জলকণা
লিখেছেন রংধনু, মার্চ ১৬, ২০১৫ ১:৫৬ পূর্বাহ্ণ

কখনো সময়ের ফাঁকে জেনে রেখো
এই ব্যস্ত শহরে
এতোটুকু অবসরের জন্যে
হন্যে হয়ে থাকা বিকেল গুলোয়
তুমি আমার ছিলে না …

জলকনার আজ মন খারাপ । মন খারাপের দিন গুলো খুব
একা কাটে বলেই হয়তো জলকনার বিছানায় রাখা স্পাইরাল
বাইন্ডিং করা খাতার পাতায় পাতায় ভরা অদ্ভূত সব পংক্তি ।
হয়তো তা কখনোই কবিতা নয় , জলকনা কবিতার অত হিসেব
জানে না , মাত্রা , চরণ নির্মানেও হয়তো ভুল থাকে , তবু
জল লিখে লিখে খাতা ভরিয়ে ফেলে … অনেক আগের
কোন এক সোনা ঝরা সন্ধ্যায় সমুদ্রের
জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলো এক কাঁচের
শিশিতে ভালো লাগার মানুষকে উদ্দেশ্য করে মনের
নিংড়ানো আবেগ , জলকনা সবসময় চাইতো ওর
জীবনে কোন মিরাকল ঘটুক , ওর চাওয়া নিখাঁদ
ছিলো ঠিকই কিন্তু সময় আজকাল বড় পানশে , ডিজিটাল এর
যুগে নাটকীয়তা হয়তো ঘটে কিন্তু রূপকথার
মতো তো নয়ই !
জলকনার অতশত ভাববার প্রয়োজন ছিলো না , সে শুধু
অপেক্ষায় থাকতো উত্তরের , প্রাণপনে বুকের
মাঝে একটা স্বপ্নকে বেঁধে রেখেছিলো ..
উত্তর আসবে নিশ্চয়ই !
যেদিন গুলোতে পরম সত্যিটা মনের
আশেপাশে গুনগুনিয়ে যেতো সেদিন
গুলোতে জলকনার ভারী থমথমে থাকতো মুখ আর
ভারী হতে থাকতো সেই খাতা !
জলকনার প্রিয় বন্ধুটির নাম সমুদ্র , দুজনের পরিচয়
অন্তর্জালের কোন এক বকর বকর বাক্সে , আজ পর্যন্ত
দেখা হয়নি তাদের , জলের তাতে খুব দুঃখ যদিও সমুদ্র
গা করে না , জলকনা যখনি সাক্ষাত প্রসঙ্গ তুলে সমুদ্র
কীবোর্ডে ঝড় তুলে না দেখা হবার সুফল
লিখে লিখে জলকনার ল্যাপটপের স্ক্রীণ
ভরে ফেলে !
সমুদ্র খুব বাউন্ডুলে , মাঝে মাঝেই কই কই যেন ডুব
দেয় , একমাত্র বন্ধুটির এরকম আচরণে জলকনার
বিরক্তি লাগে খুব … অভিমানে মন ভারী হয়ে যায় ..
হবেই বা না কেন ? ওর কি দশটা পাঁচটা বন্ধু আছে আর ?
সমুদ্রের খুব ভাব বেড়েছে , জলকনার মেজাজ
খিঁচে , বিগড়ে যায় , ডুবন্ত সমুদ্রের পাত্তা নেই !
তার ও কদিন বাদে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে আসে জল ।
একবিকেলে ওর রুমের গরাদ ছাড়া জানালায়
দাঁড়িয়ে কাকচক্ষুর মত জলে টুপটুপ পুকুরের
পাড়টা দেখে বসার লোভ হয় খুব ! গ্রামে জলকনাদের
খুব নাম ডাক , এখনো আগে পিছে মানুষের লাইন
পড়ে যায় ওরা গেলে ! এই বিকেলটা কেমন
করে ফাঁকা হলো কে জানে ?
জল পুকুর পাড়ে গিয়ে বসে থাকে ! সমুদ্রের জন্য
