প্রেম ও সম্পর্কঃ কষ্টগুলোর আর্তনাদ এবং ভাঙ্গনের সাইকোলজি
লিখেছেন আহমাদ আল-সাবা, এপ্রিল ১৫, ২০১৬ ৮:৫৯ পূর্বাহ্ণ

সামনেই কিছুটা বড়সড় সুরগোল দেখা যাচ্ছে। প্রত্যাশা সেদিকে এগিয়ে যায়। দেখতে পায় নিথর দুটি দেহ পড়ে আছে। রক্তগুলোও তাদেরকে আকড়ে ধরে পড়ে আছে লাশের পাশে। হয়তো তাদের সাথে এ রক্তগুলোও জীবন্ত-সজীবতার সাথে মৃত্যুকে স্বাগত জানিয়েছে। প্রত্যাশা কিছুই বুঝতে পারে না। শিশু দুটি হয়তো না খেয়ে পড়ে থাকতে পারে কিন্তু রক্তাক্ত কেন?! পাশেই চিল্লাচ্ছে এক বড়লোক দম্পতি। তারাই বা কেন চিল্লাচ্ছে? শিশুরা তো তাদের সন্তান হওয়ার কথা না। আর তাদের সন্তান হলেও তারা কাঁদছে না কেন?! নাকি তাদের কান্নায় জমাটবাঁধা বন্ধ্যাত্ব এটে দিয়েছে কষ্টোগুলো? প্রত্যাশা আর ভাবতে পারছে না রক্তের জীবন্ত মিছিলে পড়ে থাকা দুটি ক্ষুদ্র দেহের দিকে তাকিয়ে থেকে। হয়তো কোনো পিতামাতার স্বপ্ন ও আশাগুলোও পড়ে আছে এ দুটি শিশুর মধ্য দিয়ে।

প্রত্যাশা এ ঘটনার আদ্যোপান্ত শুনতে পায় ফারজানার-ই এক খালার কাছে। গ্রাম থেকে আসা গরিব ফারজানার বিয়ে হয়েছিল শফিকুলের সাথে। প্রথম সন্তান হয়েছিল কিন্তু সংসারের অশান্তি লেগেই থাকতো। শফিকুল ফারজানাকে এক প্রকার প্রেমে প্রলোভন দিয়েই বিয়ে করেছিল। ফারজানা বুঝতে পারে অনেক পরে। হয়তো ততদিনে শফিকের দেওয়া মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ফারজানার দেহকে ভেদ করে অন্য কোনো নারীর দেহে পৌছে গেছে। ফারজানা ও শফিকের সাথে যখন বিচ্ছেদ হয়ে যায়, তখন ফারজানা আরেকটি অনাগত সন্তানের আশায় প্রহর গুনছে। সেই স্বপ্ন ও আশারাই খাদ্যের খোঁজে বড়লোকের হাতের রক্তের খাবারে পরিণত হয়েছে।

ফারজানা কিছুটা শিক্ষিত ছিল। ততদিনে সে প্রেমের সাইকোলজি, অবৈধপন্থা ও এর চাহিদা-ফল এবং জীবনের বাস্তবতা বুঝতে শুরু করেছিল, বিচ্ছেদের পর এক অশান্ত মায়ের সন্তানদের অনাগত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। দায়িত্ব না নিয়ে যদি কেউ প্রেম করে, শরীর ভোগ করে, সে এই অবৈধ সুবিধাদী যেমন একটি মেয়ের কাছ থেকে নিচ্ছে, তেমনি এই অবৈধ সুবিধাদী নেওয়ার জন্য হাজারো মেয়েকে প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, ভাঙ্গতেও পারে। কেননা এরকম ‘দায়িত্বহীন সম্পর্ক’, ‘ভোগ’ ও ‘অবৈধ’ সম্পর্কে কিছুই ‘নৈতিক’ ও ‘বৈধ’ থাকে না। তখন সম্পর্কগুলোর ভেতর থেকে সুবিধা ও ভোগ; এসব শেষ হলেই চলে যায় এ সম্পর্ক। তখন শফিকরা ছুটতে থাকে অন্য কোনো মেয়েকে আশা দিতে, স্বপ্ন দেখাতে। কিন্তু সেটাও দায়িত্ব না নিয়ে, অবৈধভাবে – কেবল সুবিধাটুকু পাওয়া পর্যন্ত। এটাই ‘দায়িত্ব’ ও ‘নীতি’ এড়িয়ে সুবিধা আদায়ে শফিকদের সুবিধা ও ফারজানাদের অসুবিধা! পূর্ব সম্পর্ক ভেংগে যায়, কিন্তু একটি মেয়ে সেখানে কিছুই করতে পারে না। কারণ অবৈধ ভোগের মাঝে নৈতিকতা, বৈধতা ও যৌক্তিকতা খাটে না। অবৈধতার মাঝে আমরা বৈধতা খুঁজি না; খোঁজাটা বোকামীও বটে।

