ফেয়ারনেস ক্রিমের বিজ্ঞাপনের কাছে আমরা পরাজিত
লিখেছেন সাফওয়ানা জেরিন, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৪ ১১:৫৬ পূর্বাহ্ণ

download (2)

ফর্সা হতে যেয়ে গোঁফ গজিয়েছে তিন্নি নামক এক মহিলার , পুরানো খবরের পাতা খুঁজতে খুঁজতে লেখাটা দেখে থমকে দাড়াই। ফর্সা হওয়া কি এতোটাই জরুরী? যে নিজের নারীত্বকেও বিকিয়ে দিতে হবে?
আপনারা নিশ্চয়ই ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির ৫ কোটি টাকার চ্যালেঞ্জের বিজ্ঞাপনটি দেখেছেন! ইদানিং বেশ চলছে। মনে আছে? পাড়ার মোড়ে বিক্রি করা দাউদ একজিমার দশটাকা দামের ক্রিমের কথা? সারাক্ষণ একটা মাইক বাজত- চুলকানি ভালো না হইলে টাকা ফেরত পাবেন!

ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি ব্যবসার জন্য নিজেকে সেই সস্তা স্তরে নামিয়েছে, খালি পার্থক্য একটাই! ৫ কোটি টাকা! টাকার পরিমাণ শুনেই তো বঙ্গ ললনার মাথা ঘুরাবে ,চ্যালেঞ্জ আর কি দিবে বা নিবে !

ফর্সা হতে যেয়ে যেই মহিলার গোঁফ গজাল , তিনিও নাম না জানা কোন এক ফেয়ারনেস ক্রিমের শিকার হয়েছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে , টাকা খরচ করে বিষ কিনে খেলে বিষ বিক্রেতার কোন দ্বায় লাগেনি আপনাকে তার ক্ষতিপূরণ দিবে। ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীর এই ৫ কোটি টাকার চ্যালেঞ্জ ও তেমনই একটি তামাশা বটে।

ফেয়ারনেস ক্রিমগুলো কোন ক্ষতিকর পয়জনের চেয়ে কম কিছু নয়। ফর্সা বানানোর জন্য এগুলোতে ব্যবহার করা হয় পারদ। যদিও পারদ ব্যবহারের সহনীয় মাত্রা ১ পিপিএম ধরা হয় । আর আমাদের দেশের ফেয়ারনেস ক্রিমগুলোতে পারদের পরিমাণ যে কোন উন্নত দেশের কস্মেটিক্সকেই হার মানাবে।
ফেয়ার অ্যান্ড লাভলিতে এই পারদের পরিমাণ ৪১৭৫ পিপিএম।

মানব দেহের জন্য পারদ অত্যন্ত ক্ষতিকর । পারদ খুব সহজেই ত্বকে প্রবেশ করে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে জমতে থাকে । পারদের আধিক্যে নষ্ট হয়ে যেতে পারে কিডনি। যায়।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে জানা যায় আফ্রিকায় এক স্টাডিতে দেখা গেছে পারদযুক্ত ফেয়ারনেস ক্রিম বা সাবান ব্যবহারকারী মহিলারা যারা নেফ্রোটিক সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়েছিলেন তাদের প্রায় ৭৫% এ রোগ থেকে মুক্তি পেয়ে গেছেন শুধুমাত্র এসব প্রসাধনী ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়ায়।
পারে।সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো গর্ভবতী মায়েদের এসব ক্রিম ব্যবহারের কারণে তাদের গর্ভস্থ শিশুর ব্রেন ডেভেলপমেন্ট বেশ ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।

দুঃখের বিষয় হল – অনেক লেখালেখি আর প্রচারণা সত্ত্বেও বাংলাদেশে ফেয়ারনেস ক্রিমগুলোর বিক্রি দিনদিন বাড়ছেই।
বাংলাদেশের মত গরীব দেশেও বছরে শুধু ফেসক্রিমই উৎপাদন হয় প্রায় ২৮০ মেট্রিক টন! তারমানে বোঝাই যাচ্ছে সাধারণ মানুষ এই প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনগুলোতে খুব বেশী আকৃষ্ট হচ্ছে। আর ব্যাপারটা যখন ৫ কোটি টাকার , তখন আমার আপনার মতো আমজনতা , মধ্যবিত্ত মানুষ তো ৫ কোটির শেষে কয়টা শূন্য হয় , তাই জানেনা অনেক সময়।
এমন একটা শকিং আম্যাউন্ট বললে মানুষ ভেবেই নেয় , এতো বড় বুকের পাটা যেহেতু নিশ্চয়ই দেয়ার ইজ সামথিং! নিশ্চয়ই এই ক্রিম দিলে সত্যিই ফর্সা হওয়া যায়।

