পাত্রী চাই (পর্ব- ১)
লিখেছেন সাফওয়ানা জেরিন, আগস্ট ২৯, ২০১৪ ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ

“ভাই, আমার শালার জন্য একটা পাত্রী দরকার , আপনার জানা শোনা কেউ থাকলে বলবেন।” । “খালাম্মা , আপনার জানা শোনা কোন পাত্রী আছে, বিয়ে শাদী করবো ” কোন বিবাহ করতে ইচ্ছুক যুবক বা বিবাহ দিতে ইচ্ছুক যুবক বা যুবতীর অভিভাভবকের কাছ এই টাইপের কথার সম্মুখীন মোটামুটি তরুণ থেকে শুরু করে মুরুব্বি আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব সবাই হয়।

বিয়ে এবং বিয়ের ক্ষেত্র তৈরি সমাজ জীবনের একটা অপরিহার্য অংশ। আর উভয় পক্ষের আশা ভরসার প্রতীক ঘটক কিংবা মুখরা প্রাণচঞ্চল কোন আত্মীয়। আবার কেউ কেউ একটু আগ বাড়িয়ে মিডিয়া বা দৈনিক পত্রিকার শরণাপন্ন হন। একজন বিবাহযোগ্য পাত্রীর মধ্যে কি কি গুন তার ভালো পাত্রী হওয়ার মাপকাঠি? এই একটি প্রশ্নের উত্তর বের করতে পারলেই বের হয়ে যায় সমাজে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির আসল স্বরূপ।

যেহেতু আমাদের সমাজে একটি মেয়ে জন্মের পর থেকেই তাকে পাত্রস্থ করার জন্য তৈরি করা হয় সুতরাং সমাজের কাছে উপযুক্ত বিয়ের পাত্রীর আদর্শ মাপকাঠি দিয়ে মাপা যায় সমাজে নারীর অবস্থান , এই নারী স্বাধীনতার যুগে কোন পর্যায়ে আছে! দৈনিক পত্রিকা সমূহে বিবাহ বিজ্ঞাপন পাত্র/ পাত্রী চাই এর উপর গবেষণা করেছেন ডক্টর কাবেরি গায়েন।

১৯৯৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত ৪৪৬ টি বিবাহ বিজ্ঞাপনের উপর এই গবেষণা করেন তিনি। তার এই অসাধারণ গবেষণায় উঠে এসেছে সমাজে নারীর মূল্যায়নের এক বাস্তবিক উপাখ্যান। গবেষণায় দেখা গেছে- সবচেয়ে কাঙ্খিত পাত্রী সে যার গায়ের রং ফর্সা। ৪৪৬ টি বিজ্ঞাপনের মধ্যে ২২০ টি বিজ্ঞাপনে অর্থাৎ ৪৯.৩২ ভাগ বিজ্ঞাপনে সরাসরি ত্বকের রং ফর্সা উল্লেখ করা হয়েছে। মাত্র ১৩ টি বিজ্ঞাপনে পাত্রী পক্ষ পাত্রীর শ্যামলা রঙ্গের কথা উল্লেখ করেছে। সুন্দরী , প্রকৃত সুন্দরী, অসামান্য রূপসী, রূপসী, অপূর্ব সুন্দরী এইধরনের বিশেষণ ব্যবহার করে সৌন্দর্যকে  বিজ্ঞাপিত করা হয়েছে ২২২ টি বিজ্ঞাপন, অর্থাৎ ফর্সার চেয়েও বেশী, ৪৯.৭৬% ভাগ বিজ্ঞাপনে। অপরদিকে পাত্রী পক্ষ একটি মাত্র বিজ্ঞাপনে সুদর্শন পাত্র চেয়েছেন। অর্থাৎ- পাত্রী এবং পাত্র পক্ষ নির্বিশেষে সকলেই মনে করে বিয়ের পাত্রীকে অবশ্যই সুন্দরী হতেই হবে, কিন্তু পুরুষের সৌন্দর্য নিয়ে অন্তত পাত্রী পক্ষের মাথা ব্যাথা নেই। মোট ৮৬ টি বিজ্ঞাপনে সরাসরি লম্বা স্লিম বিশিষ্টক ব্যবহার করা হয়েছে।