আবেগের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠে অবৈধতার মধ্য দিয়ে যখন আমরা বাস্তবে ফিরে আসি, তখন আমাদের ক্ষতি অনেক বেশিই হয়ে যায়। ফারজানার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। তাই তারও সাইকোলজি অনেকটতা শানিত হয়েছে। জীবনের সাথে আবেগ মেশানো ও নীতিবর্জিতার ফল বাস্তবিকতায় বড় কঠিন, আবেগে যতটাই রুমান্টিক মনে হোক না কেন কবির ছন্দে; সেটা বাস্তবতায় ফিকে বুলি আর আঁধার পথে ছড়িয়ে থাকা কাটার রাস্তায় হাটার মতো।

ফারজানার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনগুলো প্রেমের ভেতরকার শত প্রতিশ্রুতির বুলি ও বিয়ে পরবর্তী বাস্তবতার মাঝে বিস্তার ফারাকের সাইকোলজি বুঝে ওঠতে চায়। সে আশা খুঁজে পায় এ চিন্তন ফলের ভেতর দিয়ে রক্তিম আকাশের ডুবন্ত সূর্যের মেঘভেদ করা সোনালি আলোকের ঝলকানিতে। সেও তাই স্বপ্ন দেখে কেউ হয়তো আর তার মতো কষ্টের ভেতরে অবৈধতার মধ্য দিয়ে সুখ খুঁজতে গিয়ে গভীর খাঁদে পড়বে না।

সে দেখতে পায় ভালোবাসা আসে Heart থেকে। সেখানে Brain এর জায়গা অনুপস্থিত। তাই ভালো মন্দ বিচার এখানে কাজ করে না। Heart এর কাজ সত্য-মিথ্যা, প্রলোভন, ভালো-মন্দ এগুলোর মাঝে পার্থক্য করা নয়। এগুলো ব্রেন এর কাজ। তাই যখন ব্রেনকে বাদ দিয়ে আমরা Heart দিয়ে প্রেম করি, তখন ভালো-মন্দ বিচারবোধ আমাদের মাঝে থাকে না। কিন্তু আমরা যখন ব্রেন ও এর চিন্তা থেকে শিক্ষা নেই, তখন আমরা সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করতে পারি, এড়াতে পারি অনাগত অনেক ক্ষতি, আশংকা ও বিপদাপদ।

ফারজানা তার জীবনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ সময়ের পূর্ব-পরবর্তী বুঝতে শিখলো, এগুলোর সাইকোলজি ও বাস্তবতাও বুঝে নিল।

ফারজানা এখন বাস্তবতায়। এখন সে Heart দিয়ে চিন্তা করে না, ব্রেন দিয়ে চিন্তা করে। সে বুঝতে শিখেছে ‘দায়িত্ব’ ও ‘বৈধ’-‘অবৈধ’ হলো ব্রেনের কাজ, যুক্তির কাজ, ধর্ম ও নীতির কাজ। এক সময় সে শফিকের শত প্রতিশ্রুতিকে আকাশ ছোঁয়া প্রত্যাশায় রুপ দিয়েছিল। বিয়ের পর বাস্তবতার সাথে সেগুলোর মিল খুঁজে পায় না। Heart এর আবেগ থেকে সে এখন সাংসারিক বাস্তবতায় এসেছে, ব্রেনের জগৎ তার এখন খোলা। কিন্তু আবেগকে প্রথমে রেখে ব্রেনের কাজ চলে না। সে এটা এতদিনে বুঝতে শিখেছে জীবনের চরম বাস্তবতায়, যখন আবেগের জায়গাগুলো ফিকে হয়ে গেছে শফিকের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির সাংসারিক ভঙ্গুরতায়, তখন ব্রেন চলে এসেছে সম্মুখে। সত্য-মিথ্যা ও বৈধ-অবৈধ বিচারিক দৃষ্টি এখন পষ্ট। কারণ সে এখন ব্রেনকে আগে রেখেছে, সে এখন বাস্তবতায়। আবেগের জায়গা ফুরিয়ে গেছে। চিন্তাগুলো বাস্তবতায় ও ব্রেনের বিচারিক ক্ষমতায় শানিত হয়, আশংকামুক্ত থাকা যায়।