মনের ভেতর ঝড় উঠে খুব , ছেলেটা খুব খারাপতো !
সব বোঝে তবু কিছু বলে না কেন ?
হঠাত্ বাঁধ ভাঙ্গে চোখের নদী ! হাঁটুতে মুখ
গুঁজে মনটাকে শান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টায় ক্লান্ত জল
পুকুরের পানি দেখে চমকে ওঠে ! ওতে শুধু ওর
ছায়া নয় , ওখানে আরো কেউ আছে !!
ছায়া হাত বাড়িয়ে দেয় , জল ও কী ভেবে হাত
বাড়ায় …তারপর … জলকনার বাড়িতে শোকের মাতম
ওঠে ! জলকনা যে অন্যরকম মানুষ তা কি আর সবাই
জানতো ? জলকনা যে জলের
মেয়ে সেকথা ভুলেছিলো সবাই একমুহুর্তের জন্য আর
তখনি মেয়ে মিশে গেলো জলে !
গভীর রাতে জলকনা স্থলের পৃথিবী দেখে আর
সারাবেলা জলের !
ওদিকে সমুদ্র জলের সাথে কথা বলতে আকুল
হয়ে আছে , সৈকতে পেয়েছে এক কাঁচের
শিশি ,সাথে ছোট চিরকুট-
‘‘হয়তোবা বারবার ছুটে আসি
বলা হয়না মরমে
নিখুঁত আচড় কেটে
করো তুমি হৃদয়ে ক্ষত নির্মাণ
জলের সায়রে ভেসে তবু
কাছাকাছি আসি
হয়তোবা ভালবাসি…!’’
সমুদ্র জলকে অনেক ভালবাসে , কিন্তু যেদিন
শুনেছিলো জলের
ছেলেমানুষী ভাবনা গুলোকে নিজেকে শামুকের মত
খোলকে আটকে রেখেছিলো !
সত্যি কথা বলতে দোষ নেই , নিষ্পাপ জলের একটু
খানি ভালবাসা পাবার আকাঙ্খা গুলো বেশ উপভোগ করত
সমুদ্র ! কাকতালীয় হোক আর যাই হোক , জলের
ভাসানো কাঁচের শিশি যখন সমুদ্র
হাতে পেলো বুঝতে আর বাকি থাকেনা সমুদ্রের
হয়তো ওদের মাঝে কিছু সত্যিই আছে ! জলকে ছোট
ছোট বার্তা পাঠায় সমুদ্র
THERE IS SOMETHING CALLED MIRACLE , YOU CANT
IGNORE OR EXPLAIN IT…..
জলের দেখা নেই ! সমুদ্র কষ্ট পায় , রাতের পর রাত পিসির
স্ক্রীণে তাকিয়ে থাকে এই বুঝি জল এলো ! কিন্তু
অভিমানী জলকন্যার দেখা মেলে না !
সমুদ্রের ইচ্ছে করে ছুটে বেড়িয়ে যেতে ,
কোথায় তুমি জলকনা ? কোথায় ??
হতচ্ছাড়া চোখের জলে সমুদ্রের বালিশ ভিজে যায় ,
ঝাপসা হয়ে যায় বইয়ের পাতা !
জলজোছনার রাতে জলকণা স্থলে ফিরে আসে ।
জোছনার আগের রাতে জলপৃথিবীটা কেমন অসহ্য
ঠেকতে থাকে জলকণার কাছে , সব ওলট পালট লাগে ,
জলের ভেতরে ঝড় ওঠে , ঝড়ের কারণটা অবশ্যিই
সমুদ্র । কোথাকার কোন অপরিচিত একজনের
জন্যে অপেক্ষা করতে করতে অতি আপন
সমুদ্রকে কাছে টেনেও টানে নি , সমুদ্র ও
ঠেলেছে দূরে কিন্তু
সে রাতে জলকনা বুঝতে পারে যার জন্য
এতো আয়োজন সে সমুদ্রই , সমুদ্র ছাড়া আর কেউ
নয় ।
জলের গ্রামের বাড়ীর সেই পুকুরের শান
বাঁধানো ঘাটে জলজোছনার গভীর রাতে এক সুপুরুষ
বসে ছিলো , তার চোখেও জলের খেলা !
