প্রশান্ত মহাসাগরে ভাসমান এক মহিলার জীবনসংগ্রাম
লিখেছেন চক সিলেট, অক্টোবর ৪, ২০১৪ ৯:২৩ অপরাহ্ণ

প্রশান্ত মহাসাগরে

মার্কস্মিথ ও জিন ম্যারি জ্যাভরল
ভাষান্তর : নজরুল ইসলাম

৪৩ বছর বয়স্কা কভিন তার ৩৩ ফিট দীর্ঘ এক মাস্তুলের ছোট পাল তোলা পরিপাটি জাহাজটি নিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। প্রথমে তিনি পৌঁছেছেন নিউ ক্যালিফোর্নিয়া দ্বীপে। এখন তিনি সোলোমন দ্বীপমালার ১৫০ মাইল উত্তর দিয়ে গুয়াম দ্বীপের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। সেখানে তার নয় বছরের পুত্র তার স্বামীর সাথে বসবাস করছে। অভিজ্ঞ নাবিক কডিন। গত পনের বছরে তিনি এবং তার স্বামী পাড়ি দিয়েছেন আটলান্টিক মহাসাগর, সহ্য করেছেন এন্টার্কটিকার সমুদ্রের তুষারঝড় এবং ঘোরাফেরা করেছেন প্রশান্ত মহাসাগরে।
১৯৯০ সালের ৩০ মে’র সকালবেলা জাহাজের ডেকের ওপর থেকে দৃষ্টি মেলে দিলেন নীল প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল বিস্তৃতির দিকে। শান্ত সমুদ্র। নির্মেঘ আকাশ। একটানা উত্তর, উত্তর-পশ্চিমা মৃদু বাতাসে জাহাজের পাল ফুলে উঠেছে, জাহাজ ভেসে চলছে।
এই বিশেষ সকালবেলায় তিনি অনুভব করছেন এক আনন্দময় অনুভূতি। তার পুত্রের স্কুল ছুটি হয়েছে। সে তার পিতার সাথে রাগ করে গুয়াম দ্বীপে অপেক্ষা করছে মায়ের জন্য। মায়ের সাথে যোগ দেবে ৩ হাজার ৫০০ মাইল সমুদ্র যাত্রায় জাপানের পথে। কডিন এবং আইল্যান্ড এই চিন্তা-ভাবনা করছে কয়েক মাস ধরে।
এক কাপ চা পান করে কডিন ব্যাটারি রিচার্জ করতে সুইচ টিপলেন। ইঞ্জিন থেকে কাশির মতো শব্দ হলো। থেমে গেল ইঞ্জিন। আশ্চর্য হয়ে ভাবলেন ফিডার লাইনে হয়তো ময়লা জমেছে। বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রের পরিবর্তে পুরাতন সেক্সট্যান্ট যন্ত্র দ্বারা দিক নির্ণয় করছিলেন আর ইঞ্জিনটি মেরামত করছিলেন তিনি। সে সন্ধ্যায় তিনি রনক্যাভোর জলমগ্ন শৈল শ্রেণীর কাছে পৌঁছলেন। তখন তিনি অধিকতর নিখুঁত উপগ্রহ নিয়ন্ত্রিত নেভিগেটরের সাহায্যে তার ুদ্র জাহাজটি চালাচ্ছিলেন। এটাও ভেঙে গেল। ইঞ্জিন মেরামত পরদিনের জন্য স্থগিত রেখে নেভিগেটান যন্ত্রটি মেরামত করতে শুরু করলেন। ফলে জলমগ্ন শৈল শ্রেণীর প্রতিধ্বনি শুনতে পাবেন বলে তিনি ভাবলেন।
দু’ঘণ্টা পর বৃষ্টি নামল প্রচণ্ড বেগে। জাহাজটির ওপর বৃষ্টি পতনের শব্দ এত জোরালো ছিল যে, সে স্থানে জলমগ্ন শৈল শ্রেণীর অস্তিত্ব তিনি জানতেই পারেননি।