কিন্তু বিজ্ঞাপনে যেমন রাতারাতি ফর্সা হওয়া দেখায় , তেমন যদি হতো বা কিঞ্চিৎ ও যদি হতো তাহলে এতদিনে বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষ সাদা হয়ে যেতো । যা হয়নি।

আর হলেও এক সমস্যা । রোগ না থাকলে যেমন রোগী ডাক্তারের কাছে যাবে না , তেমনি কালো মানুষ না থাকলে তো ফেয়ারনেস ক্রিমের ও বেচাকেনা হবেনা। তাই বছরের পর বছর শুধু রঙের পূজারী বাঙ্গালীকে এই ক্রিমগুলো দাস বানিয়ে রেখেছে।
এই ক্রিমগুলো আমাদের শেখায় আমাদের গায়ের রঙটাই আসলে সব। এই রঙ রক্ষায় মেয়েরা যেন বাহিরে না খেলতে যায় , রোদে পুরে কালো না হয়ে যায়, পাহাড় পর্বত ডিঙ্গাতে না চায় , মানে শুধুই রঙ বাঁচানোর জন্য আমরা ঘরের শো পিস হয়েই যেন থাকি!
আমি ভাবতাম , সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এইসব নিয়ে লেখায় মনেহয় একটু হলেও কাজ হয়। কিন্তু ছোটবেলার এক বান্ধুবির আচরণ দেখে এই ধারনা আবার পাল্টে গেলো , আবার লেখতে বাধ্য হলাম। দেখা হওয়ার সাথে সাথেই বান্ধুবি আগের বান্ধুবিরা কে কতো কালো হয়েছে কে কতো সুন্দর হয়েছে , সে কতো সুন্দর তাই নিয়ে গবেষণা করলো! অবশেষে তাহার হবু বরের ছবিখানা দেখতে চাইলে লজ্জায় দেখাতে চাইলো না ,ছেলেটা কালো বলে।
অবশেষে আমি আর না বলে পারলাম না যে কালো সাদা কোন বিষয় না। মানুষের প্রতিভা , মেধা মনন মানসিকতা আর সর্বোপরি স্রষ্টার প্রতি আনুগত্যই তার শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি ।
মাঝে মাঝে এমন ও হতে দেখেছি , বিয়েতে সাদা মেকাপ মাখা মায়ের ছবি দেখে বিয়ের ২০ বছর পরেও নিজের সন্তানরাই মাকে চিনতে পারে না, অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে । হয়তো সন্তানরাও এই হঠকারিতার জন্য মনে মনে মাকে নিয়ে হীনমন্যতায় ও ভোগে । আর এছাড়াও বিয়ের দিনেও এই মেকাপ দিয়ে সাঁজা মেয়েটার যাতনা ও কম নয়। একদিন না একদিন তো শ্বশুরবাড়ির লোক ও আসল রঙ দেখেই ফেলে।
এইসবই প্রমাণ করে, মেয়েদের আসলে ব্যক্তিস্বত্বার কোন দাম নেই। যা দাম শুধু উপরের চামড়াটার। কি শিক্ষিত কি অশিক্ষিত, কি বস্তির কি প্রাসাদের! সমাজের সব শ্রেণীর মেয়েদের মূল্যায়ন এখানেই থমকে গেছে, এইসব গুটিকয় ফেয়ারনেস ক্রিমের বিজ্ঞাপনের কাছে আমরা ভীষণভাবে পরাজিত।

পোস্টটি ৫৯৩ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
৩ টি মন্তব্য
৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. এই ক্রিমগুলো আমাদের শেখায় আমাদের গায়ের রঙটাই আসলে সব। এই রঙ রক্ষায় মেয়েরা যেন বাহিরে না খেলতে যায় , রোদে পুরে কালো না হয়ে যায়, পাহাড় পর্বত ডিঙ্গাতে না চায় , মানে শুধুই রঙ বাঁচানোর জন্য আমরা ঘরের শো পিস হয়েই যেন থাকি! :( :-(

  2. চমৎকার সময়োপযোগী পোষ্ট।

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.