জল তখনো ভাবেনি তার অতি ভালবাসার সমুদ্র তার সামনেই
বসে আছে ! সমুদ্র চোখে জল নিয়ে আবেগে দু হাত
বাড়ায় , জলকণা আমার ঘাট হয়েছে , কানে ধরছি আর ডুব
দেবো না ! সেকি ! আমায় চিনতে পারো নি ? আমি সমুদ্র !
জল ছাড়া কি সমুদ্র বাঁচে ?
জলকণা একবার হাসে , একবার কাঁদে ! আনন্দ অশ্ম্রু
জোছনার নীল আলোয় চিক চিক করতে থাকে !
***
নীরা এই সমস্ত আবোল তাবোল শুধু তোমার পক্ষেই
লেখা সম্ভব ! এটা কি হলো , রূপকথা না কি ?ধ্যুত্ টাইম নষ্ট !!
ছোট্ট করে মেইল পাঠালো সায়ন ।
নীরার চোখের জলে তখন ল্যাপটপের
স্ক্রীনে থাকা ছোট ছোট লেখা গুলো অস্পষ্ট হয় !
নীরা চোখ মুছতেই তা আবার জলে ভরে যায় ,
পৃথিবীতে একমাত্র সায়নই
হয়তো আছে যে তাকে এতো কাঁদানোর অধিকার
রাখে ! পাল্টা মেইলের উত্তর পাঠায় নীরা ..
কোন একদিন
এক সোনা ঝরা বিকেলে
সমুদ্রের পাড়ে বসে
একটু কি তোমার দৃষ্টি খুঁজবে আমায় ?
একটু কি ঝরাবে জল ?
একটু কি ভাববে ,
কেউ চেয়েছিল একসাথে থাকতে এই বিকেলে …
ভালবেসেছিল বলে …
মেইল পেয়ে খানিক্ষণ হাসে সায়ন ! নাহ্ মেয়েটা পাগল
আছে , এই পাগল মেয়েটাকে ও
কতোটা ভালবাসে তা কি করে বলবে ও ? ওর
তো এতো কাব্য আসে না !
ধুর সব ভালবাসায় কাব্য লাগে না ! হাসতে হাসতে নীরার
মেইলের উত্তর দেয় সায়ন
দেখো , আমার অতো কাব্য আসে না , রুপকথার নায়কের
মতো রোমান্টিকতাও নাই আমার , তবে বলি কি সমুদ্র
ধারে একা থাকার চেয়ে জলকণার সাথে বিকেলে আমার
ছোট ফ্ল্যাটের বারান্দায় ট্রাফিক জ্যাম দেখা মনে হয় খুব
পছন্দ হবে আমার ! বাকিটা জলকণার ইচ্ছে !
নীরা রিপ্লাই পেয়ে হাসে … কিন্তু ওর
চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র জল …
হয়তো বা এতো সুন্দর কোনো দৃশ্যের জন্যেই
পৃথিবী থেকে এখনো ভালবাসা মুছে যায় নি !-

পোস্টটি ৫২০ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
৩ টি মন্তব্য
৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. “কখনো সময়ের ফাঁকে জেনে রেখো
    এই ব্যস্ত শহরে
    এতোটুকু অবসরের জন্যে
    হন্যে হয়ে থাকা বিকেল গুলোয়
    তুমি আমার ছিলে না …” খুব সুন্দর

  2. রংধনুর গল্পগুলো খূব চেনা চেনা!

    • সিনেমা,গল্প,উপন্যাস তৈরী হয় মানুষের জীবন থেকেই….আর আপনার আমার সর্বসাধারনের জীবন যাপন প্রায় একই ধাচের….তাই হয়তো চেনা চেনা লাগছে!!!

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.