসারে কাঁটা হয়ে ওঠে। খিলগাঁওয়ের বাসার কার্নিশে তার পচে যাওয়া লাশ উদ্ধার করা হয়।

মায়ের পরকীয়ার বলি হতে আমরা আরও দেখেছি শিশু সামিউলকে। বস্তাবন্দি অবস্থায় যার লাশ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিলো।

লেখার শুরুতেই করিম সাহেবের স্ত্রীর পাশের বাসার ভাবির পর্দাকে লজ্জা বা সঙ্কীর্ণতা হিসেবে আক্ষা দিতে দেখেছিলাম আমরা। পাঠকের কাছেই প্রশ্ন, এই ঘটনাগুলো জানার পর সেই পর্দাকে লজ্জা বা সঙ্কীর্ণতা বলার সুযোগ কতখানি থাকছে?

বলা হয়, আগুন আর মোম যেমন পুরুষ আর নারী ও তেমন। আগুন ও মোমকে জ্বালানোর কারন যেমন জানেনা, মোম ও জানেনা, কিসের নিমিত্তে তার গলে গলে শেষ হয়ে যাওয়া। তেমনই পুরুষ আর নারী ও জানতে পারেনা, কিন্তু একদিন সংসার সন্তান জ্বালিয়ে রেখে যায় এই পরকীয়া।

কথায় বলে- prevention is better than cure. তাই পরকীয়াকে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করতে নারী পুরুষ উভয়েরই সতর্ক হতে হবে। এই সতর্কতার প্রথম এবং অন্যতম পদক্ষেপই হতে পারে পর্দা বা চলনে বলনে সংযত আচরণ ।

পর্দা মানেই বড় ঘোমটা দিয়ে লোক দেখানো নয়, পর্দার একটা চেতনা আছে, আছে একটা বোধ। অন্য পুরুষের বা নারীর সাথে কথাবার্তা মেলামেশার ক্ষেত্রে সংযত এবং প্রয়োজন মাফিক ওঠাবসা কথাবার্তা ও একধরণের সুরক্ষা।

এক আপু কল সেন্টারের খুব লোভনীয় চাকরী ছেড়ে দেওয়াতে জিজ্ঞেস করেছিলাম- কেন ছাড়লেন চাকরী ? উত্তরে তিনি বলেছিলেন- এখানে কে কতো বেশি নখ পালিশ করতে পারে আর বসের মনোরঞ্জন করতে পারে সেটাই বড়। মেধার বা কাজের কোন মূল্য নাই। তাই ঢাবি ছাত্রী হিসেবে এটা আমার জন্য অসম্মানজনক মনে হয়েছে।

আমাদের সমাজের দুই ধরণের চিত্র আছে। এক শ্রেণী হাত পা পর্যন্ত মোজা দিয়ে ঢেকে রাখছে, অন্য শ্রেণী দেশীয় সংস্কৃতি বিরোধী পোশাক পড়ছে। দুই শ্রেণিই নারী, পুরুষকে কখনো হাতা কাঁটা কিংবা পা দেখানো জামা কাপড় পড়তে দেখা যায় না। হাতাওয়ালা শার্ট, ভারি স্যুটেই তাদের আভিজাত্য। কিন্তু নারীর? নারীর এই আভিজাত্য কারা কেড়ে নিচ্ছে?

পর্দা মানেই সংযত চলাফেরা। বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ জীবন সঙ্গীর অথবা সম্পর্কের সাথে সততা রক্ষা করা। শুধুমাত্র বোরখা বা কাপড়ের আধিক্যেই পর্দাকে বাঁধা যায়না। পর্দা মানে দৃষ্টি শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ, কথাকে নিয়ন্ত্রণ করা। দুই টুকরো কাপড়ে পর্দাকে বেঁধে ফেলা যায় না।

পর্দাকে বেশিরভাগ সময়ই ধর্মীয় গোঁড়ামি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।কিন্তু পরকীয়া , অনৈতিকতা, মানব হত্যার  সুলক সন্ধানে দেখা গেছে এই অসংগত চলাফেরাকেই।

 কখনো কখনো চাকরীর ইন্টার্ভিউতেও হিজাব নিয়ে হেনস্থা হওয়ার ঘটনা আমাদের কাছে ডাল ভাতের মতোই।

পুঁজিবাদের ধর্মই হল- যেখানেই সুযোগ পাবে নিজের জন্য ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি করা। নারী দেহ পুঁজিবাদের সেই ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির বদলে যখন নারীকে অব্জেক্টিফাই করা হচ্ছে দেহ দিয়ে তখনই নারী আচরণ থেকে শুরু করে দৈহিক পর্দাকে ধারণ করতে পারছেনা।

কারন, এই পৃথিবীতে টিকে থাকাই বড় ব্যাপার। আর পেশাগত ক্ষেত্রে টিকে থাকার জন্য অবাধ মেলামেশা করতে হচ্ছে। ফলে, কর্পোরেট নারীরা পর্দার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নিজেরাও পরকীয়ার শিকার হচ্ছে কখনো অন্য নারীর দ্বারা, আবার কখনো নিজেরাই কারো ঘর ভাঙ্গার কারন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

 

( চলবে) 

পোস্টটি ১৪৮৮ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
৩ টি মন্তব্য

Leave a Reply

3 Comments on "যে কারনে পর্দার সুফল থেকে বঞ্চিত নারী সমাজ -২"

Notify of
avatar
Sort by:   newest | oldest | most voted
পি
Member

“পর্দা মানেই বড় ঘোমটা দিয়ে লোক দেখানো নয়, পর্দার একটা চেতনা আছে, আছে একটা বোধ। অন্য পুরুষের বা নারীর সাথে কথাবার্তা মেলামেশার ক্ষেত্রে সংযত এবং প্রয়োজন মাফিক ওঠাবসা কথাবার্তা ও একধরণের সুরক্ষা। “

লোরাক্স
Member

অনেক ভাল লিখেছেন।
সমাজে এত অমানবিক আর ভয়ংকর ঘটনা ঘটছে কিন্ত তা সমাধানের
িসঠিক পদক্ষেপ নিতে দেখা জাচ্ছে না।

অর্ফিয়ুস
Member

একটা আদর্শ বা থিওরি, যতই লোকনন্দিত হোক না কেন, সমাজে এর বিপরীত আচরণকারী মানুষ থাকবেই। তাদের জন্য কোন নির্দেশনা? বা যারা নিয়ম মেনে চলছে, তারা কি করে নিয়মের বিপরীত মতের উপস্থিতিতেও সমাজের ভারসাম্য ঠিক রাখবে, এই ব্যপারে ভাবা দরকার।

আরেকটা কথা, ‘পর্দা’ তো নারী পুরুষ উভয়ের। শিরোনামে এ শব্দটি থাকলেও ভেতরে শুধু হিজাব নিয়ে কথা হতেই দেখলাম। নাকি আমার ভুল হয়েছে?

wpDiscuz