আজকের ভোগবাদি দুনিয়ায় প্রেমটা ভোগবাদিতার একটা রুপ মাত্র। সে এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে সম্পর্কের ভেতরের কষ্টের তীব্রতা ও গভীরতা। তার যখন ৪ বছরের মাথায় ছিন্ন ও সাংসারিক বিচ্ছিন্নতা-ভঙ্গুরতায় চলেছে এবং সবশেষ বিদায় হয় এই সম্পর্ক, তখন সে পরিবার বিজ্ঞানীদের কিছু গবেষণা হাতড়াচ্ছিল। পরিবার বিজ্ঞানীরা বলেছিল, তারা গবেষণা করে দেখেছে, যেসব দম্পতিরা বিয়ের পূর্বে শারীরিক সম্পর্কে জড়ায়, তাদের অধিকাংশের বিয়ে ৩ বছরেই ভেঙ্গে যায়।

কেন ভেঙ্গে যায়? ফারজানা এই সাইকোলজিও বের করে ফেলেছে জীবন্ত কষ্টগুলোর ক্ষত থেকে ।

সে একজন ছেলে মনো-দৈহিক বিজ্ঞানীর কাছে গিয়েছিল। সেই মনোবিজ্ঞানী কয়েকটি কথা শুনেই গড়গড় করে কিছু কথা বলে দিয়েছিল। প্রশ্ন ছিল ভালোবাসা, শরীর, বিয়ে, সাংসারিক তিক্ততা ও বিচ্ছেদ পরবর্তী বিভিন্ন কষ্ট নিয়ে।

মনোবিজ্ঞানীর করা কিছু প্রশ্ন ছিল ফারজানার প্রতি।

(১) প্রেমের সময় শারীরিক সম্পর্ক করেছিল কিনা?

(২) ছেলে ফারজানাকে প্রচূর স্বপ্ন দেখাতো কিনা যা তার সাধ্যরও অনেক দূরে?

(৩) এতোটা ইমোশনাল সাপোর্ট দিতো কিনা যা ফারজানা তার প্রতি ডিপেন্ডেন্ট হয়ে গিয়েছিল এবং এর সুযোগ নিয়েই সে শারীরিক সম্পর্ক করে।

মনোবিজ্ঞানীর কথাগুলো আজও তার কানে বাজে। তার কথাগুলো ছিল এরকম

“ছেলে এবং মেয়েদের অনেক ক্ষেত্রেই সাইকোলজি আলাদা। একটি মেয়ে চায় কেয়ারিং ব্যক্তি, যে তাকে সাপোর্ট দেবে, প্রশংসা করবে, শারীরিক যত্নের প্রতি যত্নশীল হবে এবং তার স্বপ্নগুলো পূরণে সহায়তা করবে। কিন্তু একটি ছেলের প্রথম সাইকোলজি থাকে মেয়ের দেহের প্রতি; সেটা কারো সাথে প্রেম করার ১০ দিনের মাথায়ও করতে পারে আবার ৩ বছর কেটে গেলেও সে যদি মেয়েকে ডিপেনডেন্ট ও বশে আনতে না পারে, তাও সে এই চেষ্টা চালিয়েই যাবে। ছেলেদেরকে এখানে প্রচন্ড ধৈর্যশীল পাবেন। এইখানেই মেয়েরা প্রথম ভুল করে। কাউকে বন্ধুর মত মনে করে, একটু আশার চিন্তায় ডিপেন্ডেন্ট হয়ে পড়ে। কিন্তু ছেলে ও মেয়ের সাইকোলজি যে ভিন্ন সেটা মেয়ের সাইকোলজি দিয়েতো আর ছেলের সাইকোলজি বোঝা সম্ভব নয়। একারণেই দেখবেন একটা ছেলে তার গার্লফ্রেন্ডকে সে নিজেসহ অন্যান্য বন্ধুদের দিয়ে ধর্ষণ করে। কারণ দেহ-ই প্রধান আর কাছে। আপনাকে যতটুকু কেয়ার করেছে, সবটুকুই তার প্রতি ডিপেন্ডেন্ট করে দেহ পাবার জন্য। স্বাভাবিকভাবে একটা বাহিরের মেয়ের প্রতি একটা ছেলের দৃষ্টি ও অন্তরকে সেক্স থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়, কখনই।