কডিন মাত্র শেষ স্ক্রুটি নেভিগেশন যন্ত্রে লাগিয়েছিল। হঠাৎ জাহাজটিতে পানি প্রবেশের শব্দ শুনলেন। ছোট জাহাজটি ইতোমধ্যে জলমগ্ন পাহাড়ে ধাক্কা খেয়েছে। পাহাড়ের তীক্ষন ধার পাথরে লেগে জাহাজটি প্রচণ্ডভাবে কেঁপে উঠল। ঘুরপাক খেল জাহাজের কাঠামো ভেঙে পানি প্রবেশ করতে শুরু করল। কডিন বিপদ গুনলেন। তাড়াতাড়ি জীবন রক্ষাকারী ভেলাটি ধরে বাইরে ঠেলে দিলেন এবং ভেলাটির নোঙর ফেলে দিলেন যাতে এটি ভেসে না যায়। তারপর দ্রুত চার গ্যালন পানীয় জলের ভাণ্ড, একটি মানচিত্র, দিক নির্ণয় যন্ত্র, পেন্সিল, প্লাস্টিক ব্যাগগুলোসহ ত্রিকোনাকার পালটি ভাসমান ভেলায় ছুড়ে দিলেন ইতোমধ্যে পানি তার কাঁধ পর্যন্ত উঠে গেছে। ডুবে যাওয়া জাহাজ থেকে আরো উদ্ধার করতে পারলেন ফ্যাশ লাইট, এক হাঁড়ি কৃত্রিম মাখন, এক প্যাকেট নুডলস, দুই পাউন্ড চালের একটি ব্যাগ, একটি কমলালেবু, এক প্যাকেট বাদাম ও কিশমিশ। তারপর তিনি পাঁচ ফিট দীর্ঘ রবারের ভেলায় উঠে এলেন, কান্তিতে তিনি ভেলাটির ওপর পড়ে গেলেন। তিনি ভাবতে চেষ্টা করলেন কী করে জাহাজটি তার অগোচরে জলমগ্ন পাহাড়ে ধাক্কা খেল। তিনি দেখতে পেলেন তাকে নিয়ে তার ভেলাটি পানির ওপর দ্রুত গতিতে চলেছে। তিনি বুঝতে পারলেন তার ছোট্ট জাহাজটিকে একটি অজানা সমুদ্রস্রোত একটি জলমগ্ন পাহাড়ের ওপর নিয়ে এসেছে। রাগে তার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো। তিনি দেখতে পেলেন কয়েক গজ দূরে তার জাহাজটি মাস্তুল ঝাঁকুনি দিয়ে কাত হয়ে যাচ্ছে।

জাহাজটির কাঠামোটি শেষবারের মতো পানির ওপর ভেসে উঠল। তারপর অন্ধকারে ডুবে গেল অথৈ জলধিতে। দৃষ্টি থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল তার প্রিয় জাহাজটি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকে নিয়ে ভেলাটি ভেসে চলল অন্ধকার সমুদ্রে। অবশেষে দেখা দিল ভোরে অস্পষ্ট আলো। হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন আশ্চর্যজনক একটি কিছু। দূরে দেখা যাচ্ছে একটি মালবাহী জাহাজ। কডিন উচ্ছ্বাসে বলে উঠলেন আমি সবসময় ভাগ্যবতী। কিন্তু তার ভেলা নিকটবর্তী হলে কডিন দেখতে পেলেন একটি জাহাজ এক দিকে কাত হয়ে স্থির হয়ে আছে। তিনি বুঝতে পারলেন জাহাজটি পরিত্যক্ত এবং প্রবাল প্রাচীরে ধাক্কা লেগে ওখানেই আটকে আছে। আবার রাগে তার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো।
