যে কারণে মেয়েদের শুধুই গৃহিণী হওয়া অনুচিত ( পর্ব- ২)
লিখেছেন সাফওয়ানা জেরিন, অক্টোবর ৮, ২০১৫ ১০:৫৯ অপরাহ্ণ

mn

– পেটের দ্বায় না থাকলে কী আর পিঠা বেচতে বসতামরে মা। 
পিঠা বিক্রেতা মহিলার কথাটা শুনে একটু মায়াই লাগলো। সেই শিল্প বিপ্লবের সময় নারী ঘর থেকে পেটের দ্বায়ে বের হয়েছিলো, আজ ও বের হতে হয়। আসলে পেটের দ্বায় না থাকলে মেয়েরা চায় ও না বাসা থেকে বের হতে। কয়দিন আগে সদ্য ডিভোর্স পাওয়া এক নারী মডেল ও বলল- একটা সুন্দর সংসারের স্বপ্ন সব মেয়েরই থাকে। দেরীতে হলেও সব শ্রেণীর নারী হোক গায়িকা, নায়িকা, প্রেমিকা সবাই এই সত্যতা উপলব্ধি করেই। 
পেটের দ্বায়ে পিঠা বিক্রি করা কিংবা অন্য কোন কাজ করা নারীদের কথা বাদ দিলে বেশীরভাগ নারীই বর্তমানে বেতনের মোটা অংকের টাকাটা ফ্যাশন হাউজ আর পার্লারে ঢালে। টাকা ঢালে বাচ্চার পেছনে, তার বুয়ার ব্যবস্থা হয় নারীর টাকাতেই। এরচেয়ে বেশী আর কী হয় নাগরিক ভোগবাদী নারীর চাকরি দিয়ে? ব্যাংকে কিংবা পুরদস্তুর কর্পোরেট সেক্টরে মেয়েদের কাজ করাটা সংসারের প্রয়োজনে হলে সমর্থন যোগ্য। কিন্তু শুধুই ভোগের চাহিদা মেটানোর জন্য হলে এই চাকরী দিয়ে সমাজ খুব বেশী উপকৃত হতে পারেনা। 
কিন্তু তাই বলে আমি এটাও সমর্থন করিনা যে ২৪ ঘণ্টাই ঘরের কাজ নিয়ে পড়ে থাকতে হবে। দক্ষতা থাকলে রান্নার কাজ অনেক গুছিয়েও করা যায়। অথচ, বেশীরভাগ গৃহিণীকেই দেখা যায় রান্নাকে এক মহাযজ্ঞে পরিণত করেন। এক ঘণ্টার যায়গায় ৫ ঘণ্টা নষ্ট করেন। সময়ের মূল্যায়ন তাদের কাছে খুবই কম। ঠিক তেমনি সংসারের বাদবাকি কাজগুলোতেও ধীর স্থিরতা ও দেখা যায়। কারণ বেশীরভাগ কাজই চলে সিরিয়ালে চোখ বুলাতে বুলাতে, অথবা অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিংবা মোবাইলে খোশ গল্প দিতে দিতে।
পাটা পুতার বদলে ফুড প্রসেসর এসে যেমন সময় বাঁচিয়ে দিয়েছে মোবাইল টিভি এসে তেমন সময় নষ্ট করার উপায় ও বাতলে দিয়েছে। প্রযুক্তির সুফল কুফল মূলত ব্যবহারের উপরই খুব বেশী নির্ভরশীল। 
আপনাকে পুরদস্তুর গিন্নীই হতে হবে, তার বাইরে আপনি সমাজ নিয়ে ভাববেন না, এমন কথা কেন ভাবছেন?
আবার একবার চাকরি পেলে সংসার সন্তান সব বানের জ্বলে ভাসিয়ে মাস শেষে ব্যাগ ভর্তি টাকা নিয়ে আসলেই সব দায়িত্ব পূর্ণ হয়ে যাবে সেটা ভাবাও অযৌক্তিক। 
ভারসাম্যপূর্ণ জীবনে আসুন হে প্রিয় বোন। আপনি যদি অনেক বেশী উদ্যমী হন, অনেক বেশী গোছানো হন , টাইম ম্যানেজমেন্টের ব্যাপারে এক্সপার্ট হন, এবং সেই সাথে যদি সংসারে আপনার অর্থের প্রয়োজন হন, আপনি কর্পোরেট লাইফে আসতে পারেন। তবে, সন্তানের নৈতিকতা আর প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ার কাজে কোন প্রকার ছাড় না দিয়েই।
আর যদি আপনার সেই সামর্থ্য না থাকে অথবা প্রয়োজন না থাকে আপনি গৃহিণী হয়েও এমন কিছু সামাজিক কাজ করতে পারেন যেটা দিয়ে আপনার দ্বায়বদ্ধতার যায়গায় পরিস্কার থাকতে পারেন। যেমন একটা হতে পারে স্কুলে পড়ানো। কিংবা সেটা যদি না পারেন হয়তো আপনি ভালো কুরআন পড়তে পারেন, কিছু মহিলাকে বাসায় ডেকে সেটাই শেখান না।
