গর্ভাবস্থায় ঘুমের সমস্যা, কী করবেন?
লিখেছেন চক সিলেট, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৫ ৮:৪৫ অপরাহ্ণ

গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন জটিলতা এড়াতে গর্ভকালীন যত্ন বা অ্যান্টিনেটাল কেয়ার নেওয়া প্রয়োজন।  এ বিষয়ে কথা বলেছেন শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রসূতি ও ধাত্রী বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. নাইমা শারমিন হক।

প্রশ্ন : গর্ভকালীন যত্ন বা অ্যান্টিনেটাল কেয়ারের মধ্যে কোন কোন বিষয়গুলো পড়ে?

উত্তর : ‘অ্যান্টিনেটাল কেয়ার’ শব্দটির বাংলা অর্থ হচ্ছে গর্ভকালীন পরিচর্যা। একজন মেয়ে যখন গর্ভবতী হন, তখন তাঁর শারীরিক ও মানসিক যে পরিবর্তন তাঁর মধ্যে আসে, বিষয়গুলো তাঁকে বলা এবং তাঁর মানসিক স্থিতির সঙ্গে তাঁর গর্ভাবস্থার যে সামঞ্জস্য, সে অবস্থায় তিনি কেমন থাকবেন, তাঁর কী ধরনের পরিবর্তন হতে পারে, কী কী জটিলতা বৃদ্ধি পেতে পারে, অথবা তাঁর আদৌ কোনো জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছে কি না, যদি করে তার চিকিৎসা কী, তাঁর প্রসবটা কীভাবে করা হবে, তাঁর ও তাঁর পরিবারের প্রতিটি সদস্যদের মানসিক প্রস্তুত হতে হবে এসব নিয়ে যে আলোচনা, এটি অ্যান্টিনেটাল কেয়ার বা গর্ভকালের মধ্যে করা হয়।   

একজন মেয়ের জন্য গর্ভাবস্থায় অ্যান্টিনেটাল কেয়ার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত বলা হয় যে যখনই তাঁর ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাবে, তখনই তাঁর অতিদ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। তাঁর সঙ্গে শেয়ার করা উচিত। যদি কোনো কারণে তিনি প্রথমবার যেতে না পারেন, তাহলে অবশ্যই যেন দ্বিতীয়বার ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরপরই তিনি যান।

চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর যখন তাঁর চেকআপ হবে, তার কাছ থেকে জানা হবে তাঁর কি শারীরিক সমস্যা হচ্ছে, তার যে মানসিক শান্তিটা হবে সেটা আসলে একজন চিকিৎসকের সঙ্গে রোগীর সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। 

ওই সময়ে কিছু প্রাথমিক পরীক্ষা আমরা করি। যেমন তার রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কতটুকু থাকে। তাঁর রক্তে কোষগুলোর উপাদান যতটুকু থাকার কথা সেটি রয়েছে কি না। তাই থাইরয়েড হরমোনে কোনো সমস্যা রয়েছে কি না। ইডিটি গণনা করি। এতে প্রসবের সম্ভাব্য তারিখটি বোঝা যায়। আমরা দেখি নারী একটি বাচ্চা বহন করছেন, না কি একের অধিক বাচ্চা বহর করছেন। তা ছাড়া আরো কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার হয়। যদি বিশেষ কিছু থাকে, যদি কারো পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকে, অথবা তার আগে ছিল, অথবা আগে ছিল না হঠাৎ করে এই সময়ে হতে পারে। এখানেও একটি চেকআপের বিষয় থাকে। আসলে পরীক্ষা- নিরীক্ষার মাধ্যমে একজন মায়ের শারীরিক অবস্থাটা বোঝা যায় এবং তাঁকে সেটি বর্ণনা করা যায়। এর মাধ্যমে একজন মেয়ের সঙ্গে চিকিৎসকের আন্তরিকতার সমস্যা হয়। এবং এটি ছাড়া কোনোভাবেই সেটি সম্ভব নয়।

এখনো অনেকে রয়েছেন, যাঁরা মনে করেন গর্ভধারণ একটি রোগ। বলেন, আমি কাজটা করতে পারব না আমি তো গর্ভবতী। তবে তাঁকে বোঝানোর জন্যও দরকার এটি একটি শারীরিক পরিবর্তন। কেউ কেউ অনেক বমি করেন, এটাকে তিনি তাঁর অসুস্থতা বলে মনে করেন। তবে এই অ্যান্টিনেটাল চেকআপের সময় তাঁকে বোঝানো হয়, এটি গর্ভাবস্থায় হবে। এটি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারো কম হয়, কারো বেশি হয়। যদি কারো বেশি হয়, প্রয়োজনে তাঁকে হাসপাতালে যেতে হবে। তবে এটা একসময়ে কমে যাবে। তিন মাস পরে এটা কমে যাবে।

প্রশ্ন : গর্ভাবস্থায় যত্নেরও দরকার রয়েছে। যেহেতু শারীরিকভাবে এই সময়ে একটি পরিবর্তন আসছে। মানসিকভাবেও একটি পরিবর্তন হয়। এই সময়ে পরিবারের মানুষের কী ভূমিকা রাখা উচিত?