তারপর মাথা ঠাণ্ডা রেখে ধীরস্থিরভাবে নিজের অবস্থাটা বুঝতে চেষ্টা করলেন। সোলোমন দ্বীপুঞ্জের বিস্তৃতি ৭০০ মাইল। এই দ্বীপপুঞ্জ বাণিজ্যবায়ু বলয়ের অন্তর্ভুক্ত। বাণিজ্যবায়ু প্রবাহিত হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে। ভিজে যাওয়া চার্ট নিরীক্ষণ করে কডিন দেখলেন সবচেয়ে নিকটবর্তী দ্বীপটি ১৬০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। এখন প্রবাহমান বাতাস তার ভেলাটিকে সঠিক দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। অনুকূল স্রোতে ঘণ্টায় দুই নট গতিতে চললে পাঁচ অথবা ছয় দিনে সেখানে পৌঁছতে পারবেন। কিন্তু ৬ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশে বিষুবীয় অঞ্চলের কাছাকাছি এসে পড়ল ভেলাটি। এখানে পুঞ্জীভূত মেঘ থেকে প্রচণ্ড বৃষ্টি আর ভয়ঙ্কর বিজলি মেঘের সম্মুখীন হলেন কডিন। তিনি জানতেন তাকে বাঁচার জন্য সংগ্রাম করতে হবে। নিজকে বারবার বললেন, ‘আমাকে আমার পুত্রের জন্য অবশ্যই বাঁচতে হবে, আমাকে তার প্রয়োজন।’ পুনঃ পুনঃ এ কথা বলে তার মনোবল দৃঢ় করে তুললেন। বর্তমান পরিস্থিতর বিরুদ্ধে তার ভেতরে জেগে উঠল একটি সংগ্রামী মনোভাব।
তিনি নিজেকে গুছিয়ে নিতে শুরু করলেন। তিনি জিনিসপত্রের তালিকাটি নিরীক্ষণ করতে লাগলেন কৃত্রিম মাখনের ভাণ্ডটি ভেঙে গেছে। ভাঙা অংশ দিয়ে মাখন বেরিয়ে ভেলার তলদেশে জমা হয়েছে। কডিন তা উঠিয়ে একটি প্লাস্টিক ব্যাগে পুরে নিলেন। মাখন দেখতে মনে হলো বিকৃত হয়ে গেছে তবু তিনি ফেলে দিলেন না। কারণ সামনে সঙ্কটময় দিন আসছে। তার তখন বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত ক্যালরির প্রয়োজন হবে। নুডল্স, চকোলেট, এক প্যাকেট কুকিজ এবং চাল সবই ভিজে গেছে। শুকানোর জন্য বেসিনে মেলে দিলেন। ভিজা বাদাম এবং কিশমিশগুলো ভেলায় ছড়িয়ে দিলেন। এ ছাড়াও ছিল জীবন বাঁচানোর জন্য তিনটি রেশন প্যাকেট। প্রত্যেকটিতে চারজনের খাবার ছিল। এই তিনটি প্যাকেটে এক হিসেবে তার বারো দিন চলবে। জীবন বাঁচানোর সরঞ্জামের ব্যাগে তিনি পেলেন একটি ছোট্ট তাঁবু, একজোড়া দাঁড়, একটি বাতাসভর্তি করার পাম্প, বিপদসঙ্কেত দেয়ার হাউই, অন্য একটি ফাশলাইট, একটি স্পঞ্জ, মাছ ধরার তিনটি ছোট্ট বড়শি, একটি চিকন মাছ ধরার দড়ি, সঙ্কেত দেয়ার একটি ছোট্ট আয়না তবু এসব আয়োজন হাস্যকর মনে হলো। দোতলাবিশিষ্ট ভেলাটি তৈরি করা হয়েছে মহাসমুদ্রে উদ্ধারের অপেক্ষায় ভেসে থাকার জন্য দীর্ঘ যাত্রায় চালানোর উপযোগী করে নয়।
কডিন ভাবলেন, ‘চালনার উপযোগী করে ভেলাটি নির্মিত হলে আমি এক সপ্তাহের মধ্যে সোলোমন দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছতে পারতাম। আর এখন এই ভেলাটি নিয়ে আমাকে ভেসে চলতে হবে হয়তো এক মাস অথবা তিন মাস এই বিশাল মহাসমুদ্রে। আমাকে ভেলাটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে হবে অথবা মৃত্যুবরণ করতে হবে। ভেলাটির নিচে ডুব দিয়ে ভেলাসংলগ্ন রাবারের মলগুলো কেটে দিলেন। এগুলো ভাসমান নোঙরের কাজ করত এবং ভেলাটির গতি মন্থর করে রাখত। তারপর মাস্তুলটিতে বিভিন্ন বর্ণের পালটি জুড়ে দিলেন। ফলে ভেলাটিতে গতি সঞ্চারিত হলো। 