আপনি ভাবছেন আপনার প্রতি শফিক প্রচন্ড কেয়ারিং ছিল, কিন্তু সেটা আদতেই দেহের প্রতি। তাই আপনার দেহটি যতদিন ভোগ করতে দিয়েছেন, ততদিন সে নিয়েছে। কিন্তু আপনি যখন আপনার সেই আগের কেয়ারিং পাননি, শফিকের দেখানো স্বপ্ন ও বুলিগুলো আপনার কাছে ফাকা মনে হয়েছে ৪ বছরের প্রতিটি বাস্তবিকতায়, তখন আপনি আর থাকতে পারেন নি।

A

সেকারণেই আমরা দৈহিক-মনোবিজ্ঞানীরা কাউকে প্রেম করে বিয়ে করতে বলি না। তার কারণ হলো প্রেম করলে সাংসারিক জীবনের বাস্তবতায় যেসব উপাদান আপনি ফেস করবেন, সেগুলো ভুলেও জানতে পারেন না, জানার সুযোগ হয় না। আমরা ভালো ছেলেদের বৈশিষ্ট বলতে গেলে বলি কয়েকটি গুণ দেখতে

(১) ছেলে ভালো চরিত্রসম্পন্ন কিনা

(২) বন্ধু-বান্ধব ও তাদের চরিত্র কেমন, কাদের সাথে মেলামেশা করে

(৩) ছেলে দায়িত্ববান কিনা।

(৪) আর ক্ষেত্রবিশেষে বড় পরিবার হলে সার্বিক পরিবারের অবস্থা, সামগ্রিক পারিবারিক সহাবস্থান ও চরিত্র কেমন, দেখতে বলি।

আপনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলো এর ঠিক বিপরীত দিকগুলো। কারণ এগুলো আমরা সবাই দেখার চেষ্টা করি। কিন্তু প্রেমের ক্ষেত্রে যেহেতু এগুলো দেখা হয় না, সেজন্য দরকার এগুলোর ঠিক বিপরীতের লুকানো চিত্রাবলী। কারণ এই লোকানো চিন্ত্রাবলী-ই আপনাকে প্রতারণার কৌশল দেখাবে।

মনোবিজ্ঞানী এর বিপরীত জিনিসের প্রতিটি বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা শুরু করলেন যেগুলো প্রেমের সম্পর্কে জানা সম্ভব হয় না।

“ভালো চরিত্রসম্পন্ন কিনা। প্রেমের ক্ষেত্রে আপনি জানার সুযোগ পান না যে ছেলেটি ভালো কিনা। কারণ ছেলেটি আপনাকে চায়, আপনার দেহ ভোগ করতে চায়। সেজন্য সে এমন বিষয়াবলী আপনার সামনে উপস্থাপন করবে না যা কিনা আপনার মাঝে সন্দেহ জাগায়। প্রেমটা যদি আপনার ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর মাধ্যমে আসে, জেনেই রাখতে হবে যে সে আপনার বান্ধবীকে হাত করে, পটিয়েই আপনার দিকে এসেছে। সুতরাং সেদিক থেকে কোনো দিনই বাজে সিগনাল পাবেন না। আর যেসময় আপনি সমস্যায় পড়ে আপনার বান্ধবীকে দোষ দিতে যাবেন, সেও বলবে ‘তুই ই তো তার সাথে সারাদিন থাকিস, সারাক্ষণ কথা বলিস’ তোরই তো ভালো জানার কথা, আমাকে এত দোষ দিস কেন? ব্যাস, বান্ধবীর দায়িত্ব শেষ আর আপনার কষ্টের পালা শুরু।