যা দৈহিক সৌন্দর্যের একটি সূচক। শুধু তাই নয়, পাত্রীর কাঙ্খিত উচ্চতা ও বলে দেওয়া হয় ইঞ্চি ফুট সমেত। আরেকটি সূচক স্বাস্থ্যবতী। অর্থাৎ কোনভাবেই মেয়েটির দৈহিক সৌন্দর্যের কোন দিকই যেন ভুলক্রমে বাদ না পড়ে তাই ৪৯.৭৬% বিজ্ঞাপনে স্বাস্থ্যবতী মেয়ে চাওয়া হয়েছে।   ৪৪৬ টি বিজ্ঞাপনের মাত্র ৪৪ টিতে ভদ্র নম্র মার্জিত পাত্রী চাওয়া হয়েছে, অবশ্যই সুন্দরীও হতে হবে সেই পাত্রীকে। মোট ৪৮ টি বিজ্ঞাপনে ধার্মিক মেয়ে চাওয়া হয়েছে, যা শতকরার হিসেবে মাত্র ১০% !

১০০ বছর আগে এমা গোল্ডম্যানের একটি বিখ্যাত উক্তির কথা মনে পড়ে- পুরুষের আয় আর নারী সম্পর্কে সে দেখতে সুন্দর কিনা এর চেয়ে বেশী কি জানবার আছে? গবেষণার সুবিধার জন্য যদিও সুন্দরী, ফর্সা, লম্বা, স্বাস্থ্যবতী এসব ভাগে ভাগ করা হয়, কিন্তু মূলকথা একটাই দাড়ায়- সেটা হোল দৈহিক সৌন্দর্য এগুলো ভাষার অলংকার, এই অলংকারকে তুলে নিলে যা থাকে তা হোল নারীর দেহ।

বিয়ের বাজারে নারী একধরণের পণ্য। এই পণ্যের দাম নির্ভর করে অন্য পণ্যের সাথে তুলনায় কতো সুন্দর সেই হিসেবে। আর যে ছেলের পকেট যতো ভারি, সে বাজার থেকে ততো বেশী টান দিতে পারবে সুন্দর পণ্যটি তুলে নিতে।

সবাই ফর্সা মেয়ে চায় কারন সাম্রাজ্যবাদীদের প্রকোপে ফর্সা মানেই সুন্দর এই ধারনা দেশে দেশে গেঁড়ে বসেছে।   সব সমাজেই দেখা যায় কালো মেয়েরা সামাজিক, পারিবারিক , রাজনৈতিক দিক থেকে অদৃশ্য, অথচ নির্যাতনের একদম কেন্দ্র বিন্দু।

কাবেরি গায়েনের মতে- তারা সমাজের তলানি।

মলয় রায় চৌধুরীর মতে-” একটি পরিবার যতো ধনী হতে থাকে, তেমন তেমন ফর্সা নারীর সংখ্যা ও বাড়তে থাকে। কালো মেয়ের সংখ্যাধিক্য হয় দরিদ্র পরিবারে। ফর্সা মানে অভিজাত, কালো মানে অনভিজাত। ফর্সা মানে দেবী, আর কালো মানে অসুরকন্যা। সিনেমা থিয়েটারে কেনই বা কালো নায়িকা দরকার হলে ফর্সা সুন্দরী নায়িকাকে কালো রং মাখিয়ে নামানো হয়! কালোর কাছে ফর্সা হোল পিতৃতান্ত্রিক।” (চলবে)

Comments

comments

পোস্টটি ২৩৩২ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
১ টি মন্তব্য