রাতে তার ভালো ঘুম হলো না। যখন ভালো করে জেগে উঠলেন তখন ভেলাটির অবস্থা দেখে আতঙ্কিত হলেন। ভেলাটি বিপজ্জনকভাবে চুপসে গেছে। মনে হলো টিউব থেকে বাতাস বেরিয়ে গেছে। এটি ডেট। আসলেই তাকে ভাসতে হবে সমুদ্রের পানিতে তাড়াতাড়ি বাতাস ভরার পাম্পটি নিয়ে ভেলায় আরো বাতাস ভরে নিলেন। বাকি রাতটা মরিয়া হয়ে ভেলাটির ছিদ্র অনুসন্ধান করে কাটিয়ে দিলেন। সকাল বেলায় কারণটি আবিষ্কার করলেন। রাতে ঠাণ্ডায় এবং অঝোর বৃষ্টির ফলে ভেলাটির ভেতরের বাতাস সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছিল। তাই এর পর থেকে প্রতি সন্ধ্যায় পাম্পের সাহায্যে কিছু বাতাস ভরে নিতেন এবং সকালে ভেলায় তা ছেড়ে দিতেন। কারণ সূর্যের উত্তাপে ভেলার ভেতরের বাতাস সম্প্রসারিত হলে ভেলাটির টিউব ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
এবার কডিন এই মহাসমুদ্রের অথৈ পানিতে কিভাবে বেঁচে থাকা যায় সেদিকে মনোযোগ দিলেন। তিনি ছোট্ট পালটি থেকে কয়েকটি টুকরা কেটে নিয়ে যেখানে মাস্তুল ধরার দড়ির সাথে ভেলাটিকে রবারের বিপজ্জনকভাবে ঘর্ষণ হচ্ছিল সেখানে প্যাড করে দিলেন। রাতের বেলায় শৈত্য থেকে বাঁচার প্রয়োজনে নিজের জন্য একটি স্কার্ট এবং জ্যাকেট তৈরি করলেন। মাছ ধরার বড়শিতে টোপ লাগিয়ে দিলেন। তারপর ভাবতে লাগলেন এভাবে তিনি আর কত দিন টিকতে পারবেন।
একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ বাতাস পড়ে গেল। দেখা গেল দিকচক্রবালে কালো মেঘ প্রচণ্ড গতিতে এগিয়ে আসছে। বাতাস স্তব্ধ হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো এবং কর্ণবিদারী শব্দে বজ্রপাত হতে লাগল। বিদ্যুৎ চমকে কডিনের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। ভেলাটির ছোট্ট তাঁবুতে কডিন কুণ্ডলী পাকিয়ে আশ্রয় নিলেন ভাবলেন আর হয়তো তিনি বাঁচতে পারবেন না। দশ মিনিট পরই আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডায় জমে ুধার্ত কডিন ঘুমিয়ে পড়লেন।
তারপর এলো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উত্তপ্ত দিনগুলো। সমুদ্র ছিল অত্যন্ত শান্ত এবং উষ্ণ। মাছগুলো ভেলার শীতল ছায়ায় আসত। কডিন তার বড়শিতে নানা রকম টোপ লাগিয়ে মাছ ধরতে চেষ্টা করতে লাগলেন। এমনকি হাতেও ধরতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু ব্যর্থ হলেন। তার ভেতর নৈরাশ্য দেখা দিল। কয়েক দিনের চেষ্টার পর কিশমিশের পেঁপে ধরা দিল একটি মাছ।