সে যখন আপনার সাথে দেখা করতে আসে, ডেটিং এ আসে, কোথাও খাওয়াতে নিয়ে যায়, সে কতক্ষণ ধরে ফ্রেশ হতে থাকে এটা জানেন? না। আপনি বলতে পারেন এটা আমাদের জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলবে? তাহলে মনে রাখতে পারেন, যে ছেলে আপনার কাছে আসার জন্য ত্রিশ-চল্লিশ মিনিট ফ্রেশ হয়, সেই ছেলে রুমে যেভাবে থাকে, তার অপরিচ্ছন্নতার কথা, দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার সাথে শেষ হওয়ার আগেই যে চলে আসে, ভেজা থাকে তার আন্ডারপ্যান্ট প্রস্রাবে। সে যখন আপনার সাথে দেখা করতে যায় দেখতে পান সেরা পোষাকটি, সুন্দর ফ্রেশনারের গন্ধে আন্দোলিত সুবাতাস যা আপনাকে অভিভূত করে রাখে, আপনার মনকে প্রভুল্ল করে দেয়। সেই প্রেম জীবনের সমস্ত দিনগুলো ফুরিয়ে বিয়ের এক সপ্তাহের মাথায় যখন ছেলের অভিনয় জীবন থেকে বাস্তবতার জীবন ফিরে আসে, তখন থেকেই ফিকে হতে থাকে থাকে জীবন। তার বাস্তবতা আপনাকে অস্থিরতায় নিমগ্ন রাখে কষ্টগুলোকে স্বাগত জানানোর জন্য। ভালোবাসার কারো থেকে কেউ একটুও কষ্ট সহ্য করতে পারে না। তাই তার পূর্ব জীবনের সাথে এই জীবনের বাস্তবতা যখন আপনাকে কষ্ট দেয়, কিছু বলতে গেলেও কষ্টগুলো কমে না। বাড়তে থাকে দিনদিন। কারণ ছেলেরা আর যাইহোক, মেয়েদের ফাপড় শুনতে রাজি নয়।

আর সবচেয়ে কুৎসিত ও বড় বিষয় হলো সে তার সমস্ত নেগেটিভ বিষয়াবলী গোপন রাখে, সকল পজিটিভ জিনিস আপনার সম্মুখে উন্মুক্ত থাকে। এর জন্যই একটা মেয়ে দেখে স্বপ্নরাজ্য নেমে এসেছে তার কাছে। অথচ বিয়ের সাথে বাস্তবিক জীবনে যখন একটুখানিও নেগেটিভ জিনিস দেখতে পায়, সহ্য হয় না। রাগারাগি হয়। ভালোবাসার মানুষ থেকে কেউ রাগারাগি পছন্দ করে না। ছেলেরা তো নয়-ই। সেখানে একটা মেয়ে হুকুমদাতা হতেই পারে না। ভুল সে করেছে তাতে কি। বিয়ে করেছে তো কি হয়েছে, তার টাকা-পয়সায় অন্যের হুকুম চলবে না। ব্যাস, সবুজ জীবন ধূসরতায় মলিন হতে থাকে।

এসব কারণেই আমরা মনো-দৈহিক বিজ্ঞানীরা বলি যেখানে প্রেমে Blind Heart দিয়ে সব কিছু দেখে, সেখানে আমরা ব্রেন দিয়ে, খোঁজ-খবর নিয়ে দেখতে বলি – ছেলে ভালো চরিত্রসম্পন্ন কিনা”।

মনোবিজ্ঞানী এবার দ্বিতীয় দিকটি বর্ণনা করা শুরু করলেন এভাবে,

“বন্ধু বলতে যে যাদের সাথে সে চলাফেরা করে। কারণ বন্ধুরা একই চিন্তা ও আদর্শের হয়ে থাকে। এজন্য যদি একজন বন্ধু সম্পর্কেও আপনি খুবই ভালভাবে বোঝতে পারেন, সেটাও অনেক বড় বিষয়। কিন্তু প্রেমে সমস্যা হলো, যেহেতু আপনি রুমান্টিকতায় ভোগেন, তাই এগুলো জানার সুযোগ হয় না। আর একটি ছেলে এতই ধূর্ত যে আপনি তার সাথে যখনই দেখা করতে যান, তার বন্ধুরা তাকে সাহায্য করবেই। এজন্য এদের থেকে সত্যিকার তথ্য কখনই পাবেন না। কারণ ঐ ছেলেরাও জানে তাদের বন্ধুর উদ্দেশ্য একটিই- মেয়েটির শরীর। তাদের কমন সাইকোলজির জন্যই অন্য বন্ধুকে বাঁধা দেওয়ার বিপরীতে আরো উৎসাহ দেয়। এর বিপরীতে আপনার যে বান্ধবীকে হাত করে, তার প্রশংসা করে, তাকে গিফট দিয়ে, সুন্দর করে ‘আপু’ বলে আপনাকে হাত করেছে, সেও যেহেতু মেয়ে এবং রুমান্টিকতায় ভুগে বয়সের সাথে আবেগের খেলায়, সেও নারী সাইকোলজি দিয়ে প্রথমেই আচ করতে পারে না এই ছেলেটি শরীর ভোগ শেষেই চলে যাবে এবং তখন একজন নারীর কি অবস্থা হয়। সার্বিকভাবেই প্রেমের রাস্তায় কখনই বন্ধুদের প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবেন না বা আপনিও হয়তো তাদের অবস্থা দেখার জন্য ঘুরবেন না। কারণ আপনি Heart দিয়ে দেখেন, ব্রেন দিয়ে নয়। আপনার মোহগ্রস্থতা একজনকে ঘিরে, যে আপনাকে এই মোহের টুপে ফেলতে সবই করেছে, তাই আপনি অন্ধ, আপনার আবেগ এমনিতেই ব্রেনহীনভাবে অন্ধত্বে ঢুবে আছে”।

