মেয়েদের কি বিয়ের আগেই প্রতিষ্ঠিত হতে হবে!
লিখেছেন সাফওয়ানা জেরিন, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০১৫ ১১:১১ অপরাহ্ণ

est একটা ছেলের যদি বিয়ের যোগ্যতা কিংবা প্রতিষ্ঠিত হওয়া যদি হয় – ব্যাংকে টাকা, ঢাকায় বাড়ি, বাড়ির সামনে গাড়ি , তাহলে একটা মেয়ের ও বিয়ের আগে যোগ্যতা হতে হবে ঠিক এমনই। জী না পাঠক! ভুল বুঝছেন। কথাগুলো ঠিক আমার নয়। অধুনা একটি ফেয়ারনেস ক্রিমের বিজ্ঞাপন আপনাকে আমাকে এই হিসাব কিতাব শেখাচ্ছে। এবার আসা যাক, এই কথার সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে। বাংলাদেশে ছেলে বা মেয়ের প্রতিষ্ঠিত হওয়া বলতে যা বোঝায় সে পর্যায়ে পৌছাতে আনুমানিক কতদিন লাগে? জানতে চেয়েছিলাম বিবাহিত মহিলাদের কাছে। কারন, জীবনে প্রতিষ্ঠিত স্বামী পেয়েছেন কিনা সেই মূল্যায়ন তারাই সঠিক ভাবে করতে পারেন। আসলে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বলতে কিন্তু তিন বেলা খাবার, মাথার উপরে ন্যূনতম একটা ছাদ, কিংবা ভদ্র সমাজে বসবাস যোগ্য পরিধেয় বস্ত্রের সংস্থানকেই বোঝায় না। প্রতিষ্ঠিত বলতে যা বোঝায় তার আসলে নির্দিষ্ট কোন মাপকাঠি এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। কারন, এটা সম্পদের সাথেই খুব সম্পর্কিত। আর সম্পদ দিয়ে কোন অভৌত জিনিষের মূল্যমান নির্ধারণ কিন্তু বেশ কঠিন। যাই হোক, বিবাহিত মহিলাদের দৃষ্টিতে একটা ছেলে ৩৫ বছর বয়সে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, বিশেষত মধ্য বিত্ত পরিবারের ছেলেরা। আলোচ্য বিজ্ঞাপনের ভাষ্য হলো , বিয়ের আগে মেয়েদের ও প্রতিষ্ঠিত হওয়া চাই। কিন্তু প্রশ্ন হল, বিয়ের পরে কি প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায় না? এর পেছনে লুকিয়ে আছে বিশাল এক তত্ত্ব। যে সমাজে বিয়ের পরে একটা মেয়ে প্রতিষ্ঠিত না হতে পারে, সেটা সে সমাজের জন্য কিন্তু বেশ বড় চিন্তার বিষয়। তারমানে যে মেয়েটার লেখার হাত ভালো, বিয়ে হলো মানেই তার পাঠক কমে যাবে , প্রকাশকরা তার বই প্রকাশে অনাগ্রহ জানাবে , কেননা এখানে তাদের মধু খাওয়ার আর খাতির জমানোর উপরি আশা ভণ্ডুল, ঠিক যেমন সিনেমার নায়িকাদের বিয়ে মানেই ক্যারিয়ারের চরম ধস! যে নারী সাংবাদিক হবে, আগেই তার বিয়ে হয়ে গেলে বস তাকে কাজে রাখবেনা। কারন যখন তখন তাকে সেক্সুয়ালি হ্যারেজ করার সুযোগ থাকছেনা বিয়ের কারনেই। তারমানে প্রতিষ্ঠিত হওয়া কিন্তু অধরাই। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো কর্পোরেট সেক্টরে মেয়েদের অবিবাহিত হওয়ার উপরে আলাদা কোঁটা থাকবে। যতো বছর অবিবাহিত থাকবেন , ততবছর এই এই সুবিধাগুলো পাবেন। কারন, বিবাহিত মেয়ে মানেই তার বাচ্চা হবে। এরপর মাতৃত্বকালীন ছুটি দাও, মা হিসেবে বিভিন্ন সমস্যা বিবেচনা করো! এই ঝামেলায় কে যায়! এই ক্রিম কোম্পানির বিজ্ঞাপন বোঝায় মেয়েরা বিয়ের পর প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেনা! সুতরাং যা খুশী জলাঞ্জলি দাও কিন্তু বিয়ের আগে অন্তত প্রতিষ্ঠিত হও! অথচ, যে প্রকৃত নারী হিতৈষী সে এইভাবে ঘুরিয়ে কখনোই নারীর বিয়ে কিংবা পারিবারিক জীবনের বিরুদ্ধে এহেন প্রচারণা চালানোর কথা নয়। বিয়ে হলেই ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায় না। বরং উপযুক্ত জীবন সঙ্গী, সাপোর্টে জীবন চলার পথ আরও মসৃণ হতে পারে। আর না হলেও খুব ক্ষতি নেই। যে নারীর কিছু করার স্বপ্ন আছে, সে সংগ্রাম করে ঠিক ঠিক বেরিয়ে আসে, সেটা বিয়ের আগে হোক কিংবা পরে। তার জলজ্যান্ত উদাহরণ বেগম রোকেয়া নিজেই। আর বিয়ের বয়সটা বাড়লে হয়তো প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায় ঠিক! কিন্তু ততদিনে মেয়ের কপালে আইবুড়ো কিংবা ধাড়ি মেয়ের তকমা লেগে যায়। তখন দেখা যায়, যার এই প্রতিষ্ঠা দিয়েও দশ জনের কথার থেকে নিস্তার পাচ্ছে না মেয়েটি। আবার ওদিকে বেশী বয়সে বিয়ের ফলস্বরূপ চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় মাতৃত্বকালীন জটিলতায় ভোগা মেয়েদের সংখ্যা ও কম নয়। “প্রতিষ্ঠিত হওয়া “এই বিশেষণটি নারী আর পুরুষের ক্ষেত্রে এক করে দেখার কোন সুযোগ ও কিন্তু নেই। সারাদিন ব্যাংকে কাজ করে মাস শেষে ৫০ হাজার টাকা আয় করাই নারীর প্রতিষ্ঠা পাওয়ার একমাত্র নির্ণায়ক হতে পারে না। একজন নারী একজন মা, একজন স্ত্রী, একটা বাড়িকে ঘর বানিয়ে দেওয়া ব্যক্তি। তার প্রতিষ্ঠাকে শুধু টাকার অংকে মাপা যায় না। তার ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা আর সন্তান গঠন এবং তাদের উত্তম চরিত্র ও তার প্রতিষ্ঠা, শান্তির গৃহকানন ও তার প্রতিষ্ঠার নির্ণায়ক। সুতরাং, পুঁজিবাদীদের এইসব কথার ফাঁদে পা দিতে যেয়ে প্রিয় নারী সমাজ টাকার অংকে প্রতিষ্ঠাকে বিচার না করাই বুদ্ধিমতির কাজ হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা ফর্সা কালোর ভেদাভেদের মতোই, এই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কথিত অপ্রতিষ্ঠিত নারীদের নিজেদের নিচু অবস্থানের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিবাহিত নারীদের হতাশা তৈরি করে দিচ্ছে খুব সুক্ষভাবে। মনে মনে অনেকেই এই বিজ্ঞাপন দেখে ভাবেন- আহ! আমার প্রতিষ্ঠিত হবার দিন তো চলেই গেছে! আমার তো জীবন শেষ! আর অপরদিকে যে ছেলেরা অবিবাহিত তাদের কিংবা তাদের পরিবারিক তথা সামাজিক গণ্ডিতে কথিত প্রতিষ্ঠিত মেয়ের ব্যাপারে লালসার জন্ম হচ্ছে। যেটার ফলাফল খুব ভালো হবে না। কারন, সমাজের দৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠা যাকে বলে, বিয়ের সঠিক সময়ে একটা মেয়ের তা অর্জন করা বাংলাদেশে প্রায় অসম্ভব বললেই চলে। আর যে সমাজে বিয়ে দুর্লভ সে সমাজে পাপাচার নিজেই খুঁজে নেয় তার নিজস্ব শীর্ষস্থান।

পোস্টটি ৮০৩ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
৪ টি মন্তব্য
৪ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. চমৎকার একটা টপিক। মাঝে একটু প্যারা করে দেয়া থাকলে ভালো হতো!

  2. হুম, সুন্দর উস্থাপনা।

  3. আমার কি মনে হয় জানেন! ইউনিলিভার তাদের উৎপাদিত প্রোডাক্ট আর নারীকে সমান ব্যবসায়ীক পন্য বলে প্রমান রাখতে চায়।

  4. খুবই চমৎকার লেখা, তবে- এসব নিয়া আর কিছু কইবার মন চায় না। কে শুনতাছে কার কথা? মেয়ে একবার চাকরিতে নামলে খালি শ্বশুর বাড়ি কি বাপের বাড়ির মানুষও লোভী হয়া যায়। সবই টাকার নেশা! so called প্রতিষ্ঠীত। কোনো লক্ষ্যই নাই যাদের!

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.