ভেলাটির এক কিনারে যখন তিনি মাছটি পরিষ্কার করছিলেন তখন দেখা দিল অপ্রত্যাশিত এক বিপদ। কডিন অনুভব করলেন একটা কিছু ভেলাটিকে ঢুঁ দিচ্ছে। দেখা গেল দু’টি বিশাল হাঙর ধৃত মাছের রক্তের গন্ধ পেয়ে ছুটে এসেছে। কডিন তাদের ভয় দেখানোর জন্য চিৎকার করে উঠলেন। দ্রুত সেগুলো পিছিয়ে গেল। কিন্তু আবার আক্রমণ করল। কডিনের আশঙ্কা হলো যদি হাঙরগুলো তাদের পিঠের ডানা দিয়ে ভেলাটির রাবারে ছিদ্র করে ফেলে কিংবা ভেলাটি উল্টে দেয় তবে তাকে তাদের চোয়ালের ভয়ঙ্কর দাঁতের মধ্যে পড়তে হবে।
হঠাৎ একটি হাঙর ভেলাটির কাঠামোর নিচের রাবারের বহিরাবরণ রগড়ে ছিঁড়ে ফেলল। আবার যখন আক্রমণ করতে এলো কডিন তখন ফাশলাইটটি দিয়ে পানি খাবার কেনেস্তারায় জোরে জোরে আঘাত করে শব্দ করলেন। শব্দে ভয় পেয়ে হাঙরগুলো পালিয়ে গেল। কিন্তু এখন একটিমাত্র কাঠামোর রাবারের আবরণে নির্ভর করে ভেলাটিকে ভেসে থাকতে হবে।
বার দিন ভেসে চলার পর কডিন শারীরিক দিক দিয়ে দুর্বল হয়ে পড়লেন। মনে দেখা দিল হতাশা। মনকে চাঙ্গা করে তোলার জন্য তিনি চেষ্টা করলেন প্যারিস শহরের শহরতলীতে কেটে যাওয়া শৈশবের দিনগুলোর কথা। তার চুল পরিচর্যার প্রশিক্ষণের কথা। চুল পরিচর্যা করে তিনি কিছু অর্থ জমিয়েছিলেন। সেই অর্থ দিয়ে নিজে সেলুন খুলেছেন। কিন্তু ছয় বছর পর তা বিক্রি করে দিয়ে দুঃসাহসিক অভিযানের পথ বেছে নিয়েছিলেন। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে তার ছেলে জন্মগ্রহণ করেছিল। তাই ছেলের নাম রেখেছিলেন আইল্যান্ড। হঠাৎ তার মনে আশঙ্কা দেখা দিল তিনি হয়তো তার ছেলেকে আর কখনো দেখতে পাবেন না। কিন্তু মনে জোর এনে ভাবলেন, আমি তো হাল ছেড়ে দিতে পারি না। আমাকে বাঁচতেই হবে। আমাকে আইল্যান্ডের প্রয়োজন রয়েছে।
একদিন অপরাহ্ণে দূর দিগন্তে একটি মাছ ধরার জাহাজ দেখতে পেলেন। উত্তর পাওয়ার আশায় উদ্বিগ্ন হৃদয়ে কডিন জাহাজটির দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য হাউই ছুড়লেন আকাশে। প্রথমে একটি, তারপর আর একটি। কিন্তু না, কোনো কাজ হলো না। জাহাজটি তার গন্তব্য পথে অদৃশ্য হয়ে গেল। তার মন নৈরাশ্যে ছেয়ে গেল। তিনি ভাবলেন এটাই ছিল শেষ সুযোগ। এই বিশাল প্রশান্ত মহাসাগরের অথৈ পানিতে হারিয়ে গিয়ে কী করে দ্বিতীয় অলৌকিক ঘটনার আশা করতে পারি।