মনোবিজ্ঞানী কথাগুলো শেষ হওয়ার পর ফারজানা নিজের স্মৃতিতে ফিরে যায়। তার জীবনের প্রতিটি বাস্তবতার সাথে কেমন যেন হুবহু অধ্যায়ে অধ্যায়ে নয়, প্রতিটি শব্দের সাথে আদ্যোপান্ত জীবন্ত মনে হয় কথাগুলো। যেন তার জীবনের পূর্ব ও এখনকার দুংখের জীবন্ত চিত্রফলা একে দিচ্ছে একজন নিপুন চিত্রকলা।

মনোবিজ্ঞানীর কথায় সে ফিরে আসে স্মৃতির গভীর খাদ থেকে। তার দীর্ঘ নিঃশ্বাস-ও মনোবিজ্ঞানীর অজানা নয়। তার চোখের চিকচিক বালুকনাগুলোও অতি পরিচিত। এ পানি সাধারণ পানি নয় যা তীব্র ঠান্ডায় জমাট হয়ে যায়। এ এমন পানি যা বরফে জমাট বাঁধে না। কেননা সেগুলো হয়তো হৃদয় থেকে আসা কষ্ট বা তীব্র আনন্দের ফুয়ারা হয় এই দুটি চোখ। ফারজানার চোখের চিকচিক পানির সাথে তার চেহারার অভিব্যক্তিই পষ্ট করে দেয় সেগুলো কষ্টগুলোর ফুয়ারা থেকেই বেরিয়ে এসেছে।

মনোবিজ্ঞানী এবার বলতে শুরু করে,

“প্রতিটি সুবিধা নেওয়ার পেছনে থাকে দায়িত্ববোধ। আপনি কেবল সুবিধাই নেবেন কিন্তু দায়িত্ব নেবেন না, সেটা নীতিহীনতার-ই ফল। এজন্য একজন ব্যক্তি যখন বিয়ের মাধ্যমে সম্পর্ককে সামাজিক ও পারিবারিক ভিত্তি করে নেয়, তখন সেখানে ভোগ-সুবিধা ও দায়িত্ব উভয় থাকে। এজন্য এখানে নীতি কাজ করে, আইন চলে। আর নীতিবান এই লোকেরাও সুখে থাকার প্রয়াস পায়। কিন্তু প্রেমে যেহেতু দায়িত্ব নেই, আদতে দায়িত্বহীন নীতিবর্জিত কাজ সেখানে ঘটলে আপনি না পাবেন সামাজিক সহায়তা আর না পারিবারিক সহায়তা। দায়িত্বহীন এমন প্রতিটি পরিণত ভোগেই রয়েছে নীতিবর্জিতা ও অবৈধতা। প্রেম কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা নৈতিক বৈধ নীতি নয়। সেজন্য এখানে অধিকারের কথা আসে না, আসে না নৈতিকতা বা বৈধ-অবৈধতার কথাও। এজন্য এখানে শারীরিক মেলামেশার পরেও যারা নীতিকথা দিয়ে একটা ছেলেকে আটকাতে চায়, বিয়ের জন্য চাপ দেয়, এদের সমস্যা হলো আবেগের অনুপলব্ধির মধ্য দিয়ে যখন সর্বনাশ শুরু হয়েছে, তখন অবৈধ জিনিসে বৈধতা খোঁজা, নীতিবর্জিতার মাঝে নীতি খোঁজা আবেগের মনস্তাত্ত্বিক রোগে ভোগে পরিণত হয়।