উত্তর : আসলে চিকিৎসকের ভূমিকা তো চিকিৎসক পালন করবেন। এই মেয়ে কিংবা মা বেশির ভাগ সময়েই তার পরিবারের মানুষের সঙ্গে থাকে। আমি মনে করি পরিবারের লোকজনদের ভূমিকা এখানে অনেকটাই কাজ করে। মেয়ের গর্ভাবস্থার সময়টি কেমন যাবে তার ওপরে। এই গর্ভকালীন পরিচর্যার ওপর নির্ভর করছে সুস্থ মা ও সুস্থ শিশুর। সুস্থ মা, সুস্থ গর্ভাবস্থা এবং সুস্থ নবজাতক শিশু। সবকিছুই নির্ভর করছে একটির সঙ্গে আরেকটি। একটি যোগসূত্র কাজ করছে। যদি আমি তাকে ভালো অ্যান্টিনেটাল চেকআপ দিলাম, তবে তাঁর পারিবারিক পরিবেশে তিনি সুখী নন।

প্রশ্ন : সেই ক্ষেত্রে আপনারা কি তাঁর পরিবারের কাউকে এই পরামর্শটা দেন?

উত্তর : যখন একজন মা অ্যান্টিনেটাল চেকআপে আসেন, অবশ্যই স্বামী তাঁর সঙ্গে আসবেন। যদি স্বামী না আসতে পারেন, তাহলে তাঁর মা আসতে পারেন। অথবা শাশুড়ি আসতে পারেন। কারণ তাঁদেরও পরামর্শের দরকার আছে। কীভাবে এই মায়ের যত্ন করবেন? কীভাবে তাঁর পরিচর্যা করবেন? কীভাবে তাঁকে মানসিকভাবে সাহায্য করবেন? এই জিনিসগুলো পরিবারের সদস্যদের জানার জন্য খুবই দরকার।

প্রশ্ন : এই সময়ে একজন গর্ভবতী মায়ের কতটুকু খাবার খাওয়ার প্রয়োজন এবং তার পরিমাণ কতটুকু হলে, একজন গর্ভবতী মায়ের জন্য সবচেয়ে ভালো?

উত্তর : প্রথম দিকে দু-তিন মাসে অনেকে বলেন যে খেতে পারেন না। অনেক গন্ধ লাগে, বমির প্রবণতা হয়। এরপর বলা হয়, একজন মেয়ে স্বাভাবিকভাবে যে খাবারটা খায়, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্য সেটি হলো ২০০০ কিলোক্যালোরি। গর্ভাবস্থায় আমরা যেটা বলি আগে যা খেত তার সঙ্গে একমুঠ, দেড় মুঠ খাবার বেশি খাওয়ার জন্য। খাবারটা একবারে না খেয়ে কিছুক্ষণ পরপর খাওয়ার জন্য। কারণ দেখা গেল অনেকে সকালে খান, দুপুরের  আগে কিছুই খান না। খুব বেশি সময় বিরতি যাতে না থাকে। মা যদি অনেকক্ষণ ধরে না খেয়ে থাকেন, সে ক্ষেত্রে শিশুও হাইপোগ্লাইসেমিক হতে পারে। হয়তো দেখা যায় বাচ্চা কম নড়াচড়া করে, কখনো কখনো বাচ্চা বেশি নড়াচড়া করে। তখন আমরা মাদের বলি যদি দেখেন বাচ্চা কম নড়াচড়া করছে তখন খাবেন এবং বাম কাত হয়ে শুয়ে থাকবেন। তারপরও যদি না কমে, বিশ্রাম নিতে হবে। বিশ্রামের বিষয়ে আমরা বলি দুপুরে দুই ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন, একজন গর্ভবতী মায়ের। রাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম খুবই প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায়, একজন গর্ভবতী মা তাঁর দুশ্চিন্তা থেকে হোক বা অন্য কোনো কারণে হোক ঘুমটা হয় না। এটা রোগীদের জন্য খুব প্রচলিত একটি সমস্যা।

প্রশ্ন : গর্ভবতী নারীদের ঘুমের সমস্যা নিয়ে কী চিন্তিত হওয়ার কোনো বিষয় রয়েছে?