পরবর্তী দিনগুলোতে সৃষ্টি হলো আর এক আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির। তার ভেলার রবার ক্ষয় হয়ে ভেতরের কাপড়ের আস্তরণ দেখা যাচ্ছে। ভেলাটি আর কত দিন টিকবে আর তিনিই বা আর কত দিন টিকে থাকবেন। তা ছাড়া পচে যাওয়া খাবার খেয়ে তার পেটে ব্যথার সৃষ্টি হয়েছে। তার খাবারের মধ্যে আছে শুধু কিছু কুকি পেস্ট এবং চকোলেট। তার সাহস বজায় রাখার জন্য নিজেকে বললেন, ‘আরো গুরুতর সঙ্কট আসবে যে করেই হোক তার মোকাবেলা করতে হবে।’
আর একদিন তিনি দেখতে পেলেন উত্তর-পূর্ব দিকে দূরে তিনটি ছোট দ্বীপ। আবার উদ্ধার পাওয়ার আশায় তার হৃদয় উদ্বেল হয়ে উঠল। বাতাসের বিপরীত দিকে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি তিনি পাল নামিয়ে নিলেন। মরিয়া হয়ে দাঁড় বাইতে লাগলেন। কিন্তু বাতাস ছিল জোরালো। তিনি ভাবলেন, এই ছোট্ট দাঁড় দিয়ে আমি কখনো সেখানে পৌঁছতে পারব না। কান্ত এবং নিরুৎসাহ হয়ে তিনি দেখতে পেলেন দূরে দ্বীপগুলো মিলিয়ে যাচ্ছে।
১৮ জুন কডিন উত্তর-পশ্চিম দিকে আবারো একটি ভূ-বাস দেখতে পেলেন। তিনি অনুমান করলেন এখান থেকে দ্বীপটি ১৫ মাইল দূরে অবস্থান করছে বাতাস ভেলাটিকে উত্তর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন তার উদ্ধার পাওয়ার এটাই শেষ সম্ভাবনা। এই দ্বীপটিতে পৌঁছতে না পারলে এই হাজার হাজার মাইল বিস্তৃত প্রশান্ত মহাসাগরে তাকে চিরকালের জন্য হারিয়ে যেতে হবে।
আবার তিনি স্রোতের বিরুদ্ধে তার অবশিষ্ট পুরো শক্তিটুকু দিয়ে দাঁড় বাইতে শুরু করলেন। তিনি নিজেকে বললেন, ‘যদি কান্তিতে আমার মৃত্যু ঘটে তবে তা ঘটুক। আমার যতটুকু সাধ্য তাই করব।’ তার হাতগুলো ফুলে গিয়েছিল। সেই হাত নিয়েই দাঁড় বাইতে লাগলেন। সারাদিন সমুদ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন। তিনি দৃঢ়সঙ্কল্প করলেন হাল ছাড়বেন না। তিনি মনে মনে বললেন, ‘আমি বেঁচে আছি এখনো যেকোনো কিছু ঘটতে পারে।’
সন্ধ্যার দিকে তিনি দ্বীপটির এত কাছে পৌঁছে গেলেন যে, তীরে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন। তখন হঠাৎ এক দমকা বাতাস এসে ভেলাটিকে আঘাত করল এবং সেটাকে একটানা ভাসিয়ে নিয়ে গেল দ্বীপটি থেকে দূরে। অর্ধেক রাত পর্যন্ত তিনি ভেলাটিতে অসহায় হয়ে পড়ে রইলেন। আর ভাবতে লাগলেন সবই শেষ হয়ে গেল কি না, তারপর ঘুমিয়ে পড়লেন।