একটি ছেলে যখন বিয়ের পূর্বেই দায়িত্ব না নিয়েই শারীরিক সম্পর্ক করেছে, আপনার কাছে দাবি করেছে আপনার শরীরকে, তখনই আপনার জানা উচিত এই ছেলে বিয়ের আগেও নীতিবর্জিত, চরিত্রহীন আর বিয়ের পরেও একটি কবুলের মাধ্যমেই চরিত্র ঠিক হয়ে যাবে না। এজন্য এই ছেলেকে চিনতে, এর থেকে কষ্টগুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে, আপনাকে কমপক্ষে তিনটি বছর সময় নিতে হয় বিচ্ছেদের জন্য!! আদতে বিচ্ছেদের জন্য সময় নেয় না কেউ, সময় নেয় কষ্টগুলো পাবার জন্য। কষ্টগুলো পেয়ে যখন সহ্য সীমার একান্ত বাহিরে চলে যায়, সেই তিক্ততায় বিচ্ছেদ ঘটে। কারণ ছেলে যে নীতিহীন সেটা বুঝার জন্য তিন বছর সময় লাগেনি মেয়েটির, সেটা কিছুদিন পরেই বুঝেছে। ”

ফারজানার স্বপ্ন ছিল, আশাও ছিল। তার ইচ্ছা ছিল ছেলে-মেয়েদেরকে এই মনো-দৈহিক বৈজ্ঞানিক সাইকোলজিস্টের মত বানাবে। অবৈধতার মধ্য দিয়ে শারীরিক সুখের ভেতরে যে কি বাস্তবিক কষ্ট প্রতীক্ষা করছে সেগুলো জানাবে তার মত মানুষদের। সে কেবল চেম্বার বসে থাকবে না, সারা দেশের মানুষকে নিয়ে কাজ করবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, ক্যাম্পেইন করবে নারীদের নিয়ে, সচেতনার মিডিয়া হিসেবে তাদের দুটি সন্তানই যথেষ্ঠ হবে। দেশে নারীদের কষ্টগুলোকে সে দেখতে চায় না। কারণ এরাই হয়তো আমাদের কেউ মা, কেউ বা বোন। সেজন্যই হয়তো ফারজানা তার ছেলে-মেয়ের নামগুলো রেখেছিল স্বপ্ন ও আশা। ফারজানার স্বপ্ন ছিল, আশাও ছিল – দেশে একদিন তার স্বপ্ন ও আশাগুলো ফুটে উঠবে। কিন্ত ফারজানার সেই সেই স্বপ্নগুলো ট্রাকের তলায় আর স্বপ্ন ও আশারা মাটির সাথে রক্তে মিছিলে একাত্ব হয়ে ঘুমিয়ে গেছে।

প্রত্যাশাদের মধ্য দিয়েই একদিন বের হবে স্বপ্ন ও আশা। স্বপ্ন ও আশারাই একদিন আজকের নিথর দেহের স্বপ্ন ও আশাদের বাস্তবিক জীবনের নৈতিকতার আইকন হয়ে উঠবে। সেদিন হয়তো ক্ষমতাশীল জালিমদের কাছে বিচার চাইতে হবে না আমাদের। আমাদের বিচার আমরাই করবো, জালিমদের থেকে কোনো সাক্ষী নয়, বরং মজলুমের সাক্ষ্যই চূড়ান্ত।

 

আর্টিকেলটির পিডিএফ ডাউনলোড করতে পারেন এখান থেকে – https://goo.gl/dBpMPt

পোস্টটি ৫৩৮ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
২ টি মন্তব্য
২ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. সত্য কথা গুলি কত সহজ সাবলিল ভাষায় বলে ফেললেন! ধন্যবাদ এত সুন্দর লেখা উপহার দেবার জন্য। একটি কথা, শেষে স্বপ্ন আর আশাকে মেরে ফেললেন কেন? :)

  2. স্বপ্ন আর আশাকে মেরেছে এই সমাজেরই কথিত সার্টিফিকটধারী শিক্ষিত নামের মূর্খরা। আর আমি চেয়েছি তাদের মৃত্যুর রক্ত থেকে পূণরুজ্জীবিত করে তুলতে।

    ধন্যবাদ ভাই।

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.