উত্তর : আমরা তখন বলি, ঘুম হচ্ছে না এটি কোনো সমস্যা নয়। ঘুম হবে। আপনি আপনার মনকে অন্য দিকে নেন। টিভি দেখেন, গান শোনেন, বই পড়েন। একসময়ে আপনি অবশ্যই ঘুমাবেন। এই জন্য বাড়তি কোনো ওষুধের প্রয়োজন নেই।  

প্রশ্ন : আরেকটি বিষয় যেটি অ্যান্টিনেটাল কেয়ারের মধ্যে পড়ে,  অ্যান্টিনেটাল চেকআপ যেটি। এই চেকআপটি কতখানি গুরুত্বপূর্ণ? এটি কতবার পুরো গর্ভকালীন অবস্থায় যাওয়া উচিত?

উত্তর : এর গুরুত্ব অনেকখানি। একজন মা যদি চিকিৎসকের কাছে না আসেন, তাহলে তো চিকিৎসক বুঝতে পারবেন না যে তাঁর মধ্যে কোনো সমস্যা তৈরি হচ্ছে কি না। নিয়মিত চেকআপও তাঁর জন্য দরকার। দুটো কারণে দরকার। প্রথম হলো, একটি সুস্থ গর্ভাবস্থার জন্য। আর দ্বিতীয় হচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তিনি জন্ম দিতে যাচ্ছেন। একজন সুস্থ সন্তানের জন্ম যেন হয় সে জন্য দরকার। আর অ্যান্টিনেটাল চেকআপ না হলে তো গর্ভাবস্থায় কী ধরনের জটিলতা হতে পারে, সেটা তো বোঝার কোনো উপায় নেই। যে কারণে একসময়ে মায়ের মৃত্যুর হার অনেক বেশি ছিল। তখন গর্ভকালীন চেকআপে তাঁরা আসতেন না। কিংবা কোনো কারণে তাঁরা নিজেরা আসতে চাইলেও পরিবারের লোকজনই তাঁদের আসতে দিতেন না। এই জিনিসটা এখন মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রেটটা আস্তে আস্তে কমে আসছে।

প্রশ্ন : অ্যান্টিনেটাল চেকআপে কতবার যেতে হবে?

উত্তর : সাধারণত আদর্শ চেকআপের ক্ষেত্রে আমরা বলি প্রথম তিন মাসে তাঁকে একবার করে আসা উচিত। পরবর্তীকালে আমরা বলি ৩২ সপ্তাহ পর্যন্ত তাঁর ১৪ দিন পরপর আসা উচিত। দুই সপ্তাহে একবার। এর পরবর্তীকালে ৩৬ সপ্তাহ পরপর প্রসবের আগ পর্যন্ত,  প্রতি সপ্তাহে তার আসা উচিত। সেই ক্ষেত্রে অন্তত তিন থেকে চারবার তাঁর যাওয়া উচিত।

প্রশ্ন : এই সময়ে অনেকেরই অন্য কোনো সমস্যা হতে পারে। যেমন হঠাৎ করে জ্বর হয়ে যাওয়া, সেই সময়ে ওষুধ খাওয়ার বা আলাদা কোনো ওষুধ  নেওয়া তাঁর কতটুকু উচিত হবে?

উত্তর : গর্ভাবস্থায় শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা একটু কম থাকে। হরমোনাল কারণে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তারপরও যদি কোনো কারণে জ্বরের কথা বলেন আপনি, কোনো কারণে তার ভাইরাল ফিবার হলো, অথবা অন্য কোনো সংক্রমণ হলো, সে ক্ষেত্রে যে ওষুধটা রোগীর জন্য উপকারী হবে, সেটিই আমাদের দিতে হবে। সাধারণত, প্যারাসিটামলের বেশি অন্য কোনো তীব্র ওষুধ আমরা দিতে চাই না। তারপরও যদি দিতে কোনো ধরনের জটিলতা যদি তাঁর বৃদ্ধি পায়, তাঁকে এমন ওষুধ দিতে হবে যেটা গর্ভাবস্থায় নিরাপদ। অনেক মা আসেন গর্ভাবস্থার আগে থেকে তাঁর উচ্চ রক্তচাপ। তাই গর্ভাব্স্থায় উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে,  এই সময়ে যে ওষুধ নিরাপদ সেটিতে চলে যেতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় আগের ওষুধ চালিয়ে গেলে বাচ্চার অনেক ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা থেকে যায়।

Source: Ntv online.

পোস্টটি ৪৫৭ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.