যখন তিনি জাগলেন প্রথমে দেখতে পেলেন প্রশান্ত মহাসাগরের অথৈ জলধির বিস্তার। এ ছাড়া আর কিছুই নেই। অন্যমনস্কভাবে চতুর্দিকে চোখ ফেরালেন। এক দিকে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে গেল। এ যে অবিশ্বাস্য! মাত্র কয়েক শ গজ দূরে দ্বীপটি। রাতে যখন ঘুমিয়েছিলেন তখন বাতাস গতি পরিবর্তন করে ভেলাটিকে নিয়ে এসেছে দ্বীপটির অতি কাছে। তিনি পরিষ্কার দেখতে পেলেন একটি গ্রাম, নারিকেল কুঞ্জ, একটি গির্জার ছাদ। সমুদ্র তীরে লোকদের মধ্যে চাঞ্চল্য। ক্যানো ভাসিয়ে লোকগুলো ছুটে আসছে তার ভেলার দিকে। শ্রান্ত-কান্ত-দুর্বল কডিনের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো একটি শব্দ। অবশেষে তার চিন্তা করার শক্তি হারিয়ে গেল।
পপুয়া নিউগিনির নিউ আয়ারল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত ছোট্ট টাঙ্গা দ্বীপের জেলেরা ভেলাটিকে দড়ি বেঁধে নিয়ে এলো তীরে। তীরে পৌঁছে তিনি দাঁড়াতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। অত্যন্ত যত্নে ও সতর্কতার সাথে জেলেরা কডিনকে বহন করে এলো একটি ছোট্ট ডিসপেনসারিতে। এটি পরিচালনা করতেন একজন আমেরিকান যাজক এবং একজন জার্মান সন্ন্যাসিনী। তারা তাকে লবণ দ্রবণ এবং গ্লুকোজ খেতে দিলেন তার শরীরের পানির ঘাটতি মেটানোর জন্য। সমুদ্রে ভেলায় অবস্থানকালে তার ওজন কমে গেছে ২২ পাউন্ড। গ্রামের লোকরা তার জন্য তৈরি করে নিয়ে এলো খাবার। কিন্তু তা খেতে তার লেগে গেল কয়েক ঘণ্টা। কারণ তার খাদ্যনালী শুকিয়ে গিয়েছিল এবং পাকস্থলী সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছিল। কডিনের চশমাটি তার সেই ভগ্নজাহাজে হারিয়ে গিয়েছিল। এই ছোট্ট দ্বীপে কোনো চু বিশেষজ্ঞ ছিল না তাই নতুন চশমা নেয়ার উপায় ছিল না। সে জন্য তাকে যেতে হবে হাজার হাজার মাইল দূরে। এই অবস্থায় যাজক তার অতিরিক্ত চশমাটি তাকে দিলেন। কৃতজ্ঞতায় কডিনের চু অশ্রুপূর্ণ হয়ে উঠল।
৩ সেপ্টেম্বর বিমানে করে কডিন গুয়াম দ্বীপে রওনা হলেন। সেখানকার ছোট্ট বিমানবন্দরের লাউঞ্জে তার জন্য অপেক্ষা করছে তার পুত্র আইল্যান্ড। বিমানবন্দরে পৌঁছে পুত্রকে দু’বাহুতে জড়িয়ে ধরলেন কডিন। জীবনের সব অর্থ আজ তার কাছে প্রকাশিত হয়েছে। কূল-কিনারাহীন প্রশান্ত মহাসাগরে একাকী ভেসে বেড়ানোর সেই সঙ্কটময় দিনগুলোতে বেঁচে গিয়েছিল তার অদম্য মনের জোরে। পুত্র স্নেহ তার ওপর এক বিরাট দায়িত্ব অর্পণ করেছিল। তার পুত্রই তার জন্য সব কষ্টের পুরষ্কার।
কডিন এখন ভ্রমণ করেন নতুন স্বপ্ন নিয়ে। তার অগ্নিপরীক্ষা তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে প্রতিদিন জীবন আমাদের কাছে যে সুখের বার্তা নিয়ে আসে তার স্বাদ গ্রহণ করা যে কত গুরুত্বপূর্ণ।

 সূত্রঃ 

Onno Diganta

পোস্টটি ৩৮১ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

Leave a Reply

Be the First to Comment!

Notify of
avatar
wpDiscuz