ধরুন আপনার পরিচিত কিছু দুস্থ মহিলা আছে। তাদের কিছু দক্ষতা ও আছে। তাদেরকে একত্রে করে একটা ব্যবসার উদ্যোগ নেন না। আপনার শিক্ষাটা তাদের পথ দেখাতে পারে, যেই গাইডলাইনের অভাবেই হয়তো এই মহিলারা বিপথগামী হচ্ছে, কিংবা না খেয়ে মরছে। আপনার একটা পরিচিত বড়লোক সার্কেল আছে। তারা হয়তো ব্যাংকে পয়সার স্তুপ জমিয়েছে। চাইলেই কিছু পয়সা খরচ করে মেয়েদের একটা ইয়াতিম খানা, দুঃস্থ মেয়েদের একটা আশ্রয়স্থল খুলে দেওয়া কোন ব্যাপার না। আরও কয়েজনকে সাথে নিয়ে তেমন একটা কিছু করুন আপনার শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সংসারের ফাঁকে ফাঁকে। শিক্ষাটা কী আর ফেলনা পড়ে থাকতে পারে তখন?
চাকরী না করতে পারলেই আমরা শিক্ষিত মেয়েরা হতাশ হয়ে যাই। বাচ্চার উপর সংসারের উপর আমাদের চলে আসে অপিরিসিম বিরক্তি। অথচ, আমরাই যে সমাজ গড়ার কারিগর, আমরাই যে মায়ার কেন্দ্রবিন্দু। আম পাশের ঘরে কেউ না খেয়ে থাকলে ঘরের কর্তাকে তার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার কথা আমাদেরই। আমাদেরই যে মানুষের নৈতিকতা গড়ে তোলার কথা, শুধু অফিসে বসে টাকা গুনলেই যে আমার শিক্ষার ষোলকলা উশুল হয়না তা যেন আমরা ভুলেই যাই। 
মার্কিন নারীবাদী শার্লোট পারকিনস গিলম্যান মনে করেন ঘর ও শিশুদের শিক্ষালয়গুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার মত কাজগুলো যদি কোনো বিশেষ সংস্থার পেশাদার কর্মীদের মাধ্যমে করানো হয় তাহলে নারীরা নিশ্চিন্তে ঘরের বাইরে যেতে পারবেন এবং সহজেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক ততপরতা চালাতে পারবেন।
অথচ, শুধু বিশেষ পারদর্শী চাকর ঘরে আনা আর আয় করে বস্তা বস্তা মেকআপ কেনাই যে জীবনের মূল লক্ষ্য নয় তা কে বোঝায় এই নারীবাদীদের।
স্ত্রী যখন সামাজিক কাজ করবে তখন স্বামীকে তার সাথে সাহায্য ও করতে হবে। তাহলেই স্ত্রী চার দেয়ালে আটকে না থেকে সমাজকেও কিছু দিতে পারবে। সমাজকে পুরুষ জীবিকার সন্ধান দিলে নারী দিবে নৈতিকতার উৎকর্ষ। দায়িত্বটা ও এইভাবেই ভাগ হয়েছে। হযরত আলী ঘরের চুলার জন্য লাকড়ি বয়ে আনতেন, ঘরের জন্য পানি আনতেন এবং ঘরে ঝাড়ু দিতেন। অন্যদিকে ফাতিমা (সা.) আটা বানাতেন, খামির করতেন ও রুটি তৈরি করতেন।ইসলাম গৃহস্থালী কাজ করার দায়িত্ব কখনও নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়নি। তবে নৈতিক উপদেশ হিসেবে ঘরের কাজ করতে সক্রিয় বা উদ্যোগী হওয়ার জন্য নারীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এবং এ ধরনের কাজ করাকে ইবাদতের সমতুল্য বলে উল্লেখ করেছে। 
এবং এরপরেও নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ফাতিমা বাবার সাথে যুদ্ধের ময়দানে  গিয়েছেন।  তারপরেও কী বলবেন নারীর শুধুই গৃহিণী হওয়া উচিৎ? একজন নারীকে হতে হবে সব গুণে গুণান্বিত। পরিবার ও সমাজের প্রয়োজনের মাঝে ভারসাম্য বজায় রেখেই।

 
 
 
পোস্টটি ২৭